Nirvana
Source: Consciousness Evolution Site

[“ধর্মপালন বিষয়ে সিদ্ধার্থ মহারাজকে প্রাণিহত্যা ও বলিদান থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিলেন, “প্রাণহত্যা করে ধর্মসাধন, মানুষের এ কেমন প্রেম? বলিদানের ফল যদি অক্ষয় হয়, তাহলেও প্রাণিহত্যা অনুচিৎ, তবে ক্ষণস্থায়ী ফলের আশায় সে কাজ বোধকরি আরো কত অন্যায়! প্রজ্ঞাবান মানুষ প্রাণহত্যা থেকে বিরত থাকেন। বায়ুপ্রবাহের ন্যায়, তৃণশীর্ষে বারিবিন্দুর ন্যায়, অনাগত ভবিষ্যতের ফলাফল ক্ষণস্থায়ী ও অনিশ্চিত নিয়মের বশবর্তী, আমি তাকে তাই দূরে সরিয়ে রাখি, কারণ আমি যে যথার্থ মুক্তি চাই!” ]

গৌতম যে বনে তপস্যা করতেন, সেই বনে অন্যন্য যে সব শীর্ষস্থানীয় ঋষি-মুনিও তপস্যা করতেন, গৌতম তাঁদের সঙ্গে নানান বিষয়ে আলাপ আলোচনা করতেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম, আরাদা উদারামা (Arada Udarama), গৌতম তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “মুনিবর, কোন উপায়ে জরা, রোগ, ও মৃত্যু হতে উদ্ধার পাওয়া যাবে?”


উদারামা উত্তর দিলেন, “অহং” এর পরিশুদ্ধিতেই প্রকৃত মুক্তি। এ ছিল সেই সময়কার সনাতনী শিক্ষা: বলা হত যে “পুরুষ”, অবিনশ্বর আত্মা, আত্মন, পরমাত্মা – এঁরা জন্ম থেকে জন্মান্তরে ক্রমাগত পরিশুদ্ধ হতে হতে অবশেষে স্বর্গে শুদ্ধ আত্মার অবস্থাপ্রাপ্ত হন, এইটাই প্রতিগমনের উদ্দেশ্য।

শুদ্ধচিত্ত গৌতমের এ কথা শুনে মনে হল, যদি এমনটা ধরে নেওয়া হয় যে জন্মের উৎস আর লয় থেকে কারো সত্যিকারের নিস্তার নেই, তাহলে পুরুষ ব্যাপারটা বেসিকালি একটা খেলার বল বই কিছু নয়। খেলার বল যেমন মাটিতে লাফাতে লাফাতে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়, যখন যেরকম অবস্থার মধ্যে পড়ে, স্বর্গ, নরক, মর্ত্য, যেখানে যেমন। অথচ “জন্ম” মানে মৃত্যুও অনিবার্য – এইখানেই ত ব্যথা, এইটাই তো ক্ষয়, ভয়, সব কিছুই যে পরিবর্তনশীল।

গৌতম বললেন, “আপনি যে বলছেন, অহংবোধ পরিশুদ্ধ হলেই তৎক্ষণাৎ প্রকৃত মুক্তি; আবার যেখানেই কার্য-কারণের একত্র সংযোগ দেখি, সেখানেই যেন জন্মের প্রতিবন্ধকতায় ফিরে যাবার একটা ব্যাপার থাকে; ধরুণ বীজের মধ্যে যে প্রাণ নিহিত; যখন মনে হয় যে মাটি, জল, অগ্নি, বায়ু সব মিলে তার অন্তর্নিহিত প্রাণকে বুঝি শেষ করে ফেলেছে, সে-ই আবার যখন উপযুক্ত পরিবেশ পায় পুনর্জীবিত হয়ে ওঠে। তার এই বেঁচে ওঠার পেছনে এমন কোন কারণ নেই, যার বহিঃপ্রকাশ আপনি দেখতে পাবেন, কিন্তু বেঁচে থাকার অন্তর্নিহিত বাসনাই তার পুনর্জীবনের কারণ; বেঁচে ওঠে ঠিকই, তার আবার মৃত্যু হবে, যেন মরার জন্যই বেঁচে ওঠা। সেই রকম, যাদের তথাকথিত মুক্তি হল, (তাদের আবার কোন না কোন সময় বন্ধন হবে), অহংবোধের ধারণা আর জীবিত প্রাণী, সেভাবে দেখলে প্রকৃত মুক্তি আর তাদের মেলে না।”

প্রজ্ঞা আর করুণা তাঁর মধ্যে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশের সময় যত এগিয়ে এল, ততই এই যুবা সন্ন্যাসীটি দেখতে লাগলেন সমুদায় বস্তু – তপোবনে উপবিষ্ট সাধু, গাছপালা, আকাশ, আত্মা-সম্পর্কে ভিন্ন মত, নানান রকমের আত্মবোধ – সমস্তই যেন একত্রিত শূন্যতা, সমস্তি যেন কোন এক কল্পনার পুষ্প – চারিদিকে অবিভেদ্য একতা, সে একতা সর্বব্যাপী, অন্তঃসলিলা বিশুদ্ধ এক স্বপ্নময়তা।

অস্তিত্বকে দেখলেন যেন প্রজ্জ্বলিত দীপশিখা; প্রদীপের আলোর শিখা আর সেই আলোর নির্বাণের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই। একই সঙ্গে দীপের আলো যেমন জ্বলতে থাকে, এই উজ্জ্বল আলোই তার নির্বাপণের কারণও বটে। দুই-ই এক।

দেখলেন, পরমাত্মার অস্তিত্বের ধারণা অর্থহীন। এ যেন একটা খেলার বলের সত্তার বিধেয় নির্ণয়ের খেলা, হাওয়ায় যে বলটা এলোমেলো, এদিক ওদিক ঘুরপাক খেতে থাকে, অনেকটা কেউ যেন ইচ্ছে করে দুঃস্বপ্ন দেখে যাচ্ছে, দেখেই যাচ্ছে, ভয়াল দুঃস্বপ্নের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, অথচ বুঝছে না যে পুরোটাই মনের মায়া।

গৌতম একটা ব্যাপার দেখলেন যে বুদ্ধের নির্বাণকল্পের মধ্যে একটা শান্তির, একটা স্থিতির ব্যাপার আছে। নির্বাণ মানে নিভে যাওয়া, যেমন একটা প্রদীপের আলোর নির্বাপণ। কিন্তু বুদ্ধ যে অর্থে নির্বাণের কথা বলেন, তা অস্তিত্বের অতীত, তাকে অতিক্রম করে যায়। বুদ্ধের নির্বাণের ধারণায় প্রদীপের আলোর অস্তিত্বও নেই, তার অনস্তিত্বও নেই। এবং ব্যাপারটা শুধু প্রদীপের শিখার নয়, তাবৎ বস্তুর, অবিনশ্বর আত্মার, সমস্ত কিছুর ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে। এমনকি নির্বাণও নয়। প্রদীপের কথায বললে, প্রদীপের আলোকশিখাকে সংসার ধরা যাক (ইহজগৎ), প্রদীপের নির্বাপিত শিখাকে নির্বাণ বলা যাক (মরজগৎ) – বুদ্ধের নির্বাণ কিন্তু এ দুটো অবস্থার একটাও নয় – বুদ্ধের নির্বাণ এসমস্তের উর্দ্ধে , আমাদের সবরকম প্রতিষ্ঠিত ধ্যানধারণার অতীত একটা সদাজাগ্রত অবস্থা!

সিদ্ধার্থর ঠিক আরাদার ধ্যান ধারণা যে “অহং” বা “আমি” কে মুছে দিলেই স্বর্গের পবিত্রতা অর্জন করা হবে এই ব্যাপারটা ভালো লাগেনি। সিদ্ধার্থ ঠিক বস্তুনিচয়ের মধ্যে “আমি” ব্যপারটাকে দেখছিলেন না। যার জন্য কাউকে কিছু শুদ্ধিকরণ করার নেই। এই স্বর্গের পুরো কনসেপ্টটাই স্বপ্নের জগতে বিচরণ করার মত। তন্মাত্র (“সৎ মন”) মনের পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখলে সমস্ত বস্তু, সবকিছুকে মনে হবে হাওয়ায় কেউ যেন জাদু-প্রাসাদ তৈরী করেছে।

“আরাদা যা বলছেন মন থেকে মানতে পারছি না। যাই, দেখি আরো ভালো একটা ব্যাখ্যা খুঁজে বার করি।” গৌতম খুঁজে বার করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এক মনীষীর ভাষায়, “মানুষের মধ্যে, প্রকৃতির মধ্যে খুঁজে বেড়াচ্ছেন, পাচ্ছেন না, অথচ দেখ! এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর আপন হৃদয়ে!”

meditation
Source: Buddha’s Meditations

“সুধন্য তপস্বী” এবারে বুদ্ধগয়ায় গেলেন। আর তখনি তাঁর ওপর আদি বুদ্ধদের সুপ্রাচীন স্বপ্ন যেন ভর করল। সেখানে তমালবন, আম্রকুঞ্জ, ও বটবৃক্ষের পানে একমনে চেয়ে ধ্যানস্থ হলেন। দ্বিপ্রহরে ঝিরি ঝিরি বায়ু বইছে, সিদ্ধার্থ সেই সব বৃক্ষশাখার তলায় একা একা তন্ময় হয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, মনের কোণে কোথাও বোধ হচ্ছে ভারি রকম কিছু একটা হতে চলেছে। বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম তথাগতের সুপ্রাচীন লুপ্ত পথ খুঁজে বের করেছিলেন মাত্র, পৃথিবীর আদিমতম শিশিরবিন্দুটির পুনরায় উন্মোচন হয়েছিল তাঁর হাতে; পরম করুণামাখা চোখের একটি মরাল যেন কমল-সরোবরে ধীরে ধীরে ডানা মেলে নেমে এল, এবারে সেখানেই সে স্থিত হবে।
সেই তরু!
যে তরুতলে তিনি বসবেন বলে তাবৎ বুদ্ধ-জগৎ ও সমুদায় বুদ্ধ-বস্তুদের কথা দিয়েছিলেন, সেই সব বুদ্ধনিচয়, যারা দশদিকে ‘অ’-বস্তুর দীপ্তমান অনুভূতি নিয়ে সর্বত্র দেবদূত আর বোধিসত্ত্বরূপে বিরাজমান; তারা এখন অদৃশ্য পতঙ্গের মত শূন্যতার গর্ভ অভিমুখে মহাউপাসনার অনন্তযাত্রায় চলেছে ।
“অত্র সর্বত্র, আকাশপাতাল সব এখানেই এক হয়েছে”, সন্ন্যাসী অন্তরে অনুভব করলেন।
দূরে একটি লোক ঘাস কেটে নিয়ে যাচ্ছিল, তার কাছ থেকে কিছুটা টাটকা নরম ঘাস চেয়ে নিলেন। গাছের তলায় সেই ঘাস বিছিয়ে দিলেন। তারপর সেখানে ধ্যানস্থ হলেন। সাবধানে পা গুটিয়ে ঋজু শরীরে উপবিষ্ট হলেন। বসে ধীরে ধীরে সামনে পিছনে দুলতে লাগলেন, যেন এক ঋজু, অটল মহানাগ । নিজের কাছে ঘোর প্রতিজ্ঞা করলেন, “যতদিন না বাসনার সংশ্লেষ থেকে মুক্ত হব, যতদিন না এ অন্তরাত্মা দুঃখ জয় করবে, ততদিন এই স্থান থেকে উঠব না!”

অস্থিচর্মসার যদি হতে হয়, কাকপক্ষীতে যদি ঠুকরে শেষ করে দেয়, তবু যতদিন না বিশ্বরহস্য উন্মোচন করতে পারবেন, ততদিন এই দেবতুল্য মানব বটবৃক্ষের তলায় বিছানো তৃণাসন থেকে উঠে দাঁড়াবেন না, এই তাঁর পণ। দাঁতে দাঁত লাগিয়ে তাতে জিব দিয়ে চেপে ধরলেন, তেজোময় ধীশক্তিকে দাবিয়ে রেখে, আপন অন্তরের দৃষ্টি ও অনুভূতিবোধকে প্রবাহিত করলেন অন্তরপানে। হাতে হাত, শিশুর মত মন্দ শ্লথ নীরব শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে, দুই চোখ বন্ধ, অনড়, অবিচল। ধ্যানমগ্ন হয়ে আছেন।
তখন, সেই সোপানে সন্ধ্যার নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে, আবছায়া নামছে।
সারা জগৎ থরোথরো কাঁপে কাঁপুক, এই স্থান অটল, অবিচল থাকবে।
ভারতবর্ষে তখন বৈশাখ মাস, গোধুলি লগ্ন, স্বর্ণালী বাতাস বইছে, ঈষদোষ্ণ, স্বপ্নিল। প্রাণীকূল ও জগৎসমুদায়ের নিঃশ্বাসে মেশানো দিবাবসানের সতত মানসিক নীরবতা ।

emptiness
Source: Emptiness

“রাত্রির মধ্যযামে, দেবদূতগণ যে প্রজ্ঞার অধিকারী, সেই প্রজ্ঞায় বুদ্ধ উপনীত হলেন। জগতের সমস্ত প্রাণীর প্রতিচ্ছবি তাঁর সামনে যেন আয়নায় প্রতিবিম্বিত হল; মৃত্যুর নিমিত্ত প্রাণীরা পুনঃপুন জন্মগ্রহণ করে, উচ্চ নীচ, ধনী দরিদ্র, সৎ বা অসৎ, যে যার কৃতকর্মের ফলহেতু, দুঃখ বা সুখভোগ করে”
“তিনি দেখলেন কিভাবে অসৎ কর্মে মন অনুতপ্ত হয় ও সেই অসততার প্রায়শ্চিত্ত করার অজ্ঞাত আগ্রহ ও ইহজগতে পুনরাবির্ভাবের তেজ সঞ্জাত হয়: অন্যদিকে কোন প্রকার সন্দেহ ও অনুতাপ না রেখেই কিভাবে সৎকর্ম জ্ঞানমার্গে বিলীন হয়ে যায়।


“দেখলেন পশুযোনিতে জন্মের কি ফল; কেউবা শুধু তাদের চর্ম বা পিশিতের কারণে মৃত্যুবরণ করে, কেউ কেউ তাদের শৃঙ্গের, কেশের, অস্থির, পক্ষের কারণে; কেউ হত হয় বন্ধু-আত্মীয়ের পারস্পরিক দ্বন্দে বিদীর্ণ হয়ে; কেউবা ভারবহন করতে করতে প্রাণত্যাগ করে, কারো প্রাণ যায় অঙ্কুশতাড়িত বিদ্ধ অবস্থায় । তাদের ক্ষতবিক্ষত শরীর বেয়ে অঝোরে রক্তস্রাব হয়ে চলেছে, শুষ্ক ক্ষুধিত শরীর – তবু কোন উপশম নেই, তারা পারস্পরিক সংগ্রামে রত, শরীরের শেষ শক্তিটুকুও কে শুষে নিয়েছে। আকাশে উড্ডীয়মান বা গভীর জলে নিমজ্জমান, মৃত্যুর হাত থেকে কারো নিস্তার নেই।


“এবং দেখলেন, যাদের মানবরূপে পুনর্জন্ম হয়েছে, ক্লেদময়, পূতিগন্ধময় শরীর, অবর্ণনীয় যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাদের দিনযাপন, জন্মবস্থা থেকে যারা শঙ্কায় কম্পমান, নমনীয় শরীরে যা কিছু স্পর্শ করে তাতেই যন্ত্রণাবোধ, যেন কেউ শাণিত ছুরির ফলায় খান খান করে তাদের কেটে ফেলছে”
এই যে কণ্টকময় উপত্যকা, যাকে জীবন বলে জানি, এ যেন এক বিভীষিকাময় দুঃসপ্ন।
“জন্ম ইস্তক মৃত্যু, পরিশ্রম, দুঃখের হাত থেকে কারো মুক্তি নেই, অথচ পুনর্বার জন্মের আকাঙ্খা, এবং জন্মানো মাত্রই যন্ত্রণাভোগ ।”


নিদারুণ অজ্ঞানতার নিপীড়নযন্ত্র নিষ্পেষণ করতে করতে নিরন্তর এগিয়ে চলে।


“তারপর দেখলেন যারা সদ্গুণসম্পন্ন হয়ে স্বর্গলাভ করেছে; সতত প্রেমের তৃষ্ণা তাদের গ্রাস করে আছে, জীবনাবসানের সঙ্গে সঙ্গেই তাদের সৎকর্মেরও অন্ত হয়, পাঁচটি চিহ্ন তাদের মৃত্যুর ঈঙ্গিত বহন করে। ঔজ্জ্বল্য হৃত হয়ে অঙ্কুর যেমন শুষ্ক অবস্থায় বিনষ্ট হয়, এই সব মানুষের পারিপার্শ্বিক আত্মীয়বন্ধুরা যত শোকই করুক, এঁদের চিরকাল বাঁচিয়ে রাখতে অপারগ।


এখন শূন্য প্রাসাদ, শূন্য প্রমোদ-অঙ্গন। একাকী নিঃসঙ্গ দেবদূতগণ ধুলিধুসরিত পৃথিবীতে উপবেশিত, প্রিয়জনের কথা স্মরণ করে রোদন ও হাহাকার করছেন। বিভ্রমের এ কি ছলনা, হায়! ব্যতিক্রম নেই কোথাও, প্রতি জন্মেই নিরন্তর বেদনা।


“স্বর্গ, নরক, বা পৃথিবী, জন্ম মৃত্যুর বারিধি এইভাবে আবর্তিত – অনন্ত ঘুর্ণায়মান আবর্তনচক্র – এই সমুদ্রে নিমজ্জিত শরীরসমূহ অস্থির ভাবে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে চলেছে! এইভাবে মানসচক্ষে তিনি জীবনের পঞ্চক্ষেত্র ও জাত প্রাণিসমূহের লয়তত্ব অবধান করলেন। দেখলেন সকলই কদলীবৃক্ষ কি জলবিম্বের ন্যায় শূন্য ও অসার, সাপেক্ষহীন! “

 

buddhamara
Source: The Life of Buddha

বোধিবৃক্ষ বা জ্ঞানবৃক্ষের তলায় গৌতম ধ্যানে বসছেন, তাঁর অধিষ্ঠানের এই শুভ মুহূর্তটি নিয়ে বহু লেখালিখি হয়েছে। এই অধিষ্ঠানে উদ্যান-ভ্রমণের যন্ত্রণা ছিল না, বরং ছিল তরুতলে নিশ্চিন্তে বসে থাকার অপার শান্তি। কোনকিছুরই পুনরুজ্জীবন করার তো ছিল না, ছিল তাবৎ সমুদায়ের বিলয়।
সেই প্রহরে বুদ্ধের প্রতীতি হল সকল বস্তু কারণ হতে উৎপন্ন হয় তারপর তাদের লয় অবশ্যম্ভাবী, সেই জন্যই সকল বস্তু অনিত্য, সমস্তই অসুখী, সবই অমূর্ত, অবাস্তব!
তিরতির করে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে।


গৌতম অনুভব করলেন, এই জগদ্ব্যাপারের যা কিছু সব মনসিজ, মন হতেই তাদের উৎপত্তি, ঐশ্বরীয় বাস্তবতার জমিতে মিথ্যার ফাঁকি যে বীজ বপন করে, সেই বীজ থেকে তাদের জন্ম। একটা মিথ্যা স্বপ্ন, সেই স্বপ্নটা জুড়ে শুধু দুঃখ আর শোক।


“সেই অরণ্যের যত পশু ছিল, তারা স্তব্ধ ও নীরব হয়ে তাঁর দিকে অপার বিস্ময়ে চেয়ে রইল” ।
বুদ্ধের খুব প্রলোভন হচ্ছিল । একবার ভাবলেন যে উঠে অন্য কোথাও চলে যান, তরুতলে এই অনর্থক ধ্যান করার দরকার নেই; পরক্ষণেই উপলব্ধি হল যে এ সবই মারের প্রলোভন, তখন অনড় রইলেন। একবার মনে দারুণ ভীতির সঞ্চার হল। এদিকে চোখ বন্ধ তবু যেন চোখের সামনে দেখলেন পিছনে কি সব হচ্ছে, প্রায় জ্বর এসে গেল ভেবে: নানারকমের চিন্তাভাবনা মনে উদয় হল। কিন্তু শিশুদের খেলতে দেখলে মানুষ যেমন অবিচল থাকে, তিনি তেমনি অবিচল রইলেন; এইসব মানসিক সংশয় আর উৎপাত মনে উঠতে দিলেন, বাধা দিলেন না, তারা বুদ্বুদের মত একবার করে উদয় হল, আবার মনসমুদ্রের শূন্যতায় বিলীন হয়ে গেল।


রাত হল।


বুদ্ধ শান্ত নীরব রইলেন, অতীন্দ্রিয় গভীর ধ্যানের অবস্থায় প্রবেশ করলেন। সর্বপ্রকার বিমলানন্দবোধ একের পর এক তাঁর নয়নের সমুখ দিয়ে চলে যেতে লাগল। রাত্রির প্রথম প্রহরে বুদ্ধ সম্যক দৃষ্টি প্রাপ্ত হলেন (সম্মা দিত্তি), সমস্ত পূর্বজন্মের স্মৃতি তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল।
“অমুক স্থানে, অমুক নাম নিয়ে প্রথম জন্মের পর ক্রমাগত নিম্নগামী হতে হতে এই বর্তমান জন্মে আসা, এভাবে নিজের সহস্র সহস্র জন্মের ও মৃত্যুর জ্ঞান হল”

 

 

zengarden
Source: The Timeless Tao

অস্তিত্বের সারাৎসার এর মূলতত্ত্ব যাঁর আয়ত্তে, তাঁর উজ্জ্বল, রহস্যময়, মানস-সত্তায় এমন কোন জন্মের কথাই বা বিস্মৃত থাকে? যেন তিনি সব হয়েছেন। সত্যিকারের আলাদা করে “তিনি” তো কখনো ছিলেন না, তিনি সদাসর্বত্র বিরাজমান ছিলেন, কাজেই সমস্ত বস্তুই প্রকারান্তরে এক সত্তা, আর সবটাই নিখিল মানসের অন্তর্গত, কেননা ভুত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান, ত্রিকাল ব্যাপি সে-ই একমাত্র মানস।


“জন্ম ও মৃত্যু গঙ্গার বালুকারাশির মতই অসংখ্য, তাবৎ জীবের প্রতি অন্বয় চিন্তায় তাঁরও হৃদয়ে অপার করুণার সঞ্চার হল”


দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে, জীবনের সুপ্রাচীন স্বপ্ন, বহুমাতৃত্বময় বেদনার অশ্রুজল, সেই সব সহস্র পিতৃপুরুষ যাঁরা এখন মৃত্তিকায় মিশে গেছেন, অনন্তকালের ভাই বোনেদের হারিয়ে যাওয়া দুপুরবেলা, ঘুম ঘুম মোরগের ডাক, কীটপতঙ্গের গহ্বর, শূন্যতায় অপব্যয়িত সেই সব দয়ার্দ্র অনুভূতি, ফেলে আসা কোন এক ঝিমধরা বিশাল স্বর্ণযুগ মস্তিষ্কে অনুভূতি জাগায় যে, এ চেতনা তো আজকের নয়, এই জ্ঞান বিশ্বের জন্মেরও প্রারব্ধ ।


তারপর, “পরম করুণার অনুভূতিও যখন অতিক্রান্ত হল, বুদ্ধ তখন পুনরায় সর্বজীবের কথা বিবেচনা করলেন, কেমন করে তারা জীবচক্রের ছটি অংশে পরিভ্রমণ করে, জন্ম বা মৃত্যু কোনটাই শেষ কথা নয়; সমস্তই শূন্যগর্ভ, সমস্তই কদলীবৃক্ষের কি স্বপ্নের কি কল্পনার প্রায় অলীক”

অনুভূতির এই সূক্ষ্ম কারুকর্মে বুদ্ধ যখন উপবেশন করছিলেন, তাঁর মুদ্রিত নেত্রে দৃষ্টির তমসার আবছায়ায় তূরীয় দুগ্ধফেননিভ উজ্জ্বল জ্যোতি যেন সপ্রভ বিরাজমান, তাঁর কর্ণকূহরে শ্রবণসমুদ্রের অপরিবর্তনীয় স্তব্ধতা, সে সমুদ্র কখনো উদ্বেল, কখনো অপসৃয়মান, শব্দের চেতনা স্মরণে মননে আসছিল, সে শব্দ যদিও অপরিবর্তনীয়, সেই শব্দের যদিও কোন হেরফের হয়নি, বুদ্ধের চেতনার কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছিল; জোয়ার ভাঁটায় সমুদ্রের জল যেরকম মাঝে মাঝে চিড়বিড় করে বালি ভিজিয়ে দিয়ে যায় সেইরকম; সেই শব্দ কানের অভ্যন্তরেও নয়, তার বাইরেও নয় অথচ সে সর্বত্র বিরাজমান, অনঘ শ্রবণসিন্ধু, নির্বাণের অতীন্দ্রিয়নাদ, যাকে নিষ্পাপ শিশুরা শয্যায় শুয়ে শুনতে পায়, যে থাকে চাঁদের বুকে আর ঝড়ের হাহাকারের বক্ষদেশ জুড়ে, তাকেই সদ্যজাত বুদ্ধ শুনতে পেলেন যেন কেউ শিক্ষা দিচ্ছে তাঁকে; প্রাচীন কালের ও অনাগত ভবিষ্যতের সমস্ত বুদ্ধের কাছ থেকে ভেসে আসছে এক অন্তহীন অথচ স্পষ্ট জ্ঞানগর্ভ দীক্ষামন্ত্র।


দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ ডাকছে; মাঝে মাঝে নিদ্রিত পাখিদের গলা থেকে অনবধানবশত কিচির মিচির শব্দ; মেঠো ইঁদুরের খড়খড় শব্দ, গাছে গাছে পত্রমর্মর – অতীন্দ্রিয় শ্রবণের শান্তি এতে মাঝে মাঝে ভঙ্গ হচ্ছে বটে, কিন্তু এও দৈববশে। অবিচল, অবিভেদ্য তূরীয় শ্রবণ-পারাবারে যাবতীয় কোলাহল, যাবতীয় দৈববশ মিশে গেল, না তার বৃদ্ধি হল, না তার ক্ষয় হল, সে মহাশূন্যের ন্যায় আত্মশুদ্ধ ।
নক্ষত্রখচিত আকাশের নীচে , রত্নসমাধির তূরীয়নাদের স্বর্গীয় প্রশান্তিতে মগ্ন অবস্থায় ধর্মরাজ অনড় ধ্যানমগ্ন হয়ে রইলেন।

ভোর তখন তিনটে। ইহজগতের দুঃখের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভোরের কুয়াশা ক্রমশ ঘন হল।

“তৃতীয় প্রহরে তাঁর গভীর সত্যের উপলব্ধি হল। তিনি দুঃখসঞ্জাত, জীবনের জটিল গ্রন্থিতে আবর্তিত জগতের তাবৎ প্রাণিকূল, সেই সব অগণিত প্রাণ, যারা বেঁচে থাকে, বৃদ্ধ হয়, তারপর এক সময় মারা যায়, তাদের জন্য ধ্যানমগ্ন হলেন। সেই সব অগণিত লোভী, কামুক, অজ্ঞানতিমিরে আবদ্ধ অগণিত মানুষের দল যাদের শেষ পর্যন্ত মুক্তির উপায় জানা নেই, বুদ্ধ তাদের নিমিত্ত ধ্যানমগ্ন হলেন।”


ওগো, দেহের মৃত্যুর কারণ কি?


“সৎচিন্তায়, আপন অন্তরে তিনি ধ্যানমগ্ন হলেন জন্মের, মরণের, উৎস সন্ধানে।”


দেহের জন্মই দেহের মৃত্যুর কারণ। যেমন, বীজ বপণই গোলাপ ফুলের প্রস্ফুটনের কারণ।
আরো দূরে দৃষ্টিপাত করলেন, জন্ম তবে কোথা থেকে এসেছে? দেখলেন জন্ম এসেছে অন্য জীবনে অন্য কোথাও কৃতকর্মের কারণে; তারপর সেই কর্মের নির্ণয় করতে গিয়ে দেখলেন যে কোন বিধাতা তাকে আপন বিধানে বেঁধে দেন নি, এমনকি তারা স্বয়ম্ভুও নয়, না তাদের নিজস্ব কোন অস্তিত্ব আছে না তার অ-সৃষ্টি; দেখলেন, দীর্ঘ, দীর্ঘতর কারণ-শৃঙ্খলে কর্মের প্রাপ্তি, কারণের পর কারণের অতিদীর্ঘ সেই শৃঙ্খল, শ্রেণীপরম্পরায় গ্রথিত মাল্যবন্ধনে আবদ্ধ তাবৎ মূর্ততা – কী নীচ রূপ, কী রজকণা, বা বেদনা।

তারপর। বাঁশের প্রথম গ্রন্থিটি ভেঙ্গে ফেলার পরে যেমন পরপর বাঁশ আলগা করা যায়, মৃত্যুর কারণ জন্ম ও জন্মের কারণ কর্ম অনুধাবন করার পর তিনি ক্রমশ সত্যের দর্শন পেলেন; মৃত্যু জাত হয় জন্ম হতে, জন্ম জাত হয় কর্ম হতে, কর্ম জাত হয় বন্ধন হতে, বন্ধন জাত হয় বাসনা হতে, বাসনা জত হয় বেদন হতে, বেদন জাত হয় অনুভূতি হতে, অনুভূতি জাত হয় ষড় ইন্দ্রিয় হতে, ষড় ইন্দ্রিয় জাত হয় ব্যক্তিত্ব হতে, ব্যক্তিত্ব জাত হয় চৈতন্য থেকে।


কৃতকর্ম জাত হয় বন্ধন থেকে, কর্ম এক কাল্পনিক আকাঙ্খার হেতু করা হয়, যে কাল্পনিক আকাঙ্খার বন্ধনে প্রাণী বদ্ধ, যার নামে কৃতকর্মের শুরু, বন্ধন আসে বাসনা থেকে, স্বভাবের আগেও বাসনা, বাসনা আসে অনুভুতি থেকে। যার সম্বন্ধে কিছু জানতেন না, তাকে আপনি পেতে চান নি কখনো, তারপর যেদিন পেতে চাইলেন, সেদিন হয় যাকে পেতে চেয়েছিলেন তার সম্বন্ধে সুখানুভূতি হল, আর নয়ত না পাওয়ার দুঃখ যার থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলেন, বাসনা নামের মুদ্রাটির এপিঠ ওপিঠ; অনুভূতি সংবেদন থেকে এসেছিল, আঙুল পুড়ছে এই সংবেদন আর অনুভূতি একসঙ্গে তো হয়না। সংবেদন হয়েছিল কারণ চেতনা জাগানিয়া বস্তুটির সঙ্গে ষড়-ইন্দ্রিয়ের (চোখ, কান, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক, মস্তিষ্ক) সংস্পর্শ হয়েছিল, আগুনের সংস্পর্শে না এলে তো আঙুল পোড়ে না ;
ষড়েন্দ্রিয় ব্যক্তিত্বের কারণে জাত; বীজ যেমন পত্র-শাখা-প্রশাখায় পল্লবিত হয়, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রও তেমনি একমেবাদ্বিতীয়ম দর্পণসম স্বচ্ছ পরম-মানস জাত হয়ে ষড়গুণসম্পন্ন হয়ে বেড়ে ওঠে; ব্যক্তিস্বাতন্ত্র আসে চৈতন্য থেকে, যে চৈতন্য বীজের ন্যায় অঙ্কুরিত হয়ে একেকটি পত্রে বিকশিত হয়, চেতনাকে বাদ দিলে কুতো বৃক্ষপল্লব?; তো, চৈতন্য আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে, আর কিছুই বাকী নেই; সমাপতিত কারণে চেতনা থেকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের উৎপত্তি, অবার অন্যদিকে অন্য কোন সমাপতনে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র থেকেই চেতনার জন্ম। সমুদ্রে জাহাজ ভেসে চলেছে, সেখানে জাহাজ ও মানুষ একসঙ্গে, আবার দেখ তীর আর জল একে অপরকে জড়িয়ে আছে; চেতনা ব্যক্তিত্বকে নিয়ে আসে, ব্যক্তিত্ব শিকড় প্রোথিত করে। শিকড় ষড়েন্দ্রিয়ের বহির্জগতের সঙ্গে সংস্পর্শবোধের উৎপত্তির কারণ, সেই সংস্পর্শ যা অনুভূতিকে বয়ে আনে; অনুভূতি বয়ে আনে অভিলাষ বা অনভিলাষ; অভিলাষ অনভিলাষ দুইই বন্ধনের কারণ; বন্ধন থেকে কৃতকর্মের উৎপত্তি, কৃতকর্ম থেকে জন্মের, জন্ম থেকে মৃত্যুর; তাবৎ জীবের অস্তিত্বের এ এক অনন্ত চক্র।

একে অতিক্রম করে, অস্তিত্ব-শৃঙ্খলের (নির্দান শৃঙ্খল) দ্বাদশ গ্রন্থিকে অবলোকন ও পরিপূর্ণ করার পর, বুদ্ধ দেখলেন এই যে চৈতন্য, যে ব্যক্তিত্ববোধের সঙ্গে সঙ্গে এত রকম সব বিপত্তিরও উৎস, সে স্বয়ং কর্ম (স্বপ্নের অবশিষ্ট অসমাপ্ত ফেলে আসা কাজ) সঞ্জাত, এবং কর্ম এসেছে অজ্ঞানতা থেকে, ও অজ্ঞানতা এসেছে মানস থেকে। যে অমোঘ অনড় বিধি ক্রিয়া ও তার ফলকে একসূত্রে বেঁধে রাখে, কি ইহকালে কি পরকালে, কর্ম তারই মূর্ত প্রতিরূপ। মরজগতের যা কিছু, পশু, মানুষ, রাজন্যবর্গের ক্ষমতা, নারীদেহের সৌন্দর্য, ময়ুরপুচ্ছের অসামান্য রূপ, মানুষের নৈতিকতা, সব সব। কর্ম সজ্ঞান জীবের উত্তরাধিকার, যে ভ্রূণ তাকে বহন করে, যে ভ্রূণে সে পুনরায় ফিরে যাবে; কর্ম নৈতিকতার মূলে, কেননা যা ছিলাম নির্ধারণ করে যা হয়েছি। যে মানুষ জ্ঞানদীপ্ত হন, আলোকপ্রাপ্ত হন, তারপর স্তব্ধ হন, সর্বোচ্চ বোধি অর্জন করে নির্বাণপ্রাপ্ত হন, তার কারণ তাঁর কর্ম নিজেকে নিঃশেষ করেছে এবং এও তার কর্মেই বিধি ছিল; তেমনই অশিক্ষিত, ক্রুদ্ধ, লোভী, নির্বোধ মানুষের কর্মও নিজেকে নিঃশেষ করতে পারেনি বলেই এই অবস্থা, এও তার কর্মেই ছিল।

ঠিকমত আলোকপ্রাপ্ত হয়ে, সম্যকভাবে অবলোকনপূর্বক তিনি প্রজ্ঞায় উপনীত হলেন।
জন্মের বিনাশ হলে মৃত্যুও স্তব্ধ হবে, কর্মের বিনাশ হলে জন্ম স্তব্ধ হবে, আসক্তির বিনাশ হলে কর্ম সাঙ্গ হবে, বাসনার বিনাশ হলে আসক্তির অন্ত, চেতনার নাশ হলে বাসনার অন্ত, অনুভবের নাশ হলে বেদনের অন্ত, ষড়েন্দ্রিয়ের সঙ্গে সংযোগ ছিন্ন হলে অনুভবও শেষ হবে, ইন্দ্রিয়ে প্রবেশের পথের বিনাশ হলে, ব্যক্তিত্ববোধের ও সংলগ্ন বিষয়ের অন্ত হবে। চৈতন্যের নাশ হলে ব্যক্তিত্ববোধের অন্ত, আবার ব্যক্তিত্ববোধের অন্ত হলে চেতনারও অন্ত, চেতনার অন্তে কর্মের প্রভাব থাকে না। কর্ম গেলে স্বপ্নময় অজ্ঞানতারও অন্ত হয়, অজ্ঞানতার বিনাশ হলে ব্যক্তিমানুষের মৃত্যু; মহাঋষি এই ভাবে পরম প্রজ্ঞায় উপনীত হলেন।


এই হচ্ছে নির্দান চক্রের তালিকা:
১। অজ্ঞানতা
২। কর্ম
৩। চৈতন্য
৪। ব্যক্তিত্ববোধ
৫। ষড়েন্দ্রিয়
৬। অনুভূতি
৭। উপলব্ধি
৮। বাসনা
৯। আসক্তি
১০। কৃতকার্য
১১। জন্ম
১২। মৃত্যু

অন্তর্দৃষ্টি জাগল, অজ্ঞানতা দূরীভূত হল, অন্ধকার রাত্রি শেষে সূর্যোদয় হল। আমাদের ইহজগতের তেজোময় উজ্জ্বল, আত্ম-অধীশ্বর বুদ্ধ স্থাণুবৎ উপবেশিত রইলেন, তাঁর অন্তরে এই মহাসংগীত ধ্বনিত হল,


“কত না জীবনের গৃহ আমাকে বেঁধেছে,
কতদিন তাঁকে খুঁজে পাব বলে সংগ্রাম করেছি,
সেই তাঁকে, যিনি ইন্দ্রিয়ের এই দুঃখময় কারাগার সৃষ্টি করেছেন,
অথচ, আজ, এই মন্দিরের স্রষ্টা – তুমি!
এই যে তোমায় চিনলাম, তুমি আর কখনো
এই বেদনার প্রাকার গড়ে,
কপট বৃক্ষশাখ, মৃত্তিকার ভেলা গড়ে
আমায় ভোলাতে পারবে না,
তোমার দুয়ার ভেঙে সেতু পেরিয়ে
পেয়েছি তোমায়,
মায়া দিয়ে গড়েছ যারে, অজ্ঞানতার নামে,
চললাম আমি মুক্তির পথে।”

এইভাবে মুক্ত হয়ে তাঁর অন্তরে জ্ঞান ও মুক্তচিন্তার উদয় হল, জানলেন পুনর্জন্মের অন্ত হয়েছে, উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে। জগতের মঙ্গলকামনায় চতুরার্য সত্যে তিনি নতুন পথের সন্ধান দিলেন।

চতুরার্য সত্য


১। সমগ্র জীবন ক্লেশময় (অস্তিত্ব মাত্রই দুঃখ, অনিত্য, অপ্রকৃত/অবাস্তব অবস্থা)
২। দুঃখের কারণ অজ্ঞান অন্ধ বাসনা কামনা
৩। দুঃখ ও যন্ত্রণার অপলাপ সম্ভব
৪। তার পথ আর্য-অষ্টাঙ্গমার্গ

আর্য-অষ্টাঙ্গমার্গ
1. সম্যক দৃষ্টি (সম্মা দিত্তি)। – চতুরার্য সত্যকে আশ্রয় করে
২। সম্যক সংকল্প (সম্মা সংকপ্পা) – যে এই পথেই দুঃখ জয় করতে হবে
৩। সম্যক বাচ (সম্মা বাচ) – জগতের সমস্ত ভ্রাতা ভগিনীদের সঙ্গে নম্র, মর্মস্পর্শী বাক্যালাপ
৪। সম্যক কর্মান্ত (সম্মা কম্মান্ত) – নম্র, সরল, পরোপকারী, সৎ ব্যবহার
৫। সম্যক আজীব (সম্মা অজীব) – কারো কোন ক্ষতি না করে অন্নসংস্থান করাই জীবন
৬। সম্যক ব্যায়াম (সম্মা ব্যায়াম) – উদ্যম ও উৎসাহের সঙ্গে সৎপথে চলার প্রতিজ্ঞা
৭। সম্যক স্মৃতি (সম্মা সতি) – সর্বদা বিপথ গমনে যে বিপদ তার কথা স্মরণে রাখা
৮। সম্যক সমাধি (সম্মা সমাধি) – সমস্ত জীবজগতের বোধির নিমিত্ত আপন মনে একাকী ধ্যান প্রার্থনায় মগ্ন থেকে পরমানন্দ লাভ (সমাধি সমাপত্তির নিমিত্ত ধ্যান করা)

“এই জ্ঞান যখন আমার মধ্যে জাগ্রত হল, আমার অন্তরাত্মা কামনা, পুনর্জন্ম, অজ্ঞানতার প্রমত্ততা থেকে মুক্তিলাভ করল।”

 

 

 

 

যেভাবে তৃণের অভাবে অগ্নি নির্বাপিত হয়, সেইভাবে বুদ্ধ “আত্ম” রহিত হলেন; যে কাজ তিনি চাইতেন যে অন্যে করুক এখন তাই তিনি নিজে করলেন; পূর্ণজ্ঞানে পৌঁছনর পথ তিনি পেয়েছেন। উদ্ভাসিত জ্ঞানের আলোয় বুদ্ধের উপলব্ধি হল: যে পূর্ণজ্ঞান, সে যেন বয়ে আনা উপহার, তাঁর পূর্বে আগত অগণিত বুদ্ধের পথ নিখিল বিশ্বের দশ দিক, দশচক্র বেয়ে তাঁর কাছে এসেছে, তাতে চোখের সামনে যেন এক মহান জ্যোতি দৃশ্যমান হল যে সেই তাঁরা, বুদ্ধেরা, সর্বত্র আলোকিত করে মহাপদ্মসিংহাসনে সমাসীন, প্রপঞ্চ মহাবিশ্বের সর্বত্র সর্বকালে সর্বজীবের আর্তিতে তাঁরা সংবেদনশীল, পূর্বকাল, ইহকাল, পরকাল, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের তাবৎ অস্তিত্বে তাঁরা বিরাজমান।

মহাসত্য নির্ণয় করলেন তিনি, অতঃপর সেই সত্যকে নিজের জীবনে উপলব্ধি করে মহাঋষি আলোকিত হলেন, সম্বোধি লাভ করে তিনি বুদ্ধত্ব প্রাপ্ত হলেন। এ সম্বোধি যথার্থ সম্বোধি, শুধুমাত্র অন্তরগজৎ হতে তার আত্মপ্রকাশ, সেখানে বহির্জগতের, বহির্জাগতিক ঈশ্বরের, গুরুর কোন স্থান নেই। কবি বলেছেন,


“শিরোপরি আত্মজ্যোতি ব্যতিরেকে,
মানুষকে কেউ পথ দেখায় না, কেউ দেখায়নি।”

তখন সেই প্রত্যূষে প্রভাতসূর্যের জ্যোতিকিরণ ক্রমশ উজ্জ্বল হল, অপসৃয়মান ধোঁয়াশা আর কূহেলী মিলিয়ে গেল দিনের আলোয়। চন্দ্র তারকার ক্ষীণ আলো ক্রমশ নিষ্প্রভ হল, দূর হল রাত্রির তমসাঘন অন্তরায়। বুদ্ধ তাঁর প্রথম পাঠ, শেষ পাঠ, সাবেক পুরাতন পাঠ সমাপন করলেন, মহাঋষির নিঃস্বপন সুপ্তিগৃহে প্রবেশ করে, পূর্ণ সমাধির স্থিতাবস্থায় তিনি অনন্ত সত্যের উৎসমুখে পৌঁছলেন যে, আনন্দের আদি নেই, আনন্দের অন্ত নেই, আনন্দ সদাসর্বদা সৎচিতে বিরাজমান।

এই যে বুদ্ধ সৎচিতের প্রকৃত রূপ উন্মোচন করলেন, এতে কোন বাহ্যিক দেখনদারির বহিঃপ্রকাশ ছিল না, ছিল অন্তরের নিঃস্তব্ধতা ও অপার শান্তি। সে পরম এক নিশ্চলতা, চরম এক স্থিতাবস্থা ।


তিনি এখন শিহিভুত, শীতল।


এইবার আসবে পরমসুখী মহাতাপসের জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। বহু সংগ্রামের শেষে তিনি গভীর সত্যকে খুঁজে পেয়েছেন, এখন সেসব খুবই অর্থপূর্ণ, কিন্তু খুব পণ্ডিত জ্ঞানী ব্যতিরেকে তা সাধারণ মানুষের দুর্বোধ্য। সাধারণ মানুষ নেহাতই পার্থিব, তারা সুখের সন্ধানে ঘুরে মরে। তাদের ধর্মজ্ঞান, পুণ্যার্জন, বিষয়সম্পদের প্রকৃত রূপ অবধান করার ক্ষমতা থাকলে কি হবে, তারা সব পুতুলনাচের পুতুলের মতন। ছলচাতুরীর, অজ্ঞানতার মায়াজালে ফেঁসে গিয়ে, হাবিজাবি ধারণার বশবর্তী হয়ে কি যেন এক অদৃশ্য সুতোয় নাচতে থাকে। এইসব উল্টোপাল্টা ধ্যানধারণার সঙ্গে তাদের প্রকৃত শান্ত সমাহিত স্বরূপের কোন সম্পর্কই নেই। তারা কি পূর্বকৃত-স্বপ্নের কর্মফলের ধর্ম বুঝতে পারবে? তারা কি তাদের নৈতিক জগতে ক্রমান্বয়ে চলতে থাকা কার্য-কারণকে অবধান করতে সক্ষম? তারা কি আত্মার মতন একটা পাশবিক ধারণাকে বিদেয় করে মানুষের প্রকৃত স্বরূপের বিষয়টাকে ধরতে পারবে? বামুন-পুরুত ধরে এই যে তাদের মোক্ষলাভের প্রবণতা, এই প্রবণতাটিকে তারা কি অতিক্রম করে বেরিয়ে আসতে পারবে? এরা কি পরম শান্তির অবস্থাটিকে উপলব্ধি করতে সক্ষম? সেই শান্তির স্থিতাবস্থা, যা জাগতিক তৃষ্ণা নিবারণ করে নির্বাণের স্বর্গসুখের পথে মানুষকে এগিয়ে দেয়? চারিদিকে যা চলছে, তাতে যে সত্য তিনি উপলব্ধি করেছেন, যা আবিষ্কার করেছেন, সেসব প্রচার করা কি ঠিক উচিত হবে? তারপর যদি না বোঝাতে পারেন, যদি ব্যর্থ হন, তখন? সে যন্ত্রণা কি সইতে পারবেন ? এই রকম সব প্রশ্ন আর সন্দেহ তাঁর মনে উদয় হল, তারপর সার্বজনীন করুণা আর সহমর্মিতায় সেসব ধারণা মিটেও গেল। সেই তিনি, যিনি যাবতীয় স্বার্থপরতা পরিত্যাগ করেছেন, তিনি তো অন্যদের ব্যতীত কেবল নিজের জন্য বেঁচে থাকতে পারেন না। পরের জন্য বেঁচে থাকার ব্রত যে নিয়েছে তার কাছে মানুষকে পরম সুখ অর্জনের পথ দেখানোর চেয়ে মহৎ আর কিই বা হতে পারে? সাংসারিক ব্যথা বেদনা, অশ্রুপূর্ণ সমুদ্রে নিমজ্জমান এই সব প্রাণী, এদের উদ্ধারের চেয়ে মহৎ সেবা আর কিছু আছে কি? জগতকে উপহারই যদি দিতে হয়, “প্রতিষ্ঠিত সত্য”রূপী ধর্মের সন্দর্শন করানো, এই জগতকে স্ফটিকের মত কাকচক্ষু স্বচ্ছ করে দেখিয়ে দেওয়াই কি সবচেয়ে দামী উপহার নয়?


পরিপূর্ণ মহামানব অপলক নেত্রে মহাবৃক্ষ, সমস্ত বৃক্ষের অধিরাজ যে বৃক্ষ, তার পানে অনিমেষ নয়নে চেয়ে রইলেন, “এ ধর্ম এক আশ্চর্য ও মহৎ ধর্ম”, মনে মনে চিন্তা করলেন তিনি, “আবার এদিকে গতানুগতিক জীবনের অজ্ঞানতায় প্রাণিকূল অন্ধ হয়ে পড়ে আছে, কি যে করি? এই যে এখন, যতক্ষণ বাক্যস্ফুট করছি, মানুষ কিন্তু পাপে নিষ্পিষ্ট হচ্ছে। এদের অজ্ঞাতার কারণে, যা বলব এরা কেউ শুনবে না, পাত্তা দেবে না, তার ফলে নিজেরাই শাস্তি পাবে । এর চেয়ে বরং চুপ থাকাই শ্রেয়। আজই বরং নিঃশব্দে আমার মরণ হোক!”

কিন্তু যখন স্মরণে এল কালে কালে সর্বজগতে গতাসু বুদ্ধগণ কি দক্ষতায় বিভিন্ন জন-কে পূর্ণ সহজ সত্যের দর্শন দিয়েছিলেন, তখন ভাবলেন, “নাহ, আমিও বুদ্ধচেতনার, আলোকপ্রাপ্তির উদ্বোধন করব!”

এর বহুকাল পরে গৌতম সারিপুত্ত ও অন্যান্য সন্ন্যাসীদের কাছে তাঁর বোধিবৃক্ষের তলায় সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, “সেদিন যখন ধর্মের বিষয় ধ্যান করছিলাম, সর্বলোক হতে বুদ্ধেরা স্বশরীরে আমার সুমুখে উপস্থিত হয়ে সমস্বরে বললেন, “ওঁ! তথাস্তু! জগতের একমেবাদ্বিতীয়ম নেতা! শৃন্বন্তু! এই যে অপরাপর নেতৃবর্গের অতুলনীয় জ্ঞান ও ধীশক্তিতে উপনীত হলেন, ও তাঁদের ধ্যান করলেন, তাঁদের এই শিক্ষার এবার পুনরাবৃত্তি করুন। বুদ্ধরূপে আমারাও সেই পরম সত্য ত্রিকায়ায় (মূর্ত-কায়া, আনন্দ-কায়া, ধর্ম-কায়া) প্রকাশ করব। মানুষ স্বভাবত নিম্নগতি, তারা হয়ত অজ্ঞানতাবশত বিশ্বাস করতে চাইবে না, যে, “তোমরা সবাই বুদ্ধত্ব প্রাপ্ত হবে।”


“তাই আমরা আমাদের ক্ষমতাবলে ও ফললাভের উৎসাহহেতু বহু জ্ঞানীকে (বোধিসত্ত্ব-মনসত্ত্ব) জাগরিত করে তুলব”


“অগ্রজদের মুখনিঃসৃত এই মধুর বাণী শ্রবণ করে আমি আনন্দিত হলাম; চিত্তোল্লাসে সেই মুনীবরদের বললাম, “মহাতাপসগণের কথা কখনো ব্যর্থ হয়না!”


“অতএব আমিও, জগতের মহান নেতৃবর্গ যেমন বলেছেন সেই মত কাজ করব; ক্ষয়িষ্ণু প্রাণীকূলে জন্মেছি, তাই এই ভয়ংকর জগতের দুর্দশা সম্বন্ধে অবগত’


“তখন মনে হল যে কাজের জন্য আমার জন্ম হয়েছে, মহতী ধর্ম প্রচার ও পরম চৈতন্যের প্রকাশসাধন, তার সময় সমাগত।


“কখনো কখনো, কোথাও কোথাও, কিভাবে যেন মহাত্মারা এ জগতে আবির্ভূত হন, তারপর তাঁদের আবির্ভাবের পর, তাঁদের অপার জ্ঞান, তাঁরা সময়ে সময়ে একই ধরণের ধর্ম প্রচার করেন।”


“এই পরম ধর্মের সন্ধান পাওয়া বড় দুর্লভ, হোক সে শত সহস্র যুগ ব্যাপী; বুদ্ধদের বাণী শ্রবণ করে তাঁদের পরম ধর্মের যথাযথ অনুসরণ করবেন, এমন মানুষ পাওয়াও দুর্লভ।


“ঠিক এই গোলাকার মহাবটবৃক্ষে পুষ্প যেমন দুর্লভ, পাওয়া যে যায়না তা নয়, যখন দেখা যায়, সে ভারি সুন্দর।”


“তবে যে ধর্মের আমি প্রবর্তন করব তা সব চেয়ে চমৎকার! যদি কেউ একে যথাযথ ভাবে শুনে, তাকে হর্ষের সঙ্গে গ্রহণ করে, তার পুনরাবৃত্তি করে, তবে সে সব বুদ্ধদেরই শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করবে।


“এ নিয়ে মনে কোন দ্বিধাদন্দ্ব রেখো না: আমি ঘোষণা করছি আমিই সেই ধর্মরাজ!”


“তোমরা আনন্দ কর যে তোমরা সবাই বুদ্ধত্ব প্রাপ্ত হবে!”


অতএব সেই তথাগত, যিনি-চিত্তের-তদ্গত-অবস্থা-প্রাপ্ত-হয়েছেন, যিনি প্রাণীতে প্রাণীতে কোন বিভেদ দেখেন না, যিনি আপন, পর, বহু, কোন অস্তিত্বকে, অবিভক্ত নিখিল অস্তিত্বকেও আমল দেন না, যাঁর কাছে জগৎ এক দুঃখময় মায়া বই কিছু দ্রষ্টব্য নয়, না অস্তিত্ব না অনস্তিত্ব, স্বপ্ন থেকে জাগরিত কিন্তু স্বপ্নে কি দেখলেন তাই নিয়ে চিন্তা করেন না; অতএব তথাগত, শান্ত, স্তব্ধ, উজ্জ্বল, সর্বত্র জ্যোতি বিচ্ছুরণ করতঃ, তাঁর বোধি বৃক্ষের তপস্যাস্থল থেকে উথ্থান করলেন,ও অতুল্য সম্মানে তেজে একাকী স্বপ্নময় ধরিত্রীর উপর দিয়ে এগিয়ে চললেন, চিন্তা করতে করতে, “জাত বা অজাত, সকল প্রাণীর উদ্ধারকল্পে, যে সুপ্রাচীন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তাকে আজ সম্পূর্ণ করব। যারা চায়,তারা স্বকর্ণে মোক্ষ লাভের সৎপথের উপায়ের কথা শ্রবণ করুক।”


জগতের রাজধানী বারাণসী। সেই শহরের উদ্দেশ্যে তিনি যাত্রা করলেন।

জেগে ওঠ – ৪: বুদ্ধের তপস্যা ও বোধি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments