বাঙালি যখনি তাদের ক্ষুদ্র মুলুকে শুয়ে-বসে কিছু ভেবেছে বা করেছে তার মানদন্ড বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের লেভেলের নিচে কোনদিন নামেনি। শীত পড়ছে না কেন দুনিয়ার তামাম জায়গায়, এই প্রশ্ন করলে, কেউ বলবে ‘এটা আমাদের দুর্ভাগ্য’ আবার কেউ হয়ত বলতে পারে ‘এ আমাদেরই পাপের ফল ‘ ! একটু ভূগোল জানা শিক্ষিত ব্যক্তি হলে মরশুমী বায়ুর গতি প্রকৃতি নিয়ে দু চারটে জ্ঞানের কথাও ঝেড়ে দিতে পারে। কিন্ত আমাদের এখানে, এই প্রশ্ন ক্লাস ফোরে পরা বল্টু কেও জিজ্ঞেস করলে ,সে বলবে, ” গ্লোবাল ওয়ার্মিং, পুনু কাকু সেদিন বলছিলো !” সুধু এখানেই সে থেমে থাকবেনা , “আরও বলছিল, এর পর নাকি কলকাতা জলের নিচে তলিয়ে যাবে। তাই বাবাকে বল এখানকার ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে দিয়ে সময় থাকতে থাকতে তিব্বতে কিছু জমি লিজে নিয়ে রাখতে। ” ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় পুরো ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশবিদ্বেষী হাওয়ায় ভাসছে, গান্ধীজির পরের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে পুরো দুনিয়া তখনও বাঙালি কিন্ত চার্চিলের বিরুদ্ধে স্তালিনের রাশিয়া না হিটলারের জার্মানি, কোনটা বেশি গ্লোবালি যুতসই হবে, সেটা নিয়ে ডিবেট করে যাচ্ছে। আমাদের পুরো আবহাওয়াটাই এতটা বিশ্বকেন্দ্রিক যে কর্পোরেশনের কলে জল না এলে ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে ধরে বিপিন খুড়ো দুটো কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়েনা , ” বলি ওদিকে মেরুপ্রদেশের সব বরফ গলে তো জল হয়ে গেলো। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী সেই জল তো এই কলকাতার ওপর দিয়েই বঙ্গোপসাগরে যাওয়ার কথা, তা পূনরবিন্যাসের পর আমাদের ওয়ার্ডটা কি দিনাজপুর জেলায় পরে গেল নাকি?”

ছোটবেলায় দেখতাম কত মানুষের বাড়িতে টিভি নেই আর থাকলেও তখন তাতে তখনও কোনো বিদেশী চ্যানেল দেখা যায়না। কিন্ত ওই এক ভাঙ্গা রেডিওর মাথায় থাপ্পড় ও নবে মোচড় মেরে মেরে বিবিসি ধরার কি উত্সাহ। পাড়ার মোড় থেকে লোকাল ট্রেনের বগিতে, সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে যাওয়া নিয়ে কি তীব্র উদ্বেগ আর তীব্রতর তাদের বিশ্লেষণ, কিচ্ছু বুঝতে পারতাম না যে কি নিয়ে এত কথাবার্তা হচ্ছে , সুধু মনে হত যে এইখানে যা ফাইনাল দাড়াবে সেটাই গর্বাচভ, ইয়েলত্সিনরা একবাক্যে মেনে নেবে। যারা সিগনাল কে সিঙ্গেল কিম্বা প্লায়ার্স কে প্লাস বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করেনা তাদের মুখেও গ্লাসনস্ত আর পেরেস্ত্রোইকার মত রুসি শব্দ সিগারেট বিড়ির মত ঘোরা ফেরা করতে লাগলো, চায়ের দোকানে চায়ের চেয়ে খবর কাগজের বেশি ডিমান্ড দেখা দিলো, বিশ্বায়ন নিয়ে বাঙালির সে কি বিস্ময় ! উচ্চমাধ্যমিকে ব্যাক পাওয়া হারুদা তো পার্টির দেওয়া চটি বই পড়ে গোটা দান্কেল ড্রাফট এমন মুখস্থ করে ফেলল যে রাষ্ট্রপুঞ্জের লোকজনেরা ওকে ফোন করে ড্রাফটের কোন পাতায় কি লেখা আছে আর তাতে ভারতের ওপর কি প্রভাব পড়তে পারে তা জানতে চাইত।

তাই এই হ্যান গ্লোবাল কানেক্টিভিটির যুগে বাঙালি যে এফবি, টুইটার কিম্বা হোয়াটস্যাপে বিশেষরকম সক্রিয় থাকবে এতে আর আশ্চর্যের কি? ভবিষ্যতে বাঙালির ইতিহাস লেখা হলে তাতে পুরো সময়টা কে ASM (আফটার সোশ্যাল মিডিয়া ) ও BSM (বিফোর সোশ্যাল মিডিয়া) , এই দুটো পর্যায় ভাগ করা হবে। মানে আমার দাদু জন্মেছিল ১৯৩৭ BSM আর মারা যায় ২০০৯ ASM কিম্বা তোর গ্র্যজুএশন কি BSM না ASM? এইরকমভাবে না বললে সহজে লোকে ঠিক বুঝতে পারবে না। সোশ্যাল মিডিয়া আসার পরে দুপারেরই বাঙালিরা এতটাই বিশ্ববাসী হয়ে পড়েছে যে মোদী, দিদি আর হাসিনা একটা ত্রিপাক্ষিক বৈঠক করবে বলে শোনা যাচ্ছে যার সিদ্ধান্ত স্বরূপ এই দু দেশের মধ্যে পাসপোর্ট ভিসা তুলে দেওয়া হতে পারে। কোনো একটা মিডিয়ায় একাউন্ট থাকলেই এপার ওপার করা যাবে আর মানুষ এত সহজে এপার ওপার করতে পারলে স্মাগলিংও কেউ করবেনা আর থাকবেনা তিস্তার জলবন্টন সমস্যা ! বৃহত্তর বৃত্তে আরো কি কি হতে চলেছে তার হিসেব নিকেশ পরে করব, আপাতত দেখি এই সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে আম আদমির জীবনের কি কি মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। প্রথমে আসি লগইন করার পর স্টেটাস আপডেটের কথায় – শতকরা নব্বই শতাংশ মানুষ স্টেটাস আপডেটের মূল বক্তব্য ঠিক করে অন্যদের স্টেটাস দেখে লাইক ও বন্ধুদের জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে জানাতে। বাকিরা ১০%রা কিন্ত আগে ভাগেই ঠিক করে নেয় যে ঢুকেই কোন ফটো দেব ও কি লিখব তার নিচে। এবার কমেন্টের পালা, শব্দ চয়ন ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে মোটের ওপর একই রকম হলেও অন্তর্নিহিত মনোভাব কিন্ত সম্পর্ক বিশেষে একটু আলাদা হয়ে থাকে। এই যেমন অন্যর স্টেটাস-এ কোনো একই শিশুর ফটো দেখে ‘কি কিউট, ওলেবাবালে..মুআহ ‘ লেখা আর ‘ ওমা ও কত বড় হয়ে গেছে, কত ছোট দেখেছি…’ লেখার মধ্যে কোথাও একটা সুক্ষ্ম ফারাক আছে। বোঝা মুশকিল কোনটা আসল ও কোনটা নকল। অন্যের শাড়ি দেখে ‘ কি gorgeous গো , জাস্ট ফাটাফাটি….’ কিম্বা ‘কোত্থেকে কিনেছিস রে এটা….কি ভালো মানিয়েছে তোকে ‘ -এর দুইয়ের মধ্যে আপাত দৃষ্টিতে সত্যি কোনো ফারাক নেই , হয় দুটোই সত্যি মন থেকে বলা অথবা দুটোর মধ্যেই কোথাও একটা সুপ্ত ঈর্ষ্যা লুকিয়ে আছে। আবার বেকার এক যুবক তার টেম্পোরারি গার্ল ফ্রেন্ড কে নিয়ে সাউথ সিটি মলে একটা সেল্ফি তুলে তড়িঘড়ি যেই না পোষ্টালো অমনি ঠিক ওর মতই আরেকজন যে আগের দিন ঠিক একই কাজ করেছে মানি স্কয়ার মলে , সে লিখে বসলো , ‘ ভালই তো আছিস (a66is) , ভাই আমাদেরও একটু দেখিস. ..’, তার প্রত্যুত্তরে সেই প্রথম ছোকরা আবার লিখল, ” ব্রো, হিংসা করিস না, লেগে থাক, তোরও হবে। ” দুজনেরই কমেন্ট পরে বুঝতে অসুবিধে হয়না যে সত্তর এই দুটোই লাথ খেয়ে সেই সস্তার বারে গিয়ে এক সাথেই বসবে !!

আরো একটা মজার ব্যাপার লক্ষ্য করবেন যে এই রান্না বান্নার ব্যাপারটা সোশ্যাল মিডিয়াতে আসার পর কয়েকটা জিনিস হয়েছে – এক আজকাল বাড়িতে যাই খাওয়া হয় তা বেশ পরিপাটি করে পরিবেশিত হয় , সুধু মাত্র ফটো তলার জন্যে। বাঙালি এর আগে এতটা গার্নিশিং ও প্রেসেন্টেশন নিয়ে মাথা ঘামাত না বলেই জানি। দ্বিতীয়ত যতই পদ থাকুক না কেন ব্যাপারটাকে জোর করে বেশ সাদামাটা ও ঘরোয়া করে দেখানো হয়, মানে এরকম তো রোজ হয়েই থাকে ” আজকে দুপুরবেলার সিম্পল লাঞ্চ মটর শাক ভাজা, মুলো দিয়ে ডাল ,বক ফুল ভাজা, আলু ফুলকপির রোস্ট, দই মাছ , কচি পাঠার নিরামিষ ঝোল ও শেষ পাতে জলপাইয়ের চাটনি ..” একদল রাঁধুনিরা আবার তাদের অভিনবত্বের প্রশংসার দায়টা পুরো পরিবারের ওপর দিয়ে চালিয়ে দেয় , ” বিকেলের জলখাবারে বানালাম বেসন কা চিলা উইথ ট্যামারিন্ড সস – সবাই চেটে পুটে খেল ! দেখা যাবে হয়ত আদপে বাড়ির পোষা কুকুরটাও এক টুকরো মুখেই তোলেনি।

তবে সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলে আমরা বাঙালিরা এত কম সময় এরকম এগিয়ে যেতে পারতাম না , এ এক্কেবারে #হনুমানগোয়িংলঙ্কা গোছের লাফ ! অনেক ঘিলু খরচ করে বিশ্ববাংলার যে ব্র্যান্ড আজ তুলে ধরা হয়েছে তা মোটেও অমূলক নয় , ওই ‘ব’ লেখা গোলকটা এমনি এমনি শহরের এখানে সেখানে ঘুরছে না। সারদা থেকে এঞ্জেল, এমপিএস থেকে রোজ ভ্যালি পুরো বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে বাংলা চাইলে কিভাবে চুল্লু খাওয়া হাবু ও সেন্টুরাও দিনে দুপুরে পা তুলে বসে নামী দামী পাঁচতারায় কনিয়াকের বোতল একের পর এক উড়িয়ে দিতে পারে। দেখিয়ে দিয়েছে ভর দুপুরে বিভিন্ন সিন্ডিকেট কিরকম নির্ভিক সৈনিকের মতন পুলিশের ওপর গুলি চালাতে পারে। এসব উন্নয়ন তো সোশ্যাল মিডিয়ার চোখে পড়ে না। সুধু পরে ডানকান চা বাগানে শ্রমিকের না খেয়ে আর বন্ধ হয়ে যাওয়া জুট মিলের মজুরের আত্মহত্যা করে মড়ার খবর। যে যাই বলুক আমি জানি এই নানা বাধা অতিক্রম করে আমরা বিশ্ববাঙালিরা শত্রুর নানা চক্রান্তে ছাই ঢেলে দেব। এই দুর্জয় ঘাঁটিতে দেখবেন আমরা ঠিক একদিন আলতো করে স্টোভের পিনের মুখে লাগা সরু তারের মতো স্যাট করে গলে বেরিয়ে যাব।

বিশ্ববাঙালি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments