প্রবাসী বাঙালীদের মাতৃভাষার জন্যে যতরকম খিল্লি শুনতে হয় তার মধ্যে প্রধানতম হচ্ছে ‘জল খাওয়া’। তবে শুধু জল কেন, আমরা তো চা, লস্যি, শরবৎ এমনকি বিয়ার হুইস্কিও খাই। কিন্তু আকাট মুখ্খু অবাঙালীগুলো কি বুঝবে বাঙালীর ‘খাওয়া’ শব্দটার ব্যাপ্তি সম্পর্কে। অনেকেই বলে থাকেন বাংলা ভাষায় কেশরাশির হিন্দি প্রতিশব্দের ব্যবহারের ব্যাপ্তিই নাকি সর্বাধিক। কিন্তু ‘খাওয়া’ শব্দের ব্যবহারের ব্যাপ্তি ওই দুই অক্ষরের শব্দটাকে বলে বলে দশ গোল দেবে। কি হল? বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে আসুন লেগে যাই ‘আদাজল খেয়ে’।

‘ল্যাদ খাওয়া’ বাঙালীর ছুটির দিনের দুকুর বেলায় কচি পাঁঠার ঝোল সহযোগে ‘ভাত খাওয়া’র পর আরাম করে একটা ‘সিগ্রেট খেয়ে’ সুখী দিবানিদ্রা তো প্রবাদ প্রতিম। আবার উল্টো দিকে দেখলে ঠাণ্ডা শীতের রাতে উষ্ণ লেপের ‘আদর খেতে খেতে’ কারো বউকে ‘হামি খাওয়ার’ ইচ্ছে না হলে সে নিতান্তই বেরসিক। মছলন্দপুর থেকে কোলকাতার কলেজে পড়তে আসা সেই ক্যাবলা ছেলেটার কথাই ধরা যাক। বন্ধুদের উস্কানিতে হঠাতই ‘বার খেয়ে’ ক্ষুদিরাম হয়ে গেল। মনের কোনে সযত্নে লুকিয়ে রাখা ব্যথা উজাড় করে দিল ক্লাসের সব থেকে হট মামনির কাছে। সেদিন কিন্তু কষে ‘থাপ্পড় খাওয়া’র সমূহ সম্ভাবনা থাকলেও সে যাত্রা কড়া বাক্যবাণের ‘ধাক্কা খাওয়া’-তেই সীমাবদ্ধ থাকলো। কিন্তু ওই যে কথায় বলে না, “পিরীতে মজিলে মন / কেলাসরুমও বৃন্দাবন”। প্রেমে ‘হাবুডুবু খেতে’ থাকলো ঠিক ততদিন পর্যন্ত যতদিন না জানতে পারল ওই মামনির কাছে ‘ল্যাং খাওয়া’র ব্যথা বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে ওরই ক্লাসের আরও তিন জন।

আগের সেমেষ্টারে কোনও পেপারে ‘ঝাড় খাওয়া’ এমন কোনও কলেজ পড়ুয়া কেউ দেখেছেন কি যে পরীক্ষার আগের রাতে মা সরস্বতীর ‘দিব্যি খেয়ে’ এবারেরটা কোনও মতে উৎরে দেওয়ার জন্যে প্রার্থনা করেনি? হলফ করে বলতে পারি এমন ছাত্র/ছাত্রীই সংখ্যাগুরু, যারা সারাটা বছর ‘হাওয়া খেয়ে’ কাটিয়ে পরীক্ষার দিনসাতেক আগে কোমর বেঁধে লেগে পরে ‘আদাজল খেয়ে’। ইস্কুল লাইফে পড়ায় ফাঁকি দেওয়ার জন্যে বাবার হাতে বেধড়ক ‘ঠ্যাঙানি খাওয়া’ অথবা মায়ের হাতে ‘কানমলা খাওয়া’র দিনগুলোর কালো স্মৃতি ভুলতে কলেজে উঠেই পিঠে অদৃশ্য ডানা। ইস্কুল লাইফে সরস্বতী পূজোর আগের রাতে পাড়ার হার কেপ্পন খেঁকুটে বুড়োর ব্যালকনির টবসমেত ফুলগাছ চুরি করতে গিয়ে ‘তাড়া খাওয়া’ এবং সেই নালিশ বাবার কানে পৌছলে ‘জুতোপেটা খাওয়া’র সৌভাগ্য যার হয়নি সে যতই ‘জলই খাক’ বা ‘দুধই খাক’ কিছুতেই কুলীন বাঙালির লিস্টিতে নিজের নাম ওঠাতে পারবে না।

মাঝ রাত্তিরে ভুত দেখে ‘ভিরমি খেয়ে’ ভয়ে ‘খাবি খেতে খেতে’ রামনাম জপ করা বাঙালীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। কিম্বা পাড়ার সেই গুডি গুডি চশমা শোভিত ফার্স্ট বয়, যে পাশের বাড়ির নতুন বিয়ে হয়ে আসা বৌদিকে দেখে ‘ফার্স্টু খেয়ে’ হঠাত হাফ ইয়ারলিতে অঙ্কে পঞ্চান্ন। আরও সপাট ‘ধাক্কা খেল’ যখন জানতে পারল ‘ক্ষীর খাচ্ছে’ কেলাস এইটে দু’বার হোঁচট খাওয়া পটলা। শীতের দুকুরে নতুনবৌদি নাকি দীপুদার দোকান থেকে পটলাকে দিয়ে তেঁতুলের আচার আনিয়ে চেটে চেটে খেতে খেতে আদর করে পটলার গাল টিপে দিয়েছে। হাফ ইয়ারলিতে অঙ্কের পঞ্চান্নর পর বাবার মৃদু ‘বকুনি খাওয়া’র পর যত না ব্যথা পেয়েছিল তার থেকে ঢের বেশি ‘ক্ষার খেয়েছিল’ পটলার সাফল্যে।

বৌদি যতই তাড়াহুড়োয় হাতে গরম খুন্তির ‘ছ্যাঁকা খেয়ে’ও নিতাই বাড়ুজ্জেকে আপিস যাওয়ার আগে লুচি বাটি চচ্চড়ি ভর্তি টিফিন বাক্সো হাতে ধরান না কেন দৈনন্দিন ‘ঘুষটা খেতে’ না পারলে ওনার পেটের চিনচিনে খিদেটা যেন রয়েই যায়। ওদিকে বড়বাবুর আবার গিন্নির আচমকা ফোন এলেই ‘ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া’র ব্যামোটা ।আর গেল না ।

রাজনৈতিক নেতাদের মতই সিনেমাওয়ালা আর টিভিওয়ালারাও ঠিক জানে ‘পাবলিক কি খায়’ । জনগণের পিণ্ডি চটকে খাওয়াই ওনাদের ব্রেকফাস্ট , লাঞ্চ এবং ডিনার । জনগণ ‘বিষম খেয়ে’ হেঁচকি তুলতে তুলতেই মেতে ওঠে আইপিএলে অথবা মোহনবাগান -ইস্টবেঙ্গলে । হেরো পার্টি যে ভরপেট ‘প্যাঁক খায় ‘ সেটাও সকলেরই জানা ।

এতো গেল সর্বভুক বাঙালীর ভাত থেকে শুরু করে চা-লস্যি কিম্বা জুতোপেটা-আদর অথবা হামি পর্যন্ত ‘খাওয়া’র লম্বা লিস্টি। কিন্তু এই লিস্টির উপসংহার টানতে গেলে শিব্রামের স্মরণ না নিলে কেমন যেন খাপছাড়া হয়ে যায়। শিব্রামের গল্পে সেই প্রথমে ‘ডিগবাজি খেয়ে’ বলা ঐতিহাসিক সংলাপ – “আমার আবার খালিপেটে জল সহ্য হয় না……”

যা পাই খাই
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments