আরো একটা বিশ্ব এইডস দিবস পার হয়ে গেল বিনা সমারোহে। বেচারা এইডস, এরকম প্রাণঘাতী ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও লোকে তাকে নিয়ে ভদ্রসমাজে আলোচনা করতে অস্বস্তি বোধ করে। কেবলমাত্র তার সঙ্গে যৌনতার সামান্য সম্পর্ক আছে বলে। কি বিপদ! একদিক থেকে এই জীবাণু যেমন মাস্টারস্ট্রোক খেলেছে যৌন মিলনের মাধ্যমে ছড়ানোর ক্ষমতা আয়ত্ব করে, তেমনি আবার মুস্কিলেও পড়েছে।
 

অবশ্য ভাইরাসরা এত শত ভাবতে পারে কিনা জানা নেই। কিন্তু ভাইরাসরা অনেক কিছু পারে, যা ভাবলে গা হিম হয়ে আসতে পারে। আজ এইডস এর ভাইরাসের কথা বলবনা, বলব আরেক ভাইরাসের কথা। তার সাথেও যৌনতার সম্পর্ক রয়েছে, বুঝতেই পারছেন, নইলে কি আর এই সদু তাকে নিয়ে লিখতে বসত?
 

না, এইচএসভি বা হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের কথা বলছিনা। এইচএসভি নিয়ে সম্প্রতি বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে আমাদের দেশে, যদিও পশ্চিমে অনেক আগে থেকেই এই নিয়ে শোরগোল চলছে। সার্ভিকাল ক্যান্সার এবং যৌনাঙ্গের ক্যান্সারের জন্য দায়ী এই ভাইরাসের টীকাও আবিষ্কৃত হয়েছে। ফলে এই ভাইরাস পোটেনশিয়ালি খুব বিপজ্জনক হওয়ার ক্ষমতা রাখলেও বিপদকে অনেকটাই এড়ানো যাবে প্রিভেনশনের মাধ্যমে।
 

আমাদের আজকের আলোচ্য হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস বা এইচএসভি। হার্পিস রোগটার নাম আমরা অনেকেই শুনেছি, মূলত আবছা ধারণা আছে চর্মরোগ হিসেবে। এর আসল রূপ বেশিরভাগই জানেননা। অথচ মজার ব্যাপার বেশিরভাগ মানুষের শরীরের বাসা বেঁধে রয়েছে কোনো না কোনো জাতের এইচএসভি! এই এইচএসভিরই সমগোত্রীয় আরো কিছু ভাইরাস আছে যাদের একত্রে হিউম্যান হার্পিসভাইরাস বলা হয়। এই সমস্ত হার্পিসভাইরাস আদতে একই জাতের। এদের আক্রমণে হওয়া রোগের মধ্যে রয়েছে আমাদের অতি পরিচিত চিকেন পক্স, মোনোনিউক্লিওসিস, চোখের কিছু রোগ, কিছু চর্মরোগ, এমন কি কিছু কিছু ক্যান্সারও!

এইচএসভি ১ আর এইচএসভি ২, এই দু ধরনের হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস রয়েছে। প্রথমটি মূলত মুখের কোল্ড সোর এর জন্য দায়ী, আর দ্বিতীয়টি মূলত যৌনাঙ্গের হার্পিসের জন্য। এই ধরনের কোল্ড সোরের শিকার আমরা প্রায় সকলেই কখনো না কখনো হয়েছি। সময়ের সাথে সাথে সেরে গেছে। এ আর এমন কি? মুশকিলটা হল সেরে গেছে মানে এই ভাইরাস দেহ থেকে নির্মূল হয়েছে এমন নয়। হার্পিস ভাইরাসের বৈশিষ্ট হল এরা একবার দেহে ঢুকলে তাদের দূর করা যায়না। দেহের ইম্যুন সিস্টেমকে এরা এমন ভাবে ভেদ করে গেঁড়ে বসে, যে একবার ঢুকলে সারাজীবন রয়ে যায়। রোগের উপসর্গ সেরে যাওয়ার পর এরা সুপ্ত অবস্থায় থাকে, আবার পরে কখনো আউটব্রেক হবার অপেক্ষায়!
 

এইচএসভি দেহের যে অংশে আউটব্রেক হয়েছে সেই অংশের যে কোনো রকম কোষ থেকে সংক্রমণ হতে পারে। অর্থাৎ মুখের লালা, যৌনরস ইত্যাদি থেকে সংক্রমণ হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার হল অনেক ক্ষেত্রে এই আউটব্রেক সম্পূর্ণ উপসর্গবিহীনও হতে পারে, এবং সেই অবস্থায় সংক্রমণ হয়ে গেলেও দুজনের কেউই টেরও পাবেন না!
 
কোল্ড সোর কেবল মাত্র একটু বিরক্তি ছাড়া আর কোনো সমস্যার সৃষ্টি করেনা বটে, কিন্তু যৌনাঙ্গের হার্পিস রীতিমত কষ্টকর হতে পারে। তার থেকে গর্ভবতী মায়ের সন্তানেরও ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। তাই এইডসের মত প্রাণঘাতী না হলেও, উপেক্ষা করার মত রোগও নয়। অথচ যার শরীরে এই রোগ বাসা বেঁধেছে সে আদ্ধেক সময় বুঝতেও পারছেনা, না বুঝেই সংক্রমণ ঘটিয়ে দিচ্ছে অন্যের শরীরে। আর একবার সংক্রমণ হয়েছে তো ব্যাস! সারাজীবন বয়ে চলো একে!
 
এই ভাইরাসের আক্রমণে হওয়া উপসর্গকে কমানোর নানা ওষুধপত্র থাকলেও একে খতম করার বা এমন কি আগে থেকে আটকানোর মত টীকাও আবিষ্কার হয়নি এখনো। এই নিয়ে প্রচুর গবেষণা চলছে, আশা করা যায় বিজ্ঞানীরা শেষপর্যন্ত সফল হবেন। আপাতত সাবধানতা, অর্থাৎ সেফ সেক্সই একমাত্র ভরসা। কিছুদিন আগে অবধিও মনে করা হত এইচএসভি ২ কেবল যৌনাঙ্গের হার্পিস এবং এইচএসভি ১ কেবল মুখের কোল্ড সোর সৃষ্টি করে। সম্প্রতি জানা গেছে তা সত্যি নয়। উল্টোটাও সম্ভব। ফলে কেবল সঙ্গম নয়, ওরাল সেক্সের সময়ও সাবধান হওয়ার প্রয়োজন আছে। সেফ ওরাল সেক্স এখনো বেশ উপেক্ষিত একটি দিক, এই সুযোগে এইচএসভি এইচপিভিরা কিন্তু আক্রমণ শানাচ্ছে!
 
এইসব পড়ে হয়তো এইচএসভিকে মনে মনে গাল পাড়তে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সব খারাপের মধ্যে কিছু ভাল দিকও থাকে। হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাসের একটা সদর্থক দিকের কথা বলে শেষ করব। ভাইরাসদের কায়দা করে ব্যবহার করে ক্যান্সারের চিকিৎসা করা সম্ভব বলে মনে করা হয়। যে ভাইরাসদের ব্যবহার করে এই কাজ করা সম্ভব, তাদের বলে অনকোলাইটিক ভাইরাস। এইচএসভি ১ এর মধ্যে এইরকম অনকোলাইটিক ক্ষমতা আছে বলে দেখা গেছে। খুব শক্তিশালী রেজাল্ট পাওয়া না গেলেও এই নিয়ে নানারকম গবেষণা চলছে। আমরা আশা করতেই পারি কিছুদিন পর মাধ্যমিকের রচনার বিষয় হিসেবে "হার্পিসভাইরাস অভিশাপ না আশীর্বাদ?" গোছের কিছু দেখা যাবে।
 

 

ভাইরাস ভাইদের কাহিনী
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments