গত ছয় বছর ধরে ডাঃ অশোক দেবের সম্পাদনায় সুদূর কুয়েত সিটি থেকে প্রকাশিত হয়ে চলেছে ‘মেলবন্ধন’। এই সময়কালে সম্পাদক মহাশয় শুধু কুয়েত নয়, সারা বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন মেলবন্ধন-এর জাল। নিয়মিত উৎসাহদানে একত্র করতে সক্ষম হয়েছেন আমাদের মত অপেশাদার মানুষজনকে। এবারে অর্থাৎ মেলবন্ধন-ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত আমার একটি গল্প লেখার চেষ্টাকে চর্যাপদ-এর পাঠকদের জন্যে দুই পর্বে। আজ প্রথম পর্ব 

“কি ব্যাপার” – দাবার বোর্ড থেকে চোখ না তুলেই প্রশ্ন করলেন প্রণয়। প্রাচ্য এই অভ্যর্থনার জন্য প্রস্তুত ছিল। আসলে গতকালই প্রণয় ফোন করে প্রিয়াঙ্কাকে জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি আর অপেক্ষা করতে রাজি নন। খুব বেশি হলে এক সপ্তাহ উনি দেখবেন। এর মধ্যে প্রাচ্য যদি কোনও ইনিশিয়েটিভ না নেয় তাহলে তাঁকেই যা ব্যবস্থা নেওয়ার নিতে হবে। এই পর্যন্ত প্রিয়াঙ্কা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রাচ্যকে ফোন করে জানিয়ে দেয়। ফলে সে উত্তর দিল – “আসলে আমার মোবাইল নাম্বারটা জানাতে এলাম। আমার মোবাইল নাম্বার হল…”

“জানা আছে” কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রণয় তাকে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে জানালেন – গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে আমি ওই নাম্বারেই তোমার সাথে কথা বলি

-       তা হলে?

-       কাজের কাজ কিছু হয়েছে কি? আর আমি তো তোমার সাথে কথা বলতে চাইনি, তোমার স্ত্রীকে আমার একটা সিদ্ধান্তের কথা জানানোর জন্যেই ফোন করেছিলাম। আমি সেটা করেছি এবং বিশ্বাস করি ঠিক করেছি। তুমি এর ভেতরে না এলেই খুশি হব

-       কিন্তু বিষয়টা তো আমাকে নিয়েই তাই নয় কি?

-       হতে পারে। তবে তাতে আমার কিছুই যায় আসে না

-       ছোটকা, প্লিজ গিভ মি সাম মোর টাইম

-       আর কতদিন? আর কতদিন সময় তোমার দরকার? তুই কি বলতে চাইছিস যে আমার কোনও দায়িত্ব নেই!!

এতক্ষণ পরে দাবার বোর্ড থেকে চোখ তুললেন প্রণয়। পাশে রাখা ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে কাপে নিয়ে এগিয়ে দেন, নিজেও নেন।

-       শুধু চা !

-       আপাতত শুধু চা

-       অবশ্য এখনও আকাশে সূর্যদেব রয়েছেন, তা পশ্চিমদিকের জানালাগুলি বন্ধ কেন? এখন তো সবে বোধহয় শ্রাবণ মাস। আকাশের যা অবস্থা তাতে এক্ষুনি বৃষ্টিরও তো কোনও সম্ভাবনা দেখছি না। কি করে কি পরিমলদা?

প্রাচ্য এগিয়ে গিয়ে জানালার স্লাইডিং পাল্লাগুলি সরিয়ে দেয়।

-       দোষটা পরিমলের নয়, আমিই বলেছি বন্ধ রাখতে। তবে কাজের কথা শুরু করলে সুবিধে হয়

-       ওকে। নাও ফার্স্ট থিং ইজ ইউ হ্যাভ টু আন্ডারস্ট্যান্ড ছোটকা দ্যাট আই এগ্রি যে তোমার রেস্পন্সিবিলিটি আছে বাট প্লিজ থিঙ্ক অ্যাবাউট মি অলসো

-       দ্যাখ আজ দশ বছর হতে চলল

-       ইউ আর রাইট বাট কান্ট উই রিয়েলি ওয়েট এনি মোর?

-       অপেক্ষা? কোন অপেক্ষার কথা তুই বলছিস? আজ যদি তুই চাকরিটা না ছাড়তিস, তাও ঠিক আছে তোর কথা না হয় ছেড়েই দিলাম কিন্তু কি দোষ করেছিল প্রিয়াঙ্কা? ও তো শুধুমাত্র তোর জন্যেই এই স্যাক্রিফাইসটা করেছে। ওর দুই দাদাই দিল্লিতে সেটলড আর এখানে মা-বাপ মরা মেয়েটার কে আছে সে কথাটা একবার ভাববি না? তুইও তো পর্ণার পড়াশোনার কথা ভেবে ওখানেই থাকতে চেয়েছিলি, অন্তত ওকে, শুধু ওকে কেন আমাকেও সেটাই বলেছিলি। তারপর কি করলি? সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে ফিরে এলি, কারও কথা শুনলি না। হ্যাঁ প্রিয়াঙ্কা মুখে কিছু বলে না, কিন্তু আমারও তো চুল পেকেছে নাকি?

প্রাচ্য খুব ভাল করে জানে যে প্রিয়াঙ্কার সম্বন্ধে প্রণয়ের এই ধারণা সর্বৈব ভুল। বরং তার চেয়েও প্রিয়াঙ্কার বেশি উৎসাহ ছিল ফিরে আসা নিয়ে। এতটাই যে সে দিল্লিতে প্রাচ্যকে একা রেখে বেশ কিছু সময় আগেই মেয়েকে নিয়ে ফিরে আসে। তবু সে জানে এই নিয়ে তর্ক বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। সে শুধু বলল – “পর্ণার জন্যে যে আমরা এই কলকাতাতেই বেস্ট এজুকেশনের ব্যবস্থা করেছি, এটা নিশ্চয় মানো অ্যান্ড রিগার্ডিং প্রিয়াঙ্কা ও আমার বিবাহিতা স্ত্রী, অ্যাভাব অল শি ইজ অ্যান ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্ডিভিজুয়াল, কাজেই তার ব্যাপারটা তোমার কতটা বোঝা দরকার আই রিয়েলি ডাউট”

-       এটা ঠিক যে সে তোর বৌ এবং তোর কথা মতো একজন স্বাধীন ব্যক্তি, কিন্তু এটা ভুলে যাস না যে সে আমারও ছাত্রী। সেই সূত্রে কন্যাসমা। তুই নিশ্চয় আমাকে পিতৃকর্তব্য পালনে বাধা দিতে পারিস না, নাকি সে অধিকারটাও অ্যাজ অ্যান ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্ডিভিজুয়াল অর্জন করে ফেলেছিস?

-       আমি কি সে কথাই বললাম নাকি?

-       যদি না-ই বলিস তাহলে কি ভাবে জিজ্ঞেস করলি সত্যি সত্যিই আমরা আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে পারি না কি?

এই কথার কোনও উত্তর প্রাচ্যের কাছে ছিল না

-       দ্যাখ পুচু। বাস্তব বুঝতে হবে। কোনও কিছুর জন্যে জীবন থেমে থাকে না। তুই কিছুতেই বুঝতে পারছিস না যে তুই মরীচিকার পেছনে ছুটছিস। আচ্ছা বল তো তুই কি না করেছিস? কোথায় না গিয়েছিস? কি ফল হয়েছে? কিছুই তো হয়নি। এবারে এগুলো বন্ধ করে আমার কথা শুনতে হবে। আমি কখনও কারও ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করিনি। কিন্তু আজ বাধ্য হচ্ছি কারণ তুই সীমার বাইরে চলে যাচ্ছিস। আর একজন অভিভাবক হিসেবে সেটা সহ্য করা আমার অন্যায়। তোর ছুটকি চলে গেছে, আমিও হয়ত যে কোনও দিন। তার আগেই আমি এর শেষ দেখতে চাই

প্রণয়ের গলার স্বরে পরিচিত গাম্ভীর্য ফিরে এল।

-       কিন্তু ছোটকা…

-       কোনও কিন্তু নেই। নতুন কোনও সন্ধান পেয়েছিস কি?

প্রাচ্য নেতিবাচক ঘাড় নাড়ল

-       তাহলে খুব তাড়াতাড়ি ল-ইয়ারের সাথে কথা বল

-       ছোটকা প্লিজ কিছুটা সময় দাও। আই রিয়েলি নিড টাইম টু পুট দ্য সুইচ অফ

-       কত?

-       মাস খানেক

-       ঠিক আছে, কিন্তু এবারই শেষ। মনে থাকে যেন। ওখানে দেখ তোর জন্যে একটা সিভাস টোয়েন্টি ফাইভ রাখা আছে, ওটা বাড়ি নিয়ে যা

-       ওঃ ছোটকা ইউ আর রিয়েলি গ্রেট

-       ঠিক আছে, ঠিক আছে আর বিনয় করে কাজ নেই, এখন ভালয় ভালয় মদের বোতল নিয়ে বিদেয় হও। হ্যাঁ, ওই একমাসের ব্যাপারটা যেন মাথায় থাকে, তারপর কিন্তু আর এক সেকেন্ডও নয়।

আবহাওয়া হালকা হতে গিয়েও আবার ভারী হয়ে উঠল। প্রাচ্য আর কথা না বাড়িয়ে নিচে এসে অভ্যেসমত ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে একবার হাত নেড়ে গাড়িতে উঠে পড়ল।

(২)

“কি বললেন স্যর?” – চা নিয়ে এসে টেবিলে বসল প্রিয়াঙ্কা – “আমার কি মনে হচ্ছে জান? এবার বোধহয় ছেড়ে দেওয়াই ভাল”

-       ইস্যুটা যদি শুধু ছেড়ে দিলেই হয়ে যেত তাহলে সেটা একটা ব্যাপার হত। কিন্তু এর সাথে আরও যে বিষয়টা ছোটকা জুড়ছে সেটাতেই আমার আপত্তি। এটা তো আমিও বুঝতে পারছি যে আর বোধহয় কোনও ভাবেই কোনও লাভ নেই। এখন সমস্যাটা হল ছোটকা আমার এই ছকটা ধরতে পেরে ইদানিং অ্যাডামেন্ট উঠেছে, মুশকিল হচ্ছে আমিও ঠিক এই জায়গাটাকে কিভাবে ট্যাকল করব বুঝতে পারছি না। ন্যাচারালি কিছুটা হলেও টাইমপাস করতেই হচ্ছে। অ্যাটলিস্ট যতদিন না একটা ওয়ে আউট খুঁজে পাই

-       ওঃ ভাল কথা – প্রিয়াঙ্কা উঠে গিয়ে একটা মুখ বন্ধ খাম নিয়ে প্রাচ্যর হাতে দিল – প্রদীপদা এসেছিল

-       এই বুড়োকে নিয়ে আর পারা যায় না। মোবাইল নাম্বারটা পর্যন্ত লিখে দিয়ে এলাম, তাও কাউকে না কাউকে পাঠাবে

-       ওই রকম ভাবে বলছ কেন? বৃদ্ধ মানুষ আমাদের সবাইকে স্নেহ করেন বলেই তো। কি লিখেছেন?

-       স্নেহ! স্নেহের বাৎসরিক মূল্যটা তো তুমি জান। অবিশ্যি ট্যাক্সে কিছু বেনিফিট পাওয়া যায়।

-       তোমার যদি এরকম মনে হয় তাহলে দিও না, কিন্তু দিয়ে তারপর এভাবে বলাটা ঠিক নয়।

-       আরে ধুর, এমনিই মজা করছিলাম। বাবা শুরু করে গিয়েছিলেন আর আমি বন্ধ করে দেব!? যাকগে, কি লিখেছে শোন। স্নেহের পুচু, আগামী ২৩শে শ্রাবণ ইংরিজি ১০ই আগস্ট, রবিবার আমাদের আশ্রমমন্দিরের পঞ্চাশতম প্রতিষ্ঠাদিবস। ওই দিন বিশেষ পূজার্চ্চনা এবং উৎসবের আয়োজন করা হইয়াছে। তুমি যদি সপরিবারে দ্বিপ্রহরে প্রসাদ গ্রহণ করিতে পার, তাহা হইলে ভাল হয়। আপিস হইতে প্রেরিত আমন্ত্রণপত্র পাইয়াছ কিনা সঠিক জ্ঞাত নহি। সেই হেতু প্রদীপের হাতে এই পত্র পাঠাইলাম। ইহা ছাড়াও তোমার সহিত অন্য কিছু জরুরি প্রয়োজন আছে। তুমি যদি আসিতে পার বাকি কথা ওই দিন সন্ধ্যারতির পরবর্তী সময়ে সাক্ষাতে হইবে। আশীর্বাদক, ব্রহ্মচারী পবনচৈতন্য

-       সামনের রবিবার! কি দরকার আবার?

-       কে জানে। যাবে?

-       গেলে তো ভালই লাগত। কিন্তু পরেরদিন আবার পর্ণার ক্লাসটেস্ট

-       তা হলে কাটিয়ে দিই কি বল?

-       সেটা তুমি ভেবে দেখ, তবে আমার মনে হয় যাওয়া উচিৎ। বিশেষ করে যখন লিখেছেন যে দরকার আছে

-       হুঁ। দরকারটা কি সেটাই ভাবছি। চলেই যাই। টাকার দরকার হলে না হয় বলে দেব চেকবই সঙ্গে নেই

শেষ কথাটা প্রিয়াঙ্কা না শোনার ভান করেই চলে গেল মেয়ের কাছে।

 

(আগামী শনিবারে সমাপ্য)

যা হারিয়ে যায় – আরম্ভ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments