স্টেজে ওঠার সময় একবার টুক করে পকেট থেকে একটা লজেন্স বের করে মুখে দিলো সুমন, একটা জলের বোতল সঙ্গে থাকে, তা-ও গলাটা আর্দ্র না থাকলে পারফরম্যান্সে তার ছাপ টের পাওয়া যায়। এটা অবিশ্যি একটা দক্ষিণ কলকাতার মাঝারি সাইজের একটা বার – শুক্রবার সন্ধ্যে তাই এই সন্ধ্যে সাতটাতেই বেশ লোক হয়েছে। অবশ্য সবাই যে সুমনের স্ট্যান্ড-আপ কমেডির ফার্স্ট শো শুনতে এসেছে তা নয়, অনেকেই দূরে দূরে বসেছে, আর্ধেক উৎসাহ আর আর্ধেক বিরক্তি নিয়ে – তবে স্টেজের সামনে বেশ কয়েকটা চেনামুখ, পুরনো বন্ধুবান্ধব – অফিস কলিগ, উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করছে।

সত্যি বলতে এই জনা-কয়েক ফ্যানদের উপর ভরসা করেই পাকা চাকরিটা দুম করে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছে সুমন । তার সেন্স অব হিউমার মোটামুটি ভালোই, সামান্য কথাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে 'পান' করার অভ্যেসটাও এক্কেবারে ছোট্টবেলার থেকেই আছে, তবে তার আসল দক্ষতা লোকের গলা এবং আদব-কায়দা অর্থাৎ ম্যানারিজম নকল করা। ইস্কুল-কলেজে পড়ার সময় টিফিন বা ক্লাসের মাঝখানে বন্ধুরা ঘিরে ধরতো, 'একবার এস্কেজি-টু করে দ্যাখা, একবার হেডু যে মর্নিং প্রেয়ারে লেকচারটা দেয় সেটা কর !' … কলেজে বেঞ্চের উপর বসেও একের পর এক প্রোফেসারদের নকল করে দেখাতো, একজন 'স'-কে 'শ'-বলতেন, একজন ছিলেন গায়ক, তার গম্ভীর ব্যারিটোন নকল করে 'আলফা-বেইটা-গ্যামা' বললেই হেসে গড়িয়ে পড়তো বন্ধুরা … একটু নকল, আর একটু কল্পনা করে আজগুবি কিছু কথা জুড়ে দিলেই হলো ! সমস্ত পার্টির মধ্যমণি হয়ে থাকতে, আর লোককে এই প্রাণখোলা হাসি হাসাতে সে-ও কম উপভোগ করতো না …

চাকরি ছেড়ে দেওয়ার আইডিয়াটাও এইভাবেই এলো ! মাস ছয়েক আগের কথা, অফিসের রিট্রিট হচ্ছে এক চা-বাগানের এস্টেটে ! শেষদিন খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই ধরে বসলো, আজকে সুমনকে পারফর্ম করতেই হবে ! অল্প নেশা করেছিলো বলে হয়তো ইনহিবিশন-টাও কম ছিলো সেদিন, সুমন-ও রাজি হয়ে গেলো এককথায় ! নকল করার লোক-ও হাতের গোড়ায়, বস ছিলেন এক গোমড়া-মুখো ওড়িয়া লোক, মিস্টার উপাধ্যায় – বিদেশে বছরকয়েক থাকার ফলে তার উচ্চারণে আর হাবেভাবে স্পষ্ট আমেরিকান ছাপ .. সুমনের তার উপর অল্প রাগ-ও যে ছিলো না তা নয় ! ঘন্টাখানেক চলার পর যখন শেষ করলো, সেই বস এসে জড়িয়ে ধরে বললেন, অনেকদিন পর পেটফাটা হাসি হেসেছেন তিনি !

আজকে সুমন নকল করবে ঠিক করেছে তিনজন মোটামুটি নাম-করা সেলিব্রিটির, একজন বয়স্ক পলিটিশিয়ান, একজন হিন্দি সিনেমার হিরো আর একজন নামকরা খেলোয়াড় !

নকল করতে গেলে যে খুব ভালো পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা লাগে তা সুমনের আছে, সহজেই ধরে ফেলতে পারে কার বৈশিষ্ট্য কোনটা, এই যেমন পলিটিশিয়ান-টি বাংলা টোনে আশ্চর্য ইংরেজি বলেন, আর থেকে 'ইয়ে','মানে','ধ্যাত্তেরি' ঢুকে যায় স্পিচে … আর খেলোয়াড়টির-ও তাই, এই কেরিয়ারের মধ্যগগনেও তার গলায় কৈশোর যায়নি, আর টিভি খুললেই যার বিজ্ঞাপন দেখা যায়, তার মুখে সংলাপ বসানো কি এমন কাজ ? সবথেকে সোজা মনে হয় হিন্দি সিনেমার হিরোটিকে নকল করতে, তাঁর পিলে-চমকানো ডায়লগবাজি আর কৃত্রিম-ব্যারিটোন গলা বোধহয় সুমন-ও আর কোত্থাও শোনেনি !

ফার্স্ট শোয়েই জ্যাকপট ! এতো মুহুর্মুহু হাততালি আর হাসির হররা কখনো শোনেনি আগে ! এ এক অদ্ভুত উত্তেজনা – তিনের জায়গায় চা-পাঁচটা ক্যারিকেচার করে দেখালো সুমন, একবার প্রাইম মিনিস্টারের সম্ভাষণ-ও নকল করতে ছাড়লো না – শেষ করার সময় দেখলো লোকে নিজের টেবিল ছেড়ে স্টেজের পাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে, জীবনে প্রথমবার স্ট্যান্ডিং ওভেশান নিতে নিতে সুমন ঠিক করলো চাকরিটা ছেড়েই দেবে, এটাই আজ থেকে তাঁর জীবন ও জীবিকা !

—————–

শহরের আশেপাশের বার অনেক, স্ট্যান্ড আপ কমেডির বাজার-ও বেশ উঠতির দিকে এখন, তাই সুমনের প্রথম প্রথম কাজ পেতে সমস্যাই হলো না।  আজকাল সে একটা নোটবুক নিয়ে ঘোরে, নতুন কোনো লাইন মাথায় এলে লিখে রাখে, রাস্তাঘাটে ইন্টারেস্টিং ক্যারেকটার দেখলেও নোট করে নেয় আর ঘন্টার পর ঘন্টা এ-চ্যানেল ও-চ্যানেল ঘুরিয়ে টিভি দ্যাখে, সারাক্ষণ-ই কেউ না কেউ কথা বলছেন … কার ক্যারিকেচার করা যায় নোট নিতে থাকে সুমন !

অল্প অল্প নাম হলেও সুমনের একটা দুঃখ রয়েই গেছে, ওই শুক্রবারের সন্ধ্যের বারের বাইরে তাকে কেউ বড়ো একটা চেনে না ! কাফে-তে গিয়ে বসলে কেউ অটোগ্রাফ চায় না, রাস্তাঘাটে পাবলিক ট্রান্সপোর্টেও কেউ তাকে দেখে ফিসফিস করে সঙ্গীকে বলেনা, 'ঐ লোকটাকে চিনিস?'। সুমনের বদ্ধমূল ধারণা এই মিলেনিয়ামে সত্যি বিখ্যাত হতে গেলে টিভিতে মুখ দেখানো বা ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া ছাড়া উপায় নেই …

সুযোগটাও এসে গেলো দিন কয়েকের মধ্যেই ! ইস্কুলের এক বন্ধু বিপ্লব আজকাল টেলিফিল্ম-টিল্ম করে হাত পাকাচ্ছে, সেই এক চ্যানেলের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিলো, ম্যানেজার বিপ্লবের মেসোমশাই, জয়দেব বর্মণ। চুক্তি হলো, সুমনের পারফর্ম্যান্স ইন্টারনেটের মাধ্যমে সম্প্রচার করবে তারা, সরাসরি বার থেকেই, আপাততঃ একটাই শোয়ের বায়না, পাবলিক খেলে আরো ভাবা যাবে …

সময় এগিয়ে আসছে, সুমন-ও নতুন নতুন ক্যারিকেচার খুঁজছে, এক ঘন্টার শো – অতএব, অনেকগুলো চাই আর সবার জন্য ছোট্ট ছোট্ট গল্প … এই শো-টার জন্য নতুন কিছু চাই-ই চাই, আর সেই এক-ই জোক, এক-ই ক্যারিকেচার করে চলবে না !

আইডিয়াটা এলো টিভির চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতেই, হঠাৎ একটা চ্যানেল-এ এসে একটা অতিপরিচিত গলার আওয়াজ শুনে থমকে গেলো সুমন। এ তো সেই ছোটোবেলার বিখ্যাত ম্যাজিশিয়ান, তার কত শো দেখেছে মহাজাতি সদনে, এমনকি টিভিতেও বাচ্চা-বড়ো সবরকমের প্রোগ্রামে আসতেন তিনি। সুমনের মনে হতো সত্যি জাদু !  এই তাকে হাতে-পায়ে শেকল বেঁধে বাক্সবন্দি করে তাকে সাগরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, তিনি ঠিক কোথাথেকে অক্ষত শরীরে উদয় হচ্ছেন, একবার স্টেজে দেখেছে তাকে চোখে রুমাল বেঁধে দেওয়া, আর হাতে চক – দর্শকদের থেকে একজন উঠে একটা ব্ল্যাকবোর্ডে কিছু ফরমুলা লিখছে, আর পাশেই চোখ বাঁধা অবস্থাতেই যাদুকর মল্লিক অন্য ব্ল্যাকবোর্ডে হুবহু লিখে যাচ্ছেন সে-ই এক-ই ফর্মুলা ! সুমন-ও হাত তুলে ভলান্টিয়ার করেছিলো সেইদিন, খুব শক্ত একটা অ্যালজেব্রার ফর্মুলা লিখতে গিয়ে দেখলো, এ প্লাস বি হোল স্কোয়ার ছাড়া কিস্যু মাথায় আসছে না !

এখন অবশ্য মল্লিকের অনেক বয়েস, ম্যাজিক শো-ও সুমন শেষ কবে দেখেছে মনে নেই , এখন  কোনো একটা চ্যানেলে এসে তিনি তাঁর সেই অননুকরণীয় গলায় বলছেন, 'এই কলকাতা শহর থেকে দুষ্টু লোকগুলোকে সব ভ্যানিশ করে দেবো' … সুমন শুনতে শুনতেই ঠিক করে ফেললো তাঁর নতুন ক্যারিকেচার -  এক ম্যাজিশিয়ান – যাঁর সব ম্যাজিক-ই ফেল করে !!

যথারীতি এবারের শো-ও খুব হিট, প্রত্যেকটা স্কেচের পরে সুমন-কে পাক্কা তিরিশ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হয়েছে  শুধু হাততালি থামাতে! শেষ হওয়ার পরে বাইরে বেরিয়ে এলো সুমন – একটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে দেখলো পকেটে লাইটারটা নেই, অথচ এই একটু আগেই …

'দেশলাই ভ্যানিশ?'
গলাটা শুনে চমকে গেলো সুমন, অনতিদূরে দাঁড়িয়ে আছেন যাদুকর মল্লিক, তার আঙ্গুলের ফাঁকেও একটা জ্বলন্ত সিগারেট ! এগিয়ে এসে সুমনের সিগারেট-টা ধরিয়ে দিতে দিতে বললেন,
'আপনার তো সেন্স অব হিউমার মন্দ না, গল্প বলার কায়দা-ও ভালো, তাহলে এই আমাদের মতন বৃদ্ধ, বাতিল লোকেদের ভেঙিয়ে পয়সা উপার্জন করতে হচ্ছে কেন?'
সুমন বলার চেষ্টা করলো, 'ইমিটেশান ইজ দ্য বেস্ট ফ্ল্যাটারি', মল্লিক কান করলেন না। হাতের সিগারেটটা পাশের নালায় নিক্ষেপ করে চলে যেতে যেতে বললেন, 'ভাঁড়ামি করে লোক হাসাচ্ছেন, হাসান, আমার আপত্তি করায় কিছু যায় আসে না, কাজটা কিন্তু তা-ও ভালো করলেন না' ।

সারা শরীর যেন লজ্জায় রাগে অবশ হয়ে এলো সুমনের, কোনো রকমে একটা ট্যাক্সি ডেকে বাড়ি ফিরে এলো যখন মনে হলো অল্প জ্বর এসে গেছে ইতিমধ্যে, একটা প্যারাসিটামল খেয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে সে ঠিক করলো যাই হোক না কেনো, আর কোনোদিন ঐন্দ্রজালিক মল্লিকের ক্যারিকেচার নয়।

পরদিন ঘুম ভাঙলো জয়দেব-বাবুর ফোনে, সুমনের শোয়ের ভিডিও ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়ে গেছে ! ইউটিউবে হাজার কুড়িবার লোকে দেখে ফেলেছে এই অল্প সময়ের মধ্যে ! সুমন ভাবলো একবার বলে দেখবে ভিডিও-টা সরিয়ে নেওয়ার কথা, তারপর ভাবলো হাতের তীর, মুখের কথা – একবার যা বেরিয়ে গেছে আর কি ফেরানো যায়?

পরের শোয়ের আগে আর-ও সপ্তাহ দুয়েক সময় চেয়ে নিলো সুমন, জয়দেব-বাবু যদিও অধৈর্য্য হয়ে উঠেছেন ক্রমশঃ, কিন্তু সুমনকে নতুন ক্যারেকটার ভাবতেই হবে ! ম্যাজিশিয়ানের শেষ কথাগুলো কোথাও যেন একটা কাঁটার মতন ফুটে আছে । এর মধ্যে তার নাম-ও হয়েছে বেশ খানিকটা, একদিন মলে জামা কিনতে গিয়ে ক্যাশিয়ার তাকে দেখেই চিনতে পেরে খানিকটা এক্সট্রা খাতির করলেন – এমনকি পাড়ার সে কাফেটায় গত এক বছর ধরে যাচ্ছে সুমন, তার ব্যারিস্তাও আজকাল সুমনের জন্য কাফের এককোণে একটা কাউচ রিজার্ভ করে রাখছে, সুমন জানে এইভাবে একটু একটু করেই খ্যাতি আসে !

ক্যাফে-তে বসেই মাথায় এলো পরের ক্যারিকেচারের আইডিয়া, তার ছেলেবেলার ইস্কুলের মহারাজ, নাম ছিলো অজপানন্দ – মুখে সারাক্ষণ অনাবিল হাসি লেগে থাকতো বলে দুষ্টু বাচ্চারা নাম দিয়েছিলো অযথানন্দ ! এখন তিনি বেশ নাম-টাম করেছেন, টিভির চ্যানেলে এসে গান-টান করেন, টক-শোতেও এসে মানুষের সঙ্গে ফোনে কথা-টথা বলে শান্তির উপায় বাতলে দেন ! অযথানন্দকে নকল করাও ভারি সহজ, তাঁর ভাবভঙ্গি-গলার স্বর সব-ই যে বেশ মেয়েলি ! এফিমিনেট পুরুষ-মানুষের নকল করা যতই রাজনৈতিক-ভাবে অশুদ্ধ হোক, লোকে যে দেদার হাসে সে সুমনের জানা !

দিন চারেক পরে শো শুরু হলো সুমনের, শুরুতেই অযথানন্দ-কে নিয়ে একটা আনকোরা নতুন স্কিট ! কাল্পনিক কথোপকথন – একদিকে অযথানন্দ, আরেকদিকে পলিটিশিয়ান চক্কোত্তি !

কিন্তু এ কি? আজকে তো কই হাসির হররা উঠছে না, স্টেজের সামনের দিকে অল্প আলোয় পুরোনো বন্ধুদের মুখ চোখে পড়ছে, তারা-ও কেমন যেন অবাক হয়ে তাকিয়ে সুমনের দিকে ! এই স্কেচ তার সেরাগুলোর মধ্যে একটা, তা হলে?

মাইকে হঠাৎ একটা বিশ্রী জোরে ফিডব্যাকে সম্বিত ফিরে এলো সুমনের, তাতেই ব্যাপারটা দিনের আলোর মতন স্পষ্ট বুঝতে পারলো সে- মাইকে যে গলা শোনা যাচ্ছে সুমনের সেটা অযথানন্দ-ও না, পলিটিশিয়ান চক্কোত্তিও না … সেটা একটা অচেনা অদ্ভুত গলা ! নাঃ, একটা নয়, একের পর এক বিভিন্ন গলা, কোনোটা ভারি, কোনোটা মিহি, কোনোটা অত্যন্ত কর্কশ  – এবং আশ্চর্য ব্যাপার, গোটা ব্যাপারটা হয়ে চলেছে সুমনের ইচ্ছের কোনোরকম তোয়াক্কা না করে ! পুরোনো স্যাটেলাইট রেডিও-র মতন, কখন যে কি সিগ্ন্যাল ধরে চলেছে, সুমন-ও জানে না !

এক ঘন্টার শো ছিলো। হল যখন প্রায় ফাঁকা, সুমন দেখলো মিনিট কুড়িও পেরোয়নি ! রাস্তায় বেরিয়ে আজ আর ট্যাক্সি নয়, এক ঘন্টার রাস্তা হেঁটেই ফিরলো সুমন। তার মাথায় কি চলছে সে নিজেও জানেনা, রাস্তায় বার দুয়েক চাপা পড়তে পড়তে বেঁচেছে আজকে – একবার মোড়ের মাথায় গুমটিটায় দাঁড়িয়ে এক প্যাকেট সিগারেট কিনতে গিয়ে দেখলো, অবিকল মহিলার গলা বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে ! দোকানদার চেনা লোক, এক-গাল হাসলো, সুমন আবার তাঁকে কিছু বলতে গেলো, গলা থেকে কিছু যান্ত্রিক আওয়াজ বেরিয়ে এলো !

ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করে একগ্লাস ঠান্ডা জল ঢকঢক করে খেয়ে একটু যেন ধাতস্থ হলো সুমন ! একবার নিজের গালে একটা চড় মারলো, বাথ্রুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলো কোথাও কোনো অস্বাভাবিক চিহ্ন ফুটছে কিনা, গলার কাছেও কিছু নেই – সম্পূর্ণ সুস্থ একটা লোক আয়নার ওপাশে দাঁড়িয়ে ! খালি তার চোখে-মুখে অপার্থিব ভয়ের ছাপ !

সুমনের মনে হলো সে পাগল হয়ে যাচ্ছে, পৃথিবীটা যেন দুলছে তার -  ইচ্ছে হলো প্রচন্ড জোরে একটা চিৎকার করে ওঠে – আর অবাক হয়ে দেখলো তার সমস্ত প্রাণশক্তি নিঙড়ে বের করা আর্তনাদটা গলা দিয়ে বেরলো ঠিক একটা পোষা টেরিয়ারের রাগী গর্জনের মতন ! …

অনেক রাতের দিকে জ্ঞান ফিরলো বিপ্লবের ডাকাডাকিতে !
দরজা ভেঙে ঢুকে দমকল তাঁকে যখন সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করে, সুমন বাথ্রুমের মেঝেতে গলা আঁকড়ে পড়েছিলো ! পাশের বাড়ির বয়স্ক ডাক্তার চৌধুরী রাতের শেষ পেগটা ব্যালকনিতে বসে আরাম করে খান, আজ পাশের ফ্ল্যাট থেকে একের পর কুকুর-বিড়ালের পরিত্রাহি আর্তনাদ শুনে ভয় পেয়ে পুলিশকে ফোন করেন তিনি-ই!
বিপ্লব-ও শোয়ের সময় ছিলো, কিছু একটা অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে দেখে রাত্রে বন্ধুকে অনেকগুলো ফোন করেও না পেয়ে একটা ট্যাক্সি ধরে চলে আসে সুমনের ফ্ল্যাটে !
বিপ্লবের ডাকে সাড়া দিতে দিতে সেই আবছা-অবচেতনের মধ্যেও সুমন বুঝলো, তার গলা দিয়ে যে আওয়াজ বেরোচ্ছে সেটা তার-ই, নিজের চেনা গলা !

বিপ্লবের মেসোমশাই অনেকবার অনুরোধ করেছিলেন, আর কয়েকটা শো করতে – একটা একটু গন্ডগোল তো কি হয়েছে? সুমনের সেই প্রথম শোয়ের ভিডিও এতদিনে দশ লক্ষ লোক দেখেছেন ! জয়দেব-বাবুর বাকি সব প্রোডাকশন মিলিয়েও এতো লোক হবে না …

সুমন এখন আর স্ট্যান্ড-আপ করে না ! পুরনো চাকরিটা পেতেও তেমন বেগ পেতে হয়নি, বস উপাধ্যায় তাকে এককথায় আগের পোজিশান-টাই ফিরিয়ে দিলেন, এরকম একজন সেলিব্রিটি থাকলে টিমের সবদিক থেকেই ভালো, কোম্পানির ভিজিবিলিটি-ও বাড়ে, আজকাল তো লোকে চাকরির পাশাপাশি কতকিছুই না করছে !

তবুও সুমন আর স্ট্যান্ড-আপ করে না, বন্ধুদের পার্টিতেও না – সে বই পড়ে পড়ে ম্যাজিক শিখছে ! আয়নার সামনে বসে বসে একমনে পামিং আর পাসিং করতে করতে সময়টা দিব্যি কেটে যায়! বিপ্লবকে বলেছে জাদুকর মল্লিকের নাম্বারটা যদি এনে দিতে পারে – স্টেজে উঠুক না উঠুক, একটা কয়েন ভ্যানিশ করা শিখতে পারলেও অনেক !

 

পুনশ্চঃ  আমি গত কয়েকদিন ধরে টানা 'গল্প ১০১' পড়ছি, কেন ঠিক জানিনা ! হয়তো হঠাৎ ছোটোবেলা ফিরে পাওয়ার ইচ্ছে – সেই যখন পড়ার বইয়ের তলায় গোগ্রাসে গিলতাম 'এবারো বারো', 'আবার বারো'-র গল্পগুলো … আমার এই গল্পটা সেই সব  আশ্চর্য গল্পের স্রষ্টা সত্যজিত রায়ের প্রতি সামান্য এবং অতিশয় অক্ষম একটা ট্রিবিউট !

মিমিক্রি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments