বেশ কিছু ঘটনা সবসময়েই এইরকম থাকে যে একটু আগে শুরু হলেও তার এফেক্ট পেতে পেতে সময় গড়ায় এবং চূড়ান্ত রূপ ইতিহাস সৃষ্টি করে। এইরকমই একটি হল ভারতে পেপসি-কোক দ্বৈরথ যা গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছিল।

১৯৭৭ সালে কেন্দ্রে মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বাধীন জনতা সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে ভারতবাসীরা কোকের স্বাদ পেলেও পেপসির স্বাদ পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত। এখনও মনে আছে, পেপসি আসছে এই ধুয়োটা ওঠার পরেই একদম প্রথম প্রথম পেপসি বলতে বোঝানো হত, একটু মোটা প্লাস্টিকের প্যাকেটের ভেতরে একটি রঙিন বরফের লাঠি জাতীয় একটি জিনিস। যতদিন চেখে দেখিনি, ততদিন এই স্বাদটিকে সুস্বাদু মনে হলেও, প্রথমবার খাওয়ার পরে বুঝেছিলাম, স্বাদটি কিছুতেই সবচেয়ে কমদামী কাঠি আইসক্রিমের চেয়ে বেশি ছিল না।

যাই হোক, পেপসি আসছে – খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন ছেয়ে গেল অক্ষয়কুমার এবং জুহি চাওলার ছবিতে, হতবাক হয়ে সবাই দেখতে পেল বসার ঘরে টিভিতে তরুণ-তরুণীদের হার্টথ্রব দুই সুপারস্টার নেচে গেয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন যে পেপসি আসলে একটি সফট ড্রিঙ্কস। তার সাথে তৎকালীন বাজারচলতি পেপসি-র দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোনও সম্পর্ক নেই। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, টিআরপি-র নিরিখে পেপসির সেই বিজ্ঞাপনী প্রচার আজকের দিনের যে কোনও আচ্ছা আচ্ছা মেগাসিরিয়ালের টক্কর নেওয়ার ক্ষমতা রাখত।

এর আরও চার বছর পরে ১৯৯৩ সালে তুলনামূলক ভাবে অনেক নিঃশব্দে কোকাকোলা-র প্রত্যাবর্তন ঘটলেও অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পেপসি-কোক ডুয়েল সীমান্ত পেরিয়ে এসে ভারতে ঘাঁটি গেড়ে বসল। প্রথম ধাক্কাতেই বেশ কিছু বাজারচলতি নরম পানীয় অদৃশ্য হয়ে গেল, তার জায়গায় পেপসি, কোক এইসব শব্দ সবার মুখে মুখে ঘুরতে শুরু করল, প্রথম সারির ক্রিকেটার, নামী বলিউডি অভিনেতা-অভিনেত্রীরা প্রায় প্রত্যেকেই এই দুই শিবিরের কোনও না কোনও একটাতে নাম লিখিয়ে ফেললেন।

কিন্তু মূল পর্ব তখনও কিছু বাকি ছিল। যা দেখা গেল আরও তিন বছর পরে ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা একত্রে আয়োজিত আইসিসি ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপের সময়। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, ক্রিকেটপ্রেমী আপামর ভারতবাসীর দৈনন্দিন জীবনে বেশ আলোড়ন তুলে পেপসিকে পেছনে ফেলে এই মেগাইভেন্টের অফিসিয়াল স্পন্সরের তালিকায় কোক নাম তুলে ফেললেও সেই সময় আইকন ক্রিকেটারদের অধিকাংশই ছিলেন বিপক্ষ শিবিরে। সেই বছরই প্রথমবার উপমহাদেশে একটানা এতদিন ধরে দিনরাতের ক্রিকেট খেলার আসর বসেছে, খেলোয়াড়দের পরনে রঙিন জামা, বলের রং সাদা। এসবই তো মূল ক্রিকেটের পরিপন্থী ! যতই দশ বছর আগের ১৯৮৫ সালের বেনসন অ্যান্ড হেজেস কাপ থেকে দিনরাতের ক্রিকেট দেখে দেখে ততদিনে এসব ক্রিকেটপ্রেমীদের গা-সওয়া হয়ে যাক না কেন এই ঘটনাকে সামনে রেখেই ম্যাচ চলাকালীন টিভির বিজ্ঞাপন বিরতিতে আছড়ে পড়তে থাকল – নাথিং অফিসিয়াল অ্যাবাউট ইট। দর্শক বুঝে গেল – দুনিয়াতে পেপসি জ্ঞান, পেপসি ধ্যান। ফলাফল – অফিসিয়াল স্পন্সর ঝড়ের মুখে প্রায় শুকনো খড়কুটোর মতোই উড়ে গেল। শত্রুপক্ষের এই চালে বোধহয় কোকাকোলাও খানিকটা হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল অতএব যে সামান্য কিছু বিজ্ঞাপন তাদের দেখা যাচ্ছিল তা কারও মনে সেভাবে রেখাপাত করতে ব্যর্থ হল। মনে হয় বিশ্বক্রিকেট নিয়ামক সংস্থা নয়, উপমহাদেশের ক্রিকেটকে বুঝতে প্রকৃতই সক্ষম হয়েছিল পেপসি, আদ্যন্ত একটি কর্পোরেট সংস্থা।

এই ঘটনাটির ফলে অবশ্য আইসিসির স্পন্সরশিপ সংক্রান্ত স্ট্র্যাটেজি পাল্টানো অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল এবং অচিরেই তাই হল। তারা কড়া পদক্ষেপ নিল অ্যাম্বুশ মার্কেটিং রুখতে। এর সাথে আরও যেটা হল এই ‘অ্যাম্বুশ মার্কেটিং’ শব্দবন্ধটি জনসাধারণের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল।

অর্থাৎ একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট যেটা থেকে শুধুমাত্র খেলার মজা নেওয়ার কথা ছিল, উপভোগ করার কথা ছিল দক্ষ খেলোয়াড়দের কেরামতি, বাণিজ্যের কল্যাণে তা পরিচিত করিয়ে দিয়ে গেল এমন একটি শব্দবন্ধের সাথে যার সাথে অন্তত সেই সময় রোজকার জীবনযাত্রার কোনও সম্পর্ক ছিল না। 

যেমন কাটিয়েছি – ৯০-এর দশক – চতুর্থ টুকরো
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments