“শনিবার সন্ধে সাড়ে ছ’টা । রবীন্দ্রসরোবর লেক । মেনকা হলের উল্টোদিকের সেই যমজ কৃষ্ণচূড়া -রাধাচূড়ার সামনে ”

ফেসবুকের ইনবক্সে মেসেজটা দেখল প্রান্তিক । মেসেজটা পাঠিয়েছে ‘বন্দিনী নন্দিনী’ নামে ওর এক ফেসবুক বান্ধবী । মহিলার সম্পর্কে প্রান্তিক বিশেষ কিছুই জানে ও না । প্রোফাইলে কিছুই দেওয়া নেই । মহিলা কোথায় থাকেন , কি করেন , বয়েস কত , বিবাহিত নাকি অবিবাহিত কিছুই জানে না প্রান্তিক । আসলে জানার প্রয়োজন বোধই করেনি কোনও দিনই। ফ্রেন্ড লিস্টের হাজার দুয়েক মানুষের মধ্যে মাত্র বিশ-পঁচিশ জনকেই সামনা সামনি জানে প্রান্তিক । তার মধ্যে সতেরো আঠারো জনই ওর আত্মীয় স্বজন অথবা বাল্যবন্ধু । সোশাল নেটওয়ার্কে সাবলীল হলেও ব্যক্তিগত জীবনে একটু বেশিই আত্ম কেন্দ্রিক । নিজের পেশাগত ব্যস্ততার ফাঁকে ওর একমাত্র নেশাই হোক বা প্যাশন , লেখালেখি নিয়েই সময় কাটায় । সেই সূত্রেই আন্তর্জালের জগতে ওর চেনা জানার পরিধির বিস্তার বেড়েই চলেছে দিন প্রতিদিন । প্রান্তিক রোমান্টিক প্রকৃতির মানুষ । ওর প্রতিটা লেখাতেও ওর চরিত্রের প্রকাশ স্পষ্ট। সেই কারণেই বোধহয় সোশাল নেটওয়ার্কে প্রান্তিকের অনুরাগীর তুলনায় অনুরাগিণীর সংখ্যা বেশ কয়েকগুণ বেশি । ওই “বন্দিনী নন্দিনী” নামের মেয়ে অথবা মহিলাটিও প্রান্তিকের সেই অজস্র অনুরাগিণীদের মধ্যেই একজন ।

ছেলের মর্নিং স্কুল । সাড়ে ছ’টায় স্কুল বাস চলে আসে । পারমিতা তাই ছেলেকে নিয়ে শুয়ে পড়েছে । প্রান্তিক মেসেজটা আরও বার তিনেক পড়ল । মেসেজটা এসেছে দুপুর বারোটা সাঁইত্রিশ মিনিটে । প্রান্তিক তখন অফিসে । আজ কোম্পানির ইম্পরট্যান্ট ক্লায়েন্টের সঙ্গে মিটিং ছিল । একটা বড়সড় প্রোজেক্টের ডিল ফাইনাল করে ক্লায়েন্টকে নিয়ে লাঞ্চ সেরে হোটেল থেকে অফিসে ফিরতে ফিরতেই সন্ধে সাড়ে সাতটা পৌনে আটটা । তারপর নিজেই ড্রাইভ করে সল্টলেক থেকে গড়িয়ায় বাড়ি ফেরা । সারাটা দিন হেক্টিক শিডিউল গেছে । বাড়ি ফিরে রিফ্রেশ হতেই দু’চোখ যেন ঘুমে জড়িয়ে আসছিল প্রান্তিকের । মনে মনে ঠিক করল ডিনারের পরে সিগারেটে টান দিতে দিতে ফেসবুকের নোটিফিকেশনগুলো জাস্ট একটু চেক করেই আজ শুয়ে পড়বে । কিন্তু মেসেজটা দেখেই ঘুম ছুটে গেল প্রান্তিকের । এই প্রথমবার ‘বন্দিনী নন্দিনী ‘-র প্রোফাইলটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করল । কিন্তু বৃথাই চেষ্টা । এমন কিছুই খুঁজে পেল না যাতে ‘বন্দিনী নন্দিনী ‘ -কে জানতে পারে । এলোমেলো চিন্তা করতে করতেই মেসেজের উত্তর দিল প্রান্তিক ,

“তুমি কে ? কোথায় থাকো ? কি করে জানলে ওই যমজ কৃষ্ণচূড়া -রাধাচূড়ার কথা ?”

‘বন্দিনী নন্দিনী ‘ যেন তীর্থের কাকের মতই অপেক্ষা করছিল প্রান্তিকের প্রত্যুত্তরের । সঙ্গে সঙ্গে ওর ইনবক্সে মেসেজ এলো ,

“আমি তোমার সব জানি । ওই কলেজ লাইফের ক্লাস কেটে কৃষ্ণচূড়া -রাধাচূড়ার ঘনিষ্ঠতা । মেনকার ব্যালকনির কোনার দুটো সিট । ”

প্রান্তিক এবার সত্যিই ঘামতে শুরু করেছে । কিছুতেই বুঝতে পারছে না পারমিতার সঙ্গে ওর সেই ব্যক্তিগত কথা , যার কিছুকিছু দু’তিনজন একেবারে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বান্ধব ছাড়া আর কারও পক্ষেই জানা সম্ভবই না । কিন্তু ওর ওই একান্ত ব্যক্তিগত কথাগুলো এই অচেনা অজানা মহিলা কি করে জানল ? অনেক ভেবেও কোনই কূলকিনারা খুঁজে পায় না প্রান্তিক । মাঝেমাঝেই মনে হচ্ছে ওই ‘বন্দিনী নন্দিনী ‘ আসলে পারমিতা নয় তো ? ওর সাথে চোর পুলিশ খেলছে হয়তো । কিন্তু এই মুহূর্তে পারমিতা তো ঘুমোচ্ছে ! তাহলে ওর হয়ে কি অন্য কেউ প্রক্সি দিচ্ছে ? কিন্তু কে সে ? কেনই বা এইভাবে খেলছে প্রান্তিকের সঙ্গে ? আর ভাবতে পারছে না । সব কিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে । নিজের অবচেতন মনেই যেন মেসেজের উত্তর দিল প্রান্তিক ,

“ঠিক আছে । পরশু , শনিবার , ঠিক সন্ধে সাড়ে ছ’টা আমি থাকবো সেই যমজ কৃষ্ণচূড়া -রাধাচূড়ার সামনে । তোমাকে চিনব কেমন করে ? তুমিই বা আমায় কিভাবে চিনবে ? ”

“এতদিন ধরে চেনা জানা , তোমার বা আমার কারোরই চিনতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় …”

বলেই মেসেজ বক্সে একটা স্মাইলি দিয়েই অফলাইন হয়ে গেল সেই রহস্যময়ী , ‘বন্দিনী নন্দিনী ‘। শারীরিক তো ছিলই এবার মানসিক ক্লান্তিও যেন গ্রাস করে নিচ্ছে প্রান্তিককে । আর একটা সিগারেট ধরাল । দু’টান দিতেই মুখটা যেন তিতকুটে হয়ে গেল । সিগারেটটা এশট্রেতে গুঁজে লাইট অফ করে শুয়ে পড়ল ।

****

শনি রবি দু’দিন প্রান্তিকের অফ ডে । তাই পারমিতাকে আগে থেকেই বলে রেখেছে শনিবার সন্ধেয় ওর একটা ইম্পরট্যান্ট মিটিং আছে । শনি আর রবিবার এই দুটো দিন লাঞ্চের পরে দেড় দু’ঘন্টার দিবানিদ্রার অভ্যাসটা ওর বহুদিনের । আজও লাঞ্চ সেরে ঘরের জানলা দরজা বন্ধ করে এসিটা চালিয়ে আয়েশ করে শুয়ে পড়ল । কিন্তু অন্যদিনের মত আজ ঘুম কিছুতেই আসছে না । অনেকক্ষণ ধরে চোখ বুজে ঘুমনোর বৃথা চেষ্টা করে গেল প্রান্তিক । মনের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতির ঝড় বয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত । কেমন যেন এক পাপবোধ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে প্রান্তিকের মগজের কোষগুলোকে । ওর অতি ব্যস্ততায় পারমিতা যে অসন্তুষ্ট সেটা ও বোঝে । ক্রমবর্ধমান পেশাগত ব্যস্ততা যে ওদের সম্পর্কের উষ্ণতাকে দিনদিন হিমশীতল করে দিচ্ছে সেটাও বোঝে । কিন্তু মানুষ প্রান্তিকের ওপর পারমিতার ভরসা আর বিশ্বাস আগের মতই অটুট । ওর ওপর পারমিতার এই অটুট বিশ্বাস টাই আজ প্রান্তিকের কাছে ভয়াবহ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে । যে মানুষটা ওকে এইরকম অন্ধের মত বিশ্বাস করে তাকেই লুকিয়ে ও আজ যাচ্ছে ব্লাইন্ড ডেটিং -এ । আর ভাবতে পারছে না প্রান্তিক । ঘাড় ঘুড়িয়ে ডিম লাইটের আবছা নীল আলোয় দেখে পারমিতার ঘুমন্ত মুখটা । ছেলেকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে আছে । ওর নির্লিপ্ত মুখটা প্রান্তিকের অপরাধ বোধটা যেন বাড়িয়ে দেয় আরও কয়েক গুন । সন্তর্পণে উঠে বসে প্রান্তিক । নিঃশব্দে বেড়িয়ে যায় বেডরুম থেকে । ড্রয়িং রুমে এসে প্রথমে একটা সিগারেট ধরায় । ঘাড় ঘুরিয়ে ওয়াল ক্লকে চোখ বোলায় । সবে পৌনে চারটে বাজে । এখনও বেরতে ঘন্টা দেড়েক বাকি । সময় যেন আর কাটতেই চাইছে না আজ । ল্যাপটপটা অন করে ফেসবুকে লগ -ইন করল । পঁয়ত্রিশটা নোটিফিকেশনের পাশেই জ্বলজ্বল করছে একটা মেসেজ নোটিফিকেশন । মেসেজটা ওপেন করল প্রান্তিক । মেসেজের প্রথমে আর শেষে একটা করে স্মাইলি আর তার মাঝে লেখা ,

“ভুলে যেও না যেন । আমি কিন্তু অপেক্ষা করব … ”

*****

প্রান্তিক সোয়া ছ’টাতেই পোঁছে গেছে । সময়ের ব্যাপারে ও বরাবরই পাংচুয়াল । প্রায় তেরো চোদ্দ বছর পরে সেই জায়গায় আবার এলো , যে জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওর জীবনের একরাশ মধুর স্মৃতি । ওর থেকে মাত্র কয়েক হাত দুরেই প্রায় জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে সেই যমজ কৃষ্ণচূড়া -রাধাচূড়া । ওর মতই গাছ দুটোরও বয়েস বেড়েছে । কিন্তু আজও সেই গাছ থেকে আগের মতই থোকা থোকা ঝুলছে লাল – হলুদ ফুল । প্রান্তিকের মনে পড়ে ওই লাল -হলুদ ফুল নিজের মুঠো খালি করে পারমিতার হাত ভরিয়ে দিয়ে নিজের মনের কথা জানিয়েছিল ।

স্মৃতির চোরাবালিতে ডুবতে ডুবতে ই প্রান্তিক নিজের অজান্তেই রিস্টওয়াচে চোখ বোলায় । চমকে উঠে খেয়াল করে ছ’টা চল্লিশ বাজে । ততক্ষণে লেকের অন্যপাড়ের আম গাছটার ঝাঁকড়া পাতার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে সূর্যটা , লেকের জলকে রক্তাক্ত করে । আর ওই যমজ কৃষ্ণচূড়া – রাধাচূড়ার নিচে ঘনিষ্ঠ ভাবে বসে আছে অচেনা প্রেমিক যুগল । কিন্তু কোথায় সেই রহস্যময়ী ‘বন্দিনী নন্দিনী ‘ । তবে কি …

ভাবনার অতলে তলিয়ে যেতে যেতে প্রান্তিক নিজের কাঁধে আচমকাই অনুভব করল কার যেন হাতের ছোঁয়া । চমকে পেছন ফিরতেই একই সঙ্গে মুখোমুখি হল একজন অচেনা মানুষের এবং তার অদ্ভুত হিসহিসে স্বরে করা প্রশ্নের ,

- “কি বে প্রান্তিক চিনতে পারিস ?”

- “নাঃ , মানে আপনাকে ঠিক …”

প্রান্তিকের হতভম্ব ভাবটা কাটতে না কাটতেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে হাসতে ই বলে উঠল লোকটা ,

- “শা্ল্লা ! ঢ্যামনামি হচ্ছে ? আমাকে আপনি !! আব্বে , আমি গুড্ডু … দ্য গ্রেট পোয়েট এন্ড ফিলোজফার প্রসূন দাশগুপ্ত । এখন চেনা যাচ্ছে ?”

আচমকা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় প্রান্তিক । ও বিশ্বাসই করতে পারছে না এই সেই ওর কলেজের ব্যাচমেট প্রসূন ওরফে গুড্ডু । কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা এক মাথা ঝাঁকড়া চুল । কথায় কথায় অশ্লীল ছড়া কাটত আর কলেজে নতুন মামানি এলেই ওর শুরু হয়ে যেত কবি প্রতিভার বিচ্ছুরণ । কলেজের কোনও সুন্দরীই বোধহয় ওর কবিত্বের অত্যাচার থেকে রেহাই পায় নি । এমনকি পারমিতাকেও প্রান্তিকের আগেই প্রেম নিবেদনও করেছিল গুড্ডুই । তবে ওর ফ্লার্টি আর মজাদার স্বভাবের জন্যে পারমিতা সিরিয়াসলি নেয় নি বিষয়টাকে । তাছাড়া প্রান্তিককে প্রথমবার দেখেই ওর ভালো লেগে গেছিল । পারমিতার সঙ্গে প্রান্তিকের ঘনিষ্ঠতার সঙ্গে তাল মিলিয়েই বাড়তে শুরু করেছিল গুড্ডুর সঙ্গে দূরত্ব । তারপর হঠাতই একদিন কলেজ থেকেই উধাও হয়ে গেল গুড্ডু। অনেক খোঁজ করেও প্রান্তিক ওর কোনও খবরই জোগাড় করতে পারে নি । সেই গুড্ডু এতদিন পরে ওর মুখোমুখি । একমুখ কাঁচাপাকা চাপদাড়ি । মাথাজোড়া চকচকে টাক । মোটাও হয়ে গেছে অনেক । তবে সেই জ্বলজ্বলে চোখ দুটো একই রকম আছে । সেই চোখদুটো দেখেই প্রান্তিকের মনে পড়ে গেল সবকিছু । আচমকা হতভম্ব ভাবটা কাটতেই উচ্ছল গলায় জিজ্ঞেস করল প্রান্তিক ,

- “গুড্ডু তুই ? এতদিন পরে হঠাত এখানে ?”

প্রান্তিকের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই অদ্ভুত শান্ত নির্লিপ্ত গলায় গুড্ডু বলে উঠল ,

- “একটা বিড়ি হবে ?”

পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে প্রান্তিক একটা সিগারেট দিল গুড্ডুর হাতে । গুড্ডু মুচকি হেসে সিগারেটটা দু ‘ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে দিতেই লাইটার দিয়ে সিগারেটটা জ্বালিয়ে দিল প্রান্তিক । সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে গুড্ডু জিজ্ঞেস করল ,

- “তুই এই অসময়ে এই রকম জায়গায় ? কি ব্যাপার ? এক্সট্রা ম্যারিটাল চক্কর নাকি …”

- “না বে ! সেসব কিছুই না । এই কাছেই একটা কাজে এসেছিলাম । হঠাতই পুরনো কথা মনে পড়ে গেল । চলে এলাম এক চক্কর মারতে …”

গুড্ডুর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে নিজের বলা কথাগুলো নিজের কানেই কেমন যেন অজুহাতের মত শোনালো প্রান্তিকের । গুড্ডুর তরফ থেকে কোনও প্রত্যুত্তর না পেয়ে ওর দিকে তাকাতেই প্রান্তিক দেখল ওই যমজ কৃষ্ণচূড়া – রাধাচূড়ার তলায় বসে থাকা প্রেমিক যুগলের দিকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছে গুড্ডু । ওর দু’কাঁধে হাত রেখে হালকা ঝাঁকুনি দিতেই প্রেমিক যুগলের দিকে তাকিয়েই সেই অদ্ভুত হিসহিসে স্বরে জিজ্ঞেস করল ,

- “তোর ‘বন্দিনী নন্দিনী’ – র সাথে দেখা করবি না ? “

- “তার মানে তুই ? ফেক আইডি থেকে …”

- “আইডি ফেক হতে পারে কিন্তু তার পেছনের মানুষটা না । জানিস প্রান্তিক , আমার মতই তোরও যদি আইডিটাই ফেক হত মানুষটা না , তাহলে পারমিতাকে এভাবে ঠকতে হত না …”

একদমে কথাগুলো বলেই হনহন করে এগিয়ে গিয়ে সামনের গাঢ় অন্ধকারে মিলিয়ে গেল গুড্ডু । প্রান্তিক ঘাড় ঘুরিয়ে আবছা আলোয় দেখল যমজ কৃষ্ণচূড়া – রাধাচূড়ার নিচে বসে থাকা প্রেমিক যুগলের ঘনিষ্ঠতা অন্ধকারের গাঢ়ত্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়ে চলেছে ক্রমশই ।

ব্লাইন্ড ডেট
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments