রিপুঞ্জয় বাড়ি থেকে বেড়িয়ে ব্যারাকপুর স্টেশনের দিকে হাঁটছিল । বহুদিন পর দাদা -কাম – ফ্রেন্ড শিবাজী দা'র সাথে দেখা হবে । মনটা তাই বেশ ফুরফুরে ।  প্রথমে ব্যারাকপুর থেকে ট্রেনে করে সোদপুর , তারপর মিনিট পনেরো নাটাগড়গামী অটোয় চেপে গেলেই সুলেখা মোড়ের কাছে শিবাজী দার দোতলা বাড়ি ।
ব্যাঙ্কের গলি থেকে বেড়িয়ে চিড়িয়ামোড়ে এসে পড়তেই রিপুঞ্জয় দেখল এক ফুঁসতে থাকা জনসমুদ্র ,  স্টেশনের দিক থেকে রিভার সাইড রোডের দিকে দ্রুত পা চালিয়ে আসছে । একটু কাছে আসতেই দেখা গেল মিছিলের পুরোভাগে আছেন গদা-বিহীন ভীম , শ্রী ভীম সিংহ ।  এই প্রখর গরমে চুল  ছোট করে ছাঁটা হলেও সিংহই বটে । ব্যারাকপুর তো এনাকে এতদিনে কম দেখেনি । যা দেখেছে , তা-ই বলছে আর কি !  নিন্দুকের কথা তো আর সিন্দুকে বন্দী থাকে না ! তো সেই নিন্দুকের দলে এমন কজনও আছেন যারা  প্রবল প্রতাপশালী ভীমকে সিংহ কম, 'কেড়ে খাওয়া' ধর্মের ষাঁড় বলেন বেশী ।   এ হেন পথপ্রদর্শকের পেছনে সার বেঁধে আসছিল কালো, সাদাকালো, লাল , লাল-সাদা বিভিন্ন জার্সির টেরিটরিয়াল মেল  রা ।  পুরোভাগে 'বীর পাণ্ডব'( মতান্তরে তাণ্ডব) ' আছেন মানেই বুঝে নিতে হবে যে ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের  তোলাতুলির  পুরো ভাগ টাই এখনো তিনিই পান। কারণ একপাল ষাঁড়ের নেতৃত্ব করতে গেলে হিসসায় কর্তৃত্ব থাকাটা আবশ্যিক ।    

এতোসবেও অবশ্য রিপুঞ্জয়ের কিসসু যায় আসে নি । ও পাশ কাটিয়ে হাঁটছিল , নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে । যেতে যেতেই একটা মজার ঘটনা চোখে পড়লো তার  । এক খাটাল মালিক একটা সদ্য বিয়োনো গাই আর তার ছোট্ট একরত্তি এঁড়ে বাছুরটিকে কিনে বেঁধে নিয়ে ফিরছিল  । মিছিল দেখেই এঁড়ে বাছুরটি ছটফট করে উঠলো । তার শরীরী ভাষা  স্পষ্ট পড়ে ফেলল রিপুঞ্জয়  – " মা , দাদারা – কাকারা হাঁটছে, আমিও যাব " । বেয়াদবি করে কান্মলা, কঞ্চির বারি যা খেলো তা খেলোই  ।  উপরন্ত মা-র কাছে ছোট্ট বকা খেল ছানা টা -

" সোনা আমার ! এখন তুমি ছোট । আগে দুধ খেয়ে গায়ে জোর করো । গায়ে গতরে বড় হও। তারপর তো  গোটা শান্তিবাজার টা তোমারই । লুটেপুটে খেও । কদিনই বা আর  তোমায় বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে খাটালের লোক ? "

মুখে হাসি নিয়ে এগিয়ে চলেছিল রিপুঞ্জয় । এতো সহজে সে গেম রিড করতে পারছে এটা ভেবে তার  বড্ড গর্ব হল নিজেকে নিয়ে !
 আনন্দে মাটি থেকে  ছ – ইঞ্চি উপর দিয়ে প্রায় ভেসে যেতে যেতেই  হল ছন্দপতন । হঠাৎ -ই ঘাড়ে বিরাশি-সিক্কার চাপ্পড় খেল সে , সঙ্গে বাজখাঁই গলার আওয়াজ – " কিরে ! উল্টোদিকে কোথায় চললি ? "
রিপুঞ্জয় আমতা আমতা করে বললে – " উল্টোদিক মানে? আমি তো এইদিকেই যাচ্ছিলাম । স্টেশনে ।"
জবাব এলো – " দুনিয়া যেদিকে হাঁটছে , সেদিকে হাঁট খোকা । ভিড়ে থাকবি  তো পোটেকটেড থাকবি ! আর ঝুনডের বাইরে আছিস মানেই তুই থ্রেট । বুঝলি ? "
রিপুঞ্জয়ের বিরক্ত লাগ্ল , সে বোঝাতে গেল -" আমি কাউকে কিছু বলিনি দাদা , কোনও থ্রেট দেবার প্রশ্নই নেই , আমি যাচ্ছি আমার দাদার বাড়ি ! "  
জবাব এলো -" তুই এক দাদার ডাকে সাড়া না দিয়ে  যাচ্ছিস, আরেক দাদার বাড়িতে মস্তি মারতে ? দুটোতে মিলে ভাল চিড়িয়া নিয়ে ফুর্তি করবি বল ?"
এবারে রিপুঞ্জয় ক্ষেপে গেল , চিৎকার  করে বলল -" দেখো , মুখ সামলে কথা বল ! ভদ্রলোকের মান-সম্মান বলে একটা জিনিস আছে মনে রেখ ! "
মোটা ষাঁড় টা খেঁকিয়ে উঠে বলল -" সম্মান জিনিসটা হেবি বারডেন বে ! এ নে তোর  কাঁধ থেকে বোঝা পাতলা করে দিচ্ছি !  "
এই বলে রিপুঞ্জয়ের কলার টা চেপে ধরল লোকটা । রিপুঞ্জয় ক্যারাটে শেখা , ইটের পাঁজা ভাঙা ছেলে  । সে-ই বা ছাড়বে কেন ? দিল একটা ঘুষি ব্যাটার নাক তাক করে  ।
ব্যাস ! বুমেরাং হয়ে গেল সব কিছু ।
জুতো-ঝাঁটা-বেলচার ক্যালানি খেয়ে কেতরে পড়ার আগে রিপুঞ্জয় আবছা শুনতে পেল , কাপড়ের দোকানের কংগ্রেসপন্থি  বিমল কাকু বলছে  – ওরে, এটা মিত্র বাড়ির মেজো ছেলেটা না?  ওকে এ ভাবে ক্যাল দিল কে?"

তারপর আর কিছু মনে নেই রিপু-র ।
সন্ধেয়  ধ্বস্ত রিপু বিছানায় আধ শোওয়া হয়ে, খাড়া করা পাশবালিশে ঠেসান দিয়ে শিবাজিদাকে ফোন করল । শিবাজিদা কল রিসিভ করে ওকে বলল -" দাঁড়া রে রিপু , একটু পরে ফোন করছি তোকে , একটা জরুরি মিটিং- এ আটকে গেছি "
শিবাজি দা ফোন কাটার আগেই রিপুঞ্জয় শুনতে পেল পাঁড় বামপন্থী  শিবাজীদা উদাত্ত কণ্ঠে একটা অডিয়েন্স  কে অ্যাড্রেস করছে – " তো যেটা বলছিলাম বন্ধুগণ । জনগনের সর্বক্ষণের বন্ধু  মা-মাটি-মানুষের প্রতিনিধি ভীম সিংহের প্রতি এ অন্যায় মেনে নেওয়া যায়না। এর প্রতিবাদ আমাদের সম্মিলিত ভাবে করতেই হবে । "
কনুইয়ের ওপরে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের ওপরে বসা মশাটাকে তাড়াতে তাড়াতে রিপুঞ্জয় আবারো মুচকি হাসল , ঠিক যেমনটা হেসেছিল একবার দুপুরে , বাছুরটাকে দেখে !  

ভাটরেচার (দ্বিতীয় কিস্তি)
  • 5.00 / 5 5
2 votes, 5.00 avg. rating (94% score)

Comments

comments