শিকড়-বাকড় প্রায় সব-ই ছিঁড়ে গেছে অনেকদিন হলো, তাও পলিটিক্স আর পপুলেশন বৃদ্ধির বাইরেও এককালে একটু-আধটু খবর রাখতাম, আর কিছু না হোক কবে কি পালা-পার্বণ হচ্ছে ্সেটা ঠিক জেনেই যেতাম – হঠাৎ আজ সকালে ফেসবুক  খুলে জানতে পারলাম দেশজুড়ে দোল হচ্ছে .. শুনেই এই প্যাচপেচে বৃষ্টির দিনে মনটা আরেকটু স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেলো …

 

এ পোড়া দ্যাশে ভাঙ-টাঙ পাওয়ার তো কোনো আশাই নেই, উদ্যমী দেশোয়ালি ভাই-বেরাদরদের দেখা পাওয়াও মির‍্যাকলের সমতূল্য, কাজে এক্কাপ কফি খেয়েই চোখ বুজে কল্পনা করে ফেললাম খানিক। পষ্ট দেখলাম চারদিকে রংজলে ভরা বেলুন ছুটছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মতন, কিছু হনুমান রঙ মাখা ছেলেপিলে জামা কাপড় ফর্দাফাঁই করে হিংস্র উল্লাসে লাফাচ্ছে – আমার আবার ভায়োলেন্স পোষায় না, তাই মাঠের এককোণে একটা থান ইঁটে মাথা দিয়ে দিব্য নাক ডাকাচ্ছি … আর পাশে কোনো এক সদ্য প্রেম সেরে ওঠা কিশোর, ভারি দুঃখের সাথে ধানাইপানাই করছে, সিদ্ধিলাভ মনে হচ্ছে আর বেশী দূরে নেই …

 

অবিশ্যি ছোটোবেলায় দোল ব্যাপারটা আদৌ হোলি ছিলো না আমাদের বাড়িতে, বাবা-মা কচি বয়সেই ঘোষণা করে দিলেন, দোল মানে বড়োজোর গুরুজনদের পায়ে অল্প একটু এবং বিনিময়ে মাথায় আরো কম আবির – এবং বেসরকারী কারফিউ, রাস্তায় ওৎ পেতে কারা যেনো বসে আছে, বেরোলেই নর্দমার জলে চুবিয়ে বাড়ি পাঠাবে … পরেরদিন স্কুলে গেলে দেখতাম এক ক্লাস পরিষ্কার করুণ মুখের মাঝে কয়েক জোড়া লাল-রঙা কান আর বিজয়ীর হাসি, টিচারের বকুনি খেয়ে চওড়া থেকে চওড়াতর হচ্ছে সেগুলো – সেই নিষ্পাপ নব্বুইয়ের সেইগুলোই ছিলো আসল প্রতিবিপ্লব …

 

আমারও সহজেই সময় এসে গেলো, পাড়ায় মাঠের বন্ধুরা বললো – পরের দোলে আমায় বাঁদুরে রঙ মাখানোর দায়িত্ব গোটা জামরুলতলার। বাবা প্রথমে নর্দমার জলের ভয় দেখালেন, তারপর বুঝলেন মধ্যবিত্ত বাঙালী আইসক্রিম, পেপসি সবতেই নর্দমার ভয় টেনে এনে ব্যাপারটাকে ধর্মঘটের মতোই অকেজো করে ফেলেছে, তারপর বললেন বেলুন মারলে লাগবে, তাতে বললাম তাহলে শুদ্ধু বড়োদের দিকেই ছুঁড়বো – শেষমেশ বললেন জোর করে সিদ্ধি-ভাঙ খাইয়ে দিতে পারে, বলেই বুঝলেন জোরটোর লাগবে না, সেসব দৈব প্রসাদের প্রতি জন্ম থেকেই আমার অবিচল ভক্তি …

 

তারপর থেকেই দোলের মানে হুট করে পালটে গেলো – সেই সকালে মা একটা পুরোনো টিশার্ট বের করে দিতেন গজরগজর করতে করতে, আমরা কয়েকজন এপাড়া ওপাড়া ঘুরে দস্তুরমতন গোটা এলাকায় দোলের ধাত এবং জাত নিয়ে রিসার্চ করে বাড়ি ফিরতাম বেলা গড়িয়ে – বাবা তখন খ্যাপা টাইসনের মতন রিঙে পায়চারি করছেন, বাড়ি ঢুকলেই হুক-পুল-জ্যাব মেরে সোজা কলতলায় – আমার কুছ পরোয়া নেই, পরের দিন স্কুলে গিয়ে আমিও গল্প বলবো — সাঁতরাপাড়ায় কেমন পাবলিকের চান করার জায়গাটায় রঙীন চৌবাচ্চা বানিয়েছিলো, মাম্পির বাবা কেমন বাড়ির বাগানে লুকিয়ে রেখেছিলেন পাড়ার নেড়ী-ন্যাড়াদের, রঙের থেকে বাঁচাতে – আর শেষে বলবো সেরাটা,  পেয়ারাবাগানের গলিতে আমার আর আমার বন্ধুর মাথায় ছাদ থেকে বালতিভর্তি জল ঢেলে দিলো যে মেয়েটি, "পালিয়ে যাওয়ার আগে একবার চোখাচুখি" হয়েছিলো না? - দোলের গল্পেও রঙ না চড়ালে আর কিসে চড়াবো, বলুন?

 

তবে নাঃ, সিদ্ধি-টিদ্ধি কেউ দিতো না, সেই কলেজে যাওয়া অব্দি দোল এক্কেবারে মাটিতেই কেটেছে … কলেজে তো এলাহি ভরোসা, মেসের টেবিলে বিশাল বিশাল গামলায় মেসের কালিদা-বংশীদারাই বানিয়ে রাখতো অমৃতের শরবত, আ-হা ! তার বর্ণনা দেওয়ার ক্ষমতা এই খাগের কলমে অন্ততঃ নেই – তবে হ্যাঁ, যা যা ম্যাজিক দেখতাম ভোলবার নয় …

 

এক দোর্দন্ডপ্রতাপ জুনিয়র ছিলো, জেজে, চট করে তার পা বা মাথা টলে না, হরলিক্স পার্টিতে হাফ-ছাদ যখন মৃদুমন্দ মলয় বাতাসে উড়ে বেড়ায় ইধার-উধার, জেজে তখন মন দিয়ে এটাসেটামিক্স করে বা নিপুণ দক্ষতায় পথভোলা পথিকদের পৌঁছে দেয় নিজ নিকেতনে … একবার দোলের দুপুরবেলা, সেই জেজে, আমি, আরো কয়েক ঘোর পাপী বসে আছি মেসের মাঝখানে গোল করে, আর এক বন্ধু যাকে রাঙানোও যায়নি, ভাঙানোও যায়নি … হঠাৎ সবাই বুঝলো কেউ-ই প্রায় ঘন্টাখানেক কোনো কথা বলছে না, খালি ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে বেড়ালের মতন হেসেই চলেছে – থামার নাম নেই , আর সেই একজনের বদ্ধমূল ধারণা সবাই তার উপরেই হাসছে, কিন্তু কেন কেউ জানেনা… একটু পর জেজে প্রথম কথা বললো, 'বুঝলে, সিদ্ধি হচ্ছে অনেকটা ইথার তরঙ্গের মতন, যারা খেয়েছে সবাই কানেক্টে্‌ড, বাকিরা সিগন্যাল ধরার লোভে অ্যান্টেনা বাড়িয়ে আছে, কিন্তু ক্লিয়ার পিকচার আসছে না' …

 

সেদিন বাড়ি ফেরার সময় ফাঁকা মিনিবাসে উঠে জেজে দুটো টিকিট চেয়েছিলো, কন্ডাক্টর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকায় একটু পরে বলেছিলো, কেনো একটা আমার, একটা আমার ব্যাগের !

 

আমি দুপুরে বাড়ি ফেরার রিস্ক-ই নিইনি, সন্ধ্যেবেলায় হঠাৎ একটা ফোন আসে, এক পোটেনশিয়াল ছাত্রীর, অঙ্ক শিখতে চায়, তাদের বাড়ি গেছি, সন্দেশ-শরবৎ সাজিয়ে দিয়েছে, আমার এদিকে প্লেটে হাত দিয়েই মনে হলো অনেকদিন ক্যারম খেলা হয়নি, একটা গোলপানা কড়াপাকের মিষ্টিকে স্ট্রাইকার বানিয়ে একটা ইঞ্চি শট অনেকক্ষ্ণ ধরে মেপে যাচ্ছি – হঠাৎ পর্দার ওপার থেকে দয়ালু কাকিমার গলা ভেসে এলো, 'বেশী অঙ্ক-টঙ্ক করলে না এরকম হয়ে যায়, আমার মেয়েটাকে বরং ডাক্তারিটাই পড়িয়ো বুঝলে?' …

 

আরেকবার দোলের সন্ধ্যেয় পূর্ণিমার চাঁদটাকে তাড়া করে করে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম আমি আর এক বন্ধু মিলে, ঠিক করেছিলাম সেই রাত্তিরে গোটা উত্তর কলকাতার সবকটা চায়ের দোকান ঘুরে চা খেয়ে ঠিক করবো কার চা সবচাইতে ভালো – কোথায় কোথায় ঘুরেছিলাম সেটা আর মনে নেই, তবে সেরা চায়ের দোকানটা মনে আছে আবছা – একটা উঁচু রেললাইনের জমি, তার তলার একটা গুমটি ঘরে একটা দিদু চা বানায় কেরোসিনের স্টোভে …

 

লিখতে-লিখতেই মনে পড়লো সেদিন সন্ধ্যেবেলাও ঠিক এমনি টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিলো সারাক্ষণ, ভিজতে ভিজতে একটু হাঁটা, আবার ছাঁট দেখলে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট … বুড়ি দিদুর দোকানে কেউ আসেনি সেদিন … অনেকক্ষ্ণ গল্প করেছিলাম … বাড়ি ফিরে সেদিন আয়নায় দেখেছিলাম বৃষ্টিতে ভিজে রঙ আর নেশা দুটোই ফিকে হয়ে গেছে একদম …

 

তারপর আর খেলিনি, নাঃ … খুব বৈরাগ্য টাইপের এসে গেলো … কোলাহল আর ভালো লাগতো না, ফাঁক পেলেই ছুটে শান্তিনিকেতন চলে যেতাম, বসন্তোৎসব মনে হতো স্বপ্নের মতো, সকালবেলায় "ওরে গৃহবাসী"-র সাথে গলা মেলাতে মেলাতে অবাক হয়ে দেখছি ফাগুন হাওয়ায় উড়ন্ত গুলাল, মনে মনে কোথাও ওই হলুদ-লালের দলে মিশে যেতে চাইছি আমিও, দলে ভিড়ে দুপুরবেলা যাচ্ছি কঙ্কালিতলার মাঠ, বিকেলের দিকে কি কোপাই ? … হয়তো সে আর এক জন্মের কথা, ওই কোপাইয়ের মাঠেই হয়তো বসে আছি … গলা বেয়ে গান উঠছে আজ, বন্ধুরা সারি সারি সাইকেল গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে রেখেছে আর মাদল বাজছে জ্যোৎস্নার চরাচরে, সবাই নাচছে আগুনকে ঘিরে …

 

কখনো ভাবতাম নাঃ, অনেক দূরে কোথাও অন্য কোনো দেশে যেন জন্মেছি আমি, বৃদ্ধ হয়েছি লেখার পিছনে ছুটে ছুটে… জানলা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি বরফে ঢাকা ঝাউগাছের তলায় বাচ্চারা দৌড়ে বেড়াচ্ছে, আমি ধূমায়িত কফির কাপের পাশে টাইপরাইটারের সামনে পরের প্লটটা ভাবছি …

 

যেন সেই স্বপ্নের মধ্যেই জেগে উঠলাম আজ, বাইরে এখনো সেই অঝোর বৃষ্টি, সেই ধূসর আকাশ, তার মাঝে খানিক শিল পড়লো যেনো টুপ্টাপ করে, গিন্নীমশাই কফির কাপে শিল ধরতে গিয়ে ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপ্টা খেয়ে পালিয়ে এলেন, এখন আমার চারপেয়ে ছানা মেচকু সারা পাড়াকে কীর্তনগান শুনিয়ে তেনার কোলে শুয়ে নাক ডাকাচ্ছে আর স্বপ্নে খরগোশ আর কাঠবেড়ালী তাড়া করে যাচ্ছে প্রাণপণ .. লেখা শেষ করেই ওদের শোনাবো, তারপর দারুণ এককাপ চা আর সিঙ্গারা ! কে বলেছে আরকানসায় দোল আসে না?

রঙ-রুটের বাস
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments