চারটে কুকুর ছানার মধ্যে তিনটেই কুচকুচে কালো। আরেকটার ঘাড়ে আর ঝোলা কান দুটোয় সাদা ছোপছোপ। ছ’বছরের বোবোর ওই কালোর ওপর সাদা ছোপছোপ কুকুর ছানাটা ভারি পছন্দ। ওদের তিন তলার কোয়ার্টারের সামনেই এক দঙ্গল কুকুরের মাঝে রোগাসোগা চেহারার কালো কুকুরটাই যে কুকুর ছানাগুলোর মা সেটা দেখেই বোবো বুঝতে পেরেছে। সারাটা দিন মায়ের পিছু পিছু ঘোরে। খিদে পেলেই সবকটা একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়ের ওপর। ওরা নিজেদের মধ্যে মারামারিও করে। সবকটা ছানাই ভীষণ কিউট। বোবোর খুব ইচ্ছে ওই ঘাড়ে কানে সাদা ছোপছোপ ছানাটাকে বাড়িতে নিয়ে আসবে। পাপা “হ্যাঁ”ও বলেছিল কিন্তু মম রাজী হল না কিছুতেই। অগত্যা স্কুলে যাওয়ার সময় ছানাগুলোকে একটু কোলে নিয়ে চটকানো আর স্কুল থেকে ফিরে তিন তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছানাগুলোর দুষ্টুমি দেখা ছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিল না বোবোর।

****

অফিস যাওয়ার পথেই অয়ন সেদিনই দেখেছিল মাঝ রাস্তায় পড়ে আছে ওই চারটে ছানার একটার থেঁতলানো দেহ। ফেরার পথে অবশ্য আর দেখতে পায়নি। মিউনিসিপ্যালিটির লোকজন হয়তো তুলে নিয়ে গেছে অথবা বনবেড়ালে নিয়ে গেছে মুখে করে। বোবোর গত তিন দিন ধরে খুব জ্বর। স্কুলেও যায়নি। অনন্যা ওকে ঠাণ্ডা হাওয়ায় বাইরের ব্যালকনিতেও যেতে দেয়নি। তবে রোজই ওই কুকুর ছানা চারটের আপডেট নিয়েছে অয়নের কাছে। আয়ন ঠিক করেছে মাঝ রাস্তায় পড়ে থাকা ছানাটার কথা বোবোকে বলবে না। ও সুস্থ হলে জ্বরটা কমলে ওকে বুঝিয়ে কিছু একটা বলে দেবে। অসুস্থ শরীরে মেয়েটা কান্নাকাটি করলে জ্বরটা না আবার বেড়ে যায়।

*****

গভীর রাতে যখন বোবো অনন্যাকে জড়িয়ে ঘুমে কাদা হঠাত অয়নের কানে ভেসে এলো গাড়ির শব্দ আর তার সঙ্গে একপাল কুকুরের তারস্বরে চিৎকার। অয়ন সন্তর্পণে উঠে এসে দাঁড়ালো ব্যালকনিতে। নজরে পড়ল ল্যাম্পপোস্টের ভেপার ল্যাম্পের হলুদ আর কুয়াশার চাদরে মোড়া একটা লোহার জালের খাঁচাওলা ডগ ক্যাচারের গাড়ি। কিছু পালাতে পারলেও বেশিরভাগ কুকুরই ততক্ষণে খাঁচায় ভরে ফেলেছে কুকুর ধরার লোকজন। গাড়িটা যখন চলতে শুরু করেছে অয়ন অবাক হয়ে দেখতে লাগল একটা কালো কুকুর খাঁচার ভেতর থেকে রাস্তার দিকে মুখ করে অদ্ভুত করুন সুরে ডেকে চলেছে। আর সেই চলন্ত গাড়ির পিছুপিছু দৌড়চ্ছে দুটো কুকুর ছানা। তার মধ্যে একটা বোবোর সেই পছন্দের ঘাড়ে কানে সাদা ছোপছোপ ছানাটাও আছে।

*****

লং উইক এন্ডে দিন দুয়েক বাড়িতেই কেটে গেল অয়নের। বোবোর জ্বরটাও কমেছে। অনন্যার হাত থেকে বাজারের থলেটা নিয়ে গ্যারাজ থেকে বাইকটা বের করল। অনন্যা বলে দিয়েছে আজ বোনলেশ চিকেন নিয়ে আসতে। গত তিন চারদিন মেয়েটা প্রায় কিছুই খেতে চায়নি। অনন্যা ওর জন্যে চিকেন সিক্সটি ফাইভ বানাবে। চিকেন সিক্সটি ফাইভ বোবোর ফেভারিট ডিশ। এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই বাইকে স্টার্ট দিলো অয়ন। অনন্যার ধরিয়ে দেওয়া লিস্ট মিলিয়ে বাজার সেরে বাড়ি ফেরার পথেই নাকে এলো একটা গা গুলিয়ে ওঠা পচা গন্ধ। রাস্তার এক ধারে ঝোপের ভেতর নজরে পড়ল সেই ঘাড়ে কানে সাদা ছোপছোপ কালো কুকুর ছানাটার ছোট্ট শরীরটা ঘিরে চার পাঁচটা কাক। দৃশ্যটা দেখে পুরো শরীরে যেন একটা ঝাঁকুনি অনুভব করল অয়ন। কোনমতে বাড়ি ফিরে বাজারের থলেটা অনন্যার হাতে ধরাতেই আদুরে গলায় বোবো জিজ্ঞেস করল,

- “পাপা, তুমি রাস্তায় আমার সেই কুকুর ছানাটাকে দেখলে? ব্যালকনি থেকে আমি দেখতেই পেলাম না। এই ক’দিনে ও কি আরও বড় হয়ে গেছে?”

মেয়ের প্রশ্নের কোনো উত্তরই ছিল না অয়নের কাছে। ও কেমন করে ওকে বলবে যে ওই ছোট্ট শরীরটাতে পেট ভরবে না বলে চার পাঁচটার বেশী কাকও জোটেনি। ধরা পরে যাওয়ার ভয়ে মেয়ের দিকে না তাকিয়েই অয়ন শুধু অস্ফুটে বলতে পারল,

- “মায়ের সঙ্গে ওরা মামারবাড়ি গেছে। কয়েক দিন পরেই ফিরবে……”

মামার বাড়ি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments