না পারতে আমি সেরকম মুখ খুলি না, খুললে পরেই এমন সব বাজে এবং অসংসদীয় কথা বার্তা বেমালুম বেরিয়ে যায় যে পরবর্তী কালে নিজেই বেজায় বিব্রত বোধ করি। শুনেছি মুখের কথা আর ধনুকের বাণ, একবার বেরুলে আর সেরকম কিছু করার থাকে না ! তার চেয়ে বরঞ্চ 'সামাজিক মাধ্যমে' সভ্যভাবে লেখালিখি করলে দেখেছি সমাজমুখী সব সামাজিক জীবেরা তা ঝটপট পড়ে ফেলে , আবার না পড়েই হয়ত কখনো সখনো লাইকও ঠুকে দেয়। একটি রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের বিরুদ্ধে লিখলাম, অমনি সেই দলের এক ডেডিকেটেড সৈনিক সেটা দুমদারাক্কা লাইক করে কমেন্ট করলো , "জিও গুরু কি লিখেছো !!" তবে মজার ব্যাপার এই যে , সে লেখা চাইলেই এডিট করা যায় , ডিলিট করা যায় এমনকি মায় হাইডও করা যায়। মুখের কথা এরকম হুট করে পাল্টে ফেলাটা কি মুখের কথা নাকি ! এই গরমে ঘাম ঝরিয়ে নিজের গায়ের বোটকা গন্ধ সহ্য করে কত কি যে লিখি, এত কিছু কি আর নিজে মুখে কাউকে এমন ভাবে বলতে পারতাম? পাঠশালায় গুরুমশাই যখন জিজ্ঞেস করেছিল যে, "কি হে , বল দেখি অম্লশূল না কোষ্ঠকাঠিন্য , কোনটা বেশি বেদনাদায়ক?" আমি স্রেফ স্লেটে লিখে সে প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলাম , "দুটোর কোনটাই না , সবচেয়ে বেদনাদায়ক সারাদিন ধরে মানসিক ভারসাম্যবিহীন এক গুরুর বচন হজম করা !" গুরুমশাই বেত মেরে পিঠের অর্ধেক চামড়া তুলে দিয়েছিলেন আর বাকিটা তুলেছিলেন আমার বাবা। ইডেন উদ্যানের মত ফাঁকা চামড়া গোটানো পিঠ ও ভাঙ্গা স্লেট নিয়ে কদিন আমি যে কিরকম ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেরিয়েছিলাম সে সুধু আমিই জানি আর জানে বক্রেশ্বর কুন্ডুর নাতি। বক্রেশ্বর কুন্ডু বেজায় রাশভারী লোক , তার নাতি অবশ্য একদমই সেরকম ছিল না। সে আমার ক্ষত বিক্ষত পিঠে গাঁদা পাতার রস লাগাতে লাগাতে বলেছিল যে এ দুনিয়ায় নাকি চুপ করে থাকলে কারো এ হেন দুর্দশা হয় না। আমিও ততক্ষনাত তাকে সাক্ষী রেখে জং ধরা পেরেকে তিন বার থুতু লাগিয়ে প্রতিজ্ঞা করিছিলাম যে আমি আর না পারতে মুখ খুলবো না !

অদ্ভূত ভাবে সেই ঘটনার পর থেকে এই এতদিন পর্য্যন্ত আমার মুখ অদৃশ্য এক ফেভিকুইক দিয়ে আঁটা ছিল ! সুধু কলকাতার গরমে যা ঘাম হয়, তাতে সে আঠাও ক্রমশ আলগা হয়ে পড়েছে। অজান্তেই ফাঁক বুঝে এদিক সেদিক দিয়ে সেই লাগামছাড়া শব্দ গুলো ছররার মত ছিটকে যাচ্ছে। বেশ টের পাচ্ছি যে এই পাক সমাজকে কলুষিত করার দায় তিলে তিলে শেষমেশ এই আমার ওপরই এসে পড়ছে। কিন্ত কি করব , না বললেই যে নয় , তাহলে বলি সে চেয়ার ধরার গপ্প ! জনৈক অনুষ্ঠানবাড়ি , পৈতে বা শ্রাদ্ধ হয়েছে, বিয়ে বা অন্নপ্রাশনও হয়ে থাকতে পারে, ছাতের ওপর খাওয়ার জায়গাতে সুধু দৃশ্যটা অনুষ্ঠানের রকমফেরে খানিকটা একইরকম ! হাড় হাভাতে বাঙালি জড়ো হয়েছে পাত পেরে খাওয়ার জন্যে , আগের ব্যাচের শেষ পাতে চাটনি দই শেষ করার আগেই চেয়ার ধরে ফেলেছি আমি । বেশ চোরাগোপ্তা ধরাধরি চালাচ্ছি , সবাই ধরছে তবু টের পেতে দিচ্ছে না তাই আমিও দিচ্ছি না । এদিক সেদিক গল্প করছি আর দু আঙ্গুলে পাঞ্জাবির বোতাম ঘোরাচ্ছি । মুখ দেখে বোঝবার উপায় নেই যে কে কিভাবে পা দিয়ে চেয়ারের পায়াটাকে অদৃশ্য ভাবে ছুঁয়ে রেখেছি আমি , হাতে বিশ্বাস দেশেরই নেই তো আপামর জনগণ কি আর করবে । এজেন্ডা অনেকটা এরকম যে শালা সিট ছাড়লেই জানোয়ারের মতন হামলে পড়ব। এমন সময় হরলিক্স লেন্সের চশমা পরা বয়োজেষ্ঠ কেউ এসে দুম করে সেই ধরা সিটে বসে পড়ল। কাঁপা কাঁপা হাতে আগের ব্যাচের দেওয়া প্লাস্টিকের গ্লাসের জলে হাত ধুয়ে ভুল করে এঁটো পাতের কোণে রাখা মাছের তেল তুলে দাদু বলল , "এঃ বেগুনিটা কেমন নেতিয়ে গেছে !!"

বললাম না মুখ খুললেই ২৪X৭ বাওয়াল বাধবে। মামা একবার বলেছিল না পারতে ধার দিবি না, যত পারবি ধার করবি। নরানাং মাতুলোক্রমঃ অতয়েব ব্যাঙ্ক থেকে প্রচুর লোন করলাম। গাড়ি, বাড়ি, বিয়ে, এমবিএ , ট্যাব , চিমনি, ইনভার্টার, এলইডি, ব্যাংকক সবই ধারে হলো। ধার শোধ দিতে গিয়ে অবশ্য বেশ টের পেলাম যে সুখ ,শান্তি, বিশ্বাস , ভালবাসা, আন্তরিকতা , স্নেহ সব কিস্তির সাথে সাথে বেরিয়ে যাচ্ছে। ওই যে বললাম মুখ খুললেই বিপদ! ক্লাসে ফার্স্ট বয়ের মা পরীক্ষার আগে ছেলেটিকে বলেছিল,"কাউকে কিছু দেখাবে না , পারলে অন্যের খাতা দেখে নিজের ভুলটা শুধরে নেবে চুপি চুপি , কেমন !" ছেলে আজ আমেরিকায় অন্যের খাতা দেখতে ব্যস্ত তাই তার ক্যান্সারে আক্রান্ত মাকে সে আর দেখতে আসতে পারছে না। আমেরিকায় ঐশ্বর্য্য আছে, পোড়া বাংলাদেশে আছে কেবল ঘুঁটে আর মশা। আছে নিদারুন করাপ্সান আর দিনের শেষে চরম হতাশা। ওই যে বললাম মুখ খুললেই ঝামেলা। ঝামেলা মানেই আবার আজকাল রাজনৈতিক থেকে অতি রাজনৈতিক হয়ে যায়। সবাই মরার আগে থেকেই মারার প্ল্যান ছকে নেয় , ডাবল বেনিফিট ইন সিঙ্গেল ইনিশিয়েটিভ ! করতে গিয়ে লড়তে হয়, আর লড়তে গেলে মরতে হয়। ঘেমো গরমে জলে ভেজা পান্তা ভাতের মতন সহজ সমীকরণ, বোঝা বা বোঝাবার মতন এতে কিসসু নেই।

নাঃ এর পরে যদি হুস করে বলে ফেলি যে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার না হলে ভবিষ্যতটা শুটকি মাছের ঝুরোর মত ঝরঝরে হয়ে যাবে , তাহলে বোধহয় বলাটা সুধু বলার জন্যে বলা হয়ে যাবে। অনকে কিছু আছে বলার মতন সবাই জানতে চাইলেই সেই না বলতে পারা কথাগুলোকে নয় আবার বলার মত করে বলব পরে ।

পুনশ্চ: hypocrite-এর বাংলা সমার্থক শব্দ কি?

মুখ খুললেই
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments