এই যে ছেলেটা নতুন বছরের গোড়াতেই আচমকা মারা গেল । শিবা কারান । মাত্র তেইশ বছর বয়সে ঠিক করে দুনিয়া দেখার আগেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিল । বলা ভালো নিজেকে দুনিয়া থেকে নিজেই সরিয়ে দিল । এতো প্রত্যাশার চাপ – নিজের কাছ থেকে, বাড়ির কাছ থেকে, চারপাশের লোকজনের কাছ থেকে – শেষমেশ ওর জীবনের চাইতে এগুলোই বেশি প্রাধান্য পেল ওর চিন্তায় । ওর দুর্ভাগ্য যে ওকে বোঝানোর জন্যে, ভরসা জোগানোর জন্যে আশেপাশে কয়েকটা স্থির মানুষের, সঠিক মস্তিষ্কের প্রয়োজন ছিল যা ও পায়নি । আমার এই প্রায় সাড়ে চার বছরের ডক্টরাল স্টাডিজের জীবনে অন্ততঃ ৬ টা এমন ভারতীয় ছেলে মেয়ে দেখেছি , বাঙালি এবং অবাঙ্গালি মিশিয়ে , যাদের সত্যি কথা বলতে শুধু বাড়ির কথা শুনে, কিছু আধচেনা- আধা সফল বন্ধু বা সিনিয়রের কেরিয়ার দেখে লালায়িত হয়ে , একটা অজানা জীবনের আবছা ধারনা নিয়ে আমেরিকাতে ডিগ্রী নিতে চলে আসা একেবারেই উচিত হয়নি । আমেরিকার ডিগ্রী জীবনে আসার আগে প্রতিটি যুবক- যুবতীর উচিত নিঃসঙ্গতার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে অভ্যস্ত হওয়া, সেই জীবনের খোলনলচে গুলো ভালভাবে জানা, প্রচণ্ড রকমভাবে স্বাবলম্বী হওয়া । দেহ-মনে প্রচণ্ড ছাপ ফেলা একটা জীবনের জন্যে যথাযথ তৈরি না হয়ে আমেরিকান ড্রিমের মধু খেতে এদেশে এসে ছেলেমেয়েদের পরে এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে দেখলে, বা বিপাকে পরে কষ্ট পেতে দেখলে খারাপ লাগে, তার চাইতেও বেশী রাগ হয়। আমার এই নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভারসিটি তেই আমার চেনা শোনা বেশ কয়েকটা বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ে আছে যারা মনে করে থাকে – আরে এদেশে ডিগ্রী করতে চলে এসেছি , চাপ- টাপ খেয়ে টেয়ে যেভাবে হোক করে একটা গতি হয়েই যাবে। তারপরে লাইফ সেট , চাকরি – বাকরি , বৌ- বাচ্চা , জমে ক্ষীর । ভুল ! গোটাটা একটা মিথ্যা ধারণা । আমি নিশ্চিত এদের অনেকেই ছমাস, আট মাস, বছর গড়ালে একই ধরনের মানসিক বিষাদ , বৈকল্যের মধ্যে চলে যেতে পারে।
তবে কি এর থেকে বাঁচার কোনও উপায় নেই? আছে । নিজের প্রতি, নিজের চিন্তার প্রতি সৎ হতে হবে । অমুক এটা করছে বলে আমাকেও করতে হবে , তমুক এটা পারেনি বলে আমারও হবে না -এই ধরনের স্টিরিওটাইপ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে। ভীষণ রকম সার্ভেইল্যানট হতে হবে। অন্যের সমস্যা নিজের জীবনে হঠাৎ এসে পড়লে তার মোকাবিলার উপায় আগে থেকেই ভাবতে হবে । বিপদ আসার আগে নিজেকে মেনটালি সিমুলেটেড কন্ডিশনে ফেলতে হবে। এভাবে নিজের প্রতিটি রিয়াকশন নিজে মাপার , বোঝার অবস্থায় না এলে এরকম দুর্ঘটনা থাম্বেনা । পি এইচ ডি জীবনটা শুধুই বইপুথি গাঁত মেরে আর দুটো – চারটে- ছটা পেপার লিখে ফুঁকে দেবার কথা ভেবে যারা এসেছেন বা আসছেন তাদের সবার মঙ্গলার্থেই বলছি -নিজের জীবনটা নিয়ে একটু বেশি ভাবুন, সচেতন হোন । নিজেকে জানুন, বুঝুন, ভালবাসুন , সঙ্গে বাস্তব টাও বুঝুন, নিজেকে বাস্তবের সঙ্গে জুড়ুন । নিজের অবস্থান, কোমরের জোর মাপুন আর সেইমত পদক্ষেপ নিন । নাহলে অলীক স্বপ্নের অযথা মৃত্যু ঘটবে, দুর্ঘটনা চলতে থাকবে – নামগুলো পরপর ঘোষিত হবে মাধুরী সালেহ, শিবা কারান…………

ভারতীয় ছাত্রের প্রবাসে আত্মহত্যা প্রসঙ্গে
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments