শরীরের কোন অচেনা গভীরতম উৎস থেকে একঝা৺ক বোবা কবিতার মত প্রশ্ন হানাদার হয় বারবার। মিথ্যের বেসাতি কেন আমার শহরের আনাচে কানাচে? এই জাগতিক ভুয়ো সঞ্চয়ের এক একটা ইঁট কি আমাদেরই ভয়, সংশয়, লোভের জমাট প্রতিফলন ? নাকি অবিশ্বাসের শেষ সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে হড়কে যাওয়ার আগের মুহূর্ত ? ব্যাংকের লোন থেকে অষ্টাদশীর মুঠোফোন; পরতে পরতে মিথ্যের ইন্দ্রজাল। পাড়াতুতো এঞ্জেলদের ফুলঝুরি টেক্কা দেয় আধুনিক ইলুশনিস্ট ক্রিস এঞ্জেলকেও।
কে,কাকে,কখন কি বলছে কিছুই বোঝা যায় না বা কারোর বোঝার দায় নেই। কাগুজে “কবিরা তো চিরকাল মিথ্যুক”। তবে তারা শব্দের অ্যালকেমিসট। সাদামাটা মেঠো-বালি অক্ষরদের সাজিয়ে মিশিয়ে পরশপাথরে সোনালি রুপোলী হরফ বানাতে জুড়ি নেই তাদের। তাই প্রেসেনট টেনসে কাগজে কলমে মিথ্যের লাইসেন্স হয়তো কবি-লেখকদের প্রাপ্য। কিন্তু আমাদের?
এই তপ্ত সময় হাতের মুঠোয় ধরে রাখার জন্যে বড্ড কঠিন ঠাই। অতি মিহি বালুকনার মত হাত এড়িয়ে যায় অক্লেশেই। নিজের অমরতাকে প্রমান করে দিন প্রতিদিন। মোটমাট দার্শনিক কোট করেই বলি- সুবিশাল এক মহাবিশ্বের মাঝে তিন হাত মাটি জুড়ে কিছু দিনের তুচ্ছ বাসিন্দা আমরা। তাই অতি কষ্টে কিনে নেওয়া সময়টা হোক না কিঞ্চিৎ আত্মবিস্লেসনের। এতে পুঁথিগত তাত্ত্বিক হ্যালু না থাকলেও মানবিক ভ্যালু তো আছেই। আছে নিজের আয়নায় নিজেকে চেনার শপথ। যেখানে সাদাকে হলুদ আর কালোকে ধূসর বলবার প্রয়োজন হয় না। যেখানে লোক দেখানো গৈরিক বস্ত্রে নিজেকে মুড়ে রাখাটা অশোভন লাগে। যেখানে মানুষ ঠকানোর পৈশাচিক আনন্দে লাগাম পড়ে যায় অজান্তেই।

বাসের জানালায়, ট্রামের দরজায়, অটোর লাইনে; নিদেন পক্ষে ভিড় ঠাসাঠাসি শেয়ার ক্যাবেও একটু কান পেতে দেখুন, সেই শিব্রামিও বাঘ শিকারের গপ্পোটা মনে পড়ে যাবে। একটি অস্তিত্বহীন শার্দূল প্রতি মুহূর্তে কল্পনার ডানায় দুলতে দুলতে বেড়েই যাচ্ছিলো আয়তনের বহুলতায়। তবে তা ছিল নিছক বৈঠকি আড্ডার খেয়ালি ফসল। আমাদের আকাশের চাঁদোয়াটা কিন্তু আদৌ এমন নির্দোষ আবরনের নয়। বরং ইচ্ছে-মেঘের মত গোঁয়ার কিছু এ টু জেড হেঁয়ালির দল। ঘনাদা বা তারিণী খুড়োর দল এখানে ব্রাত্য। বরং নিজের কাছে হেরে যাওয়ার ভয়েই প্রতিদ্দন্ধিকে “আন্ডার দা বেল্ট” মারার ছকে সমৃদ্ধ। ময়দানের পরিভাষায় যাকে ল্যাং মারা বলে আর কি। এই জমে থাকা কংক্রিটের ফাঁক ফোকরে গড়ে ওঠা নামগোত্রহীন আধুনিক ইশপের গল্পগুলির বাস্তব চরিত্র বা আসামী যাই হই না কেন, সে কিন্তু আমরাই। বিচারকের চেয়ারে বসে কাষ্ঠহেসে মোটিভ বাগিয়ে,কলম সাজিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের দায়িত্বটাও কিন্তু আমরাই নিয়ে থাকি। আবার মোমের জলে স্নান-পরী, কাল্পনিক ফাঁসির দড়ি হাতে নাটা মল্লিকের ভূমিকাতেও আমি অথবা আপনিই।

চটপটে, ঝকঝকে হাবিব কাটিংএর ছোকরা কলেজ স্কোয়ারে বসে চলমান দূরভাষে নিজেকে নিউ হ্যাম্পসায়ারের সুদুর প্রবাসে নিয়ে যায় অনায়াসে। স্যালারি স্কেলটা দুগুন বাড়িয়ে বলে একলাই তৃপ্তির হাসি হাসে। কলেজ ফেরত এফ টিভি সুন্দরী লেট নাইট পার্টিতে যাওয়ার জন্য গোলাপি মোবাইলে “ড্যাড”কে হদিশ দেয় কল্পিত পড়ুয়া বান্ধবীদের। রাত জেগে নোটস তৈরি করতে হবে যে। মোটা ফ্রেমের চশমা আঁটা বয়স্করাও এই কম্পিটিশনে উইন্সেন বোলট না হলেও দেশি মিলখা তো বটেই। কিংসাইজ সিগারেট আর কঠিন পানীয়ে জোছনা রাতে ,ব্যালকনি ছাতে হ্যান্ডসফ্রিতেই গোছানো মিথ্যে শোনান। ফেসবুকে , অর্কুটে সকলেই আধুনিক প্রজাপতি ব্রম্মহা। চেহারা পাল্টে অন্য খাপে; বয়সের বলিরেখা উলটো ঘড়ির সময় মাপে। প্রয়োজনে প্রউরোতাও যৌবনের ডোরবেল বাজিয়ে কৈশোরে প্রাণভরে ডাইভ দেয়। ইয়াহু , গুগলইয়ানার মুখোশের নীল-সাদা জানালায় শব্দের অর্ঘ্য সাজানো হয় প্রতি মুহূর্তে। কতটা দুধ আর কতটা জল বা হলাহল সেটা হিসেবের প্যারামিটারে বাতিল। শুধু ইচ্ছের সমাজতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় নতুন নতুন আইডেন্টিটি জন্মায়।শরীর একই থাকে। দাঁত, নখ,আর মুখগুলো পাল্টে যায়।
“অ্যালা রেনে”র “নাইট এন্ড ফগ” তথ্যচিত্রটির শেষ দৃশ্যে যখন অতীতের মৃত্যু মাখা নাজি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পটিকে ইতিহাস সহ দেখি,তখন আর দু ফোঁটা চোখের জল মুছে পর্দা থেকে সরে গিয়েই শুধু দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি না; কারন সেখানে পরিচালক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন। কে বা কারা অপরাধী ? কারন এখানে আততায়ী তো আমার আপনার মতই একজন জীবিত মানব সত্তা। তেমনি রোজকার খবরের কাগজে রাহাজানি, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি পড়ে বিরক্তি, চাপা ক্ষোভে শুধু কাগজটা মুঠো পাকিয়ে ছুঁড়ে ফেললেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় ! রোজ বোকা বাক্সর পর্দায় একঘেয়ে মেগার মত রাজনৈতিক নেতৃবর্গের মিথ্যের ম্যারাথন দেখে রিমোটটা ছুঁড়ে দিলেই কি ল্যাঠা চুকে যায়? কাকে দায়ী করব আমরা ? অসহায় তর্জনী তুলি সময়ের দিকে। অর্থের নাগপাশে আরও…আরও চুড়োয় ওঠবার প্রতিযোগিতাকে! বর্তমান প্রজন্মের ন্যাপিটাইম থেকেই হাতের আঙুলের আওতায় এসে পড়া ল্যাপিসুলভ ছোট্ট পৃথিবীটাকে! কর্পোরেট গ্ল্যামারে স্নান করে ওঠা যৌবনকে ! মিথ্যে কি কখনো ছিল না? জেনেসিস এর আদি সর্প কাহিনী থেকে আমাদের সমস্ত মহাকাব্য জুড়েই রয়েছে ক্ষমাহীন মিথ্যের বেসাতি। মানুষ সৃষ্টির মুহূর্ত থেকেই নিজের স্বার্থ বুঝতে শিখেছে। হয়তো বা খানিকটা লং শটে ছিল; আর এখন অভ্যাসটা এসে করা নাড়ছে ঘরের চৌকাঠে। কোনদিন হয়তো এই অভ্যাস কানের খুব কাছ দিয়ে ধুসর মস্তিষ্কে চিরকালের মত জায়গা করে নেবে।
সত্যির কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর সাহস কি আছে আমাদের? রোজকার পথে ঘাটে ঘামে, রোদে, জ্যামে বিবর্ণ হতে হতে পড়ে আছে কি কিছু? নাঃ কোন দেবরাজ ইন্দ্র বায়সরূপ ধারন করে সত্যবাদীতার পরীক্ষা নিতে আসবেন না। গড়িয়ার অনির্বাণ তার গার্ল ফ্রেন্ড কে দিনে অকারণ দশখানা মিথ্যে বললেও ব্রেক আপটা আদৌ হয়তো হবে না; শ্যামবাজারের নিলাঞ্জনার নতুন অফিসে বসকে ভজানোর জন্য নিজের স্ট্যাটাস সিন্ডারেলার দুনিয়া থেকে তুলে না আনলেও হয়তো প্রোমোশন আটকাত না; প্রমথেশবাবু আজকের মিটিঙে এতদিনের পুরনো বন্ধুদের শুধু বলার জন্য এতোগুলো মিথ্যে না বললেও পারতেন। কিচ্ছু এসে যাবে না। শুধু স্লিপিং পিলের পরেও রাতের ঘুমটা একটু দেরিতে আসার চান্স থেকে যাবে। আমাদের রাজধানী আজ মানুষকে সংস্কারের আগুনে দগ্ধ করার পথে; কোরাপশন, মূল্যবৃদ্ধি , মিথ্যাচারের প্রতিনিয়ত মুখোমুখি আমরা। মানুষের বেক্তিগত সম্মান ধুলোর আড়ালে মুখ লুকোচ্ছে।
“কেউ কথা রাখে নি,কেউ কথা রাখে না”…
মিথ্যাবাদিতা আমাদের শিরায় শিরায় জিয়নো হেমলক।এর মাঝে “ইনসাফ ক্যা তরাজু” মার্কা কালো ফেট্টিটা খুলে সোজা কথা সোজা পথে বলতে পারলে অন্যের বা অনেকের না হোক নিজের উঠোনে এক পশলা বৃষ্টি হয়তো নামত।

মিথ্যের বেসাতি শহরে… reuploaded
  • 4.50 / 5 5
2 votes, 4.50 avg. rating (87% score)

Comments

comments