বনফুল লিখেছিলেন ‘পাঠকের মৃত্যু’। কিন্তু পাঠকের শুধু মৃত্যু হয় না, জন্মও হয়। ভাবতে গেলে শিউরে উঠতে হয় একজন অপরিণত পাঠকের হাতে পড়ে কি হাল হতে পারে কোনও কালজয়ী সাহিত্যের। আমার নিজের কথা বলছি। সবাই পড়ে ফেলেছেন আমি পড়িনি, খানিকটা এই রকম একটা মনোভাব থেকেই পড়তে শুরু করেছিলাম শ্রী অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’। সত্যি কথা বলতে কি মোটেই ভাল লাগেনি। খালি একটা জায়গা পেজমার্ক করেছিলাম “জ্যাঠামশাই, আমরা হিন্দুস্তানে চলিয়া গিয়াছি, ইতি সোনা”।

বেশ কিছুদিন পরে অন্য একটি বই হাতে এল। শ্রী অশ্রুকুমার সিকদারের লেখা ‘ভাঙা বাংলা ও বাংলা সাহিত্য’। বইটির অন্তর্গত দুটি প্রবন্ধ ‘ভাঙা দেশ, ভাঙা মানুষ, বোবা বাংলা সাহিত্য’ ও ‘ভাঙা বাংলার আখ্যানে ‘আমরা’ আর ‘ওরা’ ’ । মূল প্রতিপাদ্য দেশভাগোত্তর পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্য আসলে দেশভাগ সংক্রান্ত যন্ত্রনার বিষয়ে নীরব। এই নীরবতা পীড়িত করেছে প্রাবন্ধিককে। গভীর বেদনার সঙ্গে লেখকের উপলব্ধি, অত্যন্ত স্বল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ পরবর্তী অধ্যায় যেটুকু স্থান পেয়েছে তা মূলত উচ্চবর্ণের হিন্দুদের দুরবস্থার কথা, সঙ্গে কি হয়েছে নয়, কি হওয়া উচিত ছিল তার কথা এবং খুব সঙ্গত কারনেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্যে সেই সময় এই বিষয় খুব একটা স্থান পায়নি কারন সাময়িক ভাবে হলেও এই খন্ডিত ভূখণ্ড আসলে তাদের কাছে এক জয়। যাই হোক, এই সময়েই খানিকটা বাধ্য হয়ে আবার হাতে তুলে নিতে হল ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’। বলতে গেলে সেই প্রথম ঠিকঠাক পড়া গেল বইটিকে। সংশ্লিষ্ট অনুভব আগেই জানিয়েছি।

এরপর প্রথমেই পড়লাম ‘অলৌকিক জলযান’। জানা ছিল এইটিই পূর্বোক্ত উপন্যাসটির দ্বিতীয় পর্ব। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ বইটির শেষে সেই রকমই তথ্য দেওয়া ছিল। খটকা লাগল উপন্যাস শেষ করে। শেষ পাতায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে এটি তৃতীয় পর্ব। ইচ্ছে ছিল প্রতিটি পর্ব ধারাবাহিক ভাবে পড়ব। বাধা পড়ল। যাই হোক, হাতে নিলাম ‘মানুষের ঘরবাড়ি’। লেখক নিজেই যাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন দ্বিতীয় পর্ব হিসেবে।

পড়া শেষ করেই দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লাম। বারবার প্রশ্ন জাগতে শুরু করল লেখকের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি সত্ত্বেও ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ উপন্যাসটিকে ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসটির দ্বিতীয় পর্ব আদৌ বলা চলে কিনা।

আসুন আপনাদের একবার জানাই আমার এই সংশয়ের কারন কি। মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে জানিয়ে রাখি আমার ব্যবহৃত বইগুলির সংস্করণ।

নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে – পঞ্চম অখন্ড সংস্করণঃ জানুয়ারী ২০০২

অলৌকিক জলযান – ষষ্ঠ অখন্ড সংস্করণঃ অক্টোবর ২০১০

মানুষের ঘরবাড়ি – দ্বিতীয় অখন্ড সংস্করণঃ এপ্রিল ২০১০  

‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ পঞ্চম অখন্ড সংস্করণ প্রকাশিত হয় জানুয়ারী,২০০২ সালে (প্রথম অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশ পায় জানুয়ারি ১৯৯৯ সালে)। প্রকাশক করুণা প্রকাশনী। এই সংস্করণের শেষে ‘অলৌকিক জলযান’–কে উপন্যাসটির দ্বিতীয় পর্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রকাশকের প্রকাশিত ‘মানুষের ঘরবাড়ি’–র অখন্ড সংস্করণ প্রথম প্রকাশিত হয় সেপ্টেম্বর,২০০১ সালে। এই বইটিতে প্রকাশিত লেখকের একটি বিবৃতি আছে। যার একটি অংশ- “….পাঠকেরও অভিজ্ঞতা ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ আসলে সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব। সুতরাং এখন থেকে ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ দ্বিতীয় পর্ব বলেই চিহ্নিত করা গেল”। বিবৃতির তারিখ ০৫-০৯-২০০১। এই বইটির দ্বিতীয় অখন্ড সংস্করণের (এপ্রিল ২০১০) শেষে উল্লেখিত আছে ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’–র সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত, তৃতীয় পর্বঃ অলৌকিক জলযান, চতুর্থ পর্বঃ ঈশ্বরের বাগান। ‘অলৌকিক জলযান’-এর প্রথম অখন্ড সংস্করণ প্রকাশিত হয় জানুয়ারী, ২০০১ সালে। আর অক্টোবর,২০১০ ষষ্ঠ অখন্ড সংস্করণের শেষে উল্লেখ দেখা যায় যে ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’– ৩য় পর্ব সমাপ্ত। বলে রাখা ভাল যে এই বইটির প্রকাশকও করুণা প্রকাশনী।

অর্থাৎ সামান্য কিছু বিভ্রান্তি যা দেখা যাচ্ছে সেটাকে আপাত দৃষ্টিতে মুদ্রণপ্রমাদ বলেই মনে হয়। যা বাংলা প্রকাশনা জগতে নেহাত দুর্লভ নয়। কিন্তু না, প্রাথমিক ভাবে এটি মুদ্রণপ্রমাদ নয়। অন্তত ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ –র প্রথম অখন্ড সংস্করণের জন্য তো নয়ই।  খেয়াল করে দেখুন, ‘মানুষের ঘরবাড়ি’-র লেখক কৃত স্বীকৃতি তো ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ অখন্ড সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার প্রায় দুই বছর পরে। এমনকি ‘অলৌকিক জলযান’-প্রথম অখন্ড সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ারও কয়েক মাস পরে। বোধহয় তার পরবর্তী মুদ্রণগুলিতে বিষয়টি শুধরে নেওয়া হয়েছিল কিন্তু ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’- র ক্ষেত্রে হয়নি। খুব নিশ্চিত নই, তবু যদি এই রকম কিছু ঘটে থাকে, সেটি অবশ্যই মুদ্রণপ্রমাদ।

আরও একটি জিনিস লক্ষ্য করার আছে। পূর্বে উল্লেখিত বিবৃতিতে লেখক জানিয়েছেন ‘…১৯৭৬ সালে আমার পিতার মৃত্যু হয়। আর তখনই মনে হয় আসল পর্ব ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ সিরিজ থেকে বাদ গেছে’। ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে। তারপর ‘অবাঞ্ছিত’ নামে একটি উপন্যাস এবং আরও অন্যান্য কিছু প্রকাশিত লেখা জুড়ে নিয়ে উপন্যাসটির আজকের রূপ পেতে বেশ কিছু সময় লাগে। যদিও বর্তমান অখণ্ড সংস্করণে ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, ‘মৃন্ময়ী’ ও ‘অন্নভোগ’ যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় খন্ড হিসেবে নামাঙ্কিত হয়েছে। খুব সম্ভবত এই কারনেই বোধহয় সম্পূর্ণ উপন্যাসটির প্রথম প্রকাশ কাল সঠিক ভাবে পাওয়া যায় না বা হয়ত প্রথম অখন্ড সংস্করণেই বইটি পূর্ণরূপ পেয়েছে। (আন্তরিক অনুরোধ রইল যদি এই ব্যাপারে কারও কাছে কোনও নির্দিষ্ট তথ্য থাকে তাহলে তা জানানোর জন্য) তা সত্ত্বেও এ প্রশ্ন তোলা যায় এত দেরি কেন? কোথাও কি কোন ধন্ধ কাজ করেছিল? ‘মানুষের ঘরবাড়ি’–র মত উপন্যাস,বাংলা সাহিত্যে যার অস্তিত্ব অন্য কারো ওপর নির্ভরশীল হতে পারেনা,তাকে নিজের মত থাকতে না দিতে কিছুটা হলেও কি লেখক কুন্ঠিত ছিলেন?

আমার মনে হয়, লেখকের স্বীকৃতি সত্ত্বেও ‘মানুষের ঘরবাড়ি’–কে ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’–র দ্বিতীয় পর্ব বলে মেনে নিতে অসুবিধা হওয়ার সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’, ‘অলৌকিক জলযান’ এবং ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ এই তিনটি উপন্যাসের মধ্যেই। ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’–র শেষে দেখা যায় সোনা ভারতে এসে জাহাজে ভর্তি হয়ে জাহাজী হওয়ার ট্রেনিং নেয় আর ‘অলৌকিক জলযান’-এর শুরুতে দেখা যায় সোনা ট্রেনিং শেষে জাহাজের খোঁজে রোজ বন্দরে হাজিরা দেয়। একটা সেতু তৈরি হয়েই যায় উপন্যাস দুটির মধ্যে।

অথচ ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ সম্পূর্ণ এসবের বাইরে একটি উপন্যাস। দেশভাগের পরে একটি ছিন্নমূল পরিবার কি করে নতুন করে সব কিছু গড়ে তুলল তারই এক অসাধারন চিত্রকল্প, অনন্য এক দলিল। ব্যক্তিগত ভাবে আমার ধারণা যে ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ অবশ্যই ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’–র ভেতরকার একটা ফাঁক চমৎকার ভাবে পূর্ণ করে দেয় কারন ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ সোনার দেশ ছেড়ে চলে আসা এবং জাহাজে ট্রেনিং নিতে শুরু করার মধ্যবর্তী সময় সম্বন্ধে নীরব থাকে। ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ তাহলে কি? একান্তই যদি উপন্যাসটিকে এই সিরিজের অংশভুক্ত করতে হয় সেক্ষেত্রে তাকে কোথায় স্থান দেব? ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’-এর দ্বিতীয় পর্বে নাকি তার অন্তর্বর্তী অবিচ্ছেদ্য এক অধ্যায় হিসেবে উপন্যাসের ভেতরেই?

যদিও এই সিরিজের প্রত্যেকটি উপন্যাস স্বয়ংসম্পূর্ণ তবু বিষয়টি নিয়ে অভিজ্ঞজনের মতামতের অপেক্ষায় রইলাম।

‘মানুষের ঘরবাড়ি’ সংক্রান্ত কিছু সংশয়
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments