আমার ছোটবেলাটা কেটেছে কোলকাতা বর্ধমান লাইনের ওপর ছোট্ট একটা মফঃস্বল শহরে। আমার মতন তোমরা যারা নব্বই-এর দশকে তাঁদের টিন-এজটা কাটিয়েছ তাদের কাছে আর নতুন করে বলার কিছুই নেই যে আমরা আমাদের ছোটবেলাটা কিরকম এন্জয় করতাম। আজকালকার কচিকাঁচাদের মতন আমাদের তো আর সাত সকালে ঘুমচোখে উঠে মাইকেল ফেল্পস বা সচিন তেন্ডুলকার হবার জন্যে সুইমিং বা ক্রিকেট শিখতে যেতে হত না, তারপর সেখান থেকে বাড়ি ফিরেই নাকে মুখে গুঁজে আবার স্কুল বাসের সাথে প্রতিযোগিতাতেও নামতে হত না বা স্কুল শেষ করেই হয় ড্রয়িং অথবা ওয়েস্টার্ন ডান্স বা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে পারদর্শী হবার ইঁদুর দৌড়ে সামিল হবার দরকার পড়ত না। আমরা ধীরে সুস্থে সাতটা সাড়ে সাতটায় ঘুম থেকে উঠতাম। উঠে খানিক পড়াশোনা করে, চান খাওয়া সেরে দশটায় পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে স্কুলে যেতাম। স্কুল শেষ করে বাড়িতে এসে খাওয়া দাওয়া সেরে আবার দৌড়তাম পাড়ার মাঠে। সেখানে চুটিয়ে শীতকালে ক্রিকেট, গরমকালে ফুটবল খেলে সন্ধ্যেবেলা হাত পা ধুয়ে খানিক আড্ডা মেরে বাড়ি ঢুকতাম। তারপর কিছুক্ষণ পড়তে বসার নাম করে ঢুলে কোনোমতে রাতের খাওয়া সেরে ‘লেটস কল ইট আ ডে’ বলে স্বপ্নের জগতে ডুব লাগাতাম। মোটকথা আমাদের শৈশবটা ছিল অখণ্ড অবসরে ভরা, সেখানে ‘কেরিয়ার’, ‘টার্গেট’, ‘ডেডলাইন’ এই জাতীয় শব্দগুলো ছিল একেবারে এলিয়েনদের মতই।

 

ছোটবেলা সবারই একগাদা বন্ধু থাকে। আমারও ছিল। তার মধ্যে একজন ছিল ভুতো। নামটা শুনে নাক সিঁটকানোর কিছু নেই, তখনকার দিনে ভুতো, নাড়ু, পাঁচু, খেঁদি এরকম নাম হামেশাই পাওয়া যেত। সে যাই হোক, ভুতোকে শুধু বন্ধু বললে হয়ত কম বলা হবে, ছোটবেলায় সে ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। ওর চেহারা খুব আহামরি কিছু না হলেও অন্তত ভুতের মতন মোটেও ছিল না। ভাল নামও ওর একটা ছিল, দেবর্ষি। কিন্তু পাড়ায়, স্কুলে ও ভুতো নামেই বেশী পরিচিত ছিল। আর এই নামটাতেই ও যেন বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। আমার সাথে একই ক্লাসে পড়ত। থাকতও একই পাড়াতে। পড়াশোনায় বেশ ফাঁকিবাজ হলেও কি ভাবে জানি অ্যানুয়াল পরীক্ষায় ঠিক প্রথম দশের মধ্যে নিজের জায়গাটা করে নিত। ওর যে বৈশিষ্ট্যটা সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো ছিল সেটা হল ওর সেন্স অফ হিউমার। আজকাল ‘ওয়ান লাইনার’ বলে যে বস্তুটি বহুল প্রচলিত সেটার স্রষ্টা কে আমি তা জানি না। কিন্তু সেই সময়েই ভুতো মুখে মুখে এ জাতীয় ওয়ান লাইনার হামেশাই প্রয়োগ করত। তার উপস্থিত বুদ্ধি, তার লোককে হাসানোর ক্ষমতা এই গুনগুলোর জন্যে সে অনায়াসে পাড়ায় বা স্কুলে আমাদের অলিখিত নেতা হয়ে গিয়েছিল। তাকে নিয়ে বিভিন্ন ঘটনাগুলো মনে পড়লে আজও অজান্তেই ঠোঁটের কোনায় একটা হাসি এসে পড়ে। সেই রকম কিছু ঘটনাই শেয়ার করব বলে এই লেখাটা লিখছি।

 

স্কুলে ভুতোর জন্যে আমাদের ক্লাসকে স্যারেরা বেশী ঘাঁটাতেন না। দুএকটা উদাহরণ দিলেই কারণটা স্পষ্ট হবে। আমাদের ক্লাস নাইনে ইংরাজি পড়াতেন সনাতন স্যার। উনি খালি ট্র্যান্সলেসন করাতে ভালবাসতেন। মাঝে মাঝেই এখান ওখান থেকে একটা বাংলা প্যারাগ্রাফ দিয়ে আমাদের বলতেন ইংরাজিতে ট্র্যান্সলেট করতে। আর না পারলেই শুরু করতেন জ্ঞান বিতরন। স্যারের বক্তব্য ছিল ট্র্যান্সলেসনের মাধ্যমেই নাকি লোকে ভালভাবে ইংরাজি শিখতে পারে আর ভালভাবে ইংরাজি না শিখলে মনুষ্য জীবনটাই বৃথা। হাফ ইয়ারলি পরীক্ষায় উনি এমন সাংঘাতিক একটা প্যারাগ্রাফ দিয়েছিলেন অনুবাদ করতে যে অধিকাংশ ছাত্রই তাতে দাঁত ফোটাতে পারেনি। এরপর খাতা ফেরত দেবার দিন উনি পুরো পিরিয়ড জুড়ে আমাদের জ্ঞান দিয়েছিলেন। তার দুদিন পর ভুতো লাইব্রেরী থেকে বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ যোগাড় করে তার থেকে একটা দাঁত ভাঙ্গা প্যারাগ্রাফ খাতায় টুকে নিয়ে সনাতন স্যারকে দিয়ে বলেছিল ট্র্যান্সলেট করে দিতে। প্যারাগ্রাফটা সাধুভাষা থেকে চলতি ভাষাতে অনুবাদ করতেই অতি বড় বড় পণ্ডিতের ঘাম ছুটে যাবার কথা। সনাতনস্যার বাংলা সাহিত্যে অত ওয়াকিবহাল ছিলেন না। ফলে প্যারাগ্রাফটা যে আনন্দমঠ থেকে নেওয়া সেটা ধরতে পারেননি। কোথা থেকে পেয়েছে জিজ্ঞেস করায় ভুতো অম্লানবদনে বলল সে টেস্ট পেপারে কোনও এক স্কুলের ইংরাজি প্রশ্নপত্রে সেটা পেয়েছে। স্যার বহুক্ষন মাথা ঘামিয়েও বঙ্কিমভাষা উদ্ধার করতে না পেরে বললেন যে এক দুদিন পরে অনুবাদ করে এনে দেবেন। সেই এক দুদিন পরটা যদিও আর আসেনি, তবে এরপর থেকে উনি অন্তত আমাদের ক্লাসে ট্র্যান্সলেসন নিয়ে জ্ঞাণ দেওয়াটা কমিয়ে দিয়েছিলেন।

 

আমাদের আরেকজন স্যার ছিলেন পরিতোষবাবু। টিফিনের ঠিক আগের পিরিয়ডটায় অঙ্ক পড়াতেন আমাদের ক্লাসে। নিপাট অঙ্কপাগল ভালোমানুষ। অঙ্ক কষতে অসম্ভব ভালবাসতেন। নিজেই অনুশীলনীর একটার পর একটা অঙ্ক ব্ল্যাকবোর্ডে কষতে থাকতেন আর বলতেন, “আহা কি সুন্দর  অঙ্ক, দেখ দেখ কি ভাবে করছি। খাতায় টুকে নাও।” আমরা তাঁর পিছনে তাঁর করা অঙ্ক খাতায় টুকছি না কাটাকুটি খেলছি, সেদিকে ওনার ভ্রূক্ষেপই ছিল না। তাঁর সবই ভাল, খালি অঙ্ক করতে শুরু করলে তাঁর আর সময়ের খেয়াল থাকত না। আমাদের ক্লাসের অন্য সেকশনেও উনিই অঙ্ক করাতেন। কিন্তু সেটা সেকেন্ড পিরিয়ডে। ফলে পিরিয়ড শেষ হয়ে গেলে যখন থার্ড পিরিয়ডের স্যার চলে আসতেন, তখন অনিচ্ছাসত্ত্বেও উনি অঙ্ক কষা বন্ধ করতে বাধ্য হতেন। আমাদের বেলায় সেটা হত না। যেহেতু টিফিনের আগের পিরিয়ডটায় উনি আসতেন, তাই টিফিনের ঘণ্টা পড়ে গেলেও ওনার অঙ্কতৃষ্ণা মিটত না। এদিকে আমাদের হত মহা বিপদ। জানলা দিয়ে দেখতাম বাকী ছেলেপুলেরা মাঠে নেমে বল পেটাচ্ছে, আর আমরা হতাশ হয়ে বসে স্যারের অঙ্ক করা দেখছি। মাঝে মাঝে কেউ যদি সাহস করে বলে ফেলত যে টিফিন টাইম হয়ে গেছে, স্যার বলতেন, “ঠিক আছে, তোমরা টিফিন খেতে খেতেই দেখ আমি কিভাবে অঙ্কগুলো করি।” কিছুক্ষণ পরে অতিষ্ঠ হয়ে আবার তাড়া দিলে স্যার বলতেন, “এই তো আর দুই মিনিট।” তখন তো আমাদের আর হাতে ঘড়ি থাকত না, সেই দু মিনিটটা বেড়ে গিয়ে পাঁচ মিনিটে দাঁড়াত। আবার তাড়া দিলে উনি আরও দুই মিনিট চাইতেন। এভাবে দুই মিনিট দুই মিনিট করতে করতে কুড়ি মিনিট টিফিন টাইমের সিংহভাগ শেষ করে যখন উনি তৃপ্ত মনে হাসি মুখে ক্লাস ছাড়তেন, ততক্ষণে বাকী ক্লাসের ছেলেরা বেদম দৌড়ঝাঁপ করে হাঁপাতে হাঁপাতে ক্লাসে ফিরে এসেছে। একদিন উনি এরকম প্রথমবার দুই মিনিট সময় চেয়ে নিয়ে মনের সুখে অঙ্ক করছেন বোর্ডে, হঠাৎ শুনতে পেলাম অ্যালার্ম ঘড়ির আওয়াজ। কি হল খোঁজ নিয়ে দেখা গেল ভুতো একটা অ্যালার্ম ক্লক নিয়ে এসেছে, আর স্যার দুই মিনিট সময় চাওয়ায় ঠিক দুই মিনিট পরে তাতে অ্যালার্ম দিয়ে বসে আছে। স্যার আরও একবার দুই মিনিট সময় চাইলেন। আবার দুই মিনিট পর অ্যালার্ম বেজে উঠল। এভাবে আরও এক বার দুবার অ্যালার্ম বাজায় স্যার নিজেই বাধ্য হয়ে সেদিন তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিলেন আমাদের।

 

সম্ভবত স্কুলে সবচেয়ে বড় ঘটনাটা ভুতো ঘটিয়েছিল ইলেভেনে পড়ার সময়। আমাদের স্কুলে দুজন কেমিস্ট্রির সাবজেক্ট টিচার ছিলেন। শৈলেনস্যার আর পবিত্রস্যার। এদের মধ্যে একটু ক্ষারাক্ষারি ছিল। দুজনেই প্রাইভেটে পড়াতেন এবং শৈলেনস্যার পবিত্রস্যারের কাছে যে সব ছাত্ররা পড়ত তাঁদের পছন্দ করতেন না। এই ব্যাপারটা সবারই জানা ছিল। প্রত্যেক ব্যাচেই এই দুজনের মধ্যে শৈলেনস্যারের কাছেই কম স্টুডেন্টরা পড়ত। এতে তাঁর গাত্রদাহটা আরও বেড়ে যেত। যদিও এর প্রতিশোধটা উনি তুলতেন পরীক্ষার প্রশ্ন করার সময় আর খাতা দেখার সময়, তাও এটাকে সবাই ইগ্নোরই করত। কারণ শেষ পর্যন্ত বোর্ডের পরীক্ষায় তো আর ওনার কোনও জারিজুরি খাটত না। সে যাই হোক, একবার শৈলেনস্যার আমাদের ক্লাস নিচ্ছেন। হঠাৎ উনি আমাদের ক্লাসের ফার্স্টবয় সুদীপ্তর ওপর খাপ্পা হয়ে তাকে ধমকাতে শুরু করলেন। কারণ আর কিছুই নয়, ক্লাস চলাকালীন সে কেমিস্ট্রি বই খুলে কিছু একটা পড়ছিল। স্যার তাকে যা নয় তা বলে বকাবকি শুরু করলেন যে সে নাকি ক্লাসে উনি কি পড়াচ্ছেন সেটা মিলিয়ে দেখছে, সন্দেহ করছে যে স্যার ঠিকঠাক পড়াচ্ছেন কি না, এরকম হলে পড়ানোর ছন্দ কেটে যায়, এটা খুব বাজে স্বভাব ইত্যাদি ইত্যাদি। সুদীপ্ত যতই তাকে বোঝাতে যায় যে না, উনি যেটা ভাবছেন সেটা ঠিক নয়, স্যার ততই ক্ষেপে গিয়ে এর ফলে তাঁর অসম্মান হয়েছে এই বলে সুদীপ্তকে উত্তাল ঝেড়ে গেলেন। এটা বুঝতে কারোরই অসুবিধা হচ্ছিল না যে সুদীপ্তর ওপর ওনার রাগের আসল কারণ হল, সুদীপ্ত ওনার কাছে না পড়ে পবিত্র স্যারের কাছে পড়ে। উনি শুধু শুধু একটা তুচ্ছ অজুহাতে ওর ওপর নিজের অন্য রাগটা ঝেড়ে দিলেন। ব্যাপারটা সেদিন কোনও মতে মিটে গেলেও দু একদিন পর সোমবার স্কুলে এসে দেখি বিভিন্ন জায়গায় দেয়ালে দেয়ালে, নোটিশ বোর্ডের পাশে, প্রত্যেকটা থামে একটা জেরক্স করা পাতা সাঁটা। তাতে একটা ছোট ছড়া লেখা। আজকে দাঁড়িয়ে যতদূর মনে পড়ছে ছড়াটা এরকম -

 

শৈলেন কইলেন
বই কর বন্ধ।
বই খোলা থাকলে যে
মনে জাগে দ্বন্দ।।
ক্লাসে বই খুললে হে
চোখে লাগে ধন্দ
লেকচারে মন দাও,
পাবে যে আনন্দ।।
পড়াই ঠিক না ভুল,
হচ্ছে কি সন্দ?
ভাল নয়, এ স্বভাব…
একেবারে মন্দ।।

 

আমরা দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম এটা ভুতো ছাড়া আর কারোর কাজ হতেই পারে না। কিন্তু এটা নিয়ে ছাত্র আর শিক্ষকমহলে ফিসফাস আলোচনা চালু হয়ে গেল। আসল ঘটনাটা জানা না থাকলেও কার উদ্দেশ্যে লেখা এটা বুঝতে কারোরই সমস্যা হল না। আমাদের বায়োলজি পড়াতেন অশোকস্যার। বয়সে উনি খুব আমাদের চেয়ে একটা বড় ছিলেন না। আমাদের সাথে বন্ধুর মতই মিশতেন। উনি সেদিন আমাদের ক্লাস নিতে এসে সরাসরি বললেন যে টিচাররা ভালো ভাবেই বুঝতে পেরেছেন এটা কার লেখা। খালি ওরা জানতে চান আসল ঘটনাটা কি। স্যার কথাও দিলেন যে ব্যাপারটা ওঁকে খুলে বললে পাঁচ কান হবে না। আমরা সবাই চুপ করে আছি। শেষ পর্যন্ত ভুতো উঠে দাঁড়িয়ে স্বীকার করল যে এটা ওরই কাজ। সে ছড়াটা লিখে সেটার ফটোকপি করে আগের দিন সন্ধ্যেবেলা এসে স্কুলে সেঁটে দিয়ে গেছে। কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সে এই কাণ্ডটা ঘটিয়েছে সেটাও খুলে বলল। টিচারদের মধ্যে শৈলেনবাবুর জনপ্রিয়তা সাদ্দাম হুসেনের ইরাকে সিনিয়র বুশের জনপ্রিয়তার চেয়ে খুব একটা বেশী ছিল না। তাই শৈলেনবাবু জব্দ হওয়ায় মুখে কেউ কিছু না বললেও মনে মনে প্রত্যেকেই বেশ খুশীই হল।

 

খালি স্কুলে নয়, আমাদের পাড়াতেও ভুতো নানা ধরণের কাণ্ড কারখানা ঘটাত। আমাদের পাড়ায় একজন প্রচণ্ড খিটখিটে বদমেজাজী দাদু ছিল, নাম গণেশ মাইতি। তাঁর ছেলে বাইরে কোথাও চাকরী করত। দাদু স্ত্রীকে নিয়ে মস্ত বাড়িতে একা একা থাকতেন আর পাড়ার সবার সাথে ঝগড়া করতেন। পাড়ার মা মাসীরা তখন ভোরবেলা এর ওর বাড়ি থেকে পুজোর ফুল সংগ্রহে বেরোতেন, দাদুর বাড়িতে ভুল করে ফুল নিতে ঢুকে পড়লে দাদু তাঁদের সাথে ঝগড়া করতেন। প্রতিদিন বিকেলে পাড়ার কলে কর্পোরেশনের জল আসত, প্রত্যেকের বাড়ি থেকে সেই জল নেবার জন্যে লাইন দিতে হত। দাদু রোজ সেই জলের লাইনে দাঁড়িয়ে ঝগড়া করতেন। মাসে দুমাসে তুমুল ঝগড়া করে বাড়ির কাজের লোককে তাড়াতেন। তো সেই দাদু একবার কালীপুজোর চাঁদা চাইতে যাওয়ায় আমাদের বিনা কারণে প্রচুর বকাবকি করে ভাগিয়ে দিয়েছিলেন। এক টাকাও চাঁদা ধরাননি। ভুতো শুনে খুব ক্ষেপে গেল। আমাদের বলল কৌটো যোগাড় করে আনতে। আমরা সবাই বাড়ি থেকে আমুল স্প্রে জাতীয় কিছু কৌটো নিয়ে এলাম। এবার কালীপূজোর দিন ভুতো বুড়িমার দশ বারোটা চকলেট বোমের সলতেয় ধূপকাঠি লাগিয়ে টাইম বোম তৈরি করল। এক একটা চকলেট বোমে এক এক সাইজের ধূপকাঠি। এবার রাত বেশ গভীর হবার পর চারিদিকে যখন বোম ফাটানো প্রায় শেষের পথে, তখন সেই টাইম বোমগুলোয় আগুন ধরিয়ে, আমূল স্প্রের কৌটোয় রেখে দাদুর বাড়ির পাঁচিল টপকে ঢুকে দাদুর শোবার ঘরের জানালার আসে পাশে স্ট্র্যাটেজিক্যালি প্লেস করে এল। তখন শব্দবাজী আজকের মত নিষিদ্ধ ছিল না। বুড়িমার চকলেট বোম এমনিতেই প্রচণ্ড আওয়াজ করে ফাটত। সেটা আবার কৌটোর মধ্যে রাখলে শব্দটা প্রায় দ্বিগুন হয়ে যেত। দাদুর বাড়ির পাশের বাড়িতে থাকত চঞ্চলদা। কলেজে পড়ত। অনেক রাত অব্দি জেগে পড়াশোনা করত। সেই চঞ্চলদার কাছে পরের দিন শুনেছিলাম সেদিন রাত দেড়টা থেকে আড়াইটে পর্যন্ত নাকি বোম ফেটেছিল। পাশের বাড়িতে চঞ্চলদাই নিশুতি রাতে পাঁচ দশ মিনিট অন্তর অন্তর বোম ফাটার সেই আওয়াজে চমকে চমকে উঠছিল তো শোবার ঘরের পাশে সেই আওয়াজে সেই রাতে দাদুর ঘুম কেমন হয়েছিল সেটা পরের দিন দাদুর মুখ দেখেই ভাল মালুম পড়েছিল।

 

সুবীরজেঠার বাড়িতে ছিল প্রচুর ফলের গাছ। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লিচু কি নেই। কিন্তু লোকটা ছিল হাড়কিপ্টে। কোনদিন পাড়ার কাউকে সেসব ফল খেতে দিত না। নিজেরাও অত ফল খেতে পারত না, গাছেই নষ্ট হত। তাও লুকিয়ে লুকিয়ে পাড়তে গেলে তেড়ে আসত। একদুপুরে হঠাৎ খবর পেলাম জেঠা পুরো ফ্যামিলি সহ বাড়িতে তালা মেরে দুদিনের জন্যে কোথায় জানি বেড়াতে গেছে। ব্যাস, আমাদের আর পায় কে? ভুতোর নেতৃত্বে সেদিন বিকেলেই পাঁচিল টপকে ঢুকলাম জেঠার বাড়ি। কিন্তু হা হতোস্মি। প্রত্যেকটা গাছ দুদিন আগে অব্দি ফলে ভরা ছিল, গিয়ে দেখি সব খাঁ খাঁ করছে। জেঠা লোক ডেকে সব ফল পাড়িয়ে ঘরে রেখে তালা বন্ধ করে বেড়াতে গেছে। প্রচণ্ড হতাশ হয়ে কি করব ভাবছি, হঠাৎ কে একটা বুদ্ধি দিল বাড়ির পিছন দিকে যাবার। সেখানে জেঠার সবজি ক্ষেত। সেখানে দেখলাম বেগুনক্ষেতে বেশ দু তিনটে নধরকান্তি বেগুন ফলে রয়েছে। আমরা কিছু না পেয়ে ঠিক করলাম ওই বেগুনগুলোই পেড়ে নিয়ে বেগুনি খাওয়া হবে। কিন্তু বেগুন তো আর এমনি এমনি বেগুনি হয়ে যাবে না, বাড়িতে নিয়ে গেলে বেগুনির বদলে জুটবে ঠ্যাঙ্গানি। কি করা যায়? সবাই মিলে ঠিক করলাম স্টেশনের বাইরে হারুদার চপের স্টল। ওই বেগুনগুলো নিয়ে গিয়ে হারুদাকে বলব ভেজে দিতে। কাঁচামাল আমরা সরবরাহ করছি, তাই হারুদা নিশ্চয়ই টাকা চাইবে না। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। কাঁটার খোঁচা খেয়ে কোনোমতে দু তিনটে বেগুন পেড়ে আমরা হাজির হলাম হারুদার স্টলে। বুঝিয়ে শুনিয়ে হারুদাকে রাজী করানো গেল। আমাদের আনন্দ আর ধরে না। এমন সময় হারুদা বলল, “বেসন কই?” আমরা পড়লাম আকাশ থেকে। বেগুনি খেতে হলে যে বেগুন ছাড়া বেসনেরও দরকার সেটা তখন আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে কুলোয়নি। কি করা যায়? হঠাৎ মনে পড়ল আমাদের বন্ধু রামুর বাবার মস্ত মুদির দোকান বাজারে। রামুও ছিল আমাদের দলে। কিন্তু তাকে সাধতেই সে এক বাক্যে না করে দিল। ওর বাবা ভয়ানক রাগী। বেসন চাইতে গেলেই কারণ জানতে চাইবেন। তখন বিপদের সমূহ আশঙ্কা। শুধুমাত্র রিসোর্সের অভাবে আমাদের এত সুন্দর প্রোজেক্টটাই স্ক্র্যাপ হয়ে যেতে বসেছে। অনেক বোঝানোর পর শেষ পর্যন্ত রামু আর আরেকটা বন্ধু কে পাঠানো হল ওর বাবার দোকানে। প্ল্যান হল দোকানে রামুর বাবা যদি না থাকে, তাহলে কোনও এক কর্মচারীকে বলে চেয়ে চিনতে একটু বেসন আনা। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে রইলাম। কিছুক্ষণ পরে ওরা দুজন বিজয়ীর মতন হাসি মুখে ফিরে এল। বেসন যোগাড় হয়েছে। আমরা প্রচণ্ড খুশীতে চিৎকার চেঁচামেচি জুড়ে দিলাম। ভুতো তো আবার আনন্দে নাচতে নাচতে গানই জুড়ে দিল, “বেসন তো এসে গেছে!” আমাদের উল্লাস আর চিৎকার চেঁচামেচিতে আসে পাশের সবাই কৌতূহলী হয়ে আমাদের দিকে দেখছে। হঠাৎ দেখতে পেলাম আমাদেরই বয়সী অপরিচিত একটা ছেলে রাস্তার ওপার থেকে ভুতোর নাচ গান দেখে অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে আর কি যেন একটা ভাবছে। বোধহয় ছেলেটার সাথে ওর আরেকটা বন্ধুও ছিল। সে দু পা এগিয়ে গিয়ে যখন দেখল ছেলেটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাঁ করে ভুতোর গান শুনছে, একটু বিরক্ত হয়েই ডাকল, “কি রে অনুপম, আয়! দাঁড়িয়ে রইলি কেন।” বলতেই ছেলেটা যেন সম্বিত ফিরে পেয়ে, “হ্যাঁ হ্যাঁ, আসছি।” বলে পা চালাল। কিন্তু যেতে যেতেও দেখি মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে ভুতোকে দেখছে। কি যে মাথামুণ্ডু এত ভাবছিল ভগবানই জানে। ততক্ষণে হারুদা বেগুনি বানানোর তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে। আমিও তখন এই তুচ্ছ ব্যাপারটায় অত গুরুত্ব না দিয়ে বেগুনির প্রতি মনোযোগ দিলাম।

 

ফিচকেমি করার সময় ভুতো বড়ছোটর ভেদাভেদ মানত না। একবার এক ছুটির দিনে আমরা কয়েকজন পাড়ার রবিদার ফার্মেসির সামনে আড্ডা মারছি। বলাই বাহুল্য ভুতোও আছে আমাদের সাথে। এমন সময় পাড়ার পরিমলজ্যেঠু হন্তদন্ত হয়ে এলেন। উনি পাড়ার একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ। আমাদের বাবা কাকারাও ওনাকে শ্রদ্ধা করেন। তো জ্যেঠু এসে হাঁপাতে হাঁপাতে রবিদাকে বললেন, “রবি তাড়াতাড়ি একপাতা এন্টারোকুইনল দে তো বাবা, অবস্থা খুব খারাপ।” রবিদা চটপট ওষুধ খুঁজতে খুঁজতে জানতে চাইল কি ব্যাপার। জ্যেঠু জানালেন আগের রাতে এক বিয়েবাড়ির ভোজ সাঁটিয়ে তাঁর অবস্থা সঙ্গিন। বাঁ হাতের জল শুকোনোর সময় পাচ্ছে না। কোনোমতে এক ফাঁকে লুঙ্গি পড়া অবস্থাতেই ছুটে এসেছেন ওষুধ নিতে। রবিদা ওষুধ দিয়ে দামটা বুঝে নেবার ফাঁকে হঠাৎ ভুতো বলে উঠল, “জ্যেঠু আপনি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ নিচ্ছেন! জানেন না সমস্ত অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ বেআইনি ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে?” বলেই জ্যেঠুকে আড়াল করে আমাদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। জ্যেঠু ছিলেন একটু বোকাসোকা মানুষ। আইনের ব্যাপারে একেবারে আইনস্টাইন। তিনি অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, “সে কি? কেন?” ভুতো তখন জানাল যে পার্লামেন্টে নাকি এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে সাইড এফেক্ট হয় বলে সব অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ ব্যান করে দেওয়া হবে। আমরা ততক্ষণে বুঝে গেছি ভুতোর মাথায় কিছু একটা দুষ্টু বুদ্ধি এসেছে। তাই মজা দেখার আশায় আমরা মুখ টিপে হাসছি। রবিদা একটু প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু ভুতো ইশারায় তাকেও থামিয়ে দিল। জ্যেঠু কিন্তু সরল মনে কথাটা বিশ্বাস করে জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে কি করব? আমার এরকম অবস্থা।” ভুতো বিজ্ঞের মত বলল, “একটা কাজ করুন। অনেক সহজ কিন্তু অব্যর্থ উপায়। ঘরে গিয়ে প্রথমেই দুই তিন গ্লাস জল খেয়ে নিন।”

 

– “জল খাব?” পেটের এরকম অবস্থায় জল খেতে বলায় জ্যেঠু আরও অবাক হল।

 

– “হ্যাঁ। জল খাবেন।” বলে হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুল এক ইঞ্চি মত ফাঁক করে বলল ভুতো, “এবার জল খেয়ে যখন পেট ভরে যাবে তখন এই সাইজের একটা আস্ত সুপুরি নেবেন।”

 

– “সুপুরি!!” জ্যেঠুর চোখদুটো তখন ওই সুপুরির থেকেও বড় বড় হয়ে গেছে। আমরাও ভেবে কুল কিনারা পাচ্ছি না ভুতো কি বলতে চলেছে।

 

–  “হ্যাঁ, এবার আরেক গ্লাস জল দিয়ে টপ করে আস্ত সুপুরিটা গিলে ফেলবেন।” আমাদের সবার হতভম্ব অবস্থাকে পাত্তা না দিয়ে নির্বিকার ভাবে নিজের নিদান শেষ করল ভুতো, “পেট জলে ভর্তি তো। একটু নড়ে চড়ে ঠিকঠাক সেট করে নেবেন। সুপুরিটা জলে ডুবতে ডুবতে একেবারে ঠিক জায়গায় গিয়ে বসে পড়ে সব আটকে দেবে। ব্যাস কাজ হয়ে যাবে।”

 

আমাদের দুই এক সেকেন্ড লাগল ব্যাপারটা বুঝতে। তারপরেই বড় ছোট তোয়াক্কা না করে সবাই হো হো করে হাসতে শুরু করলাম। জ্যেঠু ওই অবস্থাতেই, “হতচ্ছাড়া, আমার সাথে মশকরা!” বলে নিজের পায়ের চপ্পলটা খুলে ভুতোকে মারতে গেলেন। ভুতো ততক্ষণে এক লাফে রাস্তায় নেমে পগার পার।

 

ভুতোর উপস্থিত বুদ্ধি ছিল মারাত্মক। একটা ঘটনা বলি। তখন আমাদের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে। কোলকাতা থেকে আমাদের বন্ধু ধ্রুবর এক ভাই বেড়াতে এসেছে। নাম প্রত্যূষ, আমাদেরই বয়সী। সেও উচমাধ্যমিক দিয়ে মফস্বলে পিসির বাড়ি বেড়াতে এসেছে। তফাতটা হল আমরা সবাই বাংলা মিডিয়ামের ছাত্র আর সে কোলকাতার নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের স্টুডেন্ট। প্রথম দিনই সে ধ্রুবর সাথে আমাদের আড্ডায় এল পিঠে একটা গিটার নিয়ে। মিউসিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টের মধ্যে আমাদের দৌড় তখন ওই হারমোনিয়াম তবলা পর্যন্ত। বই আর টিভির পর্দা ছাড়া চর্মচক্ষে কোনদিন গিটার দেখার সৌভাগ্য হয়নি। রীতিমত অবজ্ঞার স্বরে সে আমাদের জানাল যে সে নাকি কোলকাতায় তার বন্ধুদের নিয়ে তৈরি করা একটা রকব্যান্ডের লীড ভোকাল। মাঝে সাঝেই এদিক সেদিক প্রোগ্রাম টোগ্রাম করে থাকে আর তারা ইংরাজি গানই গায়। প্রত্যেক কথাতেই তার মফস্বলের আর আমাদের প্রতি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য প্রকাশ পাচ্ছিল। তার এই হাম বড়াই ভাব বেশীক্ষণ সহ্য না করতে পেরে হঠাৎ ভুতো বলে বসল যে ইংরাজিতে গান গাওয়া কি আর এমন ব্যাপার। সে তো আমরাও গাইতে পারি। শুনেই প্রত্যূষ বলল, “তাই নাকি? তোমরা ইংরাজি গান গাইতে পার? গাও দেখি।” কথা নেই বার্তা নেই ভুতোও চ্যালেঞ্জটা পট করে অ্যাকসেপ্ট করে বলে বসল, “আগে তুমি গাও। তারপর আমরা গাইব।” আমরা তখন ভাবছি এবার কেসটা খেলাম বলে। আমাদের তখন ইংরাজি জ্ঞান বলতে শুধু পরীক্ষার জন্যে শেখা কিছু এসে আর প্রশ্নোত্তর। পেটে বোম মারলেও এক লাইন ইংরাজি বেরোবে কিনা সন্দেহ, সেখানে ভুতো বলছে ইংরাজি গান গাইতে পারে। এম টিভি আর চ্যানেল ভি-র দৌলতে তখন সবে আমরা একটু একটু করে ইংরাজি গান লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে শুরু করেছি। কিন্তু প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সেই সব ইংরাজি গান গাওয়া আর পার্থের পিচে ম্যাকগ্রার বাউন্সার সামলে সেঞ্চুরি করা আমাদের কাছে একই রকম ব্যাপার। নাকটা পুরোপুরি কাটা যাবার আগে আমরা মানে মানে কেটে পড়ার তাল করছি, এমন সময় দেখি প্রত্যূষ দিব্যি গিটার বাজিয়ে গান ধরল। আমরা অবাক হয়ে শুনছি আমাদেরই বয়সী একটা ছেলে ইংরাজিতে গান গাইছে। মানে মাথা কিছু বুঝতে পারছি না, তবে ইংরাজিতে যে গাইছে সেটা বুঝতে আসুবিধা হচ্ছে না। আড়চোখে দেখলাম ভুতো মন দিয়ে গান শুনছে আর তালে তালে মাথা নাড়ছে। সেটা দেখে আমার গা পিত্তি আরও জ্বলে গেল। কি দরকার ছিল আগবাড়িয়ে রাস্তায় রাখা কুড়ুলের ওপর গিয়ে যেচে পা ফেলার? যথাসময়ে গান শেষ হলে প্রত্যূষ গিটারটা ভুতোর দিকে এগিয়ে দিল। ভুতো গম্ভীর মুখে গিটারটা নিয়ে কিছুক্ষণ টুং টাং করে বাজাল। তারপরে গিটারটা ফেরত দিয়ে বলল, “এটা লাগবে না। খালি গলাতেই গাইছি।” আমরা তখন শুধু শুধু বেড়ে পাকামি করে নিজেকে এবং সাথে সাথে আমাদেরও অপদস্থ করার জন্যে মনে মনে ভুতোর মুণ্ডুপাত করে চলেছি। এমন সময় ভুতো এক দুবার গলাখাঁকারি দিয়ে আচমকা তারসপ্তকে গান ধরল, “ব্রাজিল! লা লা লা লা লা লা লা লা!” নব্বই দশকের শেষ দিকে রিলিজ হওয়া ভেঙ্গাবয়েজ ব্যান্ডের এই গানটা যারা শোনেনি তাদের উদ্দেশ্যে জানাই এই পুরো গানটায় ‘ব্রাজিল’ আর ‘লা লা লা লা’ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। টেকনিক্যালি এটা ইংরিজি গানই বটে। অবশ্য ইংরাজি কেন, এই গানটাকে বাংলা, ল্যাটিন, গ্রীক, হিব্রু যে কোনও ভাষার গানই বলা যায়। যাই হোক ভুতোর এই গান শুনে শেষ পর্যন্ত প্রত্যূষও হেসে ফেলল এবং আমাদের সাথে তার ভাব হয়ে গেল। তারপর যে কদিন সে আমাদের শহরে ছিল তার হামবড়াই ভাবটা কিছুটা হলেও কমেছিল।

 

এতক্ষণ ধরে তোমরা যারা ধৈর্য ধরে আমার এই ফালতু বকওয়াস পড়লে, তারা নিশ্চয়ই মনে মনে ভাবছ, ঠিক আছে, বোঝা গেছে যে ভুতো বলে একটা ছেলে ছিল, যার খুব বুদ্ধি, দারুণ রসিক ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তাই বলে এই গল্পের নামটা ‘ভুতো’ না হয়ে ‘মার্শাল ভুতো’ হল কেন? তাহলে কি…? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ। আমাদের প্রত্যেকেরই যেমন ছেলেবেলায় পিতৃদত্ত নাম ছাড়াও একটা করে মিত্রদত্ত নাম থাকত, ভুতোরও সেরকম নাম হল ‘মার্শাল’। বলাই বাহুল্য ‘মার্শাল টিটো’র সাথে মিলিয়ে ভুতোর এই নামটা আমিই দিয়েছিলাম আর ভুতো সহ প্রত্যেকেই অত্যন্ত খুশী হয়ে এই নামটা অ্যাকসেপ্টও করেছিল। যে ঘটনার পর আমি ওকে এই নামটা দিয়েছিলাম সেটাই বলব এবার।

 

ছোটবেলায় আমরা স্টেশন থেকে কিছুদূরে একটা মাঠে খেলতে যেতাম। সেই মাঠটাকে সবাই ফ্যাক্টরির মাঠ বলত। মাঠটার একপাশে একটা জুট মিল ছিল আর সেই কারণেই মাঠটার নাম হয়ে গিয়েছিল ফ্যাক্টরির মাঠ। জ্ঞান হবার পর থেকে যদিও আমি সেই মিলটাকে লক আউট অবস্থাতেই দেখছি, তবুও বড়দের কাছে শুনেছি যে সেটার নাকি এককালে বেশ রমরমা ছিল। লক আউট হয়ে গেলেও, হয়ত অদুর ভবিষ্যতে আবার ফ্যাক্টরি খুলতে পারে এই আশাতেই ফ্যাক্টরির ভিতর যন্ত্রপাতিগুলো কিন্তু সরানো হয়নি। তাই বন্ধ থাকলেও ফ্যাক্টরির গেটে সবসময়ই পাহারা দেবার জন্যে কোনও না কোনও দারোয়ান মজুত থাকত। যাই হোক সেই ফ্যাক্টরির মাঠটার একদিকে ছিল সেই ফ্যাক্টরিটা, আর এক পাশে স্টেশনে যাবার রাস্তা, উল্টোদিকে ছিল রেল লাইন, আর অন্য দিকটাতে ছিল কিছু পানাপুকুর আর আগাছাভরা, পরিত্যক্ত খালি জমি। রেল লাইনটা ক্রস করলে কিছুদুর গিয়ে একটা ইঁটভাঁটা। আর তার পিছনে একটা ছোট খালের পাশে শ্মশানঘাট। বেশ নির্জন জায়গাটা, কাছাকাছির মধ্যে মানুষের বসবাস অতটা ছিল না, ফলে সেই মাঠে দাপাদাপি করে খেলতে আমাদের বেশ মজাই হত। ক্লাস সিক্স সেভেন থেকে ইলেভেন টুয়েলভ অব্দি আমরা বিভিন্ন বয়সের ছেলেরা ওই মাঠে খেলেই বড় হয়েছি।

 

আমরা তখন ক্লাস এইটে পড়ি, অ্যানুয়াল পরীক্ষার কিছুদিন বাকী, এমন সময় একদিন বিকেলে খেলতে এসে দেখলাম, ফ্যাক্টরির দারোয়ান চেঞ্জ হয়ে গেছে। আগে যে দারোয়ানটা ছিল, সে বেশ ভালোমানুষ গোছের ছিল। পরিবার নিয়ে ফ্যাক্টরির বাইরে ছোট্ট ঘরটায় থাকত। কোনও কারণে সে চলে গেছে, তার জায়গায় এসেছে আরেকটা দারোয়ান। বিহারি, বয়স খুব বেশী না। একদম রাম গড়ুরের ছানা। মুখে একফোঁটা হাসি নেই। সারাক্ষণ গোল গোল চোখদুটোকে পাকিয়ে এদিক ওদিক সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে। সাথে মনে হল কেউ নেই, একাই এসেছে। কেন জানি না প্রথম দর্শনেই আমাদের কারোরই একটুও পছন্দ হল না লোকটাকে।

 

এক দুদিনের মধ্যেই আসল বিপদটা টের পাওয়া গেল। আমাদের মধ্যে পল্টু ছিল বেশ মোটাসোটা। পিঞ্চ হিটার হিসেবে ব্যাট করত। সেদিন জীবনদার লোপ্পা ফুলটসে এমন জোরে হাঁকড়ালো যে বল মাঠ ছাড়িয়ে পাঁচিল টপকে সোজা ফ্যাক্টরির ভিতরে। এটা এমন কিছু নতুন ব্যাপার ছিল না। মাঝে মধ্যেই ক্রিকেট বল বা ফুটবল পাঁচিল টপকে ফ্যাক্টরির ভিতরে গিয়ে পড়ত। তখন ফ্যাক্টরির দারোয়ানকে বললে হয় সে বল খুঁজে এনে দিত, অথবা আমাদের দু তিনজনকে ভিতরে ঢুকতে দিত বল খুঁজে আনার জন্যে। আমাদের নিয়ম ছিল যে বলটা ভিতরে ফেলবে সে যাবে বল আনতে। আরও একজন দুজনও মাঝে মাঝে সাথে যেত। প্রথামত পল্টু আর বাউন্ডারী লাইনে যে দুএকজন ফিল্ডিং করছিল তারা গিয়ে দারোয়ানকে বলল বলটা এনে দিতে বা গেটটা খুলে দিতে। কিন্তু ও হরি, নতুন দারোয়ানটা সটান মানা করে দিল। বলল নাকি গেট খোলার হুকুম নেই। ওদের আসতে দেরী দেখে একে একে আমরা প্রত্যেকে হাজির হলাম ফ্যাক্টরির গেটে। আমরা বার বার চেষ্টা করলাম লোকটাকে বোঝাতে যে আমরা বলটা খুঁজে নিয়েই চলে আসব। এরকম আগেও আমরা বল আনতে ভিতরে গেছি। কিন্তু ভবি ভোলবার নয়। যতই বোঝাই ওর সেই এক বাঁধা বুলি, “হুকুম নেহি হ্যাঁয়।” আমরা বললাম তুমি গিয়ে খুঁজে এনে দাও তাহলে। তাতেও রাজী হল না সেই গোঁয়ার গোবিন্দ। পাঁচিলের গায়ে কাঁচের টুকরো, পেরেক এসব বসানো। তাই পাঁচিল টপকানোরও উপায় নেই। বিফলমনোরথ হয়ে আমরা সেই নতুন দারোয়ানটার উদ্দেশ্যে নতুন শেখা কিছু বাছা বাছা বিশেষণ প্রয়োগ করতে করতে ফিরে এলাম। তখনকারদিনে একটা কুড়ি টাকা দামের ক্যাম্বিস বল কেনার জন্যেও আমাদের নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলতে হত আর বাড়িতে সেই পার হেড এক টাকা বা দু টাকা চাঁদা চাইতে অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হত। তাই বলের অভাবে সেদিনে সন্ধ্যে হবার অনেক আগেই আমাদের খেলা শেষ হয়ে গেল।

 

যাই হোক পরের দিন কোনও ভাবে আর একটা বল যোগাড় করে আমরা আবার খেলা শুরু করলাম। তবে এবার একটু সতর্ক ভাবে। বিগ হিটসের লোভ সামলে রানিং বিটউইন দ্য উইকেটস আর ফাইন্ডিং দ্য গ্যাপসে মন দিলাম আমরা। কিন্তু আবার দু এক দিন পর সেই একই ব্যাপার। সেই জীবনদার একটা শর্ট পীচ বল, পল্টুর হুক, আর বলটা আবার পাঁচিল টপকে ফ্যাক্টরির ভিতরে। শুধু পার্থক্য এবারে আর উড়ে নয়, একটা ড্রপ খেয়ে। পরের চিত্রনাট্যটাও একই রকম। দল বেঁধে আমাদের দারোয়ানের কাছে নানা রকম অনুরোধ উপরোধ, আর দারোয়ানের সেই এক জবাব, “হুকুম নেহি হ্যাঁয়।”

 

একে তো এরকম ঝামেলা। তার ওপর অ্যানুয়াল পরীক্ষাও এসে গিয়েছিল। হতাশ হয়ে আমরা ফ্যাক্টরির মাঠে খেলতে যাওয়াই ছেড়ে দিলাম। পাড়াতেই ছোট একটা মাঠে ছোট পীচে হাত না ঘুরিয়ে ছুঁড়ে বল করে ক্রিকেট খেলা শুরু করলাম। এক দেড় মাস পরে অ্যানুয়াল পরীক্ষা শুরু হল আর যথাসময়ে শেষও হয়ে গেল। আমাদের ফুটবল সিজন শুরু হবার সময় এসে গেল। ফুটবল খেলতে হলে ভরসা আবার সেই ফ্যাক্টরির মাঠ। মাঝে বেশ কিছুদিন এদিকে না আসায় ভেবেছিলাম, দারোয়ানটা হয়ত এতদিনে চেঞ্জ হয়ে যাবে। কিন্তু দেখলাম সেই ব্যাটাই বহাল তবিয়তে গেঁড়ে বসেছে। আমরা ভয়ে ভয়ে খেলা শুরু করলাম। এক দুই সপ্তাহ কোনও উপদ্রব ছাড়াই খেলা হল। কিন্তু তারপর আবার সেই এক গল্প। আবার বল গিয়ে পড়ল ফ্যাক্টরির ভিতরে আর আবার সেই দারোয়ানটা অনেক কাকুতি মিনতি স্বত্তেও আমাদের ভিতরে গিয়ে বলটা খুঁজে আনতে দিল না। রবার ডিউস বা ক্যাম্বিস বলের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা ছিল। কিন্তু তাই বলে ফুটবলের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। আমরা আর পারলাম না সহ্য করতে। বেশ ঝগড়া ঝাঁটিই হয়ে গেল দারোয়ানটার সাথে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বলটা উদ্ধার করা আর সম্ভব হল না। যার বল, সে তো বল হারানোর জন্যে তার বাবার কাছে মার খাবার ভয়ে কাঁদো কাঁদো মুখে বাড়ি ফিরল। আমরা পাড়ার দু একজন কাকা জ্যাঠাদের ডেকে এনেও তাঁদের মধ্যস্থতায় ব্যাপারটার একটা ফয়সালা করানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোনও লাভই হল না। সেই হতভাগা দারোয়ানটাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে এক চুলও নড়ানো গেল না।

 

হতাশ হয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে ভাবেই হোক দারোয়ানটাকে শায়েস্তা করতে হবে। ব্যাটা প্রচুর জ্বালিয়েছে। কিন্তু শায়েস্তা কিভাবে করা যায়। সবাই মিলে ভুতোকে দায়িত্ব দেওয়া হল একটা বুদ্ধি বের করার। ভুতো একটু সময় চেয়ে নিল। দুতিন দিন পর একদিন টিফিনের সময় ভুতো আমাকে বলল যে ওর প্ল্যান রেডি। ওর মুখে সব শুনে আমিও এক কথায় রাজী হয়ে গেলাম। সত্যি, অসাধারণ আইডিয়া, ঠিকঠাক এক্সিকিউট করতে পারলে কেল্লা ফতে। সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না। প্ল্যান মাফিক আমাদের বন্ধুদের মধ্যে বাছাই করা হল ছয় জন তাগড়া ছেলেকে, পল্টু, শ্যামলদা, বিবেকদা, জয়দীপ, সুবল আর জিকো। ঠিক হল রোগা প্যাঁকাটে হলেও কম্যান্ডার জেনারেল হিসেবে ভুতো আর ওর বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে আমিও থাকব এক্সিকিউশন টীমে।

 

প্ল্যানমাফিক পরবর্তী অমাবস্যার রাতে খাওয়া দাওয়ার পর আমরা সবাই হাজির হলাম ভুতোর বাড়িতে। ততদিনে ভ্যাপসানো গরম পড়ে গেছে, যদিও বৃষ্টির দেখা নেই। তার আগের বছর পুজোয় পাড়ায় রবীন্দ্রনাথের ‘বীরপুরুষ’কে নাট্যরূপ দেওয়া হয়েছিল। সেই নাটকে ব্যবহৃত ডাকাত দলের কালো পোষাক যোগাড় করে রাখা ছিল। চটপট সেগুলো পড়ে নিলাম। ভুতো কয়েকটা বীভৎস দেখতে কালো মুখোশও এনে রেখেছিল। সেগুলোও মুখে এঁটে নিলাম। এবার দুগ্গা দুগ্গা বলে আমরা আটজন রওয়ানা দিলাম অপারেশনে। আগে থেকে খোঁজ খবর নিয়ে রাখা ছিল, ছাতুখোরটা রোজ রাতে গাঁজা টেনে ফ্যাক্টরির গেটের সামনে খাটিয়া পেতে ঘুমোয়। সঙ্গে নেওয়া হল একটা হ্যারিকেন ল্যাম্প আর লম্বা একটা লাঠি। অকুস্থলে পৌঁছে দেখলাম দারোয়ানটা সত্যি সত্যি গেটের সামনে এমনভাবে নাক ডাকাচ্ছে মনে হচ্ছে গায়ের ওপর দিয়ে একপাল বাইসন চলে গেলেও টের পাবে না। প্রথমেই লম্বা লাঠিটা দিয়ে টিমটিমে স্ট্রিটলাইট গুলো ভেঙ্গে দেওয়া হল। মেন গেটের গ্রিলের ভিতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ফ্যাক্টরির লাইটটাও নিভিয়ে দিলাম। চারিদিক নিশ্ছিদ্র অন্ধকার তখন। শুধু শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দারোয়ানটার নাসিকা গর্জন।

 

সবাই আগে থেকে ঠিক করে রাখা মতো নিজেদের পজিশন নিয়ে নিলাম। খাটিয়ার দুই পাশে তিন জন করে ছ জন। সামনে হ্যারিকেন হাতে ভুতো আর পিছনে লাঠি হাতে আমি। ভুতো চাপা গলায় ওয়ান টু থ্রি গোনার সাথে সাথে ছটা দামড়া ছেলে একসাথে দারোয়ানটা সমেত খাটিয়াটা কাঁধে তুলে নিল। ভয় ছিল এতে হতভাগাটা যাতে জেগে না যায়। তাহলেই সব মাটি। কিন্তু আমাদের ভাগ্য ভালো লোকটা কিছু টের পেল না, খালি নাক ডাকাটা এক দু সেকেন্ডের জন্যে একটু পাতলা হল। এবার একসাথে সবাই চাপা গলায় ‘বল হরি, হরি বোল’ বলতে বলতে সোজা হাঁটা শুরু করলাম খাটিয়াটা কাঁধে নিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গেট ছাড়িয়ে আমরা নেমে পড়লাম ফ্যাক্টরির মাঠে। আমাদের অভিমুখ আড়াআড়ি মাঠ পার করে রেল লাইনের ওপারে সোজা শ্মশানের দিকে। পনের কুড়ি পা মতো হাঁটার পরে হঠাৎ খাটিয়ার ওপর নড়াচড়ার শব্দ শুনে আড়চোখে তাকিয়ে দেখি মহামান্য ব্যক্তিটির ঘুম ভেঙ্গেছে। ঘাড় তুলে এদিক ওদিক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে ব্যাপারখানা কি? আমাদের হাঁটার গতি সেই দেখে আরেকটু বেড়ে গেল। এক দুই সেকেন্ডের মধ্যেই আমাদের ‘হরি বোল’ ধ্বনির সাথে আরেকটা চাপা একটানা শব্দ যুক্ত হল। দারোয়ানটার রাম নাম। আরও তিন চার পা যেতে না যেতেই আচমকা একটা বিকট চিৎকার করে দারোয়ানটা খাটিয়া থেকে লাফ মেরে নামতে গিয়ে খাটিয়ার দড়িতে পা জড়িয়ে গিয়ে ধপাস করে আছড়ে পড়ল মাঠে। পড়ে গিয়ে সেই একই মোশনে আবার উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আবার আছাড় খেল, এবার পরনের লুঙ্গিতে পা জড়িয়ে। ধস্তাধস্তি করে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে লুঙ্গিটাই গেল খুলে। কিন্তু তাতেও না দমে সে লুঙ্গির মায়া ত্যাগ করে পরিত্রাহি চিৎকার করতে করতে দৌড় লাগাল পিছনের দিকে। আমরা ছাড়া আর কেউ সেই ঘটনার সাক্ষী ছিল না বলে, নাহলে আজ উসেইন বোল্টের জায়গায় হয়ত একে নিয়েই গোটা পৃথিবী মাতামাতি করত। আমরা কোনও মতে হাসি চেপে, খালি খাটিয়াটা মাঠের ওপর ফেলে, রেল লাইন ধরে স্টেশনে এসে অন্য রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

 

পরেরদিন ভয়ে ভয়ে আর ওই মুখো হইনি। তার পরের দিন বিকেলে গিয়ে দেখলাম, ফ্যাক্টরির গেটে তালা ঝুলছে, দারোয়ানটার কোনও পাত্তা নেই। তার আরও দু তিন পরে দেখলাম আরেকটা নতুন দারোয়ান বহাল হয়েছে সেই ফ্যাক্টরিটা পাহারা দেবার কাজে। আমাদের ভাগ্য ভালো ছিল, এই নতুন দারোয়ানটা একেবারেই তার পূর্বসূরির মতন ছিল না।

 

গল্পটা হাসি আনন্দের মধ্যে এখানেই শেষ করে দিতে পারলেই বোধহয় ভালো হত। কিন্তু সেটা করলে, ওই যে অনেক ওপরে বসে থাকেন যে ভদ্রলোক, যিনি আমাদের প্রত্যেকেকে প্রতি মুহূর্তে কড়া নজর রেখে চলেছেন আর নিক্তিতে মেপে আমাদের সবার ভাগ্যে সমান সমান করে সুখ আর দুঃখ ভাগ করে দিয়ে জীবনের ভারসাম্যটা বজায় রেখে চলেছেন, তাঁর প্রতি অবমাননা করা হয়ে যাবে। তাই জাম্প কাট টু বিংশ শতকের শেষ মাস। ওয়াই টু কের আশঙ্কায় আর অপেক্ষায় দিন গুনছে গোটা বিশ্ব। ততদিনে আমি জয়েন্টে ভাল র‍্যাঙ্কিং করে ভর্তি হয়ে গেছি যাদবপুরে। আমাদের শহর থেকে যাতায়াত করা অসুবিধাজনক বলে কোলকাতায় হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করি। ভুতোও হায়ার সেকেন্ডারিতে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হয়েছে কাছাকাছি একটা কলেজে। প্রথমদিকে প্রত্যেক শনি রবিবার বাড়ি চলে এলেও, সেকেন্ড ইয়ারে উঠে আস্তে আস্তে পড়ার চাপ বাড়তে থাকায় আর হোস্টেলে থাকার মজাটা পেয়ে যাওয়ায় মাসে দুমাসে একবার বাড়ি আসতাম। তখন তো মোবাইলের চল ছিল না, তাই ভুতোর সাথে যোগাযোগটা কমে গিয়েছিল। এরকম সময়ে একদিন বাড়িতে ফোনে কথা বলার সময় বাবার কাছে দুঃসংবাদটা পেলাম। ভুতোর বাবা দেবাশিসকাকু একদিন কোলকাতা আসবেন বলে স্টেশনে এসে দেখেন একটা ট্রেন জাস্ট বেরিয়ে যাচ্ছে। উনি সেই দেখে দৌড়ে চলন্ত ট্রেনে উঠতে গিয়ে হাত ফস্কে পড়ে গেছেন ট্রেনের তলায়। প্রাণটা আশ্চর্যভাবে বেঁচে গেলেও ডান হাতটা কনুইয়ের কাছ থেকে কাটা পড়ে গেছে। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল কথাটা শুনে। পরের সপ্তাহে বাড়ি ফিরেই গেলাম দেবাশিসকাকুকে দেখতে। বাড়ির বাইরে ভুতোর সাথে দেখা হল। বলল, “বাবা ট্রেনটার হাতে হাত ধরে চলতে চেয়েছিল, বুঝলি? কিন্তু ট্রেনটার মনে হয় সেটা পছন্দ হয়নি। তাই বাবার হাতটাই নিয়ে চলে গেল।” দেখলাম এত দুঃখের মধ্যেও ভুতোর মুখের হাসিটা অমলিন। শুধু চোখের কোনায় যেন একটু জল চিকচিক করছে।

 

দেবাশিসকাকুর চিকিৎসার জন্যে প্রচুর টাকার প্রয়োজন হয়েছিল। উনি কোলকাতায় একটা প্রাইভেট অফিসে সাধারণ একটা চাকরী করতেন। অফিস থেকে কিছুটা সাহায্য পাওয়া গেলেও সেটা যথেষ্ট ছিল না। তাছাড়া সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও, ওঁর শরীর এই ধাক্কাটা সামলাতে পারেনি। এক বছরের মাথায় উনি মারা যান। এই আচমকা বিপর্যয়ে ভুতোর গ্র্যাজুয়েশনটা আর কমপ্লিট হল না। শুনলাম ভুতো নাকি এদিক ওদিক চাকরীর চেষ্টা করছে। ছুটি ছাটায় তখন বাড়ি এলেও ভুতোর সাথে সাক্ষাৎ খুব বেশী হত না। ইতিমধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ক্যাম্পাসিং-এ চাকরী পেয়ে আমি চলে এলাম ব্যাঙ্গালোরে। দু এক বছরের মধ্যে লং টার্ম অনসাইটে চলে গেলাম ইউ কে-তে। বাবার রিটায়ারমেন্টের পর বাবা মাও কোলকাতায় ফ্ল্যাট করে চলে এল। বিয়ে থা করে লাইফে সেটল করলাম। ভুতোর সাথে যোগাযোগটা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল।

 

বছর দুয়েক আগে হঠাৎ খেয়াল হল কোলকাতার বাইরে এতদিন তো কাটালাম, এবার ঘরের ছেলে ঘরে ফেরা যাক। যেমন ভাবা তেমন কাজ, চলে এলাম কোলকাতা। ভালই কাটছিল জীবন। আমাদের পৈত্রিক বাড়িতে আমার জ্যেঠু, বড়দাদারা থাকত। গতবছর বিজয়ার সময় ঠিক করলাম বৌ বাচ্চা নিয়ে একবার ঘুরে আসব ওখান থেকে। গুরুজনদেরদের প্রণাম করাটাও হয়ে যাবে, বউ বাচ্চাকে একবার ঘুরিয়ে নিয়ে আসাও হবে আমার ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার সাক্ষী শহরটা থেকে। সত্যি অনেকদিন পর ওখানে গিয়ে খুব আনন্দে কাটল দিনটা। দেখলাম কতটা পাল্টে গেছে শহরটা। পুরনো বাড়িগুলো ভেঙ্গে দিয়ে একের পর এক জি প্লাস ফোর ফ্ল্যাটবাড়ি গজিয়ে উঠেছে। দু একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্সও চালু হয়ে গেছে। আমাদের পাড়ার মুখে যে মাঠটায় আগে পুজো হত, সেখানে রেলিং করে একটা শিশু উদ্যান বানানো হয়েছে। বড়দার কাছে শুনলাম পাড়ার আগের সব কাকু জ্যেঠুরা কেউ কেউ আর নেই। কথায় কথায় ভুতোর কথা উঠল। বড়দার কাছে জানতে পারলাম, ভুতো ওদের বাড়িটা একটা প্রোমোটারকে দিয়ে দিয়েছিল। এখন চুক্তি অনুযায়ী সেখানে তৈরি হওয়া অ্যাপার্টমেন্টটায় একটা ফ্ল্যাট পেয়ে সেখানে থাকে। এছাড়াও গ্রাউন্ড ফ্লোরে একটা কমার্শিয়াল স্পেস পেয়ে সেখানে একটা স্টেশনারি দোকান খুলেছে। সারাদিন সে ওই দোকানেই বসে। এছাড়া রোজ সকালে শিশু উদ্যানটাতে পাড়ার কচিকাঁচাদের ক্যারাটে শেখায়। বড়দার কথায় মনে পড়ল কলেজে ভর্তি হবার পর জ্যাকি চ্যানের মুভি দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভুতো বেশ কিছুদিন ক্যারাটে শিখেছিল বটে।

 

সারাদিন খুব আনন্দে কাটিয়ে সন্ধ্যেবেলা যখন বাড়ির বাইরে পার্ক করা গাড়ীতে ওঠার আগে সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি এমন সময় দেখলাম সাইকেল চালিয়ে একটা খুব চেনা মুখ আমাদের দিকে আসছে। এক মুহূর্তের মধ্যে চিনতে পারলাম ভুতোকে। প্রথমে একটু অবাক হয়ে গেলেও ভুতোও আমাকে চিনতে পারল। সাইকেল থেকে নেমে এসে বুকে জড়িয়ে ধরল। বউকে পরিচয় করিয়ে দিলাম আমাদের ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড ভুতোর সাথে। এতদিন পর দেখা হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই কত কথাই না বললাম দুজনে। মিনিট দশ পনের কিভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না। শেষে আবার আসব কথা দিয়ে গাড়ীতে ওঠার আগে ভুতোর হাত দুটো চেপে ধরে বললাম, “ভাল থাকিস রে, ভুতো!” জবাবে ভুতো ওর সেই সিগনেচার হাসিটা হেসে বলল,

 

– “সে ভালই আছি রে। এই দেখ না, জীবনে ফিল্ড মার্শালও হতে পারলাম না, ম্যালকম মার্শালও হতে পারলাম না। কিন্তু তাতে কি, এই তো পার্কে রোজ সকালে বাচ্চাগুলোকে মার্শাল আর্ট শিখিয়ে তোর দেওয়া নামটা সার্থক করার চেষ্টা করছি।”

 

সমাপ্ত

 

মেলবন্ধন ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত
অলঙ্করণঃ শ্রী অনির্বাণ সেনগুপ্ত

 

মার্শাল ভুতো
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments