ফেরাম সাম্রাজ্য, —- মানুষরা যাদের বিশুদ্ধ লোহার ধাতু বলে জানে, তার ভেতরে কিলবিলোচ্ছে মুক্ত লৌহ-ইলেকট্রনের দল। লোহার মতো কঠিন মন বলে ফেরাস বা ফেরিক আয়নদের দাপটে ইলেকট্রনগুলো বেশী চালিয়াতি মারতে পারে না বটে, তবে মনে রাখতে হবে, ইলুদের মতো সুযোগ-সন্ধানী জাতকণা আর দ্বিতীয়টি নেই। আর ঠিক সেই কারণেই, আমি যখন ব্যাটারির নেগেটিভ প্রান্তটা লোহার পেরেকে ঠেকিয়েছিলাম, লৌহ-ইলেকট্রনরা চেঁচিয়ে উঠেছিলো বীভত্স উল্লাসে!

এমনি যদি লোহার পেরেক, ব্যাটারি বা তামার পাত ছাড়া, ডোবানো থাকতো কপার সালফেটের জলীয় দ্রবণে তাহলে ফেরাস আয়নরা পেরেকের ইলেকট্রনদের মোটে গ্রাহ্য না করে জলে ঝাঁপিয়ে পড়তো, ইলুর দল কাঁদতো, তাদের সে কান্না দেখে কিউপ্রিকের দল যেই না জল থেকে মাথা বাড়িয়ে জিগ্গেস করতো ‘কাঁদো কেন, খোকারা?” ব্যস আর দেখতে হতো না, কপ্ করে গিলে নিত তাদের লৌহ-ইলেকট্রনেরা! লোহার পেরেকে লেগে থাকতো কিউপ্রিকদের বিজারিত দেহাংশের বাদামী দাগ!

আজো ঠিক সেটাই ঘটছিলো, তবে অন্যভাবে। নেগেটিভ লোহার পেরেকে আজ বেড়ে গেছে ইলেকট্রনের দল! বুক ঠুকে আজ তারা বজ্রনির্ঘোষ করছে। ফেরাস বা ফেরিক আজ আর রক্ষে পাবে না, মুক্ত হতে দেবে না কোন পজিটিভ আয়নকে পেরেক থেকে! শুধু তাই নয়, টান মারবে দ্রবণের পজিটিভ কিউপ্রিক আয়নদেরও।

তামার ধাতব কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে যে খুশীতে ছিলো কিউপ্রিকদের দল, সেই খুশী ইতোমধ্যে বদলে গেছে আতঙ্কে। কিসের টানে তারা মুক্তি লাভ করেছে তামার পাত থেকে সেটা এবার প্রোটনে প্রোটনে টের পাচ্ছে! বুড়ো কিউপ্রিক ঠিক বলেছিল বটে, মুক্তির তাহলে দাম দিতে হয়!

তারপর আর কী! সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আমার আর কিছু করার ছিলো না। দ্রবণের ভেতর দিয়ে একের পর এক কিউপ্রিক আয়ন লেমুরের মতো এগিয়ে গেছে ক্যাথোড অর্থাত্ নেগেটিভ তড়িতের রাজ্যের সিংহদুয়ারের দিকে। সৃষ্টির আদিকাল থেকে বিপরীতের মধ্যে আকর্ষণ চলে আসছে। যেমন চুম্বকের উত্তর দক্ষিণ, তেমনি পুরুষ মহিলা, তেমনি পজিটিভ নেগেটিভ আয়ন বা চার্জ! তারপর যা হয়, কিউপ্রিক বীরের দল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে নিজেদের পজিটিভত্ব, তামার ইলুদের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে লোহার ইলুদের খপ্পরে পড়েছিলো।

শেষ পর্যন্ত দেখিনি, তবু আমার দেখা শেষ কিউপ্রিক আয়নটা লোহার পেরেকের গায়ে ঠোক্কর খেয়ে বিজারিত হতে হতে বলে গেল, “দেখলেন তো ভগবান শ্রী চলমান পাহাড়, মুক্তির ফাঁদ ছিলো এটা, আপনি জানতেন, তবু বলেন নি, মুক্তি পাওয়ার পর সে মুক্তির দাম দিতে হয়। ইলুর দল সেই ফিরে এলো, অন্য দলের চিহ্ন নিয়ে। কি করবো আমরা! কতবার স্বাধীন হবো ভগবান, পরাধীন হবার জন্য!”

লোহার পেরেকের যে অংশটা কপার সালফেট সলিউশনে ডুবে ছিলো, সেখানটা বিজারিত কিউপ্রিক আয়নদের বর্ণে বাদামী হয়ে গেছিলো। কোটিং পড়েছিলো ধাতব তামার, পূর্বজন্মে যারা ছিল বীর স্বাধীন কিউপ্রিক। লৌহগারদের উপরে থাকা সেই ধাতব তামার ভেতর থেকে ধ্বনিত হলো-

“আমার মুক্তি সর্বজড়ের মনের মাঝে,
জারণ বিজারণ তুচ্ছ করা কঠিন কাজে”

না, এইসব গাঁজাখুরি তড়িত্লেপনীয় দর্শনের কথা সোহিনী কেন, কোন ক্লাসের কারুর কাছে আর ফাঁস করিনি, এই জানালাম আপনাদের, আশা করি এ জিনিস অভিভাবকীয় কর্ণকুহরে যাবে না, নয়তো কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের মস্তিষ্ক চর্বণের অভিযোগে আমার বিজারণ অবশ্যম্ভাবী।

****বিজ্ঞান সমাপ্ত হয়না****

©শ্রুতিসৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়

মুক্তির দামঃ চতুর্থ তথা অন্তিম পর্ব
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments