রাজাঃ আজ থেকে পাঠশালা বন্ধ
শিক্ষামন্ত্রীঃ পাঠশালা – ?
রাজাঃ তুমি কি কালা? আজ থেকে পাঠশালা বন্ধ।
শিক্ষামন্ত্রীঃ যে আজ্ঞা খোদাবন্দ।
রাজাঃ কী নাম যেন পণ্ডিতের?
শিক্ষামন্ত্রীঃ উদয়ন, মহারাজ।
রাজাঃ হুঁ – তারে বলবে সে পড়ায়েছে ঢের। এরা যত বেশী পড়ে, তত বেশী জানে, তত কম মানে। ঠিক কিনা?
শিক্ষামন্ত্রীঃ ঠিক ঠিক।
রাজাঃ আর ঐ পুরাতন পুঁথিটুঁথি যা কিছু আছে পণ্ডিত টণ্ডীতের কাছে, সব করে ফেল ভস্ম।
শিক্ষামন্ত্রীঃ অতি অবশ্য, মহারাজ। 
রাজাঃ আর পুরাণ, কাব্য, বেদ, স্মৃতি, সংহিতা, ইতিহাস -
মোসাহেবঃ আর যত আছে ছাই পাঁশ -
রাজাঃ সব দগ্ধ করে ফেল।
মোসাহেবঃ তাতে কী আর আর এসে গেল? 

পাঠশালার ওপর হীরকরাজার এই তোপধ্বনিতে শিক্ষামন্ত্রীমশাই এত আশ্চর্য হয়েছিলেন কেন তা বোঝা মুশকিল। সেলুলয়েডের পর্দা থেকে ২০১৮ সালের ভারতবর্ষে উঁকি মারলে তিনি বুঝতে পারতেন পড়াশোনার ওপর স্বৈরশাসকদের একটা জাতক্রোধ আছে। কারণটাও তো ঐ হীরক রাজাই বলে দিয়েছেন, "এরা যত বেশী পড়ে, তত বেশী জানে, তত কম মানে।" তবে কিনা হীরক রাজার সময় তো আর নেই যে মন্ত্রী মশাই পেয়াদা নিয়ে গিয়ে সোজা পাঠশালায় তালা মেরে দেবেন। বিশেষত গণতন্ত্রের ভরং টাও জ্বালাতনের। তাই পড়াশোনার পাট চোকানোর জন্যে আজকের স্বৈরশাসকদের নানা হ্যাপা পোয়াতে হয়।

এই রাজ্যের নাগরিকরা পঞ্চায়েতে ভোট দিতে গিয়ে দেখেছিলেন রাস্তায় উন্নয়ন দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভোটের পালা মেটার পর সদ্য স্কুল উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীরা কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে দেখছে সেখানেও দরজার সামনে খাড়া হয়ে আছে উন্নয়ন। উন্নয়ন কি আর মাগনায় মেলে! তাই ভূগোল অনার্সের সিট বিক্রী হচ্ছে পঁয়ষট্টি হাজার টাকায়, ইংরেজির দাম একটু কম – মাত্রই তিরিশ হাজার। ভুক্তভোগীরা জানেন উন্নয়ন হঠাৎ করে মাথা তোলেনি। গত পাঁচ-ছয় বছর ধরেই ভালো নম্বর পাওয়াটা আর পছন্দের কলেজে ভর্তি হতে পারার মাপকাঠি নয়। নম্বরের চেয়েও বড় বিষয় হল কে কতটা খরচ করতে পারলেন, কে কত বড় নেতার নাগাল পেলেন এই গুলো। এই সব নেতারা কোন রাজনৈতিক দলের পদ আলো করে আছেন তা বলার জন্য অবশ্য কোন পুরস্কার নেই। লোকেও এখন ছোটখাটো দুর্নীতিকে সইয়ে নিয়েছে। জমির মিউটেশন করতে, পুলিস ভেরিফিকেশন করতে পয়সা দিতে যদি আপত্তি না থাকে কলেজে ভর্তিতে টাকা দিতেই বা আপত্তি থাকবে কেন? আজ হঠাৎ ভর্তিতে টাকার খেলা নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে আলোড়ন এবং তার পরিণামে মন্ত্রীদের কলেজ পরিদর্শন এবং আচমকা কাউন্সেলিং ও ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন বন্ধ করে সরাসরি ভর্তি নেওয়ার সরকারি নির্দেশনামা জারির পেছনের কারণ সম্ভবতঃ এই, যে টাকার অঙ্কটা ক্রমশ মধ্যবিত্তর নাগালের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তোলাবাজি, গুণ্ডামিতে শাসকদের অরুচি আছে বলে কখনো মনে হয়নি। সেই অধ্যক্ষ নিগ্রহকে ছোট্ট ছেলেদের দুষ্টুমি বলাই হোক বা অধ্যক্ষাকে তাজা নেতার জগ ছুঁড়ে মারা কিংবা প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির ল্যাবোরেটরিতে তাণ্ডব চালানো। সাম্প্রতি আবার সর্বাধিনায়িকার নির্দেশ এসেছে তোলাবাজির টাকার ৭৫% দলের কাছে জমা দিতে হবে!

কলেজের চিত্র যদি এই হয় তো স্কুলশিক্ষার ছবি আরো ভয়ানক। স্কুলের বাচ্ছারা বই, সাইকেল, জুতো, জামা, কন্যাশ্রীর টাকা সব পাচ্ছে, খালি শিক্ষক বাদ দিয়ে। কারণ সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ দীর্ঘদিন বন্ধ। পাশাপাশি আরেকটা ঘটনা ঘটছে। কলকাতা থেকে ক্রমশ মফস্বলেও ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠছে অজস্র বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। এইসব স্কুলে ভর্তির আগে বাচ্ছার পাশাপাশি তার বাবা-মার ইন্টারভিউ নেওয়া হয়। বলে দেওয়া হয় খবরদার যেন বাড়িতে বাংলায় কথা না বলে। আর অন্যদিকে সরকারি ও আধা সরকারি স্কুলগুলোতে ছাত্র সংখ্যা পড়তির দিকে। অনেক স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যেসমস্ত পরিবারের পক্ষে বেসরকারি স্কুলের বিপুল খরচের বোঝা বহন করা সম্ভব নয় শুধুমাত্র তারাই সন্তানকে সরকারি/আধা সরকারি স্কুলে পাঠাচ্ছে।  এই বেসরকারি স্কুল গুলো ভর্তির সময় বাচ্ছার বাবা-মার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের পাশাপাশি পেটের বিদ্যেটাও যাচাই করে নেয়। আর্থিকভাবে অসচ্ছল ঘরের প্রথম প্রজন্মের কোন শিক্ষার্থীর জন্য এইসব স্কুলের দরজা বন্ধ। তাদের জন্য রইল সেই সরকারি স্কুল। অর্থাৎ আগে যে সুযোগ ছিল একই ক্লাসে চিকিৎসকের ছেলের সঙ্গে সব্জিবিক্রেতার ছেলেও পড়বে, সে ছবি ধীরে ধীরে মিলিয়ে আসছে। "মৌলিক অধিকার" থেকে "পণ্য"এ শিক্ষার উত্তরণের পথে আর কোন বাধা থাকছে না। 

প্রায়শই বলা হয়ে থাকে পূর্বতন সরকার প্রাথমিক থেকে ইংরেজি তুলে দিয়ে একটা গোটা প্রজন্মকে পঙ্গু করে দিয়েছে। তো সেই পঙ্গু প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এতদিনে অনেকেই স্বীয় যোগ্যতায় দেশ-বিদেশের নানা উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। বাকিদের মধ্যে যাঁরা রাজ্যের মধ্যেই শিক্ষকতার বৃত্তি বেছে নিতে চান তাঁরা কি করবেন? সে এক দিন ছিল যখন ফি বছর স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে তাঁরা বিভিন্ন স্কুলে নিযুক্ত হতেন। এখন সে বালাই গেছে। তাঁদের গন্তব্যও অতএব বেসরকারি স্কুল, যেখানে বেতন যৎসামান্য, কাজের নিরাপত্তা নেই, চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য, প্রোমোশনের জন্য প্রতি পদে স্কুল কর্তৃপক্ষের তোষামোদি করা ছাড়া উপায় থাকে না। সেখানে তাঁরা শিক্ষক কম, শ্রমিক বেশী। জানি না শিক্ষকদের ক্ষেতে-কারখানায় পাঠিয়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা চেয়ারম্যান মাও এসব দেখে পুলকিত হতেন কি না। তো এহেন ভালো শিক্ষকদের শ্রমিক হিসেবে পেত কি বেসরকারি স্কুলগুলো, যদি না সরকারি শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকত? এর পাশাপাশি সরকার বাহাদুর আরেকটা কাজও করেছেন, তা হল কোনরকম বিকল্প মূল্যায়নের ব্যবস্থা না করেই পাশফেল প্রথা তুলে দেওয়া। যারা মনে করেন শিক্ষার বেসরকারীকরণ একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তাঁরা আসলে মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে লাটে তুলে দিয়ে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করা একটা সুচিন্তিত সরকারি পরিকল্পনা। হীরকরাজা থাকলে বুঝতেন পাঠশালাগুলোকে বন্ধ না করে বাজারের হাতে তুলে দিলেই উদয়ন পণ্ডিতরা জব্দ হবে।  

শুধু শিক্ষক নিয়োগ বললে ভুল হবে রাজ্যে সবরকম সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়াই কার্যত থমকে। কিছু শূণ্যপদ পূরণ করা হচ্ছে ঠিকার ভিত্তিতে। আর বেসরকারি কল কারখানা গুলোও একে একে ঝাঁপ গোটাচ্ছে, নতুন শিল্পর কথা না বলাই ভালো। তাহলে যারা স্কুল কলেজ থেকে পাশ করে বেরোচ্ছে তারা কি করবে? দেশনেতারা কেউ বলছেন চপ বিক্রী করতে, কেউ বলছেন পকোড়া ভাজতে তো কেউ পরামর্শ দিচ্ছেন পানের দোকান দিতে। চপ পকোড়া পানের ব্যবসায় সুবিধে করতে না পেরে কেউ যদি তোলাবাজিকেই রোজগারের পন্থা হিসেবে বেছে নেয় তো দোষ দেবো কাকে? এই লুম্পেন-সমাজবিরোধীরাই আবার কিছু রাজনৈতিক দলের মূল ক্যাডারবেস। বেশী পড়াশোনা করলে, নিজস্ব চিন্তাভাবনা থাকলে, মূল্যবোধ ও শিরদাঁড়া সোজা থাকলে এই রাজনৈতিক দলগুলোকে সহ্য করা কঠিন। কিন্তু বামপন্থীরা? সংবাদমাধ্যমের নিদানে সাইনবোর্ড তকমা নিয়ে, ভোটের অঙ্কে ক্রমাগত জমি হারিয়ে, শাসকপক্ষের লাগাতার ফিজিকাল এলিমিনেশানের সামনে পড়েও ভেঙে পড়া সংগঠন নিয়ে তাঁরা মাটি কামড়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন নানা ইস্যুতে। অথচ এসএসসি নিয়োগের দাবীতে বা ভর্তি দুর্নীতিতে কিছু মিটিং মিছিল বাদ দিলে শিক্ষার সামগ্রিক সংকট নিয়ে তাঁদেরও কোন সিরিয়াস ভাবনাচিন্তা শোনা যাচ্ছে না।

তবু অন্ধকারের মধ্যেও তো আলোর রেখা থাকে। ক্যাম্পাসে ট্যাঙ্ক বসিয়ে, "দেশদ্রোহী"র তকমা দিয়েও বশে আনানো যায়নি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের। কেন্দ্রের গৈরিক ফ্যাসিস্টরা চার বছরের "অপ্রতিরোধ্য" বিজয়রথ একমাত্র ছাত্রছাত্রীদের সামনেই বারবার প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। প্রবেশিকা বন্ধ করে যাদবপুরের উৎকর্ষ ধংস করার চেষ্টা করার বিরুদ্ধে লড়াইয়েই রয়েছে ছাত্রছাত্রীরা। পাঠশালা বন্ধ করে দিয়েও উদয়ন পণ্ডিতের ছাত্রদের কিন্তু দমানো যায়নি।

  

বিদ্যালাভে লোকসান, নাই অর্থ নাই মান
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments