গাঁয়ের চণ্ডীমণ্ডপের আর সেই দিন নেই! মোড়লরা আগে সেখানেই আসত, গাঁয়ের লোকজন আসত, আড্ডা গল্প তামাক সালিশি সবই হত, মান্যিগন্যি লোকেরা যা বলত বাকিরা তা মেনেও নিত। তারপর হঠাত নব্য দুনম্বরী দুশ্চরিত্র একটা লোক স্রেফ পয়সার জোরে সব নিজের কব্জা করে নিল। নতুন এই শর্মাকে পুরনোপন্থীরা কিছুতেই মানতে পারে না। এই নিয়েই আস্ত একটা উপন্যাস লিখেছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই উপন্যাসই তাঁকে এনে দিয়েছিল ভারতীয় সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মাননা। শুধু তারাশঙ্করই বা কেন? রবীন্দ্রনাথ, যার প্রতিভার বিস্তার ব্রহ্মাণ্ডের প্রায় কিছুই বাকি রাখেনি, সেই তিনিও ১৯৩২ সালে ভেবেছিলেন, এবার তাঁর সরে দাঁড়ানো উচিত। কবিগুরুর দৌহিত্র নীতুকে পাঠানো হয়েছিল জার্মানিতে, ছাপাখানার কাজ শেখার জন্য। '৩২ সালের জুন মাস নাগাদ খবর এল, তাঁর সেই একমাত্র দৌহিত্রের রোগে ভুগে মৃত্যু হয়েছে। এদিকে আর্থিক অবস্থার সমস্যায় তাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের পদ নিতে হয়েছে। কবিগুরু ভাবলেন, আর কদ্দিন কবিতা লিখবেন? লিখে ফেললেন, "পরিশেষ!" সুকুমার সেন বলছেন, "পরিশেষ বইটিকে এক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কবিজীবনস্মৃতি বলা যায়।"

কিন্তু তিনি তো বিশ্বকবি! তিনি নিজেই নিজের অনুপ্রেরণা! লেখা শেষ হয়ে গিয়ে যদি কিছু বাকি পড়ে যায়, আমরা 'পুনশ্চ' দিয়ে নিচে লিখে দিই। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, 'পুনশ্চ!' তিনি পুরনো, তাঁর কবিতা সেকেলে -বলে বুদ্ধদেব বসুদের কল্লোলগোষ্ঠী যত হইচই করেছিল, তার সমস্ত জবাব এসে গেল তাতে। রবীন্দ্রনাথ বোঝালেন, তাঁর যাবতীয় লেখার শেষে একটা "পুনশ্চ"-ই যথেষ্ট, স্বঘোষিত বোদলেয়রপন্থী আধুনিকদের তম্বি থামাতে।

 

এইভাবে যাওয়ার সময় হলে বিদায় নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের লক্ষণ, কারণ সেটাই বোধ হয় উত্তরসূরির প্রতি পূর্বসুরীর শ্রেষ্ঠ উপহার। জন গ্রিশ্যামের বিখ্যাত উপন্যাস 'দ্য টেস্টামেন্ট'-এর বিলিওনেয়ার নায়ক সেটাই করে যাননি, ফলে বিস্তর জলঘোলা হল। চলে যাওয়ার সময়ে না গেলে বা গ্যাঁট হয়ে বসে থাকলে যে কি হয়, তার ভুরি ভুরি উদাহরণ মেলে ভারতীয় রাজনীতিতে।

অনেকসময় চলে গিয়েও রাশ নিজের হাতে রাখার লোভ ছাড়তে পারেননা অনেকে। রতন টাটা যেমন। ভারতের বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠীর কর্ণধার পদ থেকে রিটায়ার করেও থেকে গিয়েছিলেন চেয়ারম্যান 'এমেরিটাস' হয়ে, কলকাঠি নাড়ছিলেন সর্বত্রই। ফল ভুগতে হল হাজার হাজার মানুষকে। একে তো টাটা বনাম সাইরাস দ্বৈরথ, তার ওপর কয়েকশো কোটি টাকার ক্ষতি। উল্টোদিকে ইনফোসিস প্রধান নারায়ণমূর্তি বিশাল সিক্কাকে সিইও করেই কাজ সেরেছেন, ছড়ি ঘোরাতে যাননি। ফারাক আজ সবাই দেখছেন।

ফলে, আসার মত যাওয়ার সময়টা আন্দাজ করাও হল একজাতের বিচক্ষণতা। সেটা না থাকলে জীবনে যতই কীর্তি থাকুক, সবই একসময় ছড়িয়ে ছত্তিরিশ হয়ে যায়। যেমন ধরা যাক লালকৃষ্ণ আডবাণী। ২০০৯ লোকসভায় এনডিএ হেরে যাওয়ার পরেই সবাই বলাবলি করছিল, এবার তাঁর সরে যাওয়া উচিত, দায়িত্ব নিক নতুন মুখ। এককালের লৌহমানব আডবাণী নিমরাজি হয়েও সরতে রাজি হলেন না। জোর করে বিরোধী দলনেতার পদ তাঁর হাত থেকে সরিয়ে দেওয়া হল সুষমাকে। ২০১৪ লোকসভা ভোট, ইউপিএ টুজি স্পেকট্রাম, কোলব্লক, কমনওয়েলথ গেমস সহ হাজারটা দূর্নীতির অভিযোগে টলমল করছে, অশোক রোডে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক বসল। গুজরাট মডেলের হাত ধরে উঠে এলেন ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতির নরেন্দ্র মোদী। সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের রাজ্য-সভাপতি থেকে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি হলেন অমিত শাহ, ক্ষমতায় এলেন রাজনাথ-জেটলিরা। আডবাণী বা মুরলীমনোহর জোশীর নাম কেউ নিল না। গোঁসা করলেন আডবাণী-ঘনিষ্ঠ সুষমা, তাঁকেও মোদী শিবির পাত্তা দিল না। শেষে 'মার্গদর্শক' নামক একটি নাম-কা-ওয়াস্তে পদ তৈরি করে কার্যত বহু যুদ্ধের দুই ঘোড়াকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিলেন মোদী-অমিত, লোকসভা ভোটে বিপুল ভোটে জিতে ক্ষমতায় এল বিজেপি। তারপর আজকাল আডবাণী মাঝেমাঝে প্রেসে দু'চারটে কোট দেওয়া ছাড়া কোনও খবরেই নেই।

 

বয়স হলেও ক্ষমতা না ছাড়ার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ বোধ করি তামিল রাজনীতির "কলাইনার" করুণানিধি। গত বিধানসভা ভোটেও ডিএমকের মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হতে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন কলাইনার, ৯২ বছর বয়েসে! তিনি জিতেছেন, দল জেতেনি। ভাগ্যিস জেতেনি! অবশ্য বেশি বয়েসে প্রধানমন্ত্রী হবার রেকর্ডও আছে। ১৯৭৭ সালের ২৩ মার্চ ৮১ বছর বয়েসে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন মোরারজি দেশাই।

সেইজন্যই বোধ হয় মহেন্দ্র সিং ধোনি সব দিক দিয়ে ব্যতিক্রম। যেমন টেস্টে ব্যর্থ হয়ে সবার অলক্ষ্যে ছেড়ে দিয়েছিলেন টেস্ট ক্যাপ, সেরকম যেখানে তিনি অবিসংবাদী সম্রাট, সেই ওয়ান ডে'র ক্যাপ্টেন্সিও তিনি সবাইকে অবাক করে ছেড়ে দিলেন। তাবড় ক্রিকেটলিখিয়েরা ভেবেছিল, ২০১৯ বিশ্বকাপে ক্যাপ্টেন হিসেবে শেষ চেষ্টা করবেন ধোনি। কিন্তু ধোনি বোঝালেন, উত্তরসূরিকে জায়গা দেওয়াটাই হল প্রকৃত অধিনায়কের কাজ!

সেইজন্যই বোধ হয় বলে, নায়ক বা নেতা সবাই হয়, ক্যাপ্টেন হাতেগোনা।

 

"যেতে পারি কিন্তু কেন যাব" বলে গোঁ ধরে বসে থাকলে কি হয়, তার জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে এই মুহুর্তে সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছেন মুলায়ম সিং যাদব। এককালে ভারতীয় রাজনীতির কলকাঠি নাড়তেন তিনি, ক্রাইসিস হলেই মুলায়মের দিকে তাকিয়ে থাকত সবাই। কিন্তু আজ লখনউয়ে তাঁর বিখ্যাত বিক্রমাদিত্য মার্গের বাড়ির দারোয়ান এক চেনা সাংবাদিকের কাছে দুঃখ করছেন, "কিছুদিন আগেও বাড়ির সামনে গাড়ির লাইন পড়ত, সবাই দেখা করতে আসত নেতাজির সঙ্গে। এখন এই ভোটের আগেও কেউ খবর নিতে আসছে না! অখিলেশ ভাইয়া কা জমানা হ্যায়, দলের সেজ নেতারাও এখন অখিলেশের দিকে হত্যে দিচ্ছে!" অথচ মুলায়ম সম্পর্কে বলা হত, তিনি নাকি আকাশে হেলিকপ্টারে চেপে উড়ে যেতে যেতে নিচের কোন গ্রামের কি নাম বলে দিতে পারতেন!

অতএব, জায়গা দখল করতে পারার মত জায়গা ছেড়ে দেওয়াটাও বিচক্ষণতা। সবাই সেটা পারে না। রাজনীতিতে বিচক্ষণতার বাকি সব পরীক্ষায় লেটার মার্কস পেয়ে পাস করা ছাত্রটি ফাইনালে ডাহা ফেল করে আরও একবার এটা প্রমাণ করে দিয়ে গেলেন।

বিদায় নেওয়া ও মুচকি হাসি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments