এই পর্বে লিখছেন সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়। পেশায় পরিবেশ বিজ্ঞানী, নেশায় লেখিকা। তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং ওয়েবজিনে।   

 

মিলি এখন পুরোপুরি আঠারো বছরের এক যুবতী। সবে হাইয়ার সেকেন্ডারী পাশ করেছে। এক পিঠ কালো মেঘের মতন কোঁকড়ানো চুল আর পাতলা ছিপছিপে চেহারায় একটা খুব মিস্টিসুলভ হাবভাব আছে। স্কুলের গন্ডি পার হবার সাথে সাথে মায়ের সর্ব প্রথম চিন্তা শুরু হল। এখনই মেয়েকে ভালো পাত্রের হাতে তুলে দিতে হবে। যেখানে যত আত্মীয় স্বজন ছিল সবাইকে বলা হল ভালো পাত্র সন্ধানের জন্য। যদি তাদের সন্ধানে কোনো ভালো পাত্র থাকে তো তাঁদের যেন চটজলদি জানানো হয়। মিলি বিয়ের নামে কখনোই আপত্তি করেনি।কারণ সে জানত, বিয়ে না করলে মা-বাবার বোঝা হয়ে সারাজীবন থাকা মোটেই সুখের নয়। তার একটাই শুধু আপত্তি ছিল, বিয়ের পরে কলকাতার বাইরে না যাওয়ার।

মনে যদিও একটু ইচ্ছে ছিল বৈকি যে, অন্য বন্ধুদের মত সে ও অন্ততঃ কলেজের একটা ডিগ্রী হাতে পাক। মা -এর আসলে খুব চিন্তা ওর কালো রং এর জন্য। আজকালকার দিনেও মেয়েদের কালো রং নিয়ে কত চিন্তা ভাবনা করেন মা-বাবা ও বাড়ির পরিজনেরা। তার বাবা কিন্তু এরকম না। বাবার খুব গর্ব মিলিকে নিয়ে। রং কালো হলেও বাবা-কে বলতে শোনে, “আমার মিলির মুখের মতন একটা মুখ দেখাও দেখি। পারবে না। তার ওপরে অত সুন্দর সেতার বাজায় যখন আমরা নিজেদের মেয়েকেই দেখি অবাক হয়ে, কি গো দেখি না?”। বাবার জ্বলজ্বল করা মুখে মা কে এইসব কথা বলতে শুনে তার মনটা আনন্দে টই টুম্বুর হয়ে ওঠে। মা ও তো মেয়ে তাও কেন যে সাত তাড়াতাড়ি নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে চান, সে বুঝে উঠতে পারে না একদম। কিন্তু বাবা একেবারে মা-এর উলটো মেরু। বাবা একেবারেই দলছুট। অনেক আশা ছিল ওকে নিয়ে ওর বাবার। তাই সে বাবাকে ছেড়ে দূরে কোথাও যেতে চাইত না। ওকে সবাই 'ড্যাডিস গার্ল' বলেই ক্ষেপায়।

সবে কলেজে যেতে শুরু করেছে মিলি। তার প্রথম কলেজ জীবন তাই বাড়ির ছাদে মা -বাবা ও আত্মীয়পরিজন মিলে বেশ একটা বড়সড় পার্টির ব্যবস্থা করেছেন। খোলা ছাদে ঝিরিঝিরি বসন্তের হাওয়া। বাঁধ ভেঙেছে চাঁদের হাসি, তার সঙ্গে মিশে গেছে অতিথিদেরও হাসি-মস্করা। রেলিং আর আলসের গায়ে ঝিকিমিকি টুনি বালবের তিরিক তিরিক নাচ। তার নাম লেখা বাহারী কেক কাটা হল। তারপর বিরিয়ানি- ফিস ফ্রাই-চিকেন কারি গন্ধে একেবারে ছাদের চারিদিক ম ম করছে। বেশ চলছিল দিনগুলো।

কিন্তু তারপরেই জীবনের প্রথম ইন্টারভিউ এলো ভবানীপুর থেকে । মিলি ভাবল- 'বাঁচা গেল', খুবই কাছে ওর বিয়ে হবে। যখন খুশী তখনই বাবা-মায়ের কাছে চলে আসতে পারবে। ইন্টারভিউর দিন চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ি ঘরে ঢুকে সকলকে নমস্কার জানিয়ে বসল। যাদের যা প্রশ্ন করার সবেরই উত্তর দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সেদিন বেশ নার্ভাস লাগছিল মিলির। বাবার বেশ কিছু টাকাও গচ্ছা গেল তাদের ডিস ভরে মিস্টি খাওয়াতে। এর কদিন পর মিলির বাবা-মা গেলেন পাত্রের বাড়ি। বাবার যদিও বা একটু পছন্দ হয়েছিল পাত্রের হাইলি কোয়ালিফিকেশন এর দিক থেকে কিন্তু মা একেবারেই বেঁকে বসলেন। বাড়িতে এসে বাবা -মায়ের তুমুল তর্ক শুরু হল। শেষে সবার কথার জেরায় বাবা সেই ঘর থেকে গজ গজ করতে করতে বেরিয়ে গেলেন। তখন মা-এর মুখে পাত্রের বিবরণ শুনে সবার সাথে মিলিও হেসে কুটোপাটি হল। কাজেই সেটা বাতিল হয়ে গেল। মা আবার চাম্পিয়ানের ভূমিকায়। আবার দিন যায়, রাত আসে। দুপুরে মা-এর হাতে করকরে আনন্দবাজার পত্রিকার 'পাত্র-পাত্রী' তে চোখ রাখা এইসব চলছে… কারণ আজকাল আর কেউই জানাশোনা পাত্র বা পাত্রীর হদিশ দিতে চায় না। দিনকাল যা পড়েছে, এই ফেসবুকের যুগে, কার জন্য যে কে ঠিক হয়ে আছে কেউ জানতে পারে না।

কয়েক সপ্তাহ বাদে এল আরেকটা ইন্টারভিউ কুচবিহার থেকে। মিলি বলল, “এত দূর দূর থেকে কেন আসছে, গো মা?” মা শুনে হাসি মুখে মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “দেখতে আসলেই কি আর বিয়ে হয়ে যায়, নাকি রে? এমনি কথায় আছে, পাঁচ কথায় বিয়ে।” চুপ করে গেল মিলি। মা-এর সাথে তর্ক করা যায় না মোটেই।

মনে পড়ল তার স্বর্গীয়া ঠাম্মার কথা। মিলির চিরকালের অভ্যাস ছিল পা ছড়িয়ে বসে ভাত খাওয়া। ঠাম্মা-পিসন-দিদন কত বারণ করেছেন। বলতেন, “পা ছড়িয়ে খেতে বসলে নাকি দূরে শ্বশুরবাড়ি হয়। তখন কেঁদে ভাসালেও আর বাপের বাড়ি আসা হবে না, বুঝতে পারবি তখন। পা ছড়িয়ে খাওয়া বার হয়ে যাবে।” কারোর বারণেই মিলি তার অভ্যাস বদলায়নি। শেষে একদিন ঠাম্মা রেগে গিয়ে দিলেন পাখার বাট দিয়ে এক ঘা। সে এক কান্ড। মিলি কেঁদে রসাতল। কারণ ঠাম্মাকেই সে সব সুখ দুঃখের কথা বলে, আদর করে 'টুসকি সই' নামে ডাকে। আর সেই ঠাম্মাই কিনা তাকে সবার সামনে পাখার বাট মারলেন? ঠাম্মার আদরেই শেষে মানভজ্ঞন হল মিলির।

আবার যথা সময়েই কুচবিহারের লোকেরা এল মিলিকে দেখতে । সেই একই নিয়ম কানুন। মিলি ঘরে ঢুকে পাত্রের মুখের দিকে তাকিয়েই ফিক করে হেসে ফেলেছে। হাসি কিছুতেই চাপতে পারছে না। সে কি অবস্থা। চেষ্টা করছে কত, কিন্তু কেন যে এরকম হচ্ছে বুঝতে পারছিল না। ছেলেটির ঠোঁটের কাছে ছিল একটা বড় লাল রঙের আঁচিল । সেটা দেখেই মিলি হেসে ফেলেছিল আর নিজের মনেই বলেছিল– ভগবান ছেলে্টার সব সৌন্দর্যই মেরে দিয়েছেন ওই আঁচিলটা দিয়ে।

যাই হোক, শেষ পর্যন্ত দেনাপাওনাতে আটকাল বলে মিলিকে আর অত দূরে যেতে হল না। এই ভাবে নানান সম্বন্ধ আসতে লাগল দূর দূর থেকে- দিল্লী, এলাহাবাদ, নাগপুর, মুম্বাই। মিলির জোরাজুরিতে বাবা তাঁদের আপত্তি জানিয়ে চিঠি দিয়েই চলেছেন। মা কে প্রায়ই বলতে শোনে আজকাল, 'এই মেয়ের যে কিভাবে বিয়ে হবে জানা নেই, বাবা।' এরপর যা ঘটল- মিলিকে সেটা তার ওপরওয়ালার ইরাদা বলে মেনে নিতে হল।

সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপার থেকে ভেসে ভেসে এল এক মিঞা -কি-মল্লার। মা বললেন, “ঘ্যান ঘ্যান করলে কী হবে? জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে- তিন বিধাতা নিয়ে। কাজেই যা হবে মেনে নিতেই হবে। এইভাবে দিনের পর দিন চলে যাচ্ছে।” মিলি ভাত খেয়ে কলেজে যাবার জন্য সবে প্রস্তুত হচ্ছিল, হঠাত ফোন বেজে উঠল। মা কা্র সাথে বেশ খানিকক্ষণ কথা বললেন। ফোন রেখেই মিলির বৌ্দির সাথে কিছু গুরুতর ব্যাপারে যেন পরামর্শ করলেন। তারপরেই মিলিকে ডেকে বললেন, “আজ আর কলেজে যাস না, মিলি!” শুনে মিলি ত অবাক। যে মা স্কুল-কলেজ কামাই করা একদম পছন্দ করেন না। আর আজ তবে হল কী মায়ের? বৌ্দির দিকে তাকাতেই উনি চোখ মেরে বললেন, “আজ তোমাকে দেখতে আসবে গো, বুঝলে ননদিনী?” মা বেশ ধমকের সুরে বললেন, “পাশের বাড়ির বৌ্দিকে বলে আয় আজ বিকেলে ওর সাথে তুই সিনেমায় যেতে পারবি না। আজ বাড়িতে তোকে থাকতেই হবে। কথার নড়চড় যেন না হয়।” মায়ের আদেশ মানে মিলির কাছে ফতোয়া জারি। মিলির মুখ থমথমে হয়ে ওঠে।

সারাদিনের সমস্ত প্ল্যান বানচাল হয়ে গেল। রাগের চোটে সাপের মতন হিস হিস করতে করতে মিলি গিয়ে আছড়ে পরল বিছানায়। বিকেলে বৌ্দির ডাকেই ঘুম ভাঙল। সন্ধ্যেবেলা অভিবাসীর নায়ক ও তার আত্মীয় এসে উপস্থিত হল। ওখানে মিলি আর কোনো আপত্তি করেনি। জা্নে বেশি আপত্তি করলে, মা -এর হাত থেকে রেহাই পাওয়া বড় ফেচাং। তার আপত্তি কোনমতেই ধোপ খাবে না। হয়ত এটাই তার কপালে ছিল। দুপক্ষেরই পছন্দ হল এবং মিলি বিয়ের সার্টিফিকেট পেয়ে বিদেশের পথে পা বাড়াল। প্লেনে উঠে ঠাম্মার কথা বড্ড যেন মনে পড়তে লাগল। প্লেন তো ছুটছে মেঘ সরিয়ে। ঘষা কাঁচের ভিতর দিয়ে অস্পষ্ট ছবির মতো তাদের বাড়ির পলাশ-রাঙা, হাসিতরল দিনগুলো চকিতে তার মনের পর্দায় ভেসে উঠে ফের মিলিয়ে যাচ্ছিল। ঠাম্মার কথা মনে এল হঠাত আর ফিক করে হেসে ফেলল। একটু ডাগর-ডোগরটি হবার পর থেকেই ঠাম্মার কাছ থেকে শুনে আসছে পতি পরম গুরু।

-দিদিভাই, যতই পড়াশুনা করো না কেন, বিয়ে মেয়েদের করে ফেললেই আর কোন চিন্তা থাকে না। নয়ত চারিদিকের হায়নারা খুবলে খুবলে খাবে।

- বিয়ের পরেই যে হায়নারা খুবলে খাবে না, তার কি কোন প্রমাণ আছে? সই? মিলি তার ঠাম্মার গালদুটো টিপে বলেছিল তখন। ফর্সা গাল লাল হতে দেখেছিল মিলি। কিন্তু ঠাম্মা কথা ঘুরিয়েই নাতনির মাথায় একটা চুমু খেয়ে বলেছিলেন, “চুপ কর তো ছুঁড়ি। আজকাল কার মেয়েগুলো বড্ড এঁচোড়ে পাকা।” ঠাম্মার কথাগুলো হাঁচোড় পাঁচোড় করছে হঠাত। মনে মনে বলে উঠল, “তোমার কথাই সত্যি হল যে সই। তুমি থাকলে আজ যে কী করতে, তা আমার ভালভাবেই জানা আছে।”

সারাদিন সংসারের কাজ আর বাড়ি সামলাতে সামলাতে মিলি ভাবে, এই জীবনটাকে কি সে টেনে নিয়ে যেতে পারবে শেষ দিন পর্যন্ত্য? তাও এই বিদেশের বাড়িতে পূজা-আহ্নিক ইত্যাদি সারা হবার পর দ্বিপ্রহরেই অতি যত্নে আহার্য প্রস্তুত করেছে মিলি। তারপর সোফায় গিয়ে বসে টিভি্র বাংলা চ্যানেলটা খুলে দিল। আজকাল তো বোতাম টিপলেই একেবারেই ঘরের মেয়ে হওয়া যায়। মুখ নিচু করেই সোফার ওপরে পা দুটো উঠিয়ে দিল। তারপর দুই হাঁটুর ভেতরে থুতনিটা গুঁজে বসে ভাবছিল মিলি, নিজের দেশটাই ছিল সবচেয়ে ভাল। এখানে যেন বড্ড টেনশন আর ডিপ্রেশন। অনেকেই চাকরি করে। ঘরে বাইরে কেবল কাজ, আর কাজ। অবসর নেই কোন। হপ্তান্তে মাঝে মাঝেই গ্রুপ পার্টি তাই লেগেই থাকে। সেখানে দেখে যারা কাজ করে তারা কত সাবলীল। এসব দেখে মিলির চাকরি করার খুব সখ হল। এখানে অল্প বিদ্যেতেও চাকরি পাওয়া যায় শুনেছে বান্ধবীদের কাছে। এটা শোনার পর থেকেই ওর মনের শুকনো মাটিতে নববর্ষার কিঙ্কিনী, মনের নদীতে জলের ছলছলাৎ শব্দেরা নেচে উঠেছে। স্বামীর কাছে বেশ আবদার করেই তাই চাকরি করার কথাটা পাড়ল। স্বামীর মুখে নিঃশব্দ হাসি ফুটে উঠল। চোখ নাচিয়ে বলে উঠল, 'কত ধানে কত চাল জানো?'

মিলি ও তার তুরুক জবাব দিল, “মেপে দেখিনি তো, জানব কি ভাবে? আর আমার জেনেও দরকার নেই। কাজ করার ইচ্ছে হয়েছে তাই তোমায় জিগেস করছি।”

স্বামী হেসে বলল, “যাবে যাও। কাজ খোঁজো, ইন্টারভিউ দিতে থাকো। ডু ইওর বেস্ট। ”

-কি রকম মানুষরে বাবা! মনে মনে বলে একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলল মিলি। মনে যে ছোট্ট ঘাসটা জন্ম নিয়েছিল, সেও কেমন যেন নেতিয়ে পড়ল। জীবনে এক -একটা সময় আসে যখন মানুষকে স্বীকার করে নিতেই হয়, প্রথম আর চলতির মধ্যে প্রথমটাই বেস্ট। আমাদের একজন বড় দার্শনিক বলেছেন- “ক্ষেতে জল দিতে হলে জলাধার থাকে উঁচু কোন যায়গায়, জলটা ক্ষেতে আসার চেষ্টা করে, একটা দরজা দিয়ে তাকে আটকে রাখা হয়। কিন্তু দরজা খোলামাত্র জল আপনধর্মে ছুটে যায়; পথে যদি ধুলো-কাদা থাকে, জল তা ধুয়ে চলে যায়। কিন্তু মানুষের এই স্বর্গীয় প্রকৃ্তি প্রকাশের কারণ বা ফল-কোনটাই ঐ ধুলো-কাদা নয়। এক আকস্মিক ঘটনামাত্র, অতএব এর সমাধান আছে।

তাও আরেকবার ইন্টারভিউর নাম শুনে মিলি আবার আঁৎকে উঠল। ঘরের আশেপাশে কোথাও তীক্ষ্ণ শিস দিয়ে ডেকে উঠল মকিংবার্ড।

'ওরে বাবা! ইন্টারভিউ?' মনে পড়ে গেল বিয়ের আগের ইন্টারভিউ-এর কথা। কত ইন্টারভিউ দিতে হয়েছে তাকে! তার পরেই তার রেজাল্ট-এর জন্য চিন্তা। বাবা-মা -এর উপাংশুকথন। নিজের মনেই প্রশ্ন করল, আচ্ছা এখানে এত প্রবাসী বাঙালি বধূ এরা সবাই কী তাদের ঠাকুরমার কথা না শুনে পা ছড়িয়ে খেতে বসত, নাকি? মনে পড়ল ওর বিয়ের জন্য মা -বাবার কত চিন্তা, কত খরচা, আড়ালে আবডালে ফিসফিসানি। অথচ এখানে অনেক বাবা-মাকেই বলতে শোনে, “ছেলে -মেয়ের জন্য চিন্তা করি না, ওদের যখন সময় হবে ওরা নিজেরাই নিজেদের সাথি বেছে নেবে। শুধু আমাদের শুনতে বাকি যে, “উই আর রেডি নাও। চার হাত এক করে দেওয়া আমাদের কাজ।” মা-বাবার মনে যেন কত শান্তি। বেশ গর্বের সাথেই কথাগুলো বলেন ওনারা কিন্তু! আমাদের বাবা-মা-এর সাথে অনেক তফাৎ এনাদের। শুধু তাই নয়, ঝক্কিও কম। দেশের মতো অত জলখাবারের জন্য ডলারও গচ্ছা যায় না। এদিক ওদিক ছুটতেও হয় না পাত্র-পাত্রী খুঁজতে। মিলি নিজের মনেই ভাবতে লাগল, অনেক নিয়মই ত এখন পাল্টাচ্ছে! এটাই বা পাল্টাবে না কেন? হয়ত পালটিয়েছে-কিন্তু তার ক্ষেত্রে পালটায়নি।

এরকমও তো হতে পারে-পাত্রী যাবে পাত্রের ইন্টারভিউ নিতে ? আজকাল তো চাকরির ক্ষেত্রে অনেক মহিলারা পুরুষের ইন্টারভিউ নেন। চাকরির ইন্টারভিউ আর সম্পূর্ণ নতুন পরিবারে পদার্পণ করার যে ইন্টারভিউ মোটামুটি দুটোই তো প্রায় একই ধাঁচের। চাকরির ইন্টারভিউতে পাশ করলে পকেটে মা লক্ষ্মী(টাকা) বিরাজ করেন আর বিয়ের ইন্টারভিউ তে পাশ করলে ঘরে মা লক্ষ্মী(বৌ) বিরাজ করেন। এটাই শুধু যা ইন্টারভিউ এর ইসপার আর উসপার। যান্ত্রিক ডিজিটালের যুগে চলাফেরা করছি আমরা। কিন্তু আমাদের অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে অনেক সময়ে বহু মাইল পেছনে।

ইন্টারভিউ দেওয়া ও নেওয়ার পদ্ধতি যদিও প্রায় একই তবুও তার মধ্যে দুটো বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। একটাতে জুতোর শুকতলা ক্ষয়ে যাওয়া আর একটাতে অভিভাবকদের জলখাবারের পয়সা বেশ কিছু গচ্ছা যাওয়া। কাজ তাতে সফল হোক আর নাই হোক। 'এক দানে ছক্কা না হলেই অক্কা।' কথাটা মিলি রেগে গেলে নিজের মনে নিজে নিজে আওরায় ছন্দে মিলিয়ে। লুডো খেলার মত যতক্ষণ না ছক্কা পড়ে ততক্ষণ ঘুঁটি ঘর থেকে বের হয় না। ডাইস চেলে যেতে হয়। তেমনি যতক্ষণ না ইন্টারভিউতে পাশ করে রেজাল্ট পাওয়া যায় ততক্ষণই ইন্টারভিউ দিয়ে যেতে হয় নানান যায়গায়। পছন্দ মত হলে হায়ার তা না হলে জিরো টায়ার-রিজেক্ট।

সত্যি কথা বলতে কি ইন্টারভিউর নাম শুনলে নার্ভাস হয় নি, এরকম মানুষ কিন্তু খুব কমই শোনা যায়। কর্মক্ষেত্রের জন্যেও ইন্টারভিউ দিতে গেলে কিছু কিছু জিনিসের প্রতি সচেতন হতে হয় যেমন রেজুমে, কভার লেটার, সার্টিফিকেটস, হ্যান্ডশেক, স্মাইল, ড্রেসকোট, কোয়ালিফিকেশন, এ্যপিয়ারেন্স, এবং আরো কিছু। জুতোর শুকতলা ক্ষয়ে গেলেও চট করে চাকরি পাওয়া সহজ হয় না, ম্যানার্স এর ঠেলায় অন্ধকার। যদিও মিলিকে তখনও পর্যন্ত জুতোর শুকতলা ক্ষোয়াতে হয় নি। বিদেশে আসতে যে ইন্টারভিউ দিতে হয়েছিল তাতেও এত ভুগতে হয়নি।

মিলি আজকাল সময় পেলেই একটার সাথে আর একটার তুলনা খোঁজে। খুঁজেও পায় তার সমাধান। বৈবাহিক ইন্টারভিউ-র কথাও তো এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারে যাওয়ার ইন্টারভিউ। অনেকটা নতুন কাজে যুক্ত হওয়ার মতই। বাঙালির-অবাঙালির এই নীতি যুগ যুগ ধরেই চলে আসছে। পালটানো সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবহমান বাঙালি জীবন এখন যদিও গ্লোবাল, তাও তো শুনতে পাওয়া যায় এখনও বর্তমান নানান ঝক্কির এই ইন্টারভিউ। আজকালকার গ্লোবাল বাঙালির মেয়ে হয়েও মিলি কিন্তু তার থেকে রেহাই পায় নি। কে বা কারা পেয়েছে তারও হিসেব নিকেশ করার চুলচেরা বিচারের পক্ষপাতি সে নয় এখন। যদিও মিলি জানে ভবিষ্যৎ কথা বলিয়ে নেয়। যা সহজ, সরল, স্বাভাবিক, তাই তো চিরকালের। অস্বাভাবিক কোনকিছুই চিরকালের হয় না, হতে পারে না। তাও একটু রদ বদল হোক না ।

 

মিলির ইন্টারভিউ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments