গ্রামটার আসল নাম যে কি সেটা আজও কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি । হিন্দু এলাকায়ে গেলে বলে কুসুমপুর আবার মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলে বলে কাশেমপুর । ডাকযোগে চিঠিপত্তর এলে ওই দুই নামেই আসে যা পোস্টম্যানকে চিঠির গোছা বাঁধার সময় খেয়াল রাখতে হয়। আর চিঠি ও মানি অর্ডার আসেও বিস্তর ,গড়ে রোজ ৫-৬ ঘরের ঠিকানায়ে তো হবেই। কারণ এই ভিন্ন নামের একই গ্রাম থেকে প্রায় ২০০ জন মত ‘মরদ’ প্রত্যেক বছর মুম্বাই বা দিল্লি যায় জীবিকার সন্ধানে। তবে মোবাইল আসার পর থেকে চিঠির চলটা এখন পড়তির দিকেই বলা চলে। হিন্দু হোক বা মুসলমান, ছেলেদের বিয়ের বয়স হলেই তারা ভাই-বিরাদরদের ধরে কয়ে ভিন রাজ্যে পাড়ি দেয় রোজগার খোজার তাগিদে। আর তখনই বাড়ির লোকেরা ছেলের জন্য মেয়ে দেখা শুরু করে। এক বছর খেটে কিছু টাকা জমিয়ে, দেশে ফিরে তারপর, তারা হিসেব মত বিয়েশাদী করে ফেলে। ধর্ম আলাদা হলেও সামাজিক রীতিটা মোটের ওপর ওই একই রকম। তবে রকমফের যে আজকাল একদম হচ্ছে না, তা অবশ্য নয়। গেল বছর বিজন হালদারের মেজ ছেলে লিখে পাঠালো যে সে শিক্ষিত মেয়ে বিয়ে করবে আর তাই দিল্লিতে মজদুরি ছেড়ে কোন এক মালিকের অটো ভাড়ায় চালাচ্ছে, তাই বাড়ি থেকে যেন কোনো মেয়ে আগে থেকে না দেখে রাখা হয় । বেশ হইহল্লা শুরু হয়ে গেছিল ঘটনাটার পর। মুরুব্বি মানুষরা তো যারপরনাই রেগে গেছিলেন ও বিজনকে দু-তিন কথা শুনিয়েও দিতে ছাড়লেন না । বাবু গায়েন তো বলেই বসলো , “বিজুর ছেলে ওখানে নিশ্চই বদ মেয়েছেলেদের পাল্লায়ে পড়েছে, খবর কাগজে দেখো না দিল্লিতে ওই মাগিগুলোর জন্য মেয়েমানুষের ইজ্জৎ কত সস্তা হয়ে গেছে !”
মুসলমানদের এলাকায়ে খবরটা পৌছাতে বেশি সময় লাগলো না। মৌলভি সাহেব সত্বর সবাইকে ডেকে একচোট হুঁশিয়ারীও দিয়ে দিলেন , “এই যে চিঠি কমছে আর ম্যাসেজ বাড়ছে, এ তারই কুপ্রভাব। কালকে তোমাদের ছেলেরা যখন গ্রামের বাইরে যাবে তার আগেই তাদের যদি বিয়েশাদী না দাও , তারাও বিদেশে গিয়ে হারাম কাজ করবে আর ওই দু লাইন এসেমেস দিয়ে জন্মের মত সম্পর্ক চুকিয়ে দেবে।”

যাই হোক মাস তিন চারেকের মধ্যে ব্যাপারটা ঠান্ডা হলো ও নতুন অলিখিত ফরমান অনুযায়ী এবার ছেলেরা বিয়েশাদী করেই তবে গ্রাম ছাড়তে লাগলো। আমিনা ও ফুলি ওই গ্রামের দু প্রান্তে আলাদা ভাবে বড় হয়েছে। তবু অমিলের চেয়ে মিলের ভাগটাই বোধহয় বেশি। দুজনের বয়স ,ভাষার টান, ভালোলাগা তো মেলেই , তাদের মরদের পাঠানো মোবাইল সেট গুলোও এক। আর এক, সেই মোবাইল রিচার্জ করানোর এক মাত্র দোকানটাও । তারা missed কল দিয়ে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে নেয় – একটা missed কল মানে আজ দেখা করা যাবে। অন্য দিক থেকে যদি দুটো কল আসে তার মানে সে পারবেনা। আর যদি তিনটে, চারটে বা পাঁচটা কল আসে তার মানে সে পারবে আর সময় জানতে চাইছে। উত্তরে সময় জানিয়ে দেওয়া হয় আবার ওই missed কল দিয়েই- চারটে কল মানে বিকেল চারটে তে দেখা করা যাবে। দেখা হয় কালুর রিচার্জ করার দোকানে।
মাস সাতেক হলো, সেই বিয়ে করার পর থেকে মরদরা বাইরে, শশুরবাড়ি ও বাপেরবাড়ি মিলিয়ে নানা সুখ দুঃখের কথা হয় দুজনের দেখা হলে।
কখনও হয়ত ফুলি ঠেস দিয়ে বলল , “তোর মানুষ বাপু অনেকবেশী কামায়ে না হলে ফোনে এত টাকা ভরাস কি করে?”
আমিনাও অমনি ফোঁশ করে উঠল , “বললেই হলো, ফোনের টাকা দুবাই থেকে আমার ভাইজান পাঠায়ে !”

সেবার ঈদ আর দূর্গা পূজা কাছাকাছি পড়াতে , দুজনের মনই একসাথে উত্ফুল্লিত হলো এই ভেবে যে এইবার পরবে সবার মত তাদের মরদরাও দেশে ফিরবে।
আমিনা ফুলিকে জিগ্গেস করলো ,”এই, কি আনতে বললি রে তুই তোর বরকে ? ”
“বাব্বা, অত সাহস হয় নাকি, তবে ওখানে শুনেছি শাল খুব ভালো পাওয়া যায়। আসার আগে বলব একটা ভালো দেখে লাল রঙের শাল আনতে। ”
“দুর বোকা, শাল তো গায়ে দিবি দু কি তিন মাস , আমি তো বলে রেখেছি জড়ি বসানো কালো শাড়ি আনতে। ”

পরব এলো, গ্রামের মরদরাও এলো, নতুন জামাকাপড় এলো। এলো না সুধু missed কল আমিনার বা ফুলির ফোনে। হয়ত মরদকে অনেকদিন বাদে কাছে পেয়ে দুজনেই ভুলে গেছে একে অপরকে !
বেশ অনেক মাস পরেই ওদের দেখা হলো সেই কালুর রিচার্জ করার দোকানে, তবে কোনো missed কল ছাড়াই, কাকতালীয় ভাবে।
আমিনা না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাচ্ছিল,কিন্তু ফুলি হাত চেপে ধরল , “কিরে মরদ চলে গেছে বুঝি তোর , তাই এতদিনে ফোনে টাকা ভরার দরকার পড়ল? তা কি নিয়ে এলো তোর জন্যে সে?”
আমিনা ম্লান হেসে বলল ,”না না সে আছে এখানেই। আমার জন্য কি আর আনবে? আমাকে তালাক দিয়ে সে নিজের জন্য আরেকটা মেয়েছেলে এনেছে নিকে করে । ছাড় সে সব , তোর লাল রঙের শাল হলো? ”
আমিনার কথায়ে দুঃখের রেশ ছিল না। রাগ বা অভিমানের কোনো বালাইও ছিল না। তবু ফুলি কেঁদে উঠলো হাউ হাউ করে।
আমিনা তাকে জড়িয়ে ধরে জিগ্যেস করলো , “কিরে তুই কাঁদিস কেন রে, হই! ”
ফুলি বলে উঠলো , “তবু তো ফিরে এসেছে, আমার জন তো এলোই না ! কোথায়ে আছে তাই জানি না, কেউ বলে বম্বে চলে গেছে, কেউ বলে গুজরাট।”
কাঁদতে কাঁদতে বলেই চলল সে, “মোবাইল নম্বর বদলে ফেলেছে। শশুরবাড়ি নেয় না আর বাবা নিজের কপালকে দুষছে। ”
আমিনা অনেকক্ষণ ফুলিকে জড়িয়ে ছিল, যাবার আগে হাতটা চেপে ধরে বলল ,”আজ চলি রে , মন খারাপ করলে মিচকল দিস। ”

শাশ্বত , ২৯এ জানুয়ারী , ২০১৪ (বইমেলা)

মিচকল
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments