“Whoever controls the media, controls the mind” 
Jim Morrison

 

বড়দিনের বিকেল। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বিমান বোয়িং-৭৩৭ ‘এয়ার ইন্ডিয়া ওয়ান’ রাশিয়া থেকে কাবুল হয়ে নয়াদিল্লি ফিরছে। ঘটনাচক্রে সেইদিনই আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্মদিন। সকালে উইশ করলেন মোদী, শরিফের উত্তর, একটু ঘুরে গেলেও তো পারেন। সবাইকে রীতিমত অবাক করে আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন মোদী। আর তাঁর বিমান নয়াদিল্লির পথে বিকেল ৫ টায় ল্যান্ড করল লাহোর বিমানবন্দরে। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে পড়েছে দু’দেশের রাজনৈতিক মহল। লাহোর বিমানবন্দর ঘিরে ফেলেছে পাকিস্তানের নিরাপত্তাবাহিনী, চূড়ান্ত সতর্কতা জারি করা হল এয়ারপোর্টের আশেপাশে। মোদী স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে নামলেন, একপ্রস্ত কোলাকুলির পর হেলিকপ্টারে চড়ে সটান উড়ে গেলেন নওয়াজের রায়উইন্দের প্রাসাদে। সেখানে তখন মহাসমারোহে চলছে নওয়াজের নাতনি মেহেরুন্নিসার বিয়ে। আশীর্বাদ করে গেলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

ঘটনাটা এতই আকস্মিক যে, প্রথমে দুপক্ষ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া দেওয়ার লোকও জোটেনি। ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এত বছরের ইতিহাসে এ এক বিরলতম ঘটনা। চরম বন্ধুত্বপুর্ণ দেশ হলেও একডাকে ঘন্টাখানেকের সফরে শ্যামবাজার থেকে এসপ্ল্যানেডে হাওয়া খেতে যাওয়ার মত ঘুরে যাওয়া বিদেশনীতির প্রোটোকলে নজিরবিহীন। সেখানে ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক খারাপ বললে কম বলা হয়। ভারত-পাক সফর মানেই বছরখানেক ধরে প্রস্তুতি, দু’চারবার সীমান্তে গুলিগোলা চলে সফর পিছিয়ে যাওয়া, তারপর আবার বাবা-বাছা করে শেষ অবধি মহা আড়ম্বরে সফর, বিশ্বব্যাপী ঝড় ওঠা… এসব দেখতেই অভ্যস্ত আমরা। সেখানে মোদীর ধুরন্ধর বিদেশনীতি অত্যাধিক বিদেশসফরের জন্য যতই সমালোচিত হোক, ডেথ ওভারে ঠিকই ম্যাচ বের করে চলে গেল।

ঘটনার আকস্মিকতায় কেউই কেজো মন্তব্যের বাইরে গেলেন না। পাক বিদেশসচিব আইজাজ আহমেদ চৌধুরী ভূয়সী প্রশংসা করলেন, বিলাবল ভুট্টোও ওয়েলকাম করলেন, সুধীন্দ্র কুলকার্নি বললেন সাহসী পদক্ষেপ, এমনকি হুরিয়ত অবধি একটু কেশে-টেশে শেষটায় “আমাদের কোনও সমস্যা নেই” বলতে বাধ্য হল। শুধু কংগ্রেস সমালোচনায় মুখর। আনন্দ শর্মা বললেন, এসবে ভবি ভুলবার নয়, এত উচ্চমানের সফর তাৎক্ষণিক হতে পারে না। আর এসবই মোদীর নিজের ‘বিজনেস ইন্টারেস্ট’ চোকানোর ধান্দা! কেজরিওয়ালও হইহই করে নেমে পড়লেন। দিনের শেষে প্রাপ্তি, বামেদের সমর্থন আর ওমর আবদুল্লার আশাবাদী মন্তব্য।

কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল করবার মত। খোদ মোদীর ট্যুইট আর বিদেশসচিব জয়শঙ্করের মিডিয়া ব্রিফিং ছাড়া সরকারিভাবে সফরের ব্যাখা কি কেউ করলেন?

 

 

আমাদের আলোচনা শুরু হচ্ছে এই প্রশ্নকে ঘিরেই। প্রথমেই ফিরে যাওয়া যাক আরো ১৮ মাস আগে। মোদীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান। আমন্ত্রিত হয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সবদেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা। এবং আফগানিস্তানের হামিদ কারজাই, নেপালের সুশীল কৈরালা, ভুটানের শেরিং তোবগে, বাংলাদেশের সংসদের স্পিকার, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি সেখানে সবচেয়ে আলোচিত দুই ব্যক্তিত্বের নাম, পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে। তামিলনাড়ু জুড়ে বিক্ষোভ চালাচ্ছে জয়ললিতার এআইএডিএমকে, পশ্চিম ভারতে শিবসেনা। মোদী কিন্তু নিরুদ্বেগভাবে নিজের বিদেশনীতির মোক্ষম চালটা দিলেন। এর আগে ভারত-পাক সম্পর্কে বারবারই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অভিযোগ এসেছে, জিয়া উল হকের আমল অবধি ভারত-পাক সম্পর্কের অবনতি বারবার ঘটেছে আমেরিকার ক্রমাগত সামরিক সাহায্য দিয়ে পাকিস্তানকে শক্তিশালী করার অভিযোগে। আর পাকিস্তান মার্কিন জোটের অংশ হিসেবে বারবারই দক্ষিণ এশিয়ার জিও-পলিটিক্সে আমেরিকাকে জায়গা করে দিয়েছে। ১৯৯৫ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে তৎকালীন পাক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো তীব্র ভারতবিরোধী বক্তৃতা করেছিলেন। এমনকি নিক্সনের ঐতিহাসিক চিন সফরের পিছনেও হেনরি কিসিংগার ও পাকিস্তানের হাত ছিল বলে জানা যায়। মোদীর কাছে তাই স্বভাবতই একটা চ্যালেঞ্জ ছিল, দক্ষিণ এশিয়ার আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর। এদিকে লাদেনের হত্যার পর মার্কিন-মুখাপেক্ষিতাও পাকিস্তানের অনেক কমেছে। সব মিলিয়ে বিদেশনীতির প্রশ্নে দক্ষতার সাথে সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মোদী। যেটা অন্তত দক্ষিণ এশিয়ার স্বার্থেই মহাগুরুত্বপুর্ণ ছিল।

কিন্তু দুর্ভাগ্য, বিজেপির তরফে মোদীর একএকটি পদক্ষেপকে ব্যাখা করার মতই কেউ রইলেন না।

কেন রইলেন না? সে খালটাও মোদী নিজেই কেটেছেন, যাতে করে এই মিসকমিউনিকেশন বা বলা ভাল, কমিউনিকেশনের অভাব নামক কুমির তড়বড়িয়ে ঢুকে পড়েছে। সাধারণভাবে ক্যামেরা দেখলেই পোজ নিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া, রীতিমত লোকজনকে সরিয়ে হাসিমুখ দেখানো নরেন্দ্রভাই ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বিদেশসফরেই (ভুটান, পরে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ব্রাজিল) এয়ার ইন্ডিয়া ওয়ানে মিডিয়ার ওঠা বন্ধ করে দিলেন। এই নীতিটা বহুদিন ধরেই চালু ছিল। ইউপিএ জমানায় প্রধানমন্ত্রীর বিদেশসফর মানেই বিশাল মিডিয়া সঙ্গে যেত, মনমোহন নিজে স্বল্পবাক হলেও মিডিয়ার সাথে যথেষ্ট হৃদ্যতা ছিল তাঁর। তাছাড়া কংগ্রেসের তরফে আনন্দ শর্মা, জয়রাম রমেশ, কপিল সিব্বল, শশী তারুর বা সলমন খুরশিদের মত সুবক্তারা থাকতেন, মিডিয়াকে বিস্তারিত ব্যাখা দিতে তাঁদের কোনও আপত্তি থাকত না। এটা খারাপ কিছু নয়, বিশ্বের সব দেশেই স্টেট ভিজিটে মিডিয়া নিয়ে যাওয়ার রীতি আছে। ওবামা তো প্রায় মিডিয়ার মিছিল নিয়ে যান! সেখানে মোদীর অস্ত্র ছিল, তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তা। তিনি ট্যুইটারের রাজা, ফেসবুকেও কিছু কম যান না। তার ওপর দেশের জেন ওয়াই কাগজ পড়ে কম। মিডিয়ার আর দরকার কি?

 

মিডিয়ার প্রতি অবশ্য মোদীর খানিক ভীতি কাজ করে বলেও জানা যায়। সেটাও স্বাভাবিক, গুজরাট দাঙ্গার পরে প্রায় কোনও মিডিয়াই তাঁকে তুলোধনা করতে বাকি রাখেনি। মোদী বারবারই দায় এড়িয়েছেন, যদিও কোনও মতেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা কার্যত হাওয়া হয়ে যাওয়ার দায় তিনি এড়াতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রীর কুর্সি পাওয়ার পরেও প্রশ্নগুলো তাঁকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। ফলে মিডিয়ার সাথে সংস্রব কমালেন। মিডিয়া উপদেষ্টা পদেও কাউকে রাখলেন না, সম্ভবত ছুঁচ হয়ে ঢুকে সঞ্জয় বারু হয়ে বেরনোর ভয়ে। ৭০ বছরের জগদীশ ঠক্করকে জনসংযোগ আধিকারিক পদে নিয়োগ করলেন। এক বিবিসি সাংবাদিকের ভাষায়, “উনি তো কথাই বলেন না। সংযোগ পরের কথা! উনিও হাসেন, পাল্টা আমরাও হাসি। গল্প শেষ!”

মোদীর বিদেশসফর মানেই অতএব মিডিয়া বলতে হয়ে দাঁড়াল দুরদর্শন আর পিটিআই। যাদের একমাত্র কাজ ঘটনার বিবরণ দেওয়া, সমালোচনা করার অভিযোগ তাদের অতি বড় নিন্দুকও মুখে আনবে না।

আর তাদের সামনে বক্তব্য রাখবেই বা কে? মোদী স্বয়ং মিডিয়া ফেস করেন না। পিএমও থেকে নাকি ‘নিতান্ত বাধ্য না হলে মিডিয়ার দিকে ঘেঁষবেন না’ বলে হুলিয়া জারি করা হয়েছে! অতএব প্রকাশ জাভড়েকর আর রবিশঙ্কর প্রসাদ ছাড়া সে অর্থে কাউকেই ব্রিফিং দেওয়ার জন্যও পাওয়া যায় না। আর যে যাই বলুক, প্রাক্তন ব্যাঙ্ককর্মী জাভড়েকর কেজো বক্তৃতার বাইরে বেরোন না। রবিশঙ্কর প্রসাদ অভ্যন্তরীন ব্যাপার নিয়ে যতটা সরব, বিদেশনীতির প্রশ্নে একদমই না। অশোক রোডের পক্ষ থেকে চ্যানেলের সান্ধ্য তরজায় যারা যান, তারাও যে খুব ভাল ব্যখা করেন, এমন নয়। ফলে যা দাঁড়াচ্ছে, তাতে স্বভাবতই দেশবাসীর সাথে বিজেপির একমাত্র যোগসূত্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে রাজনৈতিক ভাষণ আর সোশ্যাল মিডিয়া। আর রাজনৈতিক ভাষণে ছোটখাটো কথা বলা মোদীর ধাতে নেই। ফলে ফাঁকা বুলি আওয়াজ উঠতেও সময় লাগছে না।

প্রশ্ন উঠতে পারে, বিদেশনীতির মত জটিল বিষয় কি আদৌ জনতার কাছে বোধগম্য? নাকি সেটা গবেষক ও অ্যানালিস্টদের ব্যাপার? প্রথমেই বলা ভাল, গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে জনগণের কাছে বিদেশনীতির ওপর বক্তব্য ক্লিয়ার থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। কারণ গণসমর্থণ একটা ভীষণ গুরুত্বপুর্ণ অংশ। বর্তমান ভারত পাকিস্তান প্রেক্ষাপটই ধরা যাক। পাকিস্তান ও ভারতের জনতার মধ্যে পারস্পরিক হিংসা, ভয় ও ঘৃণার পরিবেশই বেশি। দুদেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি বা অবনতির ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা যে কোনও রাষ্ট্রনেতাকেই খেয়ালে রাখতে হয়। সরকারের সম্পর্ক উন্নতি-অবনতি দেখভালের দায় আছে। বিরোধীদের নেই। ফলে বিরোধীদের সমালোচনারও কোনও পরিধি নেই, করলেই হল। সমস্যাটা হচ্ছে, এতে যদি জনতার ক্ষোভ বাড়ে, তাহলে প্রধানমন্ত্রীকেও প্রমাদ গুনতে হবে। ব্যাকডোর ডিপ্লোম্যাসি যতই বাড়ুক না কেন, একদিন না একদিন সেটা প্রকাশিত হবেই। ফলে জনবিক্ষোভ গায়ে নিয়ে সম্পর্কের উন্নতির জন্য কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া যে কোনও নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষেত্রেই একপ্রকার ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ভারত-পাক সম্পর্কের এমনই টানাপোড়েন, তাতে গ্যারান্টি বলে কোনও কিছুর অস্তিত্ব নেই। আর শিবসেনা থেকে আপ, সকলে তো পা বাড়িয়েই রয়েছে। তাই কোনও কূটনৈতিক পদক্ষেপের গুরুত্ব কোথায়, সেটা সবার আগে দেশবাসীর কাছে পরিস্কার থাকা দরকার। ব্যাঙ্ককে এনএসএ পর্যায়ের বৈঠকে দোভাল কি বললেন, সেটা না হয় গোপন থাকুক। এবার সেই বৈঠকের ফলশ্রুতিতেই হোক আর তাৎক্ষণিকই হোক (ধরে নিচ্ছি এই ব্যাকডোর ডিপ্লোম্যাসিরই ফল), এই চটজলদি শুভেচ্ছা সফরের গুরুত্বটা সঙ্গত কারণেই দেশবাসীর জানা দরকার। শরিফের সাথে মোদী বরাবরই ব্যক্তিগতভাবে সুসম্পর্ক রেখে চলার পক্ষপাতী। কিন্তু সেটা কেন? সেটা কি শুধু ভারতেরই দায়? পাকিস্তান কি আদৌ কথা শুনবে? এসবই সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্কারভাবে দেশবাসীকে জানানো উচিত। যার একমাত্র মাধ্যম, মিডিয়া।

জানানো আর হল কই? তার আগেই পাঠানকোটের আইএএফ এয়ারবেস কেঁপে উঠল জঙ্গি হামলায়। ঘরে-বাইরে পাকিস্তান নীতির জন্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়লেন মোদী।

 

 

পাকিস্তানের শরিফ শুধু নওয়াজ নন, তাঁর থেকেও বড় শরিফ আর্মি জেনারেল রাহিল। এছাড়া সরতাজ আজিজের মত ধুরন্ধর মাথা তো রয়েছেই। এদের জনপ্রিয়তা নওয়াজের থেকেও বেশি। পাক সেনাবাহিনী-মোল্লাতন্ত্র-আইএসআই জোট (বা ঘোঁট) কোনও ভাবেই আলোচনার রাস্তা খোলা রাখতে চায় না। নওয়াজ চাইলেও নয়। ফলে কথাবার্তা শুরু হবে, বৈঠকের জমি তৈরি হবে ও তারপরেই একটা জঙ্গিহামলায় সব ভেস্তে যাবে; ভারত-পাক সম্পর্কে এটা একরকম ট্র্যাডিশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এবারে আলোচনার রাস্তা খোলা রাখতে বদ্ধপরিকর ভারত, এর মধ্যেই মোট ছয়বার মুখোমুখি হয়েছেন মোদী-শরিফ। অর্থাৎ পাক সরকার, যাদের বলা হয় ‘স্টেট অ্যাক্টর’, তাকে যে কোনও মূল্যে হাতে রাখতে সাউথ ব্লক মরিয়া। কারণ সেনা-আইএসআই-জেহাদিদের সম্মিলিত ‘নন স্টেট অ্যাক্টর’দের হাজার চেষ্টা করেও ভারত হাতে রাখতে পারবে না। অতএব একমাত্র রাস্তা, তাদের দুর্বল করা। যেটা ‘স্টেট অ্যাক্টর’দের হাত শক্ত করলে হতে পারে। তাই পাঠানকোট হামলার পরেও জানুয়ারির বিদেশসচিব পর্যায়ের বৈঠক বাতিল করেনি ভারত। পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে, ওই তাৎক্ষণিক শুভেচ্ছা সফরের প্রাথমিক সাফল্য ধরে রাখতে সবরকম চেষ্টা চালাবে ভারত।

না হলে? সম্পর্কের ক্রমাবনতি মানে কিন্তু শেষ রাস্তা যুদ্ধই। যেটা দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান প্রেক্ষিতে কোনও মতেই কাম্য নয়। পাকিস্তান পরমাণু শক্তিধর দেশ। সেসবের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সামরিক বাহিনীর হাতে। ভারতের পরমাণু গবেষণা অসামরিক, পার্লামেন্ট যে কোনও মুহুর্তে হস্তক্ষেপ করতে পারে। পাকিস্তানের সাথে বড় আঁতাত রয়েছে চিনের, তাছাড়া পাক বায়ুসেনাতে মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের আধিক্য চোখে পড়ার মত। ভারতের বাহিনীও কোনও অংশেই পিছিয়ে নেই। তবু যুদ্ধপরিস্থিতির থেকে খারাপ আর কি হতে পারে? লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাবেন, গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাবে দু’দেশ। উত্তেজনার বদলে অতএব নরমে-গরমে সম্পর্ক ভাল করার চেষ্টাই একমাত্র পথ।

আর এগুলোই দেশের সামনে তুলে ধরতে পারে মিডিয়া। যাতে শিবসেনার মত দলগুলির লাফালাফির অসারতা বুঝতে পারেন মানুষ। কিন্তু করবে কিভাবে? সব কাগজেরই নিজস্ব অ্যানালিস্ট আছেন, তাঁরা নিজেদের মত করে লেখালিখি করবেন। তাতে বক্তব্য তৈরি হবার থেকে বিতর্ক বাড়বে বেশি। বিতর্ক থাকুক, বিতর্ক ছাড়া গণতন্ত্র টেকে না। কিন্তু আমজনতার কাছে বক্তব্যই আগে দরকার। যদি মিডিয়াকে পরিস্কারভাবে ব্যাখা দিতেন কোনও সিনিয়র নেতা, তাহলে দেশের যে কোনও মিডিয়াই আগে সেটা ছাপতে বাধ্য! তারপর না হয় তর্কবিতর্ক হত। কিন্তু মানুষ তো একটা গ্রাউন্ড পেতেন। যে গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী কিছু সমর্থন পেতেন, তাঁর এই তুখোড় বিদেশনীতি জনসমর্থনের অভাবে গোল্লায় যেত না। উলটে মোদীর অত্যাধিক বিদেশভ্রমণ, বিদেশে গিয়ে অপদস্থ হওয়া, মঞ্চে ফাঁকা বুলি, জুকেরবার্গকে পোজ নিতে বাধ্য করা… এসবই খবরের শিরোনামে আসছে। ‘পুবে তাকাও’ নীতির বদলে ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি, ‘প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার’ নীতি, ‘ভারত মহাসাগর অঞ্চল নীতি’, চিনের পাল্টা হিসেবে জাপানের সাথে সৌহার্দ্য বাড়ানোর নীতি, ব্রিকস দেশগুলির হাত শক্ত করে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবি জোরালো করা, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আসিয়ান দেশের সাথে সার্ক দেশের যোগাযোগ বাড়ানো… ইত্যাদি সবই প্রায় চোখের আড়ালে থেকে গেছে। ট্যুইট করে এত ব্যাখা দেওয়া কি সম্ভব?

 

 

কিছুদিন আগে একটা ঘটনার কথা পড়েছিলাম এক মার্কিন কাগজে। অনেকগুলো ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকটা লাইন আওড়াচ্ছে একজন। হাতে কিউ কার্ড, ভুল হলেই ক্যামেরা থেমে যাচ্ছে। একবার কার্ডে চোখ বুলিয়ে আবার শুরু হচ্ছে বাক্যবর্ষণ। ক্যামেরার পিছনে রয়েছেন ফোটোগ্রাফার, নামকরা সাংবাদিক থেকে প্রোডিউসার, সংবাদসংস্থার সিনিয়র ব্যুরো সবাই। ‘টেক’ ঠিকমত না হলে ‘রিটেক’-এর ব্যবস্থাও আছে। এবং তারপরেই ক্লাইম্যাক্স। স্লোগান তুলে সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা বন্দির শিরচ্ছেদ।

পাইনউড বা ওয়াল্ট ডিজনি স্টুডিও নয়, ঘটনাটা সিরিয়ার রাক্কা শহরের, আইএসআইএস গ্রুপের ঘোষিত ‘রাজধানী’।

মতাদর্শ ও নানা দাবিদাওয়াকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে এইভাবেই বিপুল উদ্যোগ নিয়েছে আইএসআইএস। সংবাদসংস্থার খবর, দামি গাড়ি থেকে বিলাসবহুল থাকার ব্যবস্থা, সাংবাদিকদের জন্য সবকিছুই করতে রাজি তারা। যে সম্মান সাংবাদিকদের দেওয়া হয়, তা প্রায় একজন সিনিয়র ‘যোদ্ধা’র সমান। বাইরের মিডিয়া বাদ দিলেও আছে তাদের নিজস্ব মিডিয়া অপারেটররা। ইন্টারনেট জুড়ে তাদের সক্রিয়তায় ঘুম ছুটেছে নানা দেশের সিক্রেট সার্ভিসের। অবস্থা এমনই যে এয়ারস্ট্রাইকের লক্ষ্য হিসেবেও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তাদের প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর সার্কেল। যার জনপ্রিয়তা পশ্চিম তো বটেই, কপালে ভাঁজ ফেলেছে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকেরও।

উল্টো ছবিটাও দেখার মত। দিন কয়েক আগে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রথম পাতার খবর, ওবামার সিরিয়া পলিসি কতটা ঠিক, তা নিয়ে মার্কিন জনতা প্রবল সন্দেহে। আর এতেই নিজের প্রচার টিমের ওপর চটেছেন ওবামা। মার্কিন বিমানহানায় মোটেই চিঁড়ে ভিজছে না, বরং জনমত বেশি ঝুঁকছে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ওলাঁদের দিকে। ওবামার ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিওরিটি অ্যাডভাইসার বেন রোডস থেকে ডিফেন্স সেক্রেটারি অ্যাশটন কার্টার… সব্বাইকে প্রচারের ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার জন্য হুলিয়া জারি করেছে হোয়াইট হাউস। এমনকি কেন জন কেরি বা মধ্যপ্রাচ্য পলিসির দায়িত্বে থাকা রব মালি ট্যুইটারে বেশি সক্রিয় নন, এমন প্রশ্নও উঠেছে। এদিকে ভয় অব্যাহত। সান বারনার্দিনো হামলার পর প্রায় কোনও আমেরিকানই পেন্টাগনের ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না।

ছবিটা অনেকটাই এক। এবং মিডিয়ার গুরুত্ব আইএসআইএসের মত মধ্যযুগীয় বর্বরতায় বিশ্বাসী জঙ্গিগোষ্ঠীও বোঝে। শুধু সিরিয়ায় খলিফা বানানো নয়, সারা পৃথিবীতে মৌলবাদকে ছড়িয়ে দিতেও তাদের বড় ভরসা মিডিয়া। তাতে ফলও মিলেছে অনেক, ইউরোপ থেকে তো বটেই, ভারত থেকেও অনেকে সিরিয়া গিয়ে যুদ্ধে যোগ দিচ্ছে। এদিকে জঙ্গিহামলার ভয়ে মার্কিন জনতা শিহরিত, ওবামার গদি টলমল করছে। কারণ সে অর্থে দেশের জনতাকে আশ্বস্ত করার জন্যও হোয়াইট হাউস থেকে বক্তব্য আসছে না। অনিবার্য ফল, ডোনাল্ড ট্রাম্পদের মত ব্যক্তিদের হাত শক্ত হওয়া। এদেশেও এরকমই অবস্থা। পাকিস্তান নিয়ে সেভাবে বলার লোকই নেই। জেটলির মত সুপণ্ডিত, সুবক্তা ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ অবধি বাজেটের পর মাত্র কয়েকবার সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন। শুধু পার্থক্যটা হচ্ছে, ওবামা তাও ব্যর্থতা আন্দাজ করে বাড়তি সক্রিয় হবার নির্দেশ দিয়েছেন। মোদী এখনও সেই তিমিরেই। এমনিতেই তাঁকে নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই। বাজপেয়ীর ১১ বছর পর প্রথম করা চূড়ান্ত নাটকীয় সফরটিও অন্তত দেশবাসীর চোখে মাঠেই মারা গেল।

 

 

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে সুকান্ত চৌধুরী মিডিয়া নিয়ে এক মনোজ্ঞ বক্তৃতায় স্বীকার করেছিলেন, মেনস্ট্রিম মিডিয়ার জায়গায় যতই সোশ্যাল মিডিয়া আসুক না কেন, মেনস্ট্রিম মিডিয়া স্বকীয় জায়গাটা কেউ নিতে পারবে না। সেইজন্যই মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট রাজনীতিতে এত গুরুত্বপুর্ণ। আমরা সকলেই শশাঙ্কের নাম জানি। আবার আমরা কেউই তাঁর নামে বিশেষ কিছু জানি না। শশাঙ্ক বাংলার প্রথম সার্বভৌম নরপতি, বিজেতা ও সুশাসক, সপ্তম শতাব্দীতে হর্ষবর্ধনের সমসাময়িককালে পূর্ব ভারতে এক শক্তিশালী রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। সে রাজ্যের নামটা আছে, মালদার গৌড়, রাজধানী কর্ণসুবর্ণের ধ্বংসাবশেষটুকুও আজ আর নেই। যা আছে, তা হল নানাপ্রকার কলঙ্ক ও রটনা। যেমন শশাঙ্ক নাকি ছলচাতুরীর দ্বারা হর্ষের দাদা রাজ্যবর্ধনকে ব্যক্তিগত সাক্ষাতের নামে একাকী ডেকে এনে নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যা করেন। আবার শশাঙ্ক নাকি বৌদ্ধধর্মের অনেক বিনাশ করেছেন, শৈব ছিলেন বলে অন্য ধর্ম সহ্য করতে পারতেন না। ভিনসেন্ট স্মিথ ও পরে ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার ছাড়া এসব গুজবের কেউ যুক্তিসম্মত প্রতিবাদ করেননি। ডক্টর মজুমদার প্রতিটি গুজবের অসারতা প্রমাণ করেছেন, হর্ষের চরিতকার বাণভট্ট ও সুহৃদ হিউয়েন সাং-এর নানা উক্তির মধ্যে স্ববিরোধও তুলে ধরেছেন। বৌদ্ধধর্ম বিষয়ক অনেক অভিযোগেরই নিষ্পত্তি করেছিলেন তিনি। হিউয়েন সাং শশাঙ্কের মৃত্যুর এক বছর পরে গৌড় রাজ্যে গিয়েছিলেন, তখনই তিনি সেখানে অন্তত দশটি বৌদ্ধ বিহার ও দশ হাজার ভিক্ষুকে সেখানে দেখতে পান। সারকথাটি লিখেছেন শেষে, তাঁকে সব মত খণ্ডন করতেই পরোক্ষ প্রমাণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। শশাঙ্ক বাঙালির ভীরু বা যুদ্ধবিমুখ পরিচিতি একাই ঘোচাতে পারতেন। স্বয়ং উত্তরপথনাথ হর্ষও তাঁর স্বাধীনতা নষ্ট করতে পারেননি। আসলে “বাণভট্টের মত চরিত লেখক অথবা হিউয়েন সাং-এর মত সুহৃদ থাকিলে হয়ত হর্ষবর্ধনের মতই তাঁহার খ্যাতিও চতুর্দিকে বিস্তৃত হইত। কিন্তু অদৃষ্টের নিদারুণ বিড়ম্বনায় তিনি স্বদেশে অখ্যাত ও অজ্ঞাত ও শত্রুর কলঙ্ক কালিমাই তাঁহাকে জগতে পরিচিত করিয়াছে”।

 

মোদীর অবশ্য স্তাবকের অভাব নেই। ইতিমধ্যেই নানারকম মোদীচরিত প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তাও নিজের দোষেই তিনি তাঁর ফাঁকা বুলি ইমেজকে শক্ত করে গাঁথছেন। গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম একে অপরের পরিপূরক। মার্কিন মিডিয়া তাঁর ওপর বিরূপ জেনে তিনি গত সেপ্টেম্বরের মার্কিন সফরে প্রায় সমস্ত মার্কিন সংবাদসংস্থার সাথে বৈঠক করলেন। এটা নিজের দেশে আগে করা দরকার। শুধু সেলফি তুললে মানুষের কাছে বিদেশের ছবি আসে, বিদেশনীতির সাফল্য আসে না। আর অভ্যন্তরীন ক্ষেত্রে আপাতত সাফল্যের মুখ না দেখা মোদীর বিদেশনীতিও প্রশ্নের মুখে পড়লে তা ভোটের বাক্সে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটা অবশ্য সময়ই বলবে।

মোদী বনাম পাকিস্তান, মোদী বনাম মিডিয়া
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments