একটু পিছিয়ে যাই। ১৯৮৩ সাল, আমাকে একটি আবাসিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। প্রাথমিক ভাবে এই আবাসিক বিদ্যালয়টি মূলত আর্থিক এবং সামাজিক ভাবে একটু পিছিয়ে থাকা ছাত্রদের মধ্যে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে স্থাপিত হলেও পরবর্তী সময়ে প্রত্যেকের জন্যেই খুলে দেওয়া হয়। অবশ্য এই উন্মুক্ত ব্যবস্থা চালু হলেও বিদ্যালয়টির খ্যাতি তখনও তার মূল কাজকর্মের জন্যেই ছিল। ফলত অন্যান্য আর পাঁচটি বিদ্যালয়ে যে সংরক্ষণ ব্যবস্থা সেই সময় চালু ছিল তার চেয়ে কিছু বেশি ব্যবস্থাই এক্ষেত্রে নেওয়া ছিল। আবাসিক থাকাকালীন বিভিন্ন কারণে, যেমন একাধিক শ্রেণীর ছাত্র, ছাত্রদের মধ্যে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাগ্রহণের পার্থক্য (প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, বিদ্যালয়টি শুধুমাত্র একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না, প্রয়োজনানুসারে একাধিক নন-কনভেনশনাল বিষয়ের পাঠদান করা হত, যার মধ্যে ছিল ডেয়ারি, কার্পেন্ট্রি, টেলারিং ইত্যাদি), পৃথক আবাসনে থাকলেও মেলামেশার মধ্যে কোন গণ্ডি ছিল না ফলত এইসব কিছুই বুঝতে পারতাম না। বরং প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা একসাথে সময় কাটানোর সুবাদে যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল, তার তুলনা মেলা ভার। দীর্ঘ সাত বছর ধরে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক যেন খানিকটা ধাক্কা খেল বেরিয়ে আসার পরে। আজকের বিচারে অনুন্নতমানের যোগাযোগ ব্যবস্থার কল্যাণে এবং একেক জন এক এক দিকে চলে যাওয়ার কারণে কিছু শিথিলতা এসেই গিয়েছিল, তবু যেটুকু এর মধ্যে বাঁচিয়ে চলা যাচ্ছিল, অযাচিত ভাবে সেখানেও এসে উপস্থিত হল এমন একটা অন্য কিছু, যা আমরা বোধ করি কেউই ভাবতে পারিনি বন্ধুত্বের মাঝে চলে আসতে পারে, সেইরকমই কিছু একটা চলে এসে যে চিড় ধরেছিল, তা পুরোপুরি নির্মূল হতে সময় লেগেছিল।

সৌজন্যে – মণ্ডল কমিশন। ১৯৭৮ সালে প্রথম জনতা সরকারের আমলে বিন্ধ্যেশ্বরী প্রসাদ মণ্ডলের নেতৃত্বে সামাজিক এবং আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের উন্নতিকল্পে এই কমিশন তৈরি হলেও ১৯৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে রিপোর্টটি পেশ হলে সেই সময় শুধু নয়, রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন পরবর্তী কেন্দ্রীয় সরকারও রিপোর্টটিকে ইমপ্লিমেন্ট করার ব্যাপারে কোনও রকম উদ্যোগী না হলেও বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহ ১৯৮৯ সালে ক্ষমতাসীন হয়েই রিপোর্টির প্রস্তাবগুলিকে বাস্তবায়িত করার ইচ্ছা প্রকাশ করতেই গোটা দেশের অধিকাংশ অঞ্চলেই এর সপক্ষে এবং বিপক্ষে হিংসাশ্রয়ী আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। যদিও এই প্রস্তাবগুলি ছিল তফশিলি জাতি এবং উপজাতি ব্যতীত অন্যান্য পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্যে এবং তফশিলি জাতি এবং উপজাতির জনগণের জন্যে স্বাধীনতার পর থেকেই সংরক্ষণ চালু ছিল, তবু চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে অনুশীলিত এই বিষয়টিই সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে কি এক অজ্ঞাত কারণে অনেক বেশি প্রকট হয়ে উঠল।

ঠিক এই জায়গা থেকেই শুরু হয়েছিল সেই সম্পর্কের ভাঙন, যার উল্লেখ আগে করেছি। খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করতে শুরু করলাম যাদের সাথে একসাথে এতদিন এত সময় একসাথে কাটিয়েছি, তাদের মধ্যে কয়েকজন একটু গুটিয়ে গেল। সংরক্ষণের আওতাধীন নই জেনে আস্তে আস্তে দূরে সরে যেতে লাগল, অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে তারা যেন একটু অপরাধ বোধেও ভুগতে শুরু করল। অথচ মন্ডল কমিশনের রিপোর্ট থেকে তাদের নতুন করে বিন্দুমাত্র অতিরিক্ত কোনও সুবিধাভোগী হয়ে ওঠার কোনও সুযোগ ছিল না। 

এই দুই গোষ্ঠীর যেসব অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সাথে সেই সময় দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তাদের অধিকাংশের সাথেই আমার উষ্ণ সম্পর্ক ফিরে এসেছে তবুও আজও আমার কাছে এটা একটা ধাঁধা ঠিক কি কারণে তারা সমবেতভাবে শুধু আমার সঙ্গেই নয়, আরও অনেকের সাথেই এইরকম আচরণে সামিল হয়েছিল। আবার হয়ত এটাও একটা সম্ভাবনা যে সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত হলেও আমরা নিজেরাই হয়ত এমন কোনও মনোভাবের শিকার হয়ে পড়েছিলাম যা আমাদের বন্ধুদের দূরে ঠেলে দিতে সাহায্য করেছিল।

যথেষ্ট দ্বিধা নিয়েই লেখার এই অংশটি প্রকাশ করলেও এই পর্বটি ছাড়া ৯০-এর দশক অনেকটাই অধরা রয়ে যেত বলেই মনে হয় 

যেমন কাটিয়েছি – ৯০-এর দশক – দ্বিতীয় টুকরো
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments