(গত শনিবারের পরে)

নির্দিষ্ট দিনে একটু সকাল সকালই প্রাচ্য পৌঁছে গেল। একসময় তার বাবা এই আশ্রমের স্কুলে চাকরি করতেন সেই সুবাদেই যাতায়াত। তারপর স্কুলের এক অশিক্ষক কর্মচারীর একমাত্র কন্যা কুমারী প্রিয়াঙ্কার সাথে আলাপের সূত্রপাত। এছাড়াও পুরনো বেশ কিছু মানুষজন আছেন, বিশেষ করে আছে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রদীপ, কাজেই তাদের সান্নিধ্যে সারাদিন কাটিয়ে দেওয়া কোনও সমস্যা নয়। উৎসাহের চোটে নিজেই বালতি নিয়ে নেমে পড়ল খিচুড়ি পরিবেশন করতে। তা দেখে প্রদীপ ফুট কাটল – “সেই যে প্রিয়াঙ্কাকে ইম্প্রেস করতে বালতি হাতে নিয়েছিলি তার অভ্যেসটা এখনও যায়নি দেখছি।“ “চল বিকেলে মাঠে ফুটবল পেটাই। এখনও ওই অভ্যেসটা আছে। মনে আছে বাইসাইকেল কিক করতে গিয়ে বেকায়দায় আমার ঘাড়ের ওপর পড়ে ঠ্যাং ভেঙেছিলি?”

প্রাচ্য অনায়াসে সন্ধ্যেবেলাতেই আসতে পারত। কারণ ধর্মীয় ব্যাপারে সে চিরকালই নিরুৎসাহী। কিন্তু তাহলে যে পুরনো দিনগুলি ফিরে পেতে তার এখানে আসা তাই অধরা রয়ে যেত। লাস্ট ব্যাচে খেতে খেতে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। এর মধ্যেই একবার বন্ধুর কাছে জানতে চেয়ে ফেলল কেন তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে সে ব্যাপারে তার কাছে কোনও তথ্য আছে কিনা। দেখা গেল তাকে যে পবনচৈতন্য ডেকে পাঠিয়েছে সেটাই প্রদীপের অজানা। বিষয়টা জানতে ব্যর্থ হয়ে প্রদীপের ঘরে একটু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যারতির সময় ঘাটে গিয়ে বসল। প্রিয়াঙ্কা থাকলে হয়ত মন্দিরেই যেতে হত কিন্ত্রু সে আর গেল না। আরতির সময় প্রদীপেরও মন্দিরে কাজ থাকে অতএব তাকে একাই আসতে হল। অদ্ভুত একটা পরিবেশ। পাশ দিয়ে নদী বয়ে চলেছে, তার মধ্যে মন্দির থেকে ভেসে আসা সমবেত প্রার্থনাসঙ্গীত, প্রাচ্যকেও যেন একটা অন্যজগতে নিয়ে যায়। সন্ধ্যারতি শেষ হতেই সে চলে গেল মহারাজের কাছ থেকে বিদায় নিতে এবং সেইসঙ্গেই জরুরি বিষয়টা কি জেনে নেওয়াটাও উদ্দেশ্য। প্রণাম করতেই ইশারায় বসতে বললেন। দুয়েকজন ভক্ত যাঁরা ঘরে ছিলেন তাঁদের ধীরে ধীরে বিদায় দিয়ে বললেন

- পুচু, জানিস তো নিশ্চয় সন্ন্যাসীর পূর্বাশ্রমের কথা প্রকাশ করা নিষেধ। তবে আমার মনে হয় ঈশ্বর সন্ধানকে যারা জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছে কোনও প্রলোভনই তাদের টলাতে পারে না। তুই স্বামী বিবেকানন্দের কথাই যদি ধরিস….
- যদ্দুর জানি স্বামীজির দুই গুরুভাইও তো তাঁদের বিবাহিতা স্ত্রীকে ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন
- সেটা ঠিক, কিন্তু এছাড়াও স্বামিজীর নিজের পারিবারিক অবস্থার কথাটাই একবার ভেবে দেখ
- সে তো বটেই, বাবা মারা গেছেন, বিধবা মা, ভাইবোনেরা ছোট, সে অর্থে কোনও ইনকাম নেই
- সত্যি কথা কি জানিস এসবই পূর্বনির্ধারিত। সবই তাঁর অভিপ্রায়। কখন যে কাকে নিজের কাজে জড়িয়ে দেবে কে জানে

এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাচ্য কোনও কথা বলল না। আসলে সে বুঝে উঠতে পারছে না এসব প্রসঙ্গ ঠিক কিভাবে এই নির্দিষ্ট সময়টিকে সম্পৃক্ত করছে। যদিও তার জানা আছে এই সব সাধু সন্ন্যাসীরা একবার ঈশ্বরপ্রসঙ্গ শুরু করলে সচরাচর শেষ করতে অনভ্যস্ত। ফলত সে ধরেই নিল একটু আগে ভক্তদের সামনে বলা কথার রেশ এখনও চলছে। প্রাচ্য একবার হাতের ঘড়ি দেখে নিয়ে বলল

- কি যেন একটা জরুরি দরকারের কথা চিঠিতে লিখেছিলেন
- হুঁ। একটু বোস। তা প্রিয়াঙ্কা আর পর্ণাকে নিয়ে এলি না কেন? নাকি ওদের এখানে আসতে ভাল লাগে না?
- না তা নয়, আপনি তো জানেন প্রিয়াঙ্কা আসতেই চায়। আসলে মেয়েটার কাল থেকে ক্লাসটেস্ট। আজকাল পড়াশোনার যা ধাক্কা!!
- কোন ক্লাস যেন
- এই তো সেভেনে উঠল। আপনার শরীর এখন কেমন আছে? কোমরের ব্যথাটা?

তার উশখুশানি ভাবটাকে বিশেষ একটা পাত্তা না দিয়েই পবনচৈতন্য একজন সহকারীকে ডেকে কিছু জলখাবার আনার নির্দেশ দিয়ে জানতে চাইলেন লাইব্রেরিয়ান ফিরেছেন কিনা। ফিরে এসেছেন শুনে তাঁকেও ডেকে দেওয়ার জন্য বললেন।
জলখাবারের প্লেট থেকে একটা মিষ্টি তুলে মুখে দিয়েই প্রাচ্য শুনতে পেল – “মহারাজ আমায় ডেকেছিলেন?”

“হ্যাঁ, ভেতরে এস” – ব্রহ্মচারী পবনচৈতন্যের অনুমতি পেয়েই যে নবীন সন্ন্যাসী ঘরে ঢুকলেন তাকে দেখে আকস্মিক ভাবে প্রাচ্যর শিরদাঁড়া বেয়ে যেন একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। যতই সময় পেরিয়ে যাক, কিছুতেই সে ভুল করতে পারে না। এই মুখ, এই চোখ, এই নাক, এই টকটকে ফর্সা প্রায় আপেলের মত গায়ের রং, সে ভুলে যাবে!! ওঃ এটাই তাহলে জরুরি দরকার!!! চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়েও আবার মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।

জল খেয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে তাকিয়ে দেখল নবতিপর বৃদ্ধের মুখে স্মিত হাসি। আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে বললেন – “তোমার কিছু জিজ্ঞাস্য আছে?” আগন্তুক প্রশ্ন করল – “মায়ের কি হয়েছিল?” প্রাচ্য একবার তাকালো। কত সহজে জিজ্ঞেস করতে পারল নিজের মায়ের মৃত্যুর কারণ!!  প্রাচ্যর মনে হল ওর গালে ঠাসিয়ে একটা চড় মারে। উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েও নিজেকে সামলে আবার বসে পড়ল। সামনের টেবিলের ওপর চোখ রেখে অস্ফূটে বলল – “ম্যাসিভ সেরিব্র্যাল অ্যাটাক। কোনও সময় দেয়নি। ছোটকার ফোন পেয়ে যখন পৌঁছালাম তখন সব শেষ” “আর বাবা?” প্রশ্নটা শুনে প্রাচ্য আবার একবার মুখের দিকে দেখল। তার চোখের ওপর নিবদ্ধ এক স্থির অচঞ্চল দৃষ্টি একের পর এক প্রশ্ন করছে। অন্য দিকে তাকিয়ে সে উত্তর দিল – “ছোটকার এক রকম চলছে। বাড়িটা বিক্রি করে কাছেই একটা ফ্ল্যাট কিনেছে। এখন তো একাই থাকে। একা একাই দাবা খেলে সময় কাটায়। এছাড়া মাঝে মধ্যে টিভিতে ফুটবল খেলা, সিনেমা, কখনও খবর, ব্যস। একজন সর্বক্ষণের কাজের লোক অবশ্য আছে। কিন্তু…..” কথা অসমাপ্ত রেখে একরকম মরিয়া হয়েই বলে উঠল – “পীতু, তুই একবার চল। বিশ্বাস কর, আমি ছোটকা আর ছুটকিকে কথা দিয়েছিলাম তোকে ফিরিয়ে আনব। আমি তোর কাছে…..”
- আর মদ্যপান?
- খুব বেশি তো কোনও কালেই খেত না। এখন সেটাও অনেক কমিয়ে দিয়েছে
- ভাল। মহারাজ আপনার সম্মতি পেলে আমি এখন…..
- কিন্তু ছোটকাকে আমি কি বলব?
- যা সত্যি
- ছোটকার ড্রিঙ্ক করাটাই শুধু দেখলি! আর দায়িত্ববোধ?

উত্তর না দিয়ে নবীন সন্ন্যাসী বেরিয়ে গেলেন। মাথা নিচু করে বসে থাকা প্রাচ্য পিঠে হঠাৎ পবনচৈতন্যের হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠল।

- জানতাম আমি
- কি জানতেন আপনি?

মরিয়া হয়ে জানতে চাইলেন প্রাচ্য

- দেখে নে পুচু, এই হল একজন সন্ন্যাসীর সাথে গৃহীর পার্থক্য। আমি অনেক ভাবেই ওকে পরীক্ষা করেছিলাম। বলেছিলাম, পুচু তোমায় জীবন বাজি রেখে খুঁজছে। ফিরে এসেছে দিল্লি থেকে। কিন্তু কোনও কিছুই যখন ওকে বিচলিত করতে পারল না তখন ঠিক করে নিয়েছিলাম একদিন তোর সাথে দেখা করিয়ে দেব। সে জন্যেই এবার যখন রাঁচি থেকে ও এল তখন এখানেই রেখে দিলাম। দ্যাখ সাধু হলেও আমরা মানুষ এছাড়া মানুষকে মুক্তি দেওয়াও সন্ন্যাসীর কাজ। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আমি তোকে দায়মুক্ত করলাম। আর এর জন্যে আজকের মত শুভদিন আর কোনদিনই বা হতে পারত?

(৪)

প্রাচ্য গাড়ি স্টার্ট করে প্রণয়কে ফোন করল
- আমি আসছি
- কখন?
- ন’টা সাড়ে ন’টা হবে
- ঠিক আছে
জানা নেই কিভাবে। কিন্তু প্রণয়কে রাজি করাতেই হবে সম্পত্তি যেন এই আশ্রমকেই দান করে দেয়।

যা হারিয়ে যায় – শেষ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments