এই পর্বে লিখছেন সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়। পেশায় পরিবেশ বিজ্ঞানী, নেশায় লেখিকা। তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং ওয়েবজিনে।

 

কবি নারীকে বলেছেন, “ অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা”-আবার সেই নারী কেমন করে নিজেকে ধ্বংস করে উন্মাদনা ছড়িয়ে দেয় সারা ভুবনে। পড়ে থাকে তার নামে রাঙা ভাঙা পদচ্ছাপের প্রতিষ্ঠান, পড়ে থাকে তার জল সরে যাওয়ার মতন বড়ো-ছোট স্মৃতি, অভিমান।

শরৎচন্দ্রের মেজদি ছিলেন বাড়ির মেজবৌ, ছিলেন গুরুগম্ভীর, ছিলেন অত্যধিক স্নেহপ্রবণা। আর আমি আজ যে মেজদি-র কথা বলব-সেই মেজদি ছিলেন না কোনো বাড়ির গৃহবধূ, না ছিলেন কারুর মা- কিন্তু তিনি ৩০ শে পা দেবার আগেই দুই ছোট্ট ছোট্ট ভাই-বোন কে কোলে টেনে নিয়েছিলেন নিজের সন্তান ভেবে। প্রশ্ন উঠবে কেন?

আপনাদের কাছেই তুলে ধরছি সেই “মেজদি” কে–আপনারাই বলে দিতে পারবেন তিনি কেমন ছিলেন-কি ছিলেন…

মায়ের অকস্মাত মৃত্যুতে বাবা যখন অসহায় হয়ে পরেছিলেন কোলের দুই শিশুর দেখভাল -এর চিন্তা  করে- তখন ই 'মেজদি' হয়ে উঠলেন এক অসামান্যা মা যশোদা। বাবাকে স্পষ্ট জানিয়েছিলেনঃ “ আজ আমার ১৮ বছর বয়সে বিয়ে হলে এদের মতন(দুই শিশুকে দেখিয়ে) ছেলে মেয়ে হত। আরো বলেছিলেন যে, ভাইদের বিয়ে হলে সেই ভাতৃবধূরা কি স্নেহ ভালবাসা দিতে পারবে এই অসহায় দুই শিশুকে? কতখানি ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি এই আত্মত্যাগ স্বীকার করেছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, তা লিখে প্রকাশ করা কোন মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্যকর। অত্যধিক আত্মবিশ্বাস থাকলে তবে এমনি কথা বলতে পারেন এক যুবতী। আর সব ভাইবোনদের মুখ চেয়ে আর কোনদিন-ই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন নি… না কোনদিন নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছিলেন।

না… না! তিনি অশিক্ষিতা ছিলেন না—একটা নয় দু দুটো বিষয়ে মাস্টার্স করেছিলেন। আর ছিলেন নানারকম গুণের অধিকরিণী। ছিলেন এক অসামান্যা নারী যাঁর সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে হাত একটু কাঁপে বৈকি। ব্যাকরণ-শূন্য প্রাণ ভরে নেয় প্রত্যক্ষ মন্দিরের চুড়া।

তিনি ছিলেন শ্যামলা বরণ কাজলা মেয়ে। আর ছিল তাঁর মেঘ রাশির মতন এক পিঠ কালো জ্যোৎস্না মাখানো চুল।   তাঁর ডাগর দু চোখ ছিল সেই রবি ঠাকুরের কবিতার এক 'আদর্শ নারী' যাঁকে দেখলে  সহজেই গেয়ে ওঠা যায়-

“কৃষ্ণকলি আমি তাকেই বলি-বলে তাকে সারা গাঁয়ের লোক।

 ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটেই……

 কালো… তা সে যতই কালো হোক।”

এই মেজদির কালো রং নিয়েও বেশ মজার গল্প আছেঃ

এই মেজদি বিহারে যখন ছিলেন তখন স্কুলের উঁচু শ্রেণিতে পড়ার দরুণ শাড়ী পড়তে হত। তিনি লাল শাড়ী পরে এলোচুলে সরস্বতী পূজার দিন আর সব বান্ধবীদের সাথে যাচ্ছিলেন স্কুলের পূজো দেখতে।  রকে বসে থাকা  কিছু ছেলে তাঁকে দেখে বলে ওঠেঃ “দেখেছিস দেখছিস -মা কালি যাচ্ছে। কালো মেয়ের পায়ের তলায় নাচে কত মানুষজন।”

এই ছেলেদের মধ্যে একজনের লন্ডন যাবার সময় বাবা-মা রা বিয়ে দিয়ে বিলেত পাঠানোর কথা উঠলে-তিনি একবাক্যে বলেছিলেন জ্যাঠামশাই-এর মেজমেয়ের জন্য তোমরা একবার জ্যেঠিমাকে বলে দেখতে পারো।  এর থেকে কি বোঝা যায়?

-বোঝা যায় এই মেজদি কুৎসিত থাকা তো দূরের কথা বেশ সুন্দরীর পর্যায়ে পড়তেন না হলে তখনকার দিনে বিলেত যাওয়া ছেলে কেন-ই বা পছন্দ করবে মেজদিকে।

বলা হল না- ছেলেরা তাঁকে রাগালে তিনি -তাদের কাছে গিয়ে নিজের পায়ের এক পাটি  চটি খুলে সেই ছেলেটি যে মেজদিকে “মা কালি” বলেছিলেন সোজা তার গালে সপাটে কষিয়ে দেন। বান্ধবীদের বারণ তিনি শোনেন নি ।  এমনি অত্যন্ত দুঃসাহসী ছিলেন। মেজদির বাবা ছিলেন রেলের এ্যাকাউন্টস অফিসার। কাজেই ওনারা থাকতেন বিহারে মুঙ্গের জেলার জামালপুর শহরের সাহেব পাড়ায়। বাবা ছিলেন খুব রাশভারী-তাই তাঁর বান্ধবীরা বারণ করেছিলেন এই জন্য যে, হয়ত মেশোমশাই রেগে গিয়ে মেজদির পড়াশুনা বন্ধ করে দেবেন। মেজদি ছাড়া তো বান্ধবীরা অন্ধকার দেখবে। তাদের সুখ-দুঃখের সাথি যে এই মুনি ওরফে 'মন '।

মেজদি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে আসলে মেজদির মা মেজদিকে ধমক দেন এই অন্যায় কাজ করার জন্য। কিন্তু মেজদি অচল অটল। চুপ করে শুধু মা-য়ের বকুনি কে হজম করেন।  সন্ধ্যেবেলা বাবা অফিস থেকে আসার পরে যখন সেই চটির থাপ্পড় খাওয়া ছেলেটি তার বাবাশুদ্ধ মেজদির বাড়িতে আসেন- মেজদির বাবা সব শুনে মেজদিকে  মৃদু ভর্ৎসনা করেন- এবং ওনাদের কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন। মেজদি সেই রাশভারী বাবাকে স্পষ্ট  জানিয়ে দেন যে, “তিনি অন্যায় করেন নি-কাজেই ক্ষমা তিনি চাইতে পারেন না কারুর কাছে।  ক্ষমা যদি চাইতে হয় তবে “মা কালি” বলা ছেলেটিকেই চাইতে হবে তাঁর কাছে।  ছেলেটির বাবা  মেজদির মুখে সব জানতে পেরে ছেলেকে খুব বকেন এবং মেজদির কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন। এতো গেল মেজদির জেদ।

সিনেমার প্রথম শো -এ সিনেমা না দেখলে মেজদির ভাত হজম হত না। তাই বান্ধবীদের একছত্র নেত্রী ছিলেন মেজদি। কোন বাঁধা বিপত্তি তিনি শুনতেন না, স্পষ্ট ভাষায় মা-কে বলতেন প্রথম দিন সিনেমা না দেখলে পরের দিন সেটা পুরোনো হয়ে যায়। সিনেমার মজাটাই হারিয়ে যায়। তিনি তো লুকিয়ে সিনেমা দেখতে যাচ্ছেন না, তাহলে বাধা কোথায়? মা চুপ করে হাসেন মেয়ের যুক্তির কাছে।  তার মানে তিনি যুক্তিবাদী ছিলেন।

ছোটবেলা থেকেই এক আশ্চর্‍্য্য 'দিদি-দিদি' সুলভ আবভাব ছিল তাঁর মধ্যে।  যারাই একবার এই মেজদিকে দেখেছে -  তাদেরই মেজদির স্নেহের পাত্র -বা পাত্রী হতে বিন্দুমাত্র সময় লাগে নি। দিদি বলে একবার ডাকলেই মেজদি-র মন গলে জল হয়ে যেত।  ভুলে যেতেন তাদের সব দোষত্রুটি।

কলেজে শিক্ষয়িত্রী করতে যাওয়াও ছিল যেন একটা ভিষণ পরীক্ষার ব্যাপার।  কাক-পক্ষী ডাকার আগে মধ্যপ্রদেশের অত্যধিক ঠান্ডা, গরম-কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়তেন । কেন??? কেন না-সংসারের সবার খাবার দাবার গুছিয়ে রাখার জন্য। তাহলে তিনি সংসারী না হয়েও সংসারী ছিলেন বলতে হয়। 

গান্স এ্যন্ড এ্যম্বুলেশন  ফ্যাকট্রীতে তাঁর এক ভাই কর্মরত ছিলেন। কিসের নেশায় সেই ভাই-এর উচ্চপদস্থ বন্ধুরা (পাঞ্জাবী, মাদ্রাসী, মারাঠী) ছুটির দিনে মেজদির হাতের রান্না বিরিয়ানী আর কষা মাংস খাবে বলে এসে হাজির হতেন?  আর সদাহাস্যময়ী দিদি তাঁদের তৃপ্তি করে খাওয়াতেন।  তার মানে-তিনি রন্ধন পটিয়সী ছিলেন -ও মানুষজনকে খাওয়াতে  ভালবাসতেন। তাঁর রান্না গড়গড়া লাল মাংস আর বিরিয়ানী যাঁরা একবার খেয়েছেন-তাঁদের মুখ থেকেই শোনা যায় কত বড় পাক্কা রাঁধুনী ছিলেন।  শুধু মশলাদার রান্নাই নয়-যে কোন রান্নাতেই তিনি পটু ছিলেন।

কলেজে বাসে যেতে যেতে বুনে ফেললেন একটা সোয়েটার।  বাসে কাউকে নতুন ডিজাইনের সোয়েটার বা শাল পড়তে দেখলেই তিনি সেই ডিজাইন মাথায় হার্ডস ডিস্কে রেখে দিতেন। বাড়ী এসেই আগে সেই ডিজাইন তুলে ফেলতেন। কি সাংঘাতিক হার্ড মেমারি ছিল তা-কল্পনার বাইরে।

আর একটা ঘটনাতে বোঝা যায় তিনি কি সাংঘাতিক বোল্ড ছিলেন-

এম এ ইকনোমিক্সের রেজাল্ট আউট হয়েছে -কিন্তু কানাঘুঁষো হচ্ছে যে, যা জব্বলপুর  ইউনিভার্সিটিতে এরকম আগে কখনও হয় নি। পেপারের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্‍্য্যন্ত কোথাও কালির আঁচড় দিতে পারেন নি পরীক্ষকরা।  তাই পরীক্ষার্থিকে সাস্পেন্ড করা হয়েছে  নকল করার অভিযোগে।

পরে জানা গেল এই পরীক্ষার্থি আর কেউ নন- সবার মেজদি।  মেজদি কিছুতেই মেনে নিলেন না এই অভিযোগ-ভাইকে সাথে নিয়ে ছুটলেন ইউনিভার্সিটিতে পেপার স্কুটিনি করবেন বলে। অনেক টাকার ব্যাপার- এক ভাই তখন সুদূর আমেরিকাতেই।  কাজেই টাকার অভাব হল না।

পৌছে গেলেন নির্দিষ্ট দিনে- পেপার যখন তাঁকে দেখানো হয় মেজদি দেখলেন-সত্যি কোথাও কালির দাগ নেই।  তিনিও দৃঢ় সংকল্পচিত্তে নির্ভয়ে বললেন যে, তাঁকে যদি প্রথম লাইন ধরিয়ে দেওয়া হয় তাহলে তিনি একবার চেষ্টা করে দেখাতে পারেন যে -তাঁরা যা বলছেন তা মিথ্যা।  তাঁরাও রাজী হয়ে গেছিলেন কারণ জানতেন কোন মানুষ-ই এইভাবে দাঁড়ি, কমা মুখস্থ করে লিখতে পারে না। বিশেষ করে  ইকনোমিক্সের মতন লম্বা বিষয়-এ।

তাঁরা পরিহাসতরল হাস্যরসে যখন মেজদিকে প্রথম লাইন ধরিয়ে দেন আর মেজদি তাঁর মুখস্থ বিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে গড়গড়িয়ে দাঁড়ি , কমা সমেত ওঁনাদের কাছে উগড়ে দেন-তখন তাঁদের চোখ মুখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে ওঠে।  কোন মানুষ পারে এইভাবে মুখস্থ রাখতে বা করতে। তাঁদের মুহূর্তের ভাষা সেই মুহূর্তে স্থির অন্ধকারে।  

তাঁরা হার স্বীকার করেন এবং  টাকা ফেরত দেন। কিন্তু ইউনিভার্সিটির ভবিষ্যতের কথা ভেবে সেকেন্ড ডিভিশন দিতে রাজী হন অথবা আরেকবার পরীক্ষা দিতে বলেন পরীক্ষার ফী ছাড়াই।  মেজদি মাথা পেতে নিলেন তাঁর অত্যধিক শ্রমের পুরস্কার। এমনি ছিলেন তিনি সহানুবর্তিকা।

এই দিদি বিহারের জামালপুরে থাকাকালিন “কর্ণ-কুন্তি সংবাদ”-শ্রুতিনাটক এ কর্ণ-এর চরিত্র  করে বনফুল-এর কাছ থেকে বিশেষ প্রশংসা পত্র পেয়েছিলেন।

একটু লক্ষ্য করে দেখলেই দেখতে পাবেন কোন কিছুতেই তিনি হারেন নি জীবনে। সবদিকেই  তিনি ছিলেন পারদর্শী। ভালোমন্দ, সুখদুঃখে সম্পদে বিপদে কিছতেই তিনি চলচ্ছক্তিহীন হন নি।

আরো একটা ঘটনায় মেজদি সবাইকে অবাক করে দিয়েছিলেন বিয়ের ব্যাপারে।

মেজদিকে ভালবাসতেন প্রায় সব যুবকেরাই।  কিন্তু মেজদি তাদের মোটেই পাত্তা দিতেন না।  এদের মধ্যে ছিলেন লালটু দা বলে এক যুবক-তাঁর হঠাত রাশিয়া যাওয়া ঠিক হলে- বিয়ের জন্য সেই লালটু দার মা বাবা মেজদি দের বাড়িতে এসে বলেন বিয়ের ব্যাপারে।   মেজদির বাবা খুব খুশী-মেজদির মা-কে গর্ব করে বলেন আমার বড় মেয়েকেও বাড়ী থেকে সেধে নিয়ে গেছে আবার মনুয়া(মেজদি -কে আদর করে মেজদির মা বাবা এই নামে ডাকতেন)-কেও বাড়ি থেকে সেধে নিয়ে যেতে চাইছে। মা বাবা খুব খুশী কিন্তু তাঁদের মনুয়া তো একগুঁয়ে মেয়ে তাকে একবার না জিগ্যেস করে 'হ্যাঁ' বলাটা ঠিক হবে না।  বাবা এই কাজটা মা কে দিলেন। তার মানে রাশভারী বাবা-ও এই জেদী মেয়েকে সমীহ করে চলতেন।

মা রাতে মেজদিকে জিগ্যেস করলে-মেজদি সোজাসুজি জোরে নাকচ করে দে্ন…

কেন????

পাত্র আন্ডারগ্র্যাজুয়েট আর মেজদি তখন ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী কদিন পরেই গ্র্যাজুয়েট হয়ে যাবেন।  তিনি আন্ডারগ্র্যাডুয়েট ছেলে বিয়ে করবেন না সরাসরি মাকে জানিয়ে দিলেন বাবাকে জানাতে।  মা আকাশ থেকে পড়লেন -কত বোঝালেন এত ভালো ছেলে, অফিসের ম্যানেজারের ভাল নজরে পড়েছে সেই ছেলে তাই আজ রাশিয়ায় বড় চাকুরি নিয়ে যাচ্ছে। আর দেখতেও তো সুপুরুষ।  এরকম পাত্র কি তাঁরা আর পাবেন?

মেজদি মা বাবাকে বোঝালেন যে, বিয়ের পরে হয়ত তাঁর হবু স্বামী হীনমন্যতায় ভুগবেন। বিবাহ জীবন সুখের হবে কি তাতে? তাঁর কাছে জীবনের মানে একান্ত মধুর।

কিন্তু মেজদির একবার 'না' মানে কেউ তা 'হ্যাঁ' করাতে পারে নি কোনদিনও। অথচ, খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, নিজে তিনি কোন কিছুতেই অংশগ্রহণ করতেন না। শুধু ভাই-বোনদের প্রাণে প্রেরণার প্রদীপটিকে উজ্জীবিত করে তোলাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। বহির্মুখী ধারার সংগে মিশিয়ে দিয়েছিলেন অন্তরমুখী সাধনার ধারা। 

খুব সাজতে ভালবাসতেন এই মেজদি। ই-টিভিতে সিরিয়াল দেখে শাড়ির আলোচনা করতেন ভাই-ইয়ের বৌদের সাথে।  দেশে কেউ গেলেই তাকে বলে দিতেন টিভি সিরিয়ালে দেখা সেই বিশেষ শাড়ীটির কথা।

এই 'মেজদি'- যে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তা কল্পনাতেও বুঝতে পারি নি কেউ। এত আমোদপ্রিয়া মানুষ খুব কমই দেখতে পাওয়া যায় । 

এই মেজদি সকলকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে হাসিমুখে বিদায় জানালেন ২০১৩ সালের ২১ শে সেপ্টেম্বর। দুরারোগ্য ব্যধি ডায়বেটিসে তাঁর অকালমৃত্যু হয়। কেনো একা একা চলে গেলেন এইভাবে, বলেও গেলেন না। পেছনে পা টিপে টিপে নেমে আসে ছায়া, ছায়া নয়, ছায়ার তরণী। বলেনঃ  “কানামাছি খেলছি, আছি আমি, এখানেই আছি”। 

এই হলো আমাদের পরম আদরের মেজদি আর আমাদের ছোট দুই ভাইবোনের “মাতৃসমা দিদি”। জানি কোন কিছুই কারুর জন্যে থেমে থাকে না। একদিন সব আবার চলমান হয়ে ওঠে। কবি বিহারীলাল -এর “সাধের আসন” থেকে তবু বলি আমরাঃ

তোমার সে আসনখানি

আদরে আদরে আনি,

রেখেছি যতন করে চিরদিন রাখিব।

এ জীবনে আমি আর

তোমার সে সদাচার,

সেই স্নেহমাখা মুখ পাশরিতে নারিব।”

আজ আমরা সত্যি বড় একা হয়ে পড়েছি। কার কাছেই বা আমাদের সুখ -দুঃখের কথা বলব? কাকেই বা আমাদের অভিমান -ভালবাসা জানাবো। তাই আজ সারা জীবন ধরে চলবে “মেজদির” অনুসন্ধানঃ

“নয়ন সম্মুখে তুমি নাই

নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই ।”

পুরানো দিনগুলো কেটে গেছে স্বপ্নের মতো। স্মৃতির সরণি বেয়ে চলে যেতে যেতে ইচ্ছে করে সেই দুই যুগ আগে রূপকথার বাড়িটিতে।  আমাদের কাছে এখন সব গল্প। দুর্লভ স্মৃতি যখন আমাদের বুকে মৌণ বেদনা হয়ে গুমরে গুমরে ওঠে ঠিক তখন আমাদের সবার প্রিয় মেজদি মিশে গেছে মাটির সঙ্গে ধূলো হয়ে। তবু আমাদের -“ মনে তাঁর নিত্য যাওয়া আসা”।

আজ জ্যোৎস্নাভরা আকাশকে কেন জানি না সহ্য করতে পারি না….তিনটে তারা যখন একযায়গায় থাকে- ভাবি(বাবা, মা আর দিদি)… চোখে জল ভরে আসে… মনে মনে গুণগুণ করি নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে ক্ষুৎপিপাসায়…

“ওমা! আমার শোলোক বলা কাজলা দিদি কই?”

 

 

মেজদি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments