একদিন জেমস ট্যুরেলের ট্যুইলাইট এপিফ্যানি দেখে ফিরছি, কয়েক পশলা বৃস্টির পর কুয়াশায় দূরের স্কাইলাইন অদৃশ্য প্রায় – হঠাত চোখে পড়ল রাস্তার পাশে সবুজ ভেজা ঘাসের ওপর চিন্তামগ্ন মণ্ডূক; পোষাকি নাম – গালফ কোস্ট টোড, ল্যাটিন নাম – Bufo Valliceps । ছবিতোলার সময় বুঝতে পারিনি কিন্তু পরে দেখলাম ব্যাঙটার মাথার ঠিক ওপরে একটা পুঁচকে শামুক বসে – অদ্ভুত সহাবস্থান। একসময় শহরতলীর আশেপাশে ইতিউতি প্রচুর ব্যাঙ দেখা যেত। হরেক কিসিমের ব্যাঙ। বৃষ্টির সাথে সন্ধ্যেবেলায় ব্যাঙের ডাক মিশে অদ্ভুত সাউন্ডস্কেপ তৈরী হতো। কুনোব্যাঙের পেছনের পায়ের পেশীগুলোয় তেমন জোর নেই – ওরা ছোট্ট ছোট্ট লাফে রাস্তা পেরোত। দেশগাঁয়ে গরমকালে পুকুরের জল নেমে গেলে, জমা শ্যাওলার ধারে সোনাব্যাঙ বসে থাকত – জলের ধারে গজিয়ে ওঠা ঘাসের মধ্যে হলদে সবুজ রংটা মিশে যেত, ভালো করে লক্ষ্য করলে কেবল গলার ওঠানামাটা বোঝা যেত। অদ্ভুত নিস্পৃহ চোখগুলো চকচক করত। একদম ছেলেবেলায় অধীর বিশ্বাসের একটি উপন্যাস পড়েছিলাম “আয় বৃষ্টি ঝেঁপে”-এক দাঁড়াশ সাপ আর দুই কোলাব্যাঙের ছানাপোনার গল্প। এখনো মনে ধরে আছে সকটা চরিত্র। আমাদের বায়োলজি ক্লাসে ব্যাঙকাটা আবশ্যিক ছিল। প্রচুর কুনোব্যাঙ ধরে আনা হতো। বালতির মধ্যে একেকবারে গোটাকয়েক রেখে তার মধ্যে ক্লোরফর্ম ঢেলে ঢাকনা চাপা দিয়ে দেওয়া হতো। ভেতর থেকে ধড়ফড় করে ব্যাঙগুলো বেরিয়ে লাফাতে চাইত – ঢাকনা চেপে ধরে রাখতে হতো অনেক সময়। এরপরেও গোটাকয় অর্ধ্মৃত ব্যাঙ আস্তে আস্তে পা নাড়তো – তাদের আছড়ে মেরে মোমভর্তি ডিসেক্সান ট্রের ওপর হাতেপায়ে পিন দিয়ে গেঁথে ছাত্রদের ব্যবচ্ছেদ শেখানো বাধ্যতামূলক ছিল।এখন সেটা নিষিদ্ধ হয়েছে – মন্দের ভালো, যদিও তাতে কতটা লাভ হয়ছে সেব্যাপারে কোন খবর আসেনি।

কোস্টারিকায় একদল বিজ্ঞানী ব্যাঙদের গলার আওয়াজ রেকর্ড করে ওখানকার রেন ফরেস্টের জীববৈচিত্র্য মাপার চেষ্টা করছেন। শ্যানন-ওয়েনার ইন্ডেক্সের মতো এটাকে ইকোলজিকাল সাউন্ডস্কেপ ইন্ডেক্স বলা যায়। ২০০০ সালে কয়েকজন ইকোলজিস্টের নজরে আসে সারা বিশ্বজুড়ে অ্যাম্ফিবিয়ানরা দ্রুত হারে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তাঁরা নেচার জার্নালে একটি প্রবন্ধ ছাপেন এটার ওপরে। পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে কোস্টারিকায় আরেকদল বিজ্ঞানী এখন আলদাভাবে গবেষণা করে সেই একই আশংকা ব্যক্ত করলেন। মৌমাছির মতো ব্যাঙেরাও এখন বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি। হয়ত কয়েকবছর পর এদের ডাক শোনার বিরল সৌভাগ্য মাত্র কয়েকজনেরই হবে। হাঁড়ির একটা চাল টিপে যেমন ভাত হয়েছে কিনা বলে দেওয়া যায় – উভচর বা অ্যাম্ফিবিয়ানদের প্রজাতিগুলি সেরকম আমাদের বাস্তুতন্ত্রের সেন্টিনেল স্পিসিস হিসেবে কাজ করে। দূষণের মাত্রার তারতম্য ঘটলে এদের প্রজনন চক্র মারাত্বক রকমের ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দূষণের পার্শবর্তী প্রতিক্রিয়ায় ফলে কয়েকটি অ্যাম্ফিবিয়ানদের মধ্যে নারী-পুরুষের অনুপাত পালটে যাচ্ছে – বিশেষ করে পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তর ঘটেছে/ঘটছে। ডায়নোসরের মতো এরাও একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং সেটা আমাদের জীবতকালেই ঘটবে।

পৃথিবীতে এর আগে পাঁচবার মাস এক্সটিংকশান হয়েছে – আমরা এখন আরেকটির উদ্গাতা। সাপ-ব্যাঙ-মৌমাছী-মাছ–পাখি-ব্যাক্টেরিয়া-গন্ডার-লেমূর সবকিছু আস্তে আস্তে গিলে নিচ্ছে উন্নয়ন আর অনিয়ন্ত্রিত জনবিস্ফোরণ। ভ্রান্ত অর্থনীতির যুক্তিগুলোকে খণ্ডন না করে শুধু নৈতিকতার দোহাই দিয়ে পরিবেশ রক্ষা করা যাবে না। ডান-বাম কোন রাজনৈতিক দলের ইস্তেহারে পরিবেশের স্থান নেই। ট্রাম্প থেকে হাসিনা প্রত্যেকেই একরাশ ভিত্তিহীন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন কিন্তু তাতে সুন্দরবনে তাপবিদ্যুতকেন্দ্র প্রকল্প বা সাউথ ডাকোটার কিস্টোন প্রজেক্ট আটকে থাকে না। এর ধাক্কায় যখন আমাদের অণ্ডকোষের শুক্রাণু কমতে শুরু করবে, মায়েরা বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দেবে তখন হয়ত সামগ্রিক উন্নয়নের সুপ্ত চেতনা ফিরবে।

ছবির নায়কটিকে হুড়ো দিয়ে ঝোপে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম – হয়ত এখনো বেঁচে আছে। আমাদের পাশাপাশি ওরাও থাকুক এই পৃথিবীতে।

মন্দদাদুরী উপাখ্যান
  • 4.50 / 5 5
2 votes, 4.50 avg. rating (87% score)

Comments

comments