ভদ্রমহিলার সঙ্গে দেখা হয়েছিল শঙ্খজেঠুর স্মরণসভায়। চোখাচোখি হতে স্মিত হেসে বলেছিলেন – “ভাল আছ বাবা?” ভাল করে লক্ষ করি ওঁকে। ছোটোখাটো চেহারা, শ্যামলা গায়ের রঙ। একটা হাল্কা সবুজ পাড় সাদা তাঁতের শাড়ি গায়ে। আমতা আমতা করে বলি – “হ্যাঁ, কিন্তু আপনাকে তো…”

- “আমায় চিনবে কিনা মনে হয়েছিল একবার, অনেকদিন আগেকার কথা তো। তবু ভাবলাম যদি চিনতে পারো। আমার ছেলেকে তুমি চিনবে…”

ইতিমধ্যে এক ভদ্রলোক স্টেজে উঠে ধরা ধরা গলায় ইনিয়েবিনিয়ে শঙ্খজেঠুর কথা বলতে শুরু করেছেন। এখুনি সেই চিরাচরিত “তোমার অসীমে” ইত্যাদি শুরু হবে।

আমি বলি – “আপনার ছেলে…”

আবার হাসেন ভদ্রমহিলা, “হ্যাঁ, ছোটোবেলায় তুমি আর তোমার বন্ধু সৈকত রবীন্দ্রপল্লীর মাঠে খেলতে আসতে, মনে আছে?”

ও আচ্ছা, ইনি তবে সৈকতের মা। সৈকতের সঙ্গে সেই ছোট্টবেলার পর থেকে আর যোগাযোগ প্রায় হয়নি বললেই চলে। ক্লাস ফোরে পড়তে ও আমাদের ইস্কুল ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যায়। তারপর দু’মাসে চারমাসে এক আধবার ফোনে কথা, তারপর… যেমন হয় আর কি।

আমার চিন্তার খেই ধরেই যেন উনি বলেন – “ভুল ভাবছ, আমি কিন্তু সৈকতের মা নয়। সৈকত আর তুমি যখন খেলতে তখন সবে আমার বিয়ে হয়েছে। বিরানব্বুই সাল…”

আমি একটু অপ্রস্তুতেই পড়ে যাই। একে তো চিনতে পারছিনা, তার ওপর আবার দুম করে ভেবে বসলাম সৈকতের মা, এটা না ভেবেই যে সৈকতের মা’র এদ্দিনে যা বয়স হত সে তুলনায় ইনি অনেকটাই কম বয়েসী।

- “ওই বিরানব্বুই এরই ডিসেম্বরে ইন্দ্রনীল চলে গেল… মানে আমার বর… সে যাই হোক, তোমাদের সেই তখন দেখতাম। তোমরা খেলতে আসতে, আর আমিও ইন্দ্রনীলের দিয়ে যাওয়া এক পেট ভালবাসা নিয়ে বারান্দায় বসে দিন গুনতাম। আর ভাবতাম, দুদিন পর হয়তো এমনই ফুটফুটে একটা ছেলে খেলে বেড়াবে আমার বারান্দায়…”

মেক আপ দিতে আমি হাল্কা হাসি। বলি, “সেই ফুটফুটে ছেলে এখন কোথায়?”

- “তুমি জানোনা, না? ছ’বছর আগে অজয় নদীতে বন্যা হল… ওরা সবাই রিলিফের কাজ করছিল… গাঁয়ের মানুষগুলো এখনো খুব বলে ওর কথা…”

- “আই অ্যাম সরি…” কি বলব না বুঝে বলে উঠি। কৌতূহল বাড়তে থাকে। এ কোন ছেলে, যাকে আমি মনে করতেই পারছিনা?

- “আমায় চিনতে পারছনা বলে লজ্জা পেওনা বাবা, আমি নিতান্তই সাধারণ এক আটপৌরে মা। আমায় যখন শেষবার ভাল করে দেখেছ তখন তুমি খুব ছোটো। তবে তোমায় আমি দেখেছি অনেকবারই…”

- “কি করে?”

- “তুমি যখন মাধ্যমিক পাশ করে সার্টিফিকেট নিতে উঠলে, আমি ছিলাম সেদিন। তুমি ভাল রেজাল্ট করেছ দেখে গর্বে বুকটা ভরে উঠেছিল। ক’জনই বা পারে অমন রেজাল্ট করতে? মনে মনে বলেছিলাম অনেক বড় হও বাবা…”

সেই কনভোকেশনের অনুষ্ঠানে শত শত মানুষের ভিড়ে এই ভদ্রমহিলা কোথায় ছিলেন জানা আমার পক্ষে অবশ্যই সম্ভব ছিলনা। তবু কেমন একটা অপরাধবোধ হতে লাগল, যেন ভুল করে ফেলেছি সার্টিফিকেটটা হাতে নিয়ে এসে ওনাকে প্রণাম না করে।

- “তা তুমি আমাদের হতাশ করোনি, এখন তো তুমি অনেক বড় চাকরি কর, তাইনা? সবাই বলে পরিচয় দার সঙ্গে দেখা করতে গেলে এখন নাকি এক মাস আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে হয়।“

এবার আমার রীতিমত অস্বস্তি হচ্ছে। কিছুতেই চিনতে পারছিনা ভদ্রমহিলাকে, অথচ আমার সম্পর্কে গড়গড়িয়ে সব বলে চলেছেন। বললাম – “না… মানে সেরকমও না… আপনি আসবেন একদিন আমার অফিসে? অনেকদিন পর দেখা হল তো, কথা বলতে ইচ্ছে করছে আরো, কিন্তু এখানে ঠিক… যে কোনো দিন চলে আসবেন। রিসেপশনে এসে বললেই ওরা ব্যবস্থা করে দেবে দেখা করার…” বললাম বটে। এদিকে রিসেপশনিস্টকে নাম না বলে রাখলে যে দুদ্দুর করে খেদিয়ে দেবে, সে তো জানা কথা।

- “পরিচয় দা, তোমাকে জয়াদি একটু ডাকছেন। একবার আসতে পারবে?” ওপাশ থেকে অমিতের গলা।

- “হ্যাঁ নিশ্চয়ই।“ বলে আমি তাকাই ভদ্রমহিলার দিকে। “একটু ঘুরে আসছি, কেমন?”

উনি কেবল একটু হাসেন।

কাজের কথা শেষ করতে করতে আধঘন্টা হয়ে গিয়েছিল। ইতিমধ্যে খানপাঁচেক গানটান হওয়ার পর স্মরণসভার কনক্লুশন টেনেছেন সেই গম্ভীর গলার ভদ্রলোক। ভুলেই গেছিলাম, হঠাত মনে পড়ে সেই ভদ্রমহিলার কথা। সভাভঙ্গের ভিড়ের মধ্যে কোথাও চোখে পড়েনা সেই সব্জে-সাদা তাঁতের শাড়ি।

অমিতকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করি “হ্যাঁ রে, ওইখানে যে ভদ্রমহিলার সাথে তখন কথা বলছিলাম, ওঁকে চিনিস?”

না, অমিত খেয়াল করেনি।

সভার শেষে বাড়ি ফিরে এসে মনটা খচখচ করতে থাকে। কিছুতেই মনে পড়েনা আমার থেকে বছর পাঁচেকের জুনিয়র ছেলেটি বা তার মায়ের কথা। সন্ধ্যে থেকে রাত হয়। ফ্রিজ থেকে খাবার বার করে খেতে বসি। হঠাত খেয়াল হয় কাজের চাপে অনেকদিন ফোন করা হয়নি মা কে। খাবার পাশে সরিয়ে রেখে ডায়াল করি মায়ের নম্বরটা…

 

 

 

মা
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments