হরর ফিল্মের প্রসঙ্গে আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই সবাই The Exorcist মুভিটির কথা বলে। এই মুভিটিকে বলা যেতে পারে হরর ফিল্মের সংজ্ঞা প্রদানকারী। আমিও লেখা শুরু করব The Exorcist এর প্রতি ভালোলাগা জানিয়ে। যদিও যে মুভিটির কথা বলতে চলেছি তা Exorcist এর চেয়ে অনেক বেশী উত্তম।

[এটি মুভিটির ইংলিশ পোস্টার। মূল কোরিয়ান ডিভিডির পোস্টার আমার ব্লগে আছে, যা কপিরাইটজনিত কারণে চর্যাপদে দিতে পারলাম না।]
 
 
এশিয়ান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মধ্যে কোরিয়ান ইন্ডাস্ট্রিগুলোর অবস্থান অনেক উঁচুতে। কোরিয়ান একটি ফিল্মই পাল্টে দিয়েছিলো হরর ফিল্মের সংজ্ঞা। হরর ফিল্মে টিপিক্যাল ভৌতিক উপাদানের পাশাপাশি দুর্দান্ত স্টোরিলাইন ও স্ক্রিপ্ট, অ-সরলরৈখিক গল্পকথনের ভঙ্গি (non-linear storytelling) এবং একাধিক অনবদ্য ট্যুইস্ট নিয়ে 2003 সালে লেখক-পরিচালক কিম জী-উন আমাদের শোনালেন A Tale of Two Sisters.
 
একই সাথে স্পয়লার না দিয়ে এবং অস্বচ্ছতা না রেখে এধরণের মুভির রিভিউ লেখা কঠিন কাজ। তবুও আমার একটা চেষ্টা থাকলো এই কঠিন কাজটি করার। কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্পয়লার রয়ে গেলো। তবে সেটা নিতান্তই পাঠকের আগ্রহ তৈরি করার জন্য, নষ্ট করার জন্য নয়।
 
মুভিটির প্রথমেই কাহিনীর মূল চরিত্র দুই বোনের আমাদের পরিচয় হয়। বড়বোনের নাম সু-মি, ছোটটির নাম সু-ইয়োন। শুরুতে একটু মনোযোগ দিলেই ধরা যায় যে সু-ইয়োন তার দিদির প্রতি অত্যন্ত নির্ভরশীল। আর সু-মি এরও তার বোনের প্রতি একটা মাতৃত্বের ভাব রয়েছে। কোরিয়ান মুভিগুলোতে বরাবরই গল্প কথনের প্রায় সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় চরিত্রগুলোর আন্তঃসম্পর্ক তৈরির দিকে। যেটা হলিউডি মুভিতে খুব কমন নয়। মুভিটি দেখার শুরু থেকেই চরিত্রগুলোর সম্পর্কের ধরণটা বোঝার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।
 
 

 
তাই প্রথম দেখাতেই এই অস্বাভাবিকতা মনোযোগী দর্শকের চোখ এড়াবে না, আর ক্যাজুয়াল দর্শকের ক্ষেত্রে অবচেতনে একটা খটকা তৈরি করে দেবে। দুই বোনের মধ্যে সম্পর্কটা যেমন হওয়া উচিত, সু-মি আর সু-ইয়োন এর ব্যাপারটা যেন ঠিক সেরকম নয়। বরং বড়বোনের তরফে একটা মাতৃত্বের ভাব রয়েছে আর ছোটবোনের তরফে রয়েছে এক অদ্ভুত জড়তা। সুতরাং গোলমালটা সেখানেই। এই দুজনের মা এর ব্যাপারটা মুভিতে মাঝামাঝির দিকেই এসেছে, আর সেটা একটা বিশেষ গুরুত্ব ধারণ করে রেখেছে।
 
সিনেমার প্রথমেই এদের সৎমা ইউন-জু এর আগমনে এ ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে এদের মা আর বেঁচে নেই। বাবার সাথে দুইবোনের সম্পর্কে একটু জটিলতা আছে। মেয়েদের তরফে, অন্তত সু-মি এর তরফে বাবার প্রতি ভালোবাসার অভাব নেই। কিন্তু বাইরে সেটা প্রকাশ পায়না। বরং সু-মি তার বাবার প্রতি একটা চাপা ক্ষোভ দেখায়। সৎমা ইউন-জু কে তো সু-মি দুচোখে দেখতে পারেনা। সে কেবল সৎমা বলেই তার এই বিদ্বেষ নয়। আরও একটা গোপন কারণ আছে, যেটা মুভির শেষের একটু আগের দিকে প্রকাশ করা হয়।
 
যাহোক, সৎমার সাথে সু-মি এর বিবাদের ফল ভুগতে হয় বেচারা ছোটবোনটিকে। ইউন-জু বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিরক্ত হয়ে সু-ইয়োন এর উপর নির্যাতন চালায়। একসময় পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়। আর তখন থেকেই একের পর এক ট্যুইস্ট আসতে থাকে, আর বোধহয় সু-মি এর চূর্ণবিচূর্ণ মানসিক অবস্থার প্রতিফলনেই সিনেমার প্রথম দিকের সরলরৈখিক গল্পকথন এবার ননলিনিয়ার আকার ধারণ করে। আর দক্ষ কোলাজ শিল্পীর মতই লেখক কিম জী-উন এবার তাঁর পরিচালনার দক্ষতাও দেখাতে থাকেন একের পর টুকরো টুকরো স্মৃতি জোড়া দিয়ে। চলতে থাকে এক অসম্ভব পরিস্থিতি, যেখানে ছিপের সুতো ছাড়া আর গুটিয়ে নেওয়া চলছে সমান্তরাল ভাবে।
 
পুরো মুভিটির বিভিন্ন অংশে দুইবোনের বাড়িটিতে তারা চারজন ছাড়াও এক পঞ্চম পক্ষের উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। বলাই বাহুল্য প্রথম দর্শনে মনে হবে এই পঞ্চমজন একটি প্রেতাত্মা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আদৌ সে প্রেতাত্মা, নাকি কারও হ্যালুসিনেশান – সেটা নিয়ে সন্দেহ হয়। প্রকৃতপক্ষে বাড়ির বাসিন্দারা আদৌ কতজন সেটা নিয়েও সন্দেহ দেখা দেওয়া বিচিত্র নয়। সিনেমার বিভিন্ন অংশে মনে হবে বাড়িটির বাসিন্দা চারজন, পাঁচজন, তিনজন এমনকি দুইজন। কারা আসলেই বর্তমান এবং কাদের উপস্থিতি ছায়াময় সেটা স্পষ্ট করার জন্যই মুভির ননলিনিয়ার অংশটি দর্শককে সাহায্য করবে।
 
এবার ফিরে আসি পোস্টের টাইটেলে। কেন "A Tale of Two Sisters" সেরা? কারণ বিভিন্ন জেনারের সেরা মুভিগুলোর সাথে এই মুভির বিভিন্ন এলিমেন্টের তুলনা চলে। হরর সিকুয়েন্সের শ্যুটিং এ একে "The Exorcist" এর সাথে তুলনা দেওয়া যায়। ননলিনিয়ার টাইমফ্রেমের অসাধারণ উপস্থাপনায় এর সমতুল্য হতে পারে একমাত্র "Memento" মুভিটি। দুর্দান্ত ট্যুইস্ট ডেলিভারির টেকনিকে এটি Fight Club এর মত যুগান্তকারী মুভির সাথে তুলনীয়। আর সংবেদনশীলতা আর সম্পর্কের জটিলতায় বোধকরি এর তুলনা দিতে গেলে অন্য কোনও কোরিয়ান মুভির কথাই বলতে হবে। এককথায়, খালি হরর ফিল্ম হিসাবে নয়, একটি পরিপূর্ণ ফিল্ম হিসাবে A Tale of Two Sisters দর্শককে মুগ্ধ করবে।
 
বরাবরের মতই হলিউডে এর একটি ট্র্যাশ রিমেক করার চেষ্টা হয়েছিলো 2009 সালে, The Uninvited শিরোনামে। যাতে মূল ছবিটির পরিচালনা বা স্ক্রিপ্টের কোনও মুন্সিয়ানাই অবশিষ্ট ছিলোনা।
যে কোরিয়ান মুভিটি হরর ফিল্মের সংজ্ঞা পালটে দিয়েছিলো : A Tale of Two Sisters
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments