নব্বইয়ের দশকে নিও লিবারেল মার্কেটে যখন খুলছে তখন বাঙালি মধ্যবিত্তের সামনে একাধিক হাতছানি। জনৈক পার্টি ক্লাসে ডানকেল সাহেবের ড্রাফট পরে বোঝার আগেই দেশ পুরো খুলে গেল আর খোলা মেলা এই সময় দেখা দিল এক বিচিত্র সামাজিক পরিবর্তন। আমাদের কি আছে আর কি নেই তা নিয়ে বাড়ি বাড়ি প্রতিযোগিতামূলক ভাবে লিস্টি তৈরী করা শুরু হলো। বস্তা পচা আধুনিক গানকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে 'জীবনমুখী' গানের কলি ফিরতে লাগলো মুখে মুখে , উত্সবের সময় প্যান্ডেল প্যান্ডেলে। সেই জমানায় সবার বাড়িতে ফোন থাকাটা প্রায় কালার টিভি কিম্বা এলপিজি গ্যাসের মতনই ইন্ডিসপেন্সিবেল হয়ে দাড়িয়েছিল । প্রাইভেট জব তখন কর্পোরেটে পরিনিত হচ্ছে ও ফিফথ পে কমিসানের আশায় সরকারী কর্মচারীরা হা পিত্তেশ করে বসে ছিল। মাইনে বাড়লেই লোন নিয়ে বাড়িতে হাত দিতে হবে, মেয়ের বিয়ে ও ছেলের উচ্চশিক্ষার জন্যে আলাদা করে কিছু সরিয়ে রাখতে হবে, ও লিস্ট ধরে ধরে একাধিক অভ্যেস বদল করার গ্যাজেট বাড়িতে ইম্পোর্ট করতে হবে!
কলকাতা টেলিফোনস একটি অতি প্রাচীন ও আজব সংস্থা। এর ম্যানেজাররা বিনি পয়সায় ল্যান্ডফোনে সহকর্মীদের ফোন করে ঘন্টার পর ঘন্টা কোম্পানি কে গাল দিত ও নিচুতলার কর্মীরা বাড়িতে কানেকশন লাগাবার পর বৌদির কাছে জল আর দাদার কাছে নির্লজ্জ ভাবে ঘুষ খেতে চাইতো । ওই ঘুষখোর দাঁত বের করা কিম্বা চুল উঠে যাওয়া চশমা পরা কর্মীরা একদিন হটাত দুম করে পাড়ার ক্লাবে একটা ইয়্যা পেল্লায় বাক্স ফোন বসিয়ে চলে গেল। ওপরে কয়েন ঢালার জায়গা, ও এক টাকা ঢেলে ৩ মিনিট যে কোনো ল্যান্ড ফোনে কথা বলার স্বাধীনতা! বিকেল বেলা মাঠ থেকে খেলে ফেরার সময় দেখলাম আ-বাল -বৃদ্ধ -বনিতা যন্ত্রটাকে ঘিরে দাড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে হুট করে যেন একটা শনি মন্দিরের থান গজিয়েছে তাই সবাই ফিস ফিস টোনে সেটা নিয়ে বিশদ আলোচনা করছে। কেউ কেউ আবার রিসিভারটা তুলে ডায়াল টোন শুনেই ফট করে নামিয়ে রেখে মাথা নেড়ে জানাচ্ছে যে ফোনটা সচল। হাবভাব অনেকটা এরকম যে একটু বেশিক্ষণ ধরে রাখলেই ফোন কোম্পানি বোধহয় পকেট থেকে এক টাকা টেনে বার করে নেবে ! ধরছে-নাড়ছে-ছুঁয়ে দেখছে অথচ কেউ গাঁটের এক টাকা খরচ করে ফোনটি করছে না। একটু ভিড় পাতলা হতে প্রথম ফোন করলো ক্লাবের সেক্রেটারি পাপ্পুদা। সে তার 'প্রায়-হয়ে-গেছিল ' মার্কা এক গার্লফ্রেন্ডকে ডায়াল করে একটু গম্ভীর ভাবেই শুরু করলো ,"হ্যালো , কে মিঠু? আমি পাপ্পু বলছি…না না বাড়িতে না ..এইতো ক্লাবে ফোন নেওয়া হয়েছে আজ, সেখান থেকেই করছি।" সবাই হা করে পাপ্পুদা কে দেখছে , আর এই হেন ঐতিহাসিক মুহুর্তে পাপ্পুদার মত একটা ডাকসাইটে হনু নার্ভাস হয়ে ঘেমে চুমে একসার হয়ে যাচ্ছে। ওপার থেকে কি জবাব এসেছিল জানি না তবে যে ভাবে পাপ্পুদা 'ঠিক আছে…ok …পরে আবার করে নেব ..' বলে ফোনটা কেটে দিল, তাতে বেশ বোঝা গেল, মিঠু বোধহয় পাবলিক বুথ থেকে ফোন পেয়ে বিশেষ উত্ফুল্লিত হয়নি। ওই সময়ের হুট লিবারেসনের ভাইরাল জ্বরটা কোথাও যেন ফোন হাতে পাপ্পুদার কাঁপা গলার কথার সাথে ঘাম দিয়ে ছাড়ছিল ।

পরের দিন থেকে দেখলাম রিকশাওয়ালারা ওই বুথের আসে পাশে তাদের রিকশা নিয়ে ভিড় করে আছে। একটু খোঁজ পরতাল করেতেই জানা গেল যে তারা সওয়ারীকে বাড়ি থেকে তুলে ফোন বুথ অব্দি পৌঁছে দিচ্ছে ও কথা হয়ে যাওয়ার পর তাকে বাড়ি ফেরত দিয়ে আসছে , লিবারেল ইকোনমি মনে হলো বেশ জাঁকিয়ে বসেছে মফস্বলের এই একটি মাত্র কয়েন বাক্স টেলিফোনটাকে ঘিরে। ক্রমশ ফোনের মাধ্যমে গ্যাস বুকিংও চালু হোলো ও একটা কল করেই ৩ মিনিটের মধ্যে বুঝিয়ে বলে ইন্ডেন বা এইচপি কোম্পানির ডাবল সিলিন্ডার বুকিং করাটা গৃহিনীদের ক্ষেত্রে একটা মৌলিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়ালো। গ্যাস অফিসের দাস বাবু ফোন তুলেই এক মিনিট খেয়ে নেয় …' কে…কোত্থেকে ..কি ব্যাপার..কেন…' ইত্যাদি ফালতু হেজিয়ে 'ওহ ফোন বুকিং ..তাই বলুন…'। আসল কারণ বুঝে উঠতে উঠতে ওদিক থেকে ফোন কেটে যায়। আবার ফোন করলে সেই শুরুর থেকে আবার.. .' কে…কোত্থেকে ..কি ব্যাপার..কেন…' । ইতিমধ্যে এই টেলিযোগাযোগ সার্ভিসে একটা নতুন সংযোজন হলো , ফোন কেটে যাবার ঠিক ২০ সেকেন্ড আগে থেকে একটা 'বিপ বিপ ' আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে 'টুইঁক টুইঁক ' শব্দ করে ওয়ার্নিং দেওয়া হবে যাতে গ্রাহক নতুন একটা সিকি ফেলে দিয়ে তার কথা চালু রাখতে পারে। মানে দাস বাবুর বেআক্কেলপানার জন্য কলকাতা টেলিফোনের ভাঁড়ারে দুগুন কিম্বা তিনগুন আমদানি হওয়া শুরু হলো ।

ছেলে ছোকড়ারা আদপে বেজায় সৃষ্টিশীল ও খারাপ ভাষায় বলতে গেলে জাত ঢ্যামনা হয়ে থাকে , এটা যুগের চিরাচরিত নিয়ম। ইস্কুল ফেরত এক টাকার আইসক্রিম বা চালতার আচার না খেয়ে সেই পয়সা দিয়ে ফোনের রিসিভারে মোজা জড়িয়ে ভারী গলায় বাবার স্বর নকল করে প্রায়শই তাদের প্রাইভেট টিউটরের বাড়িতে ফোন করে তারা বলতে লাগলো ' ওর আজ শরীরটা খারাপ…ও আজ পড়তে যাবেনা '। স্বাধীনতা এমনিতেই লোভনীয়, ও সেটা আলটপকা হলে বোধহয় অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক। অনেকে নাকি কয়েনের বদলে একই ওজনের চ্যাপ্টা কোল্ড ড্রিঙ্কসের খাপ ফেলে বিনি পয়সায় কল করার দাবি করতে লাগলো । কেউ কেউ আবার কয়েনে ফুটো করে টন সুতোয় আটকে ভেতরে ফেলে , কল শেষে সেটা টেনে বার করার চেষ্টা করতে ছাড়েনি। একলা থাকা একটা ছোট্ট যন্ত্র কি ভাবে যেন ধীরে ধীরে সবার অজান্তেই একটা আদ্যপান্ত 'এটেনশন সীকিং ডিভাইস ' হিসেবে কতকটা পাবলিকলি ইন্ডিসপেন্সিবেল হয়ে দাড়ালো। পরীক্ষার রেসাল্ট বেরিয়েছে, ফোন লাগাও। গোবরাদাকে গোবিন্দবাবু 'ইডিয়ট' বলেছে..ফোন করে পাঁচটা খিস্তি ঝেড়ে দাও। তবে হাইট হয়েছিল নাম মিলিয়ে প্রেম করার ঝোঁকে সায়ন যখন সায়নিদের বাড়িতে ফোন করেছিল। সায়নির বাবা ফোন তুলে বলল , "হ্যালো , কে বলছেন ?"
সায়ন , " ইয়ে ..কাকু..আমি সায়ন বলছি, সায়নি আছে?"
কাকু ,"কে সায়ন? ঠিক চিনতে পারলাম না তো তোমাকে?"
সায়ন , " মানে , আমি সায়নির ক্লাসমেট , কাকু !"
কাকু ,"ক্লাসমেট? ও তো চপলা বালিকা তে পরে , তা তুমিও কি ওখানেই পড় নাকি …ফাজলামো হচ্ছে ?"
সায়ন , " নাহ কাকু , আমি প্রমথ বয়জে পরি, এক ক্লাস মানে এক জায়গায় টিউশন পড়তে যাই… ."
কাকু ,"ওহ বুঝলাম, তাহলে ব্যাচমেট বল, ক্লাসমেট নয় ! আমিও প্রমথতে পড়েছি , প্রত্যেকবার নিয়ম করে স্ট্যান্ড করতাম। "
এদিকে ফোন দু বার 'টুইঁক টুইঁক' ওয়ার্নিং মেরে দিয়েছে। সায়ন হুরমুর করে আরো একটা কয়েন ঢেলে ফেলল।
সায়ন , " ওহ তাই নাকি , আচ্ছা। কাকু তখন বোধহয় নতুন বিল্ডিংটা হয়নি, তাই না?"
কাকু ,"না না, কোথায় নতুন বিল্ডিং! আমরা বসতাম বেড়া দেওয়া টালির ঘরে। তা তোমার ক্লাসে পজিশন কিরকম?"
সায়ন , " ওহ সেরকম কিছু না, তবে ১ থেকে ১০এর মধ্যে থাকি। কাকু সায়নি কে ফোনটা দেওয়া যাবে ? "
কাকু ,"দেওয়া যাবে না যাবেনা সেটা পরের ব্যাপার , আগে বল ফোনটা করছ কোত্থেকে তুমি?"
সায়ন (কাঁচু মাচু হয়ে) , " বুথ থেকে কাকু , একটু তাড়াতাড়ি ওকে ডেকে দিন না…. "
কাকু ,"বাব্বা , তা কিসের এত জরুরি দরকার যে তোমাকে বুথ থেকে ফোন করতে হলো?"
সায়ন ," সেরকম কিছু না কাকু, কাল আমার দাদুর বাত্সরিক। ওকে আসলে বলতাম, স্যারকে বলে দিতে যে আমি কাল পড়তে যাব না।"
কাকু , " হুমম বুঝলাম , ঠিক আছে আমি ওকে বলে দেব খন, তুমি এখন ফোনটা রাখো…"

আমি জানি না এখন এত মোবাইল বা ট্যাব নিয়ে আমরা ঠিক কেমন আছি ? তবে যে পার্টি ,যে সরকার, পাড়ায় পাড়ায় আবার সেই 'টুইঁক টুইঁক' শব্দ করা পাবলিক ফোন বুথ, বর্ষার জলে 'সরাত' করে স্লাইড কাটা ফুটবল খেলার মাঠ, মোতার জন্য ওপেন নালা আর মোড়ে মোড়ে 'ক্যাঁচ ক্যাঁচ ' আওয়াজ করা মিষ্টি জলের টিউবওয়েল ফিরিয়ে এনে দেবে, আমি তাকে 'যখন তখন' যে কোনো ফর্মে ভোট দিয়ে যাব।

যখন তখন
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments