'The society tends to get civilized when its intellectual frees themselves of their elitist rhetoric that signifies their fundamental inhibitions'
উপরের উক্তিটি আমারও হতে পারে ! তবে ইংরেজিতে লেখা যখন , তখন আবার নাও হতে পারে। কেননা ইংরেজিতে quotation আমি বিনা অনুমতিতেই বেমালুম ধার করে দুমদাম লেখায় গুঁজে দিয়ে থাকি। কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে আমার সবথেকে প্রিয় ফাঁকিবাজি মারা উক্তিটি হলো ' যত মত, তত পথ '! এই উক্তিটি আমার প্রিয় এই কারনেও যে এটা লিখতে মানে টাইপ করতে আমাকে 'অভ্রের' উন্মুক্ত ভাষার সাথে মুক্তিযুদ্ধ করতে হয় না, বাক্য গঠন বা বানান ভুলের দায় কাঠগড়ায় দাড়াতেও হয় না (কারনে এলিট 'ন' কেন জানিনা subaltern 'ণ' কে বেমালুম হটিয়ে দিল !)। অবশ্য বানান ভুল হলেই বা কি? নাহ, যতক্ষণ লেখার মর্মটাকে পাঠকের মরমে পৌছে দিতে পারা যাচ্ছে , ততক্ষণ অব্দি সেটা কোনো গর্হিত অপরাধ নয়। তবে বানানের দরুন ঠিক ঠাক ডিকোডিং না হলে কিন্তু সেটা আবার একটা যাচ্ছেতাই রকমের নিহিলিস্ট মার্কা হটকারিতা হয়ে যায়। কিন্তু ব্যক্তিগত হটকারিতা তো আপামর সমাজের ঘুন ধরা মৌলবাদ থেকেই জন্মায় , তাই না ? যেরকম মৌলবাদের শিকার হয়েছিল তারেক মাসুদের 'মাটির ময়না' সিনেমাতে সাদা টুপি পরা মুহ্হামাদ রুকুনুদ্দিন আহমেদ নামের বাচ্চা ছেলেটি । রুকুন যদিও তার মাদ্রাসার হুজুরকে উর্দুতে কম নম্বর পাওয়ার পর স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিল যে সে আরবি বড় ভালবাসে কিন্তু উর্দু তার মোটেও পছন্দের নয়। কিন্তু তার উত্তর শুনে হুজুর তাকে কেলিয়ে মক্কা দেখিয়ে দিয়েছিল।নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে অম্বুবাচীর মতন বাংলা দূরদর্শনের খবর যখন তার নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত , ঠিক তখনই অবাঙালি কয়লা কিং, রমেশ গান্ধীর 'খাস খবর' আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল শ্রোতাদের মাঝে সুধু মাত্র খবরের ভাষার গঠনটাকে বদলে দিয়ে। পরের দিকে ইন্টারভিউ-এর দরুন সাবেকি আমলাসুচক ভাষাকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় । তাই টেলিভিসনে নিয়মিত শোনা যেত আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা ভাষায় articulate ভাবে উদ্ধৃত করা মতামত গুলি। সন্দেশের কোনো একটা লেখায় মানিকবাবু impossible কে কৌতুকবশত আম-পচে-বেল বলে উল্লেখ করেছিলেন। কেউ কিছু না বললেও আলাপনের impeccable বাংলায় আলাপচারিতার শুনে অনায়াসেই আম-পেকে-বেল হয়ে যেতে পারত !বাংলার সাধুভাষায় লিখে বঙ্কিমবাবু যখন ঋষি হয়ে গেলেন, কালীপ্রসন্ন সিংহীর মহাভারত পড়ার দৌলতে ডেন্টিস্টদের পসারের তখন পোয়া বারো। পরবর্তী ক্ষেত্রে চলতিভাষা হিসেবে ন'দের বাংলাকে ধরে বেঁধে স্ট্যান্ডার্ড করাটা আমার মনে হয় বাংলাদেশের linguistic selection-এর নামে ডেমোক্রেটিক ইলেকশনের মতন একটা নন ইন্টেলেকচুয়াল প্রহসন হয়েছিল মাত্র। আপনারা বলবেন তাহলে সমাধান কোথায়? আমি সুনীতি চাটুজ্জ্যে নই তবে আমার সমস্যা যদি আমি ভুলভাল ভাবেও সবাইকে ঠিক ঠাক বুঝিয়ে উঠতে পারি , তাহলে সমাধানের উত্তরদায়িত্বটাও তাদের ওপরই বর্তায় যারা ঘন ঘন আমার লেখা পড়তে গিয়ে বানান ভুলের দরুন হোচট খেয়ে কষ্ট পেয়ে বাংলা ভাষার দৈন্যতার জন্য কাতরে মরেন।
বছর বারো আগে একই প্রশ্ন আমাকে আমিরুল নামের এক কিশোর করেছিল , মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়া হাই স্কুলের ছাদে। তখন আমি একটা না-সরকারী সংস্থায়ে (NGO কে নিশ্চই বেসরকারী বলা চলে না!) কাজ করি। সাগরপাড়ার ছাত্রদের নিয়ে একটা enlightening প্রোগ্রাম করতে হবে বলে গেছিলাম । বয়সন্ধিক্ষণের সমস্যা থেকে পোলিও নিয়ে সচেতনতা, সবই ছিল agendaতে। ঈদের দিন ওই আলোকপ্রাপ্ত ছাত্রদের বড় একটা বিজ্ঞান জাঠা দিয়ে প্রোগ্রাম শেষ হবার কথা । সীমান্তবর্তী ছোট্ট একটা জায়গা যেটার সাথে এ অঙ্গরাজ্যের চেয়ে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মিল বেশি ছিল বললেই চলে। এমনকি গায়ে মাখতে হলে কেয়া সাবান আর কাপড় কাচতে গেলে বক সাবান বাইরে কিছু পাওয়া যেত না। হোটেল লজ দূর অস্ত তাই থাকার জন্য ব্যবস্থা আদৌ কে করবে তা নিয়ে শেষ পর্যন্ত বড় সর কাজিয়া চলেছিল। যাই হোক , উঠেছিলাম স্কুলেরই একটা ঘরে যেটাতে ফ্যান লো ভোল্টেজের জন্য হাওয়ার চেয়ে আওয়াজই বেশি হত ও ৬০ ওয়াটের বাল্বটা টেনেটুনে ১৫ ওয়াট দিলেই বর্তে যেতাম। কয়েক সপ্তাহের মামলা, কোনরকমে কাটিয়ে দেব ! খেতে যেতাম শেখ সুলেমান সাহেবের বাড়িতে। সে সাগরপাড়া হাই স্কুলের হেড ক্লার্ক ও কাছেই তার বাড়ি ছিল। সুলেমান সাহেবের স্ত্রী পরম যত্ন করে খাওয়াতেন আমাকে ও রান্নার প্রশংসা করলে ঘোমটার আড়াল থেকে তার সুধু ঠোঁটের হাঁসিটুকু কোনরকমে দেখতে পেতাম। এই সুলেমান সাহেবেরই ছোট ছেলে আমিরুল। পরের বার উচ্চ মাধ্যমিক দেবে ও আপাতত সেই আমার লোকাল গাইড। প্রথম দিন রাতে খাওয়ার পরে সে যখন আমাকে স্কুল অব্দি ছাড়তে এলো তখন অনেকক্ষণ তার সাথে কথা বললাম।
আমি যখন এদিক ওদিক সিগারেটের দোকান খুঁজছি ,মিষ্টি হেসে সে জিজ্ঞেস করলো , "ছার, ছিগারেট খাবেন মনে হস্সে, ন্যাশা লাগসে?" আমি পাল্টা বললাম , "হ্যাঁ , কিন্তু দোকান সব বন্ধ দেখছি তো !"
সে এবার লুঙ্গির কোচর থেকে ৫৫৫ এর প্যাকেট বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিল, ""ছার এহনে এইডা দিয়া কাম চালান , কাল দুটা নতুন প্যাকেড কিন্যা দিয়া দিমুনে। খালি আব্বায় যেন টের না পায় "
আমি অভয় দিয়ে বললাম , "সে নয় ঠিক আছে , কিন্তু এত দামী সিগারেট পাও কোত্থেকে ?" সে আশ্চর্য্য হয়েই বলল, "এখানকার উইল্চের চেয়ে কম দামী , ওইপার থিক্ক্যা আমদানি হয় তো । " কথা বলতে বলতে স্কুলের ছাদে উঠে গেলাম আমরা। আমিরুল বলেই চলল , ওপার থেকে কি ভাবে ভিডিও ক্যাসেট আসে আর এপার থেকে কি ভাবে সাইকেল পাচার হয়। এবার জিজ্ঞেস না করে পারলাম না আমিরুলকে , "পরের বার তো উচ্চ মাধ্যমিক , প্রস্তুতি কেমন চলছে ?" তার মুখের হাব ভাব বলছিল যে সে এসব নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নয়। তবু সে নিজে মুখেই বলল , "বালা না ছার , আর পাশ দিয়া কি হইব, ডাক্তার হওয়ার ইস্সা আসিলো , কিন্তু ল্যাহা পড়া তো সব ইংরাজিতে , সাহস হয় না। " আমি বললাম , ""তাতে কি,এত ছাত্র পড়ছে তো তুমিও পড়বে , ভাষাটা কোনো সমস্যাই নয়। " আমিরুল নিজেকে বাঁচানোর জন্য বা যে কোনো কারণেই হোক তার পরে যা বলল তা আজও আমার কানে বাজে , "ভাষাটাই সমস্যা ছার , এই গ্রামে একটাই ইংরাজির মাষ্টার , সে বিজ্ঞান বোঝে না আর বিজ্ঞানের মাষ্টার ইংরাজি বোঝে না স্কুলে অনেক ম্যাগাজিন আসে ইংরাজিতে , এমন সব কথা লেখা থাকে তা বুঝতে পারি না, তবে ফিগার থাকলে দেইক্খাই বুইঝ্যা যাই। ভাবেন দেখি ডাক্তারি পড়ব মাইরা কাইট্যা ৬০০ জন তার জইন্য আমাদের বাংলায় কুনো বই নাই। ওদিকে চিন দ্যাশে ওদের প্রত্যেকটা ভাষায় ডাক্তারি পরানো হস্সে । দ্যাশের লোকেদের দ্যাখতে গেলে তো আর ইংরাজি জানন লাগব না , লাগব ডাক্তারি তা ঠিক ঠাক জানা। পলিটেকনিকে আমার দাদা গেসিলো পড়তে , ইংরাজি শিখ্যা উঠতেই তো দু বচ্ছর লাইগ্যা গেলো , মোটর পাম্প শিখব কখন কন দেহি !" আমিরুলের আর ডাক্তারি পড়া হয়নি,সে এখন বাংলাদেশের সাথে লিগাল ভাবেই ইম্পোর্ট এক্সপোর্ট-এর ব্যবসা করে।
আমার এক পিসতুতো দাদা ডাক্তারি পড়েছিল গ্রামে গঞ্জে সেবামূলক কামকাজ করবে বলে। পাশ করার পর তার প্রথম পোস্টিং ছিল রামপুরহাট ব্লকের এক অজ হেলথ সেন্টারে। চার্জ নিতে গিয়ে সে দেখল প্যারাসিটামল ও ডাইজিন ছাড়া আর অন্য কোনো অসুধ নেই স্টকে। কি আর করা , পরের দিন থেকে সে বুকের ওপরে অব্দি সব শারীরিক সমস্যা মানে বুকে ব্যথা থেকে কানে ব্যথা অব্দি পারাসিটামল দিয়ে মানেজ করতে লাগলো আর পেটের নিচ থেকে সমস্যাগুলোর জন্য ডাইজিন বরাদ্দ করলো মায় হাঁটু ব্যথার জন্যেও। দাদার অসুধে অনেকের কাজও হলো , পঞ্চায়েত প্রধানের বাতের ব্যথাও ডাইজিন খেয়ে কিছুটা কমল ! প্রধান এর পরে জেলা সদরে গিয়ে স্বাস্থ্য আধিকারিকদের সাথে মারপিট করে দু কার্টন eye drop ও কিছু কফ্ সিরাপের শিশি নিয়ে এলো। কন্ডমের বাক্সটাও নিয়ে এসেছিল কিন্তু সেগুলো বেলুন ভেবে নাতি নাতনিদের মধ্যেই বিলিয়ে দেয় সে। দাদার স্টকে তরল ওষুধ আসতে রুগিও বাড়তে লাগলো। বিকেল বিকেল সোজা মাঠ থেকে বুড়ো মাহাতো দাদার কাছে এসে জানালো , "হেই ডাক্তার,দেখ তো চোখ টা এমন গুলগুল করছে কেনে ?" দাদা দেখল চোখটা লাল হয়েছে, কিছু ঢুকে গেছে হয়ত ও তাই বুড়োর চোখে irritation হচ্ছে যেটাকে কিনা ব্যাটা গুলগুল বলছে। দাদা বুড়োর চোখে দু ফোঁটা eye ড্রপ দিয়ে বলল , এটা নিয়ে যাও , সকালে ও সন্ধেবেলা দু ফোঁটা করে দেবে। বুড়ো খুশি মনে চলে গেল ওষুধ নিয়ে। কিন্তু সে আবার ফিরল সাত দিনের মাথায়ে, হাতে সেই eye ড্রপের শিশি। বেশ চিন্তিত দেখে দাদা জিজ্ঞেস করলো , "কি খুড়ো , চোখ এখন কেমন?" বুড়ো শিশিটা টেবিলে রেখে বলল , "তোর্ ওষুধ রাখ তোর্ কাছে, ওষুধ ঠো পেথ্থমে কাজ দিলো বটে, গুলগুল ঠো সেরে গেল। কিন্তু এখন দেখছি যে চোখ ঠো কেমন মিসমিস করছে রে !"
শেষ করার আগে আরেকটি বার ভাষার জোরেই ফিরে যাব সেই সাগরপাড়ায়। স্কুলের বেঞ্চিতে উঠে থাকা পেরেকের খোঁচায় আমার জামার খানিকটা ছিড়ে গেছিল। আমিরুলকে বলাতে সে আমাকে তত্ক্ষনাত নিয়ে গেল সেখানকার সবথেকে নামকরা দর্জি আলম ওস্তাগারের দোকানে যার রিফু করার মুনশিয়ানার কথা ওপার অব্দি অনেকেই জানে। আলমের দোকান ছোট, ঈদ আসছে বলে যথেষ্ট ব্যস্ত তবু আমিরুলের সুপারিশে সে আমার জামাটিকে রিফু করে দিতে রাজি হলো। যতক্ষণ তা না হয়ে যাচ্ছে আমি আমিরুলের সাথে বাইরে দাড়িয়ে সিগারেট ফুকছিলাম। হটাত চোখ পড়ল দোকানের সাইনবোর্ডটাতে। তাতে লেখা 'তাজ টেলার্স ' আর নিচের ক্যাপসনটি আরো জবরদস্ত – এখানে বেমালুম রিফু করা হয় !'

বেমালুম
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments