কাগজের প্রথম পাতা আস্তে আস্তে পালটাচ্ছে। প্রত্যাশিত ছিল। আর কতদিন এইসব পড়ব আমরা? অতএব নতুন খবর। সিবিআই-কে আদালতের তোপ, রেলমন্ত্রীর ভাগ্নের খেল। বেশ বুঝতে পারছি ভুল করে যাঁরা পালং ভেবে একাদশীর দিন পুঁইশাক খেয়েছিলেন তাঁরা নিশ্চিন্ত মনে আবার বাজারহাট করতে পারবেন। আবার বুক ফুলিয়ে, কলার তুলে ঘুরতে পারবেন, ভেবে বেশ আনন্দ হচ্ছে। হাজার হোক, সহনাগরিক বলে কথা! সাফাই গাইতে গিয়ে কাঁচা গালাগাল খেয়ে ফেসবুকের পাতা বন্ধ করতে হবে না, সকাল বেলা উঠে দুর্গাঠাকুরের ছবি দেখে মন ভালো করবেন, আর কি চাই? নেহাত কপাল খারাপ ছিল, নচেৎ এই ফেরে কেউ পড়ে? বিশ্বাস করুন আমার সহনাগরিক কিন্তু কিচ্ছু জানতেন না। উনি একেবারেই সরল এবং সাদাসিধে। মানুষের ভাল করা ছাড়া আর ওনার কোনও কাজ ছিল না। চব্বিশ ঘণ্টার ভেতরে যেটুকু সময় উনি নন-রেমে থাকতেন সেটুকু সময় ছাড়া উনি ওই একটি কাজ নিয়েই ভাবতেন। খালি চিন্তা কি করে মানুষের ভালো করা যায়। উনি নিজে যেটা করতেন সেটা ছাড়াও অন্য কেউ করলে তাঁর কাছে গিয়ে মিষ্টি দুটো বাক্য বলে উৎসাহ দিতেন। এই উৎসাহ দান যে কাল হবে সেটা কে জানবে বলুন তো? কে জানত শেষে দীনু ঘোষের পরিণতি হবে? ওই হতচ্ছাড়া তারা, কেঁদে কঁকিয়ে নববর্ষের পুণ্য প্রভাতে সংক্রান্তির রাত্রিবাস জনসমক্ষে না কাচলে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হত? অথচ দেখুন ওদেরও তো কিছু না কিছু উপকার হয়েছিল। এখনও তো চলছে, কিভাবে? তাহলে ওই নাটকের কি দরকার ছিল বলতে পারেন? ব্যাপারটা অন্যভাবে মিটিয়ে ফেললেই তো ল্যাঠা চুকে যেত।

আচ্ছা আপনি হয়ত সরকারি চাকরি করেন। বলতে পারেন সরকার যদি অন্যায্য কর আদায় করে আপনার বেতন মেটানোর জন্য বা বাজার থেকে ধার করে শোধ না করে আপনার কি দায়? আরও ভাবুন, আপনার বন্ধু আপনাকে নেমন্তন্ন করে ভালোমন্দ খাওয়ালে আপনি কি তার কাছে চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে জানতে চাইবেন যে সে চুরি চামারি করে, দোকানে ধারবাকি রেখে খাওয়াচ্ছে কিনা? নাকি খাওয়াচ্ছে, খাবেন, তারপর ঢেঁকুর তুলতে তুলতে বাড়ি ফিরে আসবেন? তারপর ধরুন, আপনি পাড়ার একজন গণমান্য ব্যক্তি, রবীন্দ্রজয়ন্তী, রক্তদান শিবির এসবে আর পাঁচজনে আপনাকে আদর করে ডেকে নিয়ে গিয়ে সভাপতির আসনে বসিয়ে সাধ্যমত উত্তরীয়, ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে। আপনি ভাষণ দিতে উঠে কি বলবেন? এসব জনকল্যাণমূলক কাজের পাশে থাকার কথাই তো বলবেন নাকি মঞ্চের ওপরেই আয়োজকদের পিন্ডি চটকাবেন? আপনি যা করতেন ঠিক সেইগুলোই তো আমার সহনাগরিক করেছিলেন। তার জন্যে কি হেনস্থাটাই না হতে হল। কি লাভ হল? মধ্যিখান থেকে এখন মুখ্যমন্ত্রী শ্যামবাজারে যাচ্ছেন তো বিরোধীরাও যাবেন বলে বায়না ধরেছেন, বিরোধীরা পানিহাটিতে গেছেন তো মুখ্যমন্ত্রীকেও হাঁফাতে হাঁফাতে সেখানে ছুটতে হচ্ছে। সঙ্গে তাড়া তাড়া খবরের কাগজের কাটিং আর নানা রকমের দস্তাবেজ। এই গরমে এই অত্যাচার, কোনও মানে হয়? যা গেছে তা ফিরিয়ে তো দিতে পারব না, অনর্থক হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো। চারটি লোককে খামোখা ব্যতিব্যস্ত করে তোলা ছাড়া আর কি হল? এত সবের পরে আমাকে দেখুন। মোমবাতি হাতে রাস্তায়ও নামিনি, কারও খড়ের ছাদের দাওয়ায় বসে মাটির কুঁজোর জল খেতে খেতে জানতেও চাইনি ‘কে মেরেছে, কে ধরেছে, কে দিয়েছে গাল’। বরং ধূমপানের মাত্রাটা একটু বাড়িয়ে দিয়েছি। আর সবচেয়ে বড় কথা মাথাতেই ঢুকছে না অতি লোভের শাস্তি যারা পেয়েছে তাদের এত সমবেদনা জানানোর কি আছে। বেফালতু এখন নিন্দুকের দল আওয়াজ তুলেছে যে এ রাজ্যের প্রধান শিল্প নাকি বাগাড়ম্বর।

কিন্তু এই আমি একদিন আমাকে নিয়ে মহা ঝামেলায় পড়েছিলাম। সেদিন সন্ধ্যেবেলায় কালবৈশাখী হয়ে যখন পরিবেশটা বেশ মনোরম, সবে দু’এক চুমুক পাটিয়ালা পেটে পৌঁছেছে কি পৌঁছয়নি, অমনি কোথা থেকে উল্টোপাল্টা সব চিন্তা এসে ভিড় করল। প্রথমে মনে হল এই যে হঠাৎ করে হাজার হাজার লোক কর্মহীন হয়ে পড়ল, লক্ষ লক্ষ মানুষের সারা জীবনের উপার্জনের একটা অংশ বা পুরোটাই আকস্মিক ভাবে ‘নেই’ হয়ে গেল, এটা কি কোনভাবে ঠেকানো যেত? সামগ্রিক ভাবে সমাজ ব্যবস্থার ওপরেই কতটা আঘাত নেমে এল আর কতটাই বা এখনও বাকি রয়ে গেল। তারপর মনে হল, এই ঘটনাটা যাতে আর না ঘটে তার জন্য যা যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তা কি নেওয়া হচ্ছে না কি একাদশীর দিন যে পুঁইশাক খাইনি সেটা প্রতিষ্ঠা করতেই বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে? সংসদে মাননীয় কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রীর পেশ করা তালিকা থেকে দেখা যাচ্ছে যে তিয়াত্তরটা এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটান্নটির বিচরণক্ষেত্র হল পশ্চিমবঙ্গ। পয়লা বৈশাখের আগে না হয় জানা যায়নি, কিন্তু এখন তো জানা আছে, সেক্ষেত্রে এর মধ্যে ক’টা রাঘববোয়ালের বিরুদ্ধে ঠিকঠাক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়েছে? এই ধরনের ঘটনা আটকানোর জন্য যেসব সরকারি পরিকাঠামো ইতিমধ্যেই বর্তমান, সেগুলির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি? কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে নেটওয়ার্ক সরকার তৈরি করতে পারল না, তা কতগুলি দুষ্কৃতি মিলে কি করে অনায়াসে তৈরি করে ফেলল? জনপ্রতিনিধিরা তো কিছুই জানেন না বলছেন, কাকে যে জিজ্ঞাসা করব ভাবতে ভাবতেই সম্বিত ফিরল, মানে নেশাটা কেটে গেল।

নাক কান মুলে প্রতিজ্ঞা করেছি এবার থেকে দুধ খাবো, মদ ছোঁবো না।

মদ্যপান ছেড়ে দেওয়ার কারন সমূহ
  • 4.67 / 5 5
3 votes, 4.67 avg. rating (90% score)

Comments

comments