সোহিনী যখন আমাকে কিউপ্রিকদের উপর ইলুদের মানে ইলেকট্রনের অত্যাচারের কথাটা বলেছিলো তখন আমি খুব হেসেছিলাম। আমার ক্লাস এইটের ছাত্রীটি পড়ার সময় পড়ার এতো গভীরে ঢুকে যেত যে পরমাণু, অণু বা আয়নদের কথা শুনতে পাবার দাবী করতো। অবশ্য ক্লাসের মধ্যে ওই কথাগুলো ও আমায় জানাতো না, জানাতো মিড ডে মিল খাবার সময় কিংবা ছুটির পরে আলাদা করে। তামার তারে কান পেতে শুনতো ও ইলেকট্রনরা কি বলে! আমায় শোনাতে গিয়ে কতবার যে ধমক খেয়েছিলো তার ইয়ত্তা নেই।

আসলে সেদিন ওদের বুঝিয়েছিলাম ধাতুর ভেতরে ইলেকট্রনরা কেমন মুক্ত ভাবে চলাচল করে, তারা ইলেকট্রনের একটা সমুদ্র তৈরী করে যাতে ধাতব আয়নগুলো থাকে ভেসে। এর পরে কোনদিন তড়িত্ বিশ্লেষ্য আর ধাতব পরিবাহীর মধ্যে তফাত্ বুঝিয়েছিলাম। শেষে এই সব বলে তামার পাত আর লোহার পেরেক দিয়ে কপার সালফেট দ্রবণের তড়িত্ বিশ্লেষণ দেখানোর কথা ছিলো আমার। সোহিনী কিন্তু চোখ গোল গোল করে সব শুনলো আর বললো, স্যার বিশ্বাস করেন আর নাই করেন, ওরা খুব ছটফট করছে।

আমি বললাম, কারা রে?

ও বললো, ওই যে আপনি কপার পাতটাকে নীল রঙের কপার সালফেটের জলীয় দ্রবণে চোবালেন, ওতে ওই পাতের কিউপ্রিক আয়ন গুলো ভাবলো, নীল বৃষ্টি হচ্ছে, আর বাইরের ছুটন্ত কিউপ্রিক আয়নদের ভিড়ে ভেতরের আয়নগুলো বেরবে বলে ছটফট করছে!

আমি হাসলাম, ‘তো বেরতে পারছে না কেন?’

ও বললো, ‘পাজী ইলেকট্রনগুলোর জন্য, ওরা ওদের বেরতে দেয় না’

আমি ওকে বললাম, ‘বেশী কার্টুন দেখিস না, যা ভলিবল খেলগে যা!’

সোহিনী বললো, ‘আপনি একটু কম শব্দ হওয়া জায়গাতে নিয়ে যান, ওরা আপনার সাথে কথা বলবে, দেখবেন!’

আমি ছুটির পর ল্যাবে বসে ভাবছিলাম, মেয়েটা কি সুন্দর কল্পনা করে, আর ভোল্টামিটার, যাতে তড়িত্ বিশ্লেষণটা দেখাচ্ছিলাম, তাতে হাত দিয়ে দেখলাম। তামার একটা পাতলা পাত কপার সালফেটের নীল জলীয় দ্রবণে ডুবিয়ে রেখেছি, আর ভাবছি কিউপ্রিক আয়নগুলো কি সত্যি ছটফট করছে! ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ওখানেই তা জানি না।

ঘুম ভাঙলো কিছু একটা শব্দে, যেন অনেক লোক চেঁচাচ্ছে, কাকে যেন সবাই এক সাথে ডাকছে। ভালোভাবে শুনে মনে হলো পরিত্রাহী চিত্কার, “হে চলমান পাহাড়, হে ইলুদের মালিক, আমাদের উদ্ধার করো, মুক্ত করো। আমরা তোমার শরণাপন্ন।”

আর ঠিক এর পরেই বিদ্যুত্চমকের মতো কিছু একটা ঢুকে স্নায়ুগুলো আমার নিয়ন্ত্রণ করতে লেগেছিলো! আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম যেন তাম্রসাম্রাজ্যের আয়নদের কলরব! গরম বিকেলের দিনের ঠান্ডা করা হাওয়ার ঝাপটার মতো আমার চেতনা নাড়া খাচ্ছিলো। প্রার্থনা জিনিসটা কিভাবে ভগবানকে জ্বালায় তা বেশ উপলব্ধি করছিলাম। আমি এখন চাইলেই উদ্ধার করতে পারি কিউপ্রিক আয়নগুলোকে তাম্রজ ইলেকট্রনের কবল থেকে। মুক্ত করতে পারি, ওদের ধাতুর পাত থেকে জলের দ্রবণে এনে ছেড়ে দিতেই পারি, কিন্তু মুক্তির যে দাম দিতে হবে!

একটা দেশী ডিসি ব্যাটারি নিয়ে এলাম, পজিটিভ দিকটার সাথে তামার তার দিয়ে তামার পাতটার মাথাটা আটকে দিলাম, আর নেগেটিভ প্রান্তটার সাথে তার দিয়ে একটা লোহার পেরেক আটকে সেটাকেও কপার সালফেট সলিউশনের মধ্যে রেখে দিলাম। তামার পাতের ভেতরে যে ইলুর দল মানে ইলেকট্রনের দল আছে, সেই ব্যাটাদের অরি মানে শত্রু হলো আমার এই ব্যাটারি!

স্পষ্ট শুনতে পেলাম, ‘গেলো, গেলো, সব গেলো রে, ধরে নিয়ে গেলো ইলু-রাজাকে, হায় হায়!’ লক্ষ লক্ষ ইলেকট্রনিক ক্যাঁচড়ম্যাচড় শব্দে আমার অডিটরি স্নায়ুর সাইন্যাপসে সাইন্যাপসে ইলুর দল নাচানাচি করতে শুরু করে দিয়েছে! সমস্ত জড় আর জীব কি তাহলে এক সূত্রে গাঁথা? উত্তর পাই নি। ব্যাটারা ব্যাটারির পজিটিভ মেরুর টানে পড়ে কাতর আর্তনাদ করতে করতে ছুটছে। তামার পাত থেকে ইলেকট্রন শুষছে ডিসি ব্যাটারি!

@ শ্রুতিসৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়

মুক্তির দামঃ দ্বিতীয় পর্ব
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments