এই পর্বে লিখছেন ড. স্বপন কুমার ঠাকুর। পেশায় দাঁইহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক, নেশায় আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোক সংস্কৃতির ক্ষেত্র-গবেষক। “ইতিহাসের প্রেক্ষিতে বৃহত্তর কাটোয়া মহকুমার লোক জীবন ও লোক সংস্কৃতি” বিষয়ের ওপর কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। আঞ্চলিক ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব ও লোক সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণাধর্মী “কৌলাল” পত্রিকার সম্পাদক।   

 

এক

ভক্তি-নিষ্ঠা, কর্মসাধনা, সৃজনী প্রতিভায় যিনি ‘ইতিহাস’ তৈরি করেন; অনেক সময় সেই ইতিহাস-ই তাঁকে ভুলে যায়। চৈতন্য-সমকালীন বা চৈতন্যোত্তর যুগের এমনি এক ইতিহাস বিস্মৃত বৈষ্ণব সাধক পূর্ণানন্দ। অবশ্য তাঁর বিস্মরণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক আস্ত নগরীর বিলুপ্তি কথন। বর্গি হামলার রথচক্রতলে পিষ্ট অসংখ্য ছিন্নমূল মানুষের করুন ক্রন্দন!

পুণ্যসলিলা জাহ্নবীর তীরে ইতিহাসখ্যাত নগর ইন্দ্রাণীর বিকিহাট। অদূরে সন্ন্যাসতীর্থ কন্টকনগর। একাইহাটে কালাকৃষ্ণের পাটবাড়ি। অগ্রদ্বীপে গোবিন্দদাস পূজিত ‘ভক্তের ভগবান’ গোপীনাথ। বারো হাট তেরো ঘাট। কতো গগনচুম্বী মন্দির। ঘাটে ঘাটে স্নানার্থীদের কলকোলাহল। হাট-বাজারে ক্রেতা বিক্রেতাদের বিকিকিনি। বৃন্দাবন থেকে প্রত্যাগত সাধক পূর্ণানন্দ বিকিহাটের গঙ্গাতীরেই প্রতিষ্ঠা করলেন কানাই বলাইয়ের দারু বিগ্রহ। সেবায়, ভক্তিরসের প্রেম সাধনায়, সতত সঙ্গীত সুধায় সিক্ত ভাগীরথীর এই পুলিন-বিপিন সেদিন হয়ে উঠেছিলো ‘বঙ্গের বৃন্দাবন’।

অষ্টাদশ শতাব্দীর চতুর্থ দশক। সুদূর মহারাষ্ট্রে উত্থিত বর্গী হাঙ্গামার ঘূর্ণিঝড় প্রবল বেগে আছড়ে পড়ে সমগ্র দক্ষিণ বঙ্গে। লুঠেরা বর্গীদের ঘাঁটি হয়ে ওঠে এই ইন্দ্রাণী নগর। শাসনে শোষণে, নারী নিপীড়নে, ত্রাসে সন্ত্রাসে যেন শয়তানের অভিশাপ নেমে আসে। ‘বঙ্গের বৃন্দাবন’ হয়ে ওঠে ‘কংসের কারাগার’! দলে দলে বিভ্রান্ত লোক সাত পুরুষের ভিটে ছেড়ে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ধাবমান। জনপদ হয়ে ওঠে জনশূন্য। ক্রমশ নির্জন শ্বাপদ সঙ্কুল অরণ্য! গঙ্গাও যেন প্রবল অভিমানে আরও পূর্ব দিকে সরে যায়। বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যায় নগর ইন্দ্রাণী… বিকিহাট… সাধক পূর্ণানন্দ!

শুধু নির্জন ভগ্নমন্দিরে দণ্ডায়মান কালের বাঁশরি হাতে কানাই-বলাই।

 

দুই

যে যাই বলুন, ইন্দ্রাণীর প্রাণকেন্দ্র ছিল নিঃসন্দেহে বিকিহাট। সপ্তদশ শতকের ফন ডেন ব্রোকের ম্যাপে বিকিহাট উজ্জ্বল চিহ্নিত। কবি কৃত্তিবাস ও মঙ্গলকাব্যের বর্ণিত গঙ্গার বিখ্যাত ইন্দ্রেশ্বর ঘাট ছিল বিকিহাটে। জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের সন্ন্যাসখণ্ডে বর্ণিত হয়েছে,

গোধুলি সমএ ইন্দ্রেশ্বর ঘাট দিয়া।
বিকিহাট প্রবেশিল নিত্যানন্দ গিয়া।।


ফন ডেন ব্রোকের ম্যাপে বিকিহাট

ইন্দ্রেশ্বর বা ইন্দ্রাণীর প্রস্তর মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন একটি উলম্ব প্রস্তরখণ্ড হনুমানলাঠি নাম নিয়ে এখনও দৃশ্যমান। বর্ধমানের মহারাণী এই বিকিহাটেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হরগৌরী মূর্তি। তাঁর নিত্যপুজো এবং গাঁজন উৎসব হয়। এহ বাহ্য। বিকিহাটের মাঝামাঝি ঝিকরাডাঙা। একসময়ের সমৃদ্ধ জনপদ। বর্তমানে ঝোপঝাড় বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ। অথচ মাটি খুঁড়লেই বেড়িয়ে আসে পুরাতন মুদ্রা। কালান্তরের তৈজসপত্রাদি। ভগ্ন গৃহস্থাপত্য। টেরাকোটা পুতুল ইত্যাদি নানা প্রত্নসামগ্রী। অনেকেই ব্যক্তিগত ভাবে সংগ্রহ করেছেন। একসময় ইটের ভাটায় মাটি কাটতে গিয়ে প্রচুর শঙ্খ, পুতুল ইত্যাদি পাওয়া গিয়েছিল। সেগুলি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ঝিকরাডাঙার বকুলতলা থেকে পাওয়া গেছে লেখযুক্ত বিষ্ণু মূর্তির ভগ্ন পাদপীঠ। পাঠোদ্ধার করেছিলেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ভাস্কর চট্টোপাধ্যায়। লেখে জনৈক বসন্ত সিংহ নামে এক বণিকের নাম খোদিত। সময়কাল আনুমানিক দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী। কাজেই বহু পূর্ব থেকেই বিকিহাট পৌরাণিক বৈষ্ণব ধর্মের কর্ষিত ভূমি। সাধক পূর্ণানন্দ এখানেই প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর আরাধ্য দেব বিগ্রহ- কানাই-বলাই।

বিকিহাটের ঝিকরাডাঙা থেকে প্রাপ্ত মুদ্রা

বিকিহাটের ঝিকরাডাঙা থেকে প্রাপ্ত পোড়া মাটির সামগ্রী

কে এই পূর্ণানন্দ?

ইতিহাস তাঁর সম্পর্কে বড় নীরব। কার শিষ্য, কোথাকার ভূমিপুত্র, যাপিত জীবনের রেখাচিত্র ইত্যাদি কিছুই জানা যায়না। শুধু ক্ষীণ জনশ্রুতি, কানাই-বলাই’র সেবারীতি ইত্যাদি থেকেই একটা অস্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়। আজীবন ব্রহ্মচারী ছিলেন। বৃন্দাবন থেকে এসে বহু ঘাটের জল খেয়ে বিকিহাটেই থিতু হয়েছিলেন। আবির্ভাব তিথি জানা না গেলেও তাঁর তিরোভাব তিথি পালিত হয় পৌষমাসের বকুল অমাবস্যায়। বিকিহাটের ঝিকরাডাঙায় এই উপলক্ষ্যে পূর্ণানন্দপন্থী শিস্যরা মহোৎসবের আয়োজনে যোগ দেন। সে কথায় পরে আসা যাবে। তার আগে পূর্ণানন্দ সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক কয়েকটি তথ্য জেনে নেওয়া জরুরী।

বঙ্গীয় বৈষ্ণব ইতিহাসে এ পর্যন্ত আমরা তিনজন কবি বা সাধক পূর্ণানন্দের সাক্ষাৎ পাই। জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলে দেখি ১৫১০ খৃষ্টাব্দে কাটোয়ায় কেশবভারতীর কাছে দীক্ষাগ্রহন ও রাঢ় পরিভ্রমণ করে মহাপ্রভু শান্তিপুরে অদ্বৈত আচার্যের গৃহে ওঠেন। তাঁকে দেখে আনন্দে মূর্ছিত হয়ে পড়েন তিনজন ভক্ত- অদ্বৈত আচার্য, তাঁর স্ত্রী সীতাদেবী ও জনৈক সাধক পূর্ণানন্দ।

অদ্বৈতচন্দ্রের বাড়ি গেলা গৌরচন্দ্র।
আনন্দে সমাধি সীতা অদ্বৈত পূর্ণানন্দ।।

সুতরাং বোঝাই যায় এই পূর্ণানন্দ নিঃসন্দেহে মহাপ্রভু ও অদ্বৈত আচার্যের পূর্বপরিচিত এবং তিনি শান্তিপুরেই থাকতেন। অনুমান করা যেতে পারে এই পূর্ণানন্দ মহাপ্রভুর নির্দেশে বৃন্দাবন গিয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে কোনও এক সময়ে বিকিহাটে চলে আসেন।

দ্বিতীয়ত চৈতন্যপরিকর বংশীবদন চট্টোপাধ্যায়ের পৌত্র রামচন্দ্র গোস্বামী নিত্যানন্দ-পত্নী জাহ্নবীদেবীর পালিত পুত্র। জাহ্নবীদেবীর প্রয়াণের পর বৃন্দাবন থেকে কানাই-বলাই’র দারু বিগ্রহ নিয়ে এসে নাকি বাঘনাপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত করেন। এই রামচন্দ্রের এক শিষ্য ছিলেন বিপ্ররামচন্দ্র। তাঁর মাতুল ছিলেন সাধক পূর্ণানন্দ ব্রহ্মচারী। ইনি বিষ্ণুপুরের তপোবনে সাধন ভজন করতেন। রাজবল্লভ রচিত ‘মুরলীবিলাস’ কাব্য থেকে জানা যায়

পূর্ণানন্দ রামচন্দ্রে করাইল বিভা।
তথা প্রকাশিল কত শক্তির প্রতিভা।।
শ্রীকৃষ্ণ বৈষ্ণব সেবা তথা আরম্ভিলা।
শাখাসূত্র করি কত জীব নিস্তারিলা।।

এই ধরণের তথ্য থেকে অনুমান করা যায় যেহেতু বাঘনাপাড়াও বিখ্যাত কানাই-বলাইয়ের জন্য, সেই সূত্রে পূর্ণানন্দ হয়ত বা বাঘনাপাড়া ঘরানার সাধক। কিন্তু এই অনুমানের সমর্থনে কোনও ঐতিহাসিক তথ্য মেলেনা।

তৃতীয়ত বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যে জনৈক পূর্ণানন্দ বা পূর্ণানন্দ দাস ভণিতায় অনেকগুলি পদের সন্ধান মিলেছে। ইনি সম্ভবত চৈতন্যত্তোর যুগের পদকর্তা। রাধা-কৃষ্ণের-উক্তি-প্রত্যুক্তিমূলক অভিনব পদ রচনায় তাঁর কব্যপ্রতিভা ঈর্ষণীয়।

এই বনে কংসের আজ্ঞা নাই বলে হরি।
রাই বলে এখন ভাঙ্গিব ভারী ভুরি।।
কৃষ্ণ বলে স্বর্গ মর্ত্য মোর অধিকার।
রাই বলে তোমায় জানি আভীরকুমার।।
কৃষ্ণ বলে ব্রহ্মা ইন্দ্র দমন করি আমি।
রাই বলে নন্দের গো-ধন চরাও তুমি।।
কৃষ্ণ বলে গোবর্ধন ধরেছি কৌতুকে।
রাই বলে নন্দের বাধা বহিছ মস্তকে।।
এই বোল শুনিয়ে কৃষ্ণ ভাবে মনে মনে।
কৃষ্ণকে বাঁধিল রাই আপন বসনে।।
দেখিয়া সুবল সখা দূরে পলাইল।
দাস পূর্ণানন্দের মনে আনন্দ বেড়িল।।

পূর্ণানন্দের সম্পর্কে এখনও বোধহয় স্থিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসেনি। ক্ষেত্রসমীক্ষা সূত্রে জানা যায় তাঁর অধিকাংশ শিস্য সম্প্রদায় তন্তুবায় গোষ্ঠীর। কাটোয়া মহকুমার শিলে-পলসোনা, শ্রীবাটি, আমডাঙা, ঘোড়ানাশ-মুস্থুলি, ইসলামপুর চক প্রভৃতি গ্রাম থেকে আজও তন্তুবায় গোষ্ঠীর নরনারীরা তিরোভাব তিথি উপলক্ষ্যে সমবেত হন। তাঁদের পূর্বপুরুষরা আসতেন কাপড়চোপড় বিক্রি করতে। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া ঝাঁটি হলে মধ্যস্থতা করতেন সাধক পূর্ণানন্দ। জরিমানাস্বরূপ এক ভাঁড় করে চাল মেপে দিতে হত। আর সেই চালেই হত কানাই-বলাই এর সেবা। প্রথাটি আজও তাঁরা টিকিয়ে রেখেছেন। সংশ্লিষ্ট তন্তুবায়রা নবান্নের দিনে পূর্ণানন্দের নামে একটি ঘট প্রতিষ্ঠা করেন। সংগৃহীত চাল নিয়ে যোগ দেন পূর্ণানন্দের তিরোভাব উৎসবে। বেড়ার গোস্বামী বাড়িতে।

 

তিন

কাটোয়া থানার বেড়া গ্রামের প্রয়াত মনোরঞ্জন গোস্বামী। গৃহী বৈষ্ণব। পেশা ও নেশা ছিল দারু বিগ্রহের অঙ্গরাগ করা। দুই সন্তানের মধ্যেও সঞ্চারিত প্রবল বৈষ্ণবানুরাগ। বেড়ার গোস্বামী বাড়ির দুটি অমূল্য সম্পদ, এক প্রাচীন বৈষ্ণব পুঁথি সংগ্রহ, যেমন কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতের অনুলিপির অংশবিশেষ। চৈতন্যভাগবত, ভক্তিরত্নাকর প্রভৃতি গ্রন্থ। দুই দক্ষিণমুখি ছোট্ট দালানমন্দিরে পূর্ণানন্দ সেবিত সেই কানাই-বলাই বিগ্রহ।

বেড়ার কানাই বলাই

 

কি করে এলেন?       

সে এক দীর্ঘ ইতিহাস। গোস্বামী পরিবারের সঙ্গে কথা বলে যা যেটুকু জানা গেছে তার সারসংক্ষেপ হল – মনোরঞ্জন গোস্বামীরা ছিলেন কেতুগ্রাম থানার কেঁউগুরি গ্রামের আদি বাসিন্দা। বৈবাহিক সূত্রে তাঁর পূর্বপুরুষেরা চলে দাঁইহাট বাঘটিকরায়। এখানকার গোঁসাইরা ছিলেন বিকিহাটের। এবং কানাই-বলাইয়ের আদি সেবাইত। বর্গী হামলার পর তাঁরা বাঘটিকরায় এলেও কানাই বলাইয়ের সেবা হত বিকিহাটের নির্জন মন্দিরে। বংশ লোপ পাওয়ায় পরবর্তীকালে মনোরঞ্জন গোস্বামীরা সেবার অধিকার লাভ করেন এবং বাঘটিকরা থেকে বেড়াগ্রামে চলে আসেন। এদিকে ১৩৬২ বঙ্গাব্দের প্রবল বন্যায় বিকিহাটের আদি মন্দির ভেঙে পড়লে কানাই বলাই চলে আসেন বেড়াগ্রামের গোস্বামী বাড়িতে। বর্তমানে মাত্র একবারই বিকিহাটের ঝিকরাডাঙায় বিগ্রহদ্বয় নিয়ে যাওয়া হয় পূর্ণানন্দের তিরোভাব উপলক্ষ্যে।

বেড়ার পুঁথি


প্রাচীন দলিল দস্তাবেজ

বলাইয়ের দারুবিগ্রহের উচ্চতা প্রায় তিন ফুট। শ্বেতবর্ণ বিশিষ্ট। কানাইয়ের উচ্চতা পৌনে তিন ফুট। হালকা নীল গায়ের রঙ। গোপ বেশ। বেনুকর; যুগলকর ধৃত বংশী ললিত ভঙ্গিমায় ওষ্ঠাবদ্ধ। নৃত্যরত চরণযুগল আড়াআড়িভাবে সংস্থাপিত দ্বিদল প্রস্ফুটির পদ্মবেদিকায়। ত্রিভঙ্গিম ঠামে দুই ভাই দণ্ডায়মান। মুখমণ্ডল ঢলঢল। দীঘল চোখে কৈশোরক বিস্ময়। স্মিত হাস্যাধর। পৌগণ্ড দশার মূর্তি। বাঘনাপাড়ার কানাই বলাইয়ের সঙ্গে প্রভূত মিল থাকলেও মূর্তি বিন্যাসে কিঞ্চিৎ পৃথক। সেখানে বলরামের হস্তদ্বয় কটিসংলগ্ন।

বলরাম-কৃষ্ণের যুগল উপাসনা বহু প্রাচীন সংস্কৃতি। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর পতঞ্জলির মহাভাষ্য থেকে জানা যায় সুউচ্চ মন্দিরে কৃষ্ণ বলরামের পুজো হত। খ্রিষ্ট পূর্ব সময়ের অনেক রাজ মুদ্রায় কৃষ্ণ-বলরাম খোদিত। কিন্তু সে মূর্তি বীরের। যোদ্ধার। একসময় লোকেশ্বর বিষ্ণুমূর্তি হিসাবে বলরামের উপাসনা হত। যেমন বর্ধমান জেলার বোড়গ্রামের বলরাম। চৈতন্যত্তর যুগে বলরাম মূর্তি পুজো করতেন নিত্যানন্দপন্থী গৃহী বৈষ্ণবগণ। কাটোয়ার গৌরাঙ্গবাড়িতে, সুদপুরে, মাঝিগ্রামে, কানাইডাঙা প্রভৃতি গ্রামে বলরাম-মহাপ্রভুর দারু বিগ্রহ রয়েছে। এই মূর্তিগুলি প্রেমের, মধুর রসের। কিন্তু কানাই বলাইয়ের দারুবিগ্রহ হাতে গোনা মাত্র। অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে রচিত মানিকরাম গাঙ্গুলির ধর্মমঙ্গল কাব্যের দিগ্‌বন্দনা থেকে তৎকালে জনপ্রিয় কৃষ্ণ-বলরাম বিগ্রহের কয়েকটি নাম পাওয়া যায়। যেমন ‘সাঅড়াকোণের রাম-কৃষ্ণ’, গোরুটির রাম গোপাল’, ‘বাগনাপাড়ার বলরাম’ ইত্যাদি। অষ্টাদশ শতকের অন্তিমার্ধ পর্যন্ত বলরাম-কৃষ্ণ উপাসনা বঙ্গদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রশ্ন উঠতেই পারে এই তালিকায় পূর্ণানন্দের নাম কই? উত্তর দেওয়া নিঃসন্দেহে কঠিন। তবে সমর্থনে বলা যায় যে বর্গী হাঙ্গামার পর থেকে ইন্দ্রাণী নগরের মত কানাই-বলাইও বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যায়। তাঁদের বংশীধ্বনি চাপা পড়ে যায় অসংখ্য সাধারণ মানুষের হাহাকারে আর আর্তনাদে।

 

চার

পূর্ণানন্দ সেবিত কানাই বলাইয়ের সঙ্গে বারোটি নারায়ণ শিলাও পূজিত হয়। নিত্যসেবায় বৈচিত্র না থাকলেও নিয়মসেবার মাসে অর্থাৎ শারদীয়া একাদশী থেকে পরবর্তী একমাসব্যাপী পূর্ণানন্দ প্রবর্তিত সেবারীতিই অনুসৃত হয়। সকালে মঙ্গলারতি। শ্রী শ্রী দামোদর অষ্টকোমের পর প্রভাতী কীর্তন, স্বপ্ন বিলাসের কীর্তনের মধ্যে দিয়ে কানাই বলাইয়ের নিদ্রাভঙ্গ। বেলা ন’টার সময় বল্যভোগে চাই মালপোয়ার ভোগ, ফলমূলাদি সহ হাতে তৈরি মিষ্টান্ন। বলরামের একটি বিশেষ ভোগ আছে। মিছরির নৈবেদ্য। প্রসঙ্গত শ্রীখণ্ডের ঠাকুরবাড়ির এক কৃষ্ণ বিগ্রহের নাম চিনির ঠাকুর। চিনির ভোগ তাঁকে দিতেই হবে। দুপুরে যথারীতি আতপ ও সিদ্ধচালের ঘৃতসিক্ত অন্ন। অমৃতময় রসা। নানাবিধ ব্যঞ্জন। ভাজাভুজি। পায়সান্ন। বাঙলার নিরামিষ রন্ধনশিল্পে বৈষ্ণবদের বিশেষ অবদান রয়েছে। কানাই বলাইয়ের ভোগ পদাবলী সেই প্রাচীন ব্যঞ্জনশিল্পের দৃষ্টান্ত। সন্ধ্যায় যথারীতি সন্ধ্যারতি এবং বলরামের আরতি কীর্তনের মধ্য দিয়ে বিগ্রহদ্বয়ের মন্ত্রশয়ান। মাঝে মাঝে দেশী চালের ভাজা মুড়ি সরষের তেলের সঙ্গে মাখিয়ে ভোগ দেওয়াও প্রাচীন প্রথা। বর্গী হামলার পর বিকিহাট যখন ঘন জঙ্গলে ঢেলে যায় তখন ব্যাঘ্রভয়ের নিবারণের জন্য বিরল ব্যতিক্রমী ‘বাঘের ভোগ’ও নিয়মিত ছিল নির্জন মন্দিরে।

জন্মাষ্টমী আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। এই দিন কীর্তনলীলা পরিবেশিত হয়। পালার বিষয় শ্রীকৃষ্ণের জন্মখণ্ড ও বাল্যলীলা। নন্দোৎসবে নারকেল কাড়াকাড়ি। স্থানীয় ঘোষেদের ব্রজের রাখাল বালকের বেশে অংশগ্রহণে পুরাণ ও লোকায়ত ভাবনা মিলেমিশে একাকার। বর্তমানে তা বন্ধ হয়ে গেলেও গোস্বামী বাড়ির আরেকটি প্রাচীন বৈষ্ণব অনুষ্ঠান ‘হরিদাস নির্যাণ’। মনরঞ্জন বাবুর আমলে সাড়ম্বরে পালিত হত। অনন্ত চতুর্দশী তিথিতে বৈষ্ণব সাধক হরিদাসের তিরোভাব তিথি উপলক্ষ্যে কানাই বলাই কে কীর্তন শোনাতে আসতেন বাঙলার বিভিন্ন স্থানের কীর্তনিয়ারা। কানাই বলাইয়ের বাৎসরিক উৎসব ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার পরের দিন গোবর্ধন পুজো ও অন্নকূট উৎসব। ঘৃতসিক্ত অন্নস্তুপে একটি শিলাকে স্থাপন করে বিশেষ পুজো অর্চনা হয়। এইদিনেও গোবর্ধন যাত্রার কাহিনী নিয়ে বিশেষ কীর্তন গানের আয়োজন হয়।

 

পাঁচ

মূর্তি-বৈচিত্র, সেবারীতি, ধ্যানমন্ত্র প্রভৃতির সূত্রে অনুমান করা অসঙ্গত হবেনা যে পূর্ণানন্দ ছিলেন সখ্য ও বাৎসল্য রসের উপাসক। তাঁর কানাই- বলাই যেন ব্রজের রাখাল। চঞ্চল কিশোর। তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত কিংবদন্তীও অনুরূপ। দুই ভাইয়ের ছদ্মবেশে কানাই-বলাই দাঁইহাটের ময়রার দোকানে মিষ্টান্ন খেয়েছিল ছলনা করে। তারপরের ঘটনা ক্ষীরগ্রামের যোগাদ্যার শাঁখা পরার মত। ভগবানকে কাছে পেয়েও চিনতে না পারায় ভক্তের আকুল আক্ষেপ। আজও সেখানকার ময়রা গোষ্ঠী মিষ্টান্ন ভোগ দেন। পরবর্তীকালে অবশ্য কানাই বলাইয়ের উপাসনায় লেগেছে মধুর রসের পরশ। তবু একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় চৈতন্যোত্তর যুগে গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের সর্বগ্রাসী রাধাভাবের পাশে এ এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।

ভাবের দিক থেকে কানাই বলাই মূর্তি যথেষ্ট প্রাচীন। যদি ধরে নেওয়া যায় নিত্যানন্দ-গৌরাঙ্গ উপাসনাই এর মধ্য দিয়ে প্রকটিত তাহলে এই মূর্তি অন্তত ষোড়শ শতকেই বাঙলাদেশে চালু হয়েছিল। পরবর্তীতে কানাই বলাইয়ের পরিবর্তে বাংলাদেশে গৌর-নিতাইয়ের দারু বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার জোয়ার এসেছিল।

বৈষ্ণব দর্শনের মূল কথা ‘দেবতারে প্রিয় করি প্রিয়রে দেবতা’। দেবতাকে বৈষ্ণবরা কেবল ভক্তি শ্রদ্ধাই করেননি, অন্তর দিয়ে ভালোবেসেছেন। আদর করেছেন। তাঁদের অনেকের কাছে বিগ্রহ নিগ্রহ বা গলগ্রহ নয়। সাক্ষাৎ নারায়ণ। ঘরের ছেলে। ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শীতকালে চাদর, লেপ, গলায় মাফলার পর্যন্ত পরানো হয়। কোথাও আরাধ্য গোপীনাথই করেন মৃত ভক্তের শ্রাদ্ধ। কেউ বা খরচ খরচা করে হয়ে যান ফকির। যেমন বাঘনা পাড়ার বলরাম। বাঙলার পারিবারিক সংস্কৃতিতে কানাই-বলাইয়ের একটা আলাদা স্থান রয়েছে। পিঠোপিঠি দুই ভাই। প্রায় সমবয়সী। পরম বন্ধু। নামেও সেই কানাই-বলাই। এরই দেবায়িত রূপ কৃষ্ণ বলরাম। নিশ্চয়ই আপনাদের মনে পড়বে রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত কবিতার কয়েকটি লাইন-

‘আঙিনায় কানাই বলাই
রাশি করে সরিষা কলাই।
বড় বউ ছোট বউ মিলে
ঘুঁটে দেয় ঘরের পাঁচিলে।।

 

 

সহায়ক গ্রন্থঃ

১. জয়ানন্দের চৈতন্য মঙ্গল, সম্পাঃ বিমান বিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায়
২. মানিকরাম গাঙ্গুলি বিরচিত ধর্মমঙ্গল, সম্পাঃ বিজিত কুমার দত্ত ও সুনন্দা দত্ত
৩. বাঘনাপাড়া সম্প্রদায় ও বৈষ্ণব সাহিত্য- কানন বিহারী গোস্বামী
৪. বৈষ্ণব পদাবলী (সংগ্রহ), সম্পাঃ কাঞ্চন বসু     

ব্যক্তিঋণ- করুণা সিন্ধু গোস্বামী, বেড়া-গোস্বামী পাড়া ও ক্ষেত্র সমীক্ষায় সাহায্যকারী অনেকেই।

(ছবিঃ লেখক)

 

বিস্মৃত বৈষ্ণব সাধক পূর্ণানন্দ ও কানাই বলাই
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments