একটা বেশ বড় সময় এই পাড়ায় আসা হচ্ছে না। আমার বন্ধুরা অনেকেই বেশ ক্ষুব্ধ বুঝতে পারি। প্রকাশিত লেখাগুলিও বেশ কয়েকদিন বা মাস হয়ে গেল পড়া হয়ে ওঠেনি। তাঁদের এই মনোভাব আমায় ব্যথিত করে কারণ দোষ তো আমারই। দেওয়ার জন্যে আমার কাছে আছে সেই বহুচর্চিত অজুহাত। সেটা আর পেশ করলাম না, বরং বলা যায় ক্ষমাপ্রার্থী। ক্ষমার অযোগ্য কাজে যুক্ত মানুষজনও তো ক্ষমা চায়, পাবে কি পাবে না সে প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত রেখেই চায়।

মাঝে কিছু সময় পেয়ে আবার শুরু করছি আমার এই সব অবান্তর লেখার কাজ। আজকেও সেইরকমই একটা। তবে এই লেখা আমি আজ পোস্ট করব কিংবা আদৌ লিখব এটা গত পরশুদিন সন্ধ্যেবেলাতেও আমার মাথায় আসেনি। এমনকি পুরো লেখাটাও আমার নয়। অন্য একটা লেখা লিখেছিলাম, ভেবেছিলাম সেটাই দেব। কিন্তু মানুষ ভাবে একরকম হয় অন্যরকম। এ ক্ষেত্রেও তাই হল। গত বৃহস্পতিবার যথেষ্ট রাগ নিয়েই অফিস থেকে বেরিয়ে পৌঁছই এক বন্ধুর বাড়ি। রোজই যাই, সেই মার্চ মাসের শেষ দিনেও গেলাম। ঢোকার মুখেই মুখোমুখি বন্ধুর ষষ্ঠবর্ষীয় পুত্রের। প্রথমেই অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে জানালো – জানো আজ কি হয়েছে

- কি হয়েছে

- একটা ব্রিজ ভেঙে পড়ে গেছে

- তাই!! কি করে !!!

আমার প্রশ্নে কপট বিস্ময়। একঝলক তাকিয়ে দেখলাম বাংলা একটা নিউজ চ্যানেলে দেখানো হচ্ছে কলকাতার বিবেকানন্দ রোডে নির্মীয়মান উড়ালপুল ভেঙে পড়ার দৃশ্য। সারাদিন তাকে টিভির সামনে থেকে ওঠাতে ব্যর্থ হয়েছে তার গুরুজনেরা। নাহ, সেদিন কার্টুন চ্যানেল দেখার বায়না সে করেনি, বায়না ধরেনি কম্পিউটারে গেম খেলার। শেষে একরকম বাধ্য হয়ে বাড়ির সবাই টিভি দেখা বন্ধ করেছে। কিন্তু সে আর কতক্ষণ? টিভি খুললেই আবার বসেছে নিউজচ্যানেলের সামনে। আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে একেবারেই দেরি হল না

- ব্রিজ বানাতে জানে না, তবু ব্রিজ বানিয়েছে

সিমেন্ট, বালি কোনটা বেশি কোনটা কম তার একটা মোটামুটি হিসেবও দেখলাম তার কন্ঠস্থ। আমাকে বলে উঠতে পারার প্রাথমিক উত্তেজনা থিতিয়ে যেতেই তার প্রশ্ন – এটা কি ঠিক হয়েছে

এতক্ষণ অন্য দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলাম, এবারে ওর চোখের দিকে তাকালাম। উত্তরের আশায় থাকা চোখদুটিকে নিরাশ করতে হলই। সোজা চলে গেলাম বন্ধুর কম্পিউটারে। বাড়ি ফিরতে হবে, ফেসবুকে বিপ্লব করতে হবে, আমার তখন অনেক কাজ। কিন্তু সেই বালক সেই দিনও আমার পেছন পেছন এল। অন্যান্য দিনের মত গান শোনার বায়না তার নেই। ক্রমাগত মুখ চলে যাচ্ছে। এর পরের অংশে তার সেই অসম্পাদিত বক্তব্য যা আমি শ্রুতিটাইপ করেছিলাম। শুধুমাত্র দুটি নাম ব্যবহৃত হয়েছিল সেইদুটি পাল্টে অমুক এবং তমুক করে দিলাম। বুঝতে একটু অসুবিধে হতে পারে তাই বলি তমুক হল অমুকের ছেলে

 

ঠাকুর আমাদের খুব বাজে জিনিস করছে কিন্ত আমরা একটা কাজ করতে হবে। আমরা ঠাকুরকে যে করেই হোক, ঠাকুরকে ভাল করতে হবে। কেন ঠাকুরকে আমরা ভাল করব ? তার কারণ হচ্ছে আজ ফ্লাইওভার ভেঙেছে কিন্তু গাড়ি আর টাটাসুমো আর মানুষের ওপরে এসে পড়েছে ফ্লাইওভারটা। কিন্তু আজ অনেক মানুষদের ক্ষতি করেছে। এগুলি ঠাকুর ভাল করছে না। এবার আমরাও ঠাকুরকে এমন একটা জিনিস দেব যাতে ঠাকুর আর আমাদের এইরকম কাজ আর কক্ষনও করবে না। যেটা আমরা ঠাকুরকে জিনিসটা দেব সেই জিনিসটার নাম হচ্ছে বোম তার গায়ে একটা গায়ে কাগজ। পেরেক দিয়ে লাগানো থাকবে আর ঐ কাগজটার মধ্যে লেখা থাকবে তুমি আগে আমাদের অনেক ভাল জিনিস দিতে এখন সেটা আর করতে পারছ না, আরও বাজে জিনিস করিয়ে দিচ্ছ। তুমি যেই শাস্তিটা আমাদেরকে দিচ্ছ সেটা অনেক অনেক খুব বাজে। এবার ওর থেকেও বাজে শাস্তি দেব যাতে তুমি সব দেশকেই ভাল করে রাখবে। কোনও দেশকেই তুমি বাজে ভাবে চালাবে না আর এইরকম কাজ দেখলে কিন্তু আরও বাজে শাস্তি তোমাকে দেওয়া হবে। কিন্তু আমরা এবার কিন্তু সহ্য করেছি এর পরেরবার আর সহ্য করা হবে না। ভূমিকম্প হয়েছে সেটা তোমার দোষ নয়, এই যে আজকে তুমি অনেক মানুষদের অনেক অনেক ক্ষতি করেছ সেটা দেখে আমরা সবাই দুঃখ পেয়েছি। সেটা কি ? একটা মানুষ দুটো ট্যাক্সির মাঝখানে আটকে গেছে। পুলিস চেষ্টা করে তাকে বের করতে পেরেছে। একটা মানুষের ফ্লাইওভারের একটা লোহা বুকের ভেতর দিয়ে পিঠ কেটে বেরিয়ে গেছে। আর তার মুখ থেকে সেই রক্ত বের হচ্ছে। আর বুক থেকেও রক্ত বের হচ্ছে আর সে হাঁ করে আছে। সে কি বাঁচবে কিনা কেউ জানে না। ফ্লাইওভারের নিচ থেকে তাকে বের করেছে তবুও সে বাঁচবে কিনা আমরা সেটা নিয়েই চিন্তা করছি। হাসপাতালেও তাকে ভর্তি করা হয়েছে কিন জানি না। তাকে যদি কেউ যদি না খেয়াল করে, নাও করে থাকতে পারে, যখন ব্রিজ তুলবে তখন যদি নিয়ে যায় তালে বাঁচবে। যদি ব্রিজ তুলে তাকে নিতে ভুলে যায় তালে সে আর বাঁচবে না কোনওদিনও। সে যেই বাড়ির থেকে এসেছিল তারা তো কাঁদবে। তাকে তো ভগবান নিয়ে নিল। এইভাবে যদি ভগবান চালাতেই থাকে তালে তো আমাদেরও ভগবান নিয়ে নেবে। আমি হচ্ছি অমুকের ছেলে। ক্লাস ওয়ানে পড়ি। বড় হওয়ার আগেই যদি আমাদেরকে নিয়ে নেয় তালে কি করে আমি বড় হব? তালে আমরা এবার তমুকের বন্ধু বাড়িতে আসবে। তমুকের বাবার বন্ধুরাও তমুকের বাড়িতে আসবে। তারপরে যারা যারা তমুকের বাড়িতে এসেছে তমুকের সঙ্গে সবাই মিলে আয়োজন করা হবে যাতে ঠাকুর ভাল হয়ে যাবে। ঠাকুর যদি ভাল না হয় তখন আমরা আরও ঠাকুরকে বেশি বেশি শাস্তি দেওয়া হবে। হ্যাঁ। আমি যা যা বললাম তা তা ঠিকঠাক করতে হবে। যা যা আমি সব লিখলাম সেই কাজগুলো ঠিক সব ভগবানদের জায়গায় পৌঁছে যায়, কিন্তু না পৌঁছালে তো আমিও আছি। বোম যদি ঠাকুরের কাছে না পৌঁছায় তালে আমরা সব রকেটে করে গিয়ে বোম ছুঁড়ব। আমরা না হলে ৩৫টা রকেট নিয়ে যাব। ঠাকুর যে বাজে জিনিসগুলি করছে তার উত্তর চাই। উত্তর না পেলে ঠাকুর যেখানে থাকে সেখানে গিয়ে আমরা বোম ছুঁড়ব। বোমের গায়ে কাগজে লেখা থাকবে। নাহলে শুধু যদি আমরা কাগজ ছুঁড়ি আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি সেখানেই পড়বে। যদি আমরা বোম ছুঁড়ি তাহলে ঠাকুর যেখানে থাকবে সেখানেই পড়বে, সেটা ঠাকুরের সামনে। এই আয়োজনটা আমরা করলাম। 

 

শেষ হতে বুঝলাম শিশুটির মতে ভগবানই এসবের মূলে। অথচ সত্যি যাতে মানুষের হাত নেই, সেই বিষয়ে ভগবানকে অভিযুক্ত হিসেবে সে রেহাই দিয়েছে আর মানুষের কৃতকর্মের জন্যে অভিযুক্ত হিসেবে বেছে নিয়েছে সর্বশক্তিমানকে। একটু পরেই শুনলাম নির্মাণসংস্থার কর্ণধারও সেই ভগবানকেই দায়ী করেছেন ঘটনার জন্যে। বুঝতে পারলাম না সেই ষষ্ঠবর্ষীয় বালক ইতিমধ্যেই প্রাপ্তবয়স্কদের মত ভাবতে শিখে গেছে নাকি একজন প্রাপ্তবয়স্ক শিশুসুলভ আচরণ করছে।

ভগ্নস্তুপ ও এক ষষ্ঠবর্ষীয় শিশু
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments