জ্ঞানীজনেরা প্রায়শই বলে থাকেন যে প্রত্যেকটা সময়কালের একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট আছে। ইংরেজি তে যাকে ‘স্পিরিট অফ টাইম’ বলা হয়। যে কোনো পর্বের সামাজিক ঘটনাগুলোকে কার্য-কারণ সুত্রে ফেললে তখনকার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সমীকরণগুলোও একই বিন্যাসে প্রতিফলিত হয়। শুধু ইতিহাসের দোহাই দিয়ে হিসেবটা আমরা পরে মিলিয়ে দেখি মাত্র । ৯০এর দশকে, এক ক্যাসেট কোম্পানি কিছু আধুনিক বাংলা গানকে যেই ‘জীবনমুখী’ ছাপ্পা মারলো, ওমনি বাংলার শ্রোতা বিশেষ করে যুবকেরা তা গোগ্রাসে গিলতে লাগল। প্রসঙ্গত সেই সময়ের বাংলা গানের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া দুই শিল্পী তত্কালীন সরকারের সমলোচনায়ে সোচ্চার ছিলেন, ও পরবর্তীকালে তারা নানারকম বিরোধী রাজনীতির সাথেও সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। ছেলে ছোকরাদের কান্ড কারখানা দেখে জনৈক কমরেড বলেছিলেন, “আমরাও মিছিলে স্লোগান দিয়েছি, গণসঙ্গীত গেয়েছি কিন্তু এরা তো দেখছি গান আর স্লোগান গুলিয়ে ফেলেছে হে !!” তখনি মনে হয়েছিল কমরেড ওই ‘স্পিরিট অফ টাইম’ টাকে ঠিক ধরতে পারছেন না এবং বুঝেছিলাম যে CPM-এর আর বেশি দিন নেই। আবার ঠিক সেই সময়ে, ১৯৯৫ এর বইমেলায়ে মহিনের ঘোড়াগুলির ‘আবার বছর কুড়ি পরে’ বেরোয়ে, পরের বছরগুলোতে আরও দুটো অ্যালবাম প্রকাশ করেন তারা। তখনও বাংলা রক ব্যান্ড বললে আমরা বাংলাদেশের মাইলস,ফিডব্যাক বা ওয়ারফেজের মতন দলগুলোকে বুঝতাম। এপার বাংলায়ে তখনও ক্যাকটাস,পরশ পাথর বা চন্দ্রবিন্দু তাদের ঢাল তলোয়ার নিয়ে মাঠে নামেনি। ২০০০ এর পরে বাংলা রক ব্যান্ড ব্যাপারটা কলেজ ফেস্ট এর গন্ডি পেরিয়ে যখন ছোট-বড় সব রকমের মঞ্চ বা সদন ভরাতে লাগলো তখন সেই কমরেড আবার ক্ষেপে গিয়ে বললেন, “এতো সমবেত ক্যাকোফনি, গানটা কোথায়ে?” ব্যাস এবারে মোটামুটি বুঝতে পারলাম যে CPM এর কফিন বানানোও শুরু হয়ে গেছে। যাই হোক গল্পটা সেই কমরেডের একমাত্র পুত্র ও আমার বন্ধু সায়নকে নিয়ে, যে তার ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করার জন্য মার্কিন মুলুক পারি দেয় ২০০০ নাগাদ। চোঙ্গা ফোঁকা তার সেই বাবা যে মার্কিন মুলুকের জোর জুলুমের প্রতিবাদে যখন তখন ব্রিগেড ভরাতো, ছেলের আমেরিকা যাওয়া নিয়ে একটা চাপা গর্বই পোষণ করতেন । ঝামেলার শুরু২০০৩ এ!! সে ছেলে ফিরে এসে এখানকার বাংলা রক ব্যান্ড এর রমরমা দেখে যারপরনাই উদ্বুদ্ধ হয় ও সেটা নিয়ে সাময়িক কিছু কাঁটাছেড়া করার সিদ্ধান্ত নেয় । ওদিকে পুত্রের suicidal মতিগতি দেখে সেই কমরেড তাকে অনেক বুঝিয়ে তাড়াতাড়ি সমগ্র কমরেডকুলের ব্রাত্যভূমি, সেই আমেরিকাতেই আবার ফেরত পাঠাতে চায়। এবার স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে CPM-এর কফিন বানানো শেষ, পেরেক ও হাতুড়ির যোগার চলছে। সায়ন তার কমরেড বাবার কোনো প্রতিবাদও করেনি আবার আমেরিকাও ফিরে যায়নি। স্রেফ একদিন সকাল সকাল উঠে পিঠের পেছনে ল্যাপটপ, ক্যামেরা ইত্যাদি পুরে দেশ দেখতে বেরিয়ে পরে সে । এই মার্কিন দেশ থেকে দু কি তিন বছর কাটিয়ে আসা বঙ্গসন্তানরা প্রথম প্রথম একটা সাময়িক রোগে ভোগে , যার সিম্পটমগুলো হলো ১) এরা কথায়ে কথায়ে ডাটা সার্চ করার জন্য ল্যাপটপ খুলে ফেলে। ২) কিছু দেখ মনে ধরলে, পটাপট দামী SLR-এ ছবি তোলে। ৩) আর ‘গোপাল বড় ভালো’ ছেলের মতন যাহা পায় তাহাই টপাটপ খেয়ে ফেলে ও ঝপাঝপ যা জানলো বা যা যা ছবি তুলল, তা ব্লগে পাবলিশ করে সোশ্যাল মিডিয়া তে তত্ক্ষনাত তার লিঙ্কটা পোস্ট করে। যাই হোক ২০০৩ এ সোশ্যাল মিডিয়া ততটা বাজার গরম করেনি, তাই সায়ন একদিন সশরীরে এসে দেড় ঘন্টার মধ্যে আমাকে তার যাবতীয় কীর্তিকলাপ ল্যাপটপ খুলে বুঝিয়ে দিল। আমি গোমুখ্য, পন্ডিত বন্ধুকে আর কি-ই বা দিতে পারি, যাওয়ার আগে দোহার এর একটা সদ্য প্রকাশিত ক্যাসেট দিলাম শুনে দেখার জন্য। ব্যাস, শুনে টুনে ছেলে ক্ষেপলো, এবার সে একটা ডকুমেন্টারী করবে বাংলার ফোক ও সমকালীন রক ব্যান্ড নিয়ে!!দরকার পড়লে বাংলাদেশেও যাবে শুট করতে। অতি সত্বর সে কমরেড বাবার বুকের পাঁজর খসিয়ে, একদা আয় করা ডলার ভাঙিয়ে, দুমদারাক্কা ভিডিও ক্যামেরা এবং আরো কি সব সাজ সরঞ্জাম কিনে ফেলল। এর পর শুরু হলো নানা রকমের উদ্ভট বাদ্যযন্ত্র ও তার বাজনাদারের খোঁজ। আজ পুরুলিয়া, কাল দিনাজপুর , পরশু মাথাভাঙ্গা -তারসানাই,ভেল্কিভেপু ,ধামসা,মাদল কিছুই বাদ পড়লনা লিস্ট থেকে। আমিও এই ফাঁকে বঙ্গদর্শন করতে লাগলাম তার সাথে, মার্কিন প্রবাসী বন্ধুর স্থানীয় গাইড আর কি !! বেশ চলছিল,হঠাত এক তৃতীয় ব্যক্তির আবির্ভাব গোটা ব্যাপারটাতে একটা অন্য মাত্রা যোগ করলো, আর সে হলো সায়নের মার্কিন বান্ধবী, ক্রিস্টিনা !! সে সায়নের এই অভিনব কর্মযজ্ঞে যোগ দিতে যারপরনাই ইচ্ছুক, তা জানিয়ে একটা মেল করলো। সায়নও তাতে ততোধিক প্রফুল্লিত হয়ে তার সম্মতি জানালো। ব্যাস, এরপর থেকে যা যা হলো তা দিনপঞ্জিকার আকারে লিখলে ভালো হত, কিন্তু ভেতো বাঙালি তো, তাই মার্কিনদের মতন জার্নাল এন্ট্রি গুলো নিয়মিত করা হয়নি !! যাই হোক গল্পে ফিরি, এতদিন আমার পাগল বন্ধুর হাবভাব দেখে বুঝেছিলাম যে একটা docu তৈরির প্রস্তুতি চলছে। রাত জেগে সায়ন নানা রকমের ডকুমেন্টারী দেখে, লাপটপে খটাস খটাস করে নোট টোকে, ফান্ড জোগার করার জন্য এদিক ওদিক প্রপোসল পাঠায়ে। কিন্তু এই ক্রিস্টিনা এসে এক কথায়ে এসব ট্র্যাশ বলে বাতিল করে দিল !! বুঝলাম সায়নের ব্যাকগ্রাউন্ড রিসার্চকে সে কুলীন পর্যায়ে ফেলতে মোটেই ইচ্ছুক নয়। উল্টে সে তার macbook খুলে আমাদের যে গল্পটার blueprint দেখালো, সেটার অর্ধেক তার নাকিসুরে ইংরেজির দায়ে বুঝে উঠতে পারলাম না। মোদ্দা কথা যা বুঝলাম তা হলো ‘ ফোক লাইফ অফ বেঙ্গল’ হচ্ছে মূল থিম। ‘ফোক সং অফ বেঙ্গল’ টা মূল থিমের একটা সুত্র মাত্র, যেরকম আরও সুত্রগুলো হলো ‘ফোক লিটারেচার’, ‘ফোক ড্রেস এন্ড লাইফস্টাইল’ ইত্যাদি। এর পর সে আরো বড় ব্যাপার স্যাপার যেরকম merchandising , নন প্রফিট , গ্রীন ইনিশিয়েটিভ, ম্যারাথন নিয়ে অনর্গল বলে গেল !! সায়ন দেখলাম বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে, যদিও আমার মাথাটা বেজায়ে ঝিমঝিম করছিল। কিছু একটা হচ্ছে, এই আশার ওপর ভরসা রেখেই ক্রিস্টিনা কে বললাম , “Excellent আইডিয়া !! কিন্তু শুরুটা কোথায়ে ?” সে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল, প্রথমেই আমাদের একটা ফোক ব্যান্ড তৈরী করতে হবে, যেখানে নিতান্তই সাধারণ ছাপোষা মানুষ দৈনন্দিন ব্যবহার করা জিনিসপত্র বাজিয়ে, গানের মাধ্যমে তাদের কথা তুলে ধরবে। মানে ব্যাপারটা অনেকটা এরকম পাড়ার পচাদা বালতি পেটাচ্ছে, চায়ের দোকানের শিবুদা কাঁচের গ্লাসে চামচ দিয়ে টুং টাং করছে , স্যালুনের বিল্লোভাই জলের কলসিতে চিরুনি ঘষছে ও মিনুপিসী চেঁচিয়ে গাইছে , “আলু, পটল, বেগুনের দাম, ভুলিয়ে দিল বাপের নাম….” আর সেটা রেকর্ড করা হচ্ছে। আমি আশু বাওয়াল আঁচ করে বললাম,”এর চেয়ে কির্তন পার্টি ভাড়া করলে হয়না, মানে পুরো ব্যাপারটা organised ভাবে করা যেত। ” তা কোন সাহেব বাঙালির কথা শুনেছে আর এ মেম তো আরই নাছরবান্দী !! সায়ন ও দেখলাম এরকম একটা চিত্তাকর্ষক ঘটনার ঘটাবার লোভ সামলাতে পারছেনা। তা বলে, বিপদকালে বুদ্ধিভ্রষ্ট হলে চলবে কেন? সায়নকে নিয়ে সোজা চলে গেলাম নবুদার কাছে। নবুদা পাড়ার ‘প্রাচীন প্রবাদ’ বলে খ্যাত। বাকসর্বস্ব তার ব্যক্তিত্বের কাছে কত সেলেব্রিটি হাওয়া হয়ে গেছে , কত রাজা উজির মাথা নুইয়েছে , তার ইয়ত্তা নেই। সব শুনে টুনে নবুদা সায়নকে জিগ্গেস করল , “তা তুই বিলেতে গিয়ে পাগল হলি তো হলি , সাথে এই পাগলিটাকে কোত্থেকে জুটালি?” সায়ন কি একটা বলতে যাচ্ছিল, আমি চিমটি কেটে থামিয়ে দিলাম। যাই হোক , নবুদা বলল , “পরশু অমাবস্যার পরের দিন , ক্যামেরা ফ্যামেরা নিয়ে পেছনে পোল পাড়ের বস্তিতে চলে আসবি , গান বাজনার বন্দোবস্ত হয়ে যাবে।” আশার আলো দেখে আমরা দুজনেই একটু স্বস্তি পেলাম। নবুদা যাবার আগে বলল , “আর শোন , দুটো ফুল বাংলার বোতল আর পঞ্চাশটা টাকা আনবি সাথে, মাগনায়ে মুজরো দেখাতে পারব না। ” মাথা নেড়ে কথা না বাড়িয়ে সোজা হাঁটা লাগলাম। ক্রিস্টিনা তো শুনেই দারুন excited , যে এর মধ্যে কমিউনিটি ব্যান্ড তৈরী হয়ে গেছে। যথাসময়ে আমরা ক্যামেরা , লাইট, বাংলুর বোতল নিয়ে পোলপাড়ে পৌছলাম। গিয়ে দেখলাম জনা ২০ পুরুষ ও মহিলা একটা ভ্যান রিক্সায় তোলা কালিঠাকুরের পেছনে দাড়িয়ে আছে আর আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। নবুদা কোত্থেকে হাফ লোড অবস্থায়ে উদয় হলো ও আমার হাত থেকে বোতল দুটো ছোঁ করে ছিনিয়ে নিয়ে বলল , “গুড মর্নিং , ক্যামেরা চালু করে ফেল , এই ব্যান্ড স্টার্ট হলো বলে।” মুহুর্তের মধ্যে যার হাতে যা আছে তা বাজিয়ে জনগণ উত্তাল কেওড়া গান আর নাচ শুরু করলো। ক্রিস্টিনা ক্যামেরা নিয়ে একবার সামনে, একবার পেছনে দৌড়তে লাগলো। সায়ন আলো টাকে একবার কালীর মুখে , একবার জনগনের দিকে ফোকাস করতে করতে স্লিপ কেটে কয়েক বার পড়ে গেল। এর মধ্যেই ৩-৪ তে চ্যাংরা ঢাক কাসর নিয়ে ভ্যান রিকসায়ে চড়ে চেল্লাতে লাগলো , :”মা কালী তোর সঙ্গে যাব …পাঠার ঝোল আর বাংলা খাব…”. ক্রিস্টিনা কি বুঝলো কে জানে , সেও জ্বলজ্বলে চোখ করে বলে উঠলো,”Its an amazing folk bandwagon !!!”

ব্যান্ডওয়াগন
  • 3.00 / 5 5
1 vote, 3.00 avg. rating (71% score)

Comments

comments