বাবা মার কথা না শুনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তপা সারাজীবন পস্তাচ্ছে। ছোটবেলা থেকে বাপমায়ের বাধ্য থাকার পর মাধ্যামিক এর বাধ্য মেয়ে বিগড়ে গেলো বারো ক্লাসে গিয়ে। কাঠ বাঙাল বামুনের মেয়ে কিনা প্রেমে পড়লো রাজার, যে একে ঘটি তায় কায়েতসন্তান। সে প্রেমের পরিনতি কয়েকবছর পরে বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়েতে। তারপরই তপা প্রতিদিন অনুভব করতে থাকলো কি ভুলই না করেছে।
কায়েত শাশুড়ি তো বামুনের মেয়ের প্রণাম নিয়ে নতুন করে কোনও পাপ করতে রাজি ছিলেন না। আগে কি ছিলেন ওনারা তপা জানে না, কিন্তু বাঙাল বউ ঘরে আসার পর শ্বশুর বাড়ির সবাই তাদের চরম বাঙাল বিদ্বেষ দেখাতে থাকল। ওদের মতে, নদিয়া পেরলেই পৃথিবীর সীমানা, ওপারে ভিনগ্রহের জীবের বাস। বাঙালরা নাকি কি এক অদ্ভুত ভাষায় কথা বলে, যা মনুষ্যজাতির বোধগম্য নয়।ওনারা ইলিশ মাছ খান না, ওই কাঁটাময় জিনিষ নাকি ভদ্রলোকে খায় না। ওনারা চিংড়ির ভক্ত। পরে আত্মীয়দের কাছে জেনেছিল শাশুড়ি মা নাকি চরম ইলিশ ভক্ত ছিলেন, বাঙাল বউ আসার পর নিজেকে বদলেছেন। চিংড়ির মালাইকারির ভক্ত তপাও চিংড়ি বর্জন করল।

অবস্থা চরমে উঠত মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল খেলার দিনে। শ্বশুরবাড়ির কল্যাণে তপা জানলো যে ইংরেজদেরকে দেশ থেকে তাড়িয়েছিল মোহনবাগান ক্লাব। ওনারাও জানলেন যে মোহনবাগানের কাজ হল ইস্টবেঙ্গলের কাছে পাঁচ গোল খাওয়া। এভাবেই কাটছিল দিন। তপা রাজার একমাত্র ছেলে যে নিজেকে কখনো বাঘ কখনো বাটি বলত, সে বড় হতে থাকল। ছেলেকে ঘিরে দুজনেরই খুব আশা। তপা ঠিক করে রেখেছিলো ছেলের জন্য বাঙাল বৌ আনবেই। সে আশায় ছাই দিলো আমেরিকাবাসি পুত্র। ঘোষণা করলো সে বিয়ে করতে চায় এক পাঞ্জাবিতনয়াকে।
রাজা তপা দুজনেরই ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টায় কোনও খামতি দিল না। কিন্তু ভবী ভুলল না। তপা- রাজা দুজনেই গজগজ করতে থাকলো, আজকালকার ছেলেমেয়েরা বাপমায়ের কথা শোনে না। তবে তপা এই ভেবে শান্তি পেল যে পাঞ্জাবিরাও তো এক অর্থে বাঙাল, ওরা পাকিস্তান থেকে বেড়া টপকে এসেছে। কাজেই বউমা তার দলেই হবে। পাঞ্জাবি বাঙাল আর আসল বাঙাল এক হয়ে এই ঘটি সাম্রাজ্যের পতন ঘটাবে। ইলিশ মাছ এবার এই বাড়ীতে ঢুকবেই।

ছেলের বিয়ে দিতে পৌঁছল ওরা মোহালিতে। নিজেরা কি মতে বিয়ে করেছিল, তা নিজেরাই জানে না। কিন্তু ছেলের বিয়েতে বাঙালীয়ানা দেখাতেই হবে, তাই তপা অনেক ভেবেচিন্তে শাঁখা আর লজ্জাবস্ত্র এনেছিল। বিয়ের আগের দিন বেয়াইয়ের গলা জড়িয়ে তপা খুব নাচ নাচলো। পাঞ্জাবি আর রাবিন্দ্রীক ঘরানার মিশ্রনে এক অদ্ভুত নৃত্যশৈলি তৈরী হল। রাজাও কম গেল না। মদের সবকটা ব্র্যান্ড পেটে যাওয়ার পর জিতেন্দ্র আর বচ্চন দুজনে একজোটে তার পায়ে ভর করল।

বিয়ের দিন সকালে ব্যাগ খুলে দেখা গেল শাঁখা হয়েছে তিন টুকরো, রাজা গজগজ করতে থাকলো এই বাঙালরা নিজের দেশটাকেই ভেঙেছে, শাঁখা কি করে গোটা থাকে! এরপর চিন্তা এই পাঞ্জাবে শাঁখা পাওয়া যাবে কোথায়। মেয়ের বাড়ীর কাছ থেকে গাড়ী নিয়ে বেরোল রাজা। সংগে তার মাসতুতো ভাই। রাস্তায় এক শাঁখাশাড়ী পরিহিতাকে দেখে মাসতুতো ভাইয়ের জিজ্ঞাসা, দিদি শাঁখার দোকান কোথায় পাব। মহিলা প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও বললেন, আমি তো কলকাতা থেকে কিনে আনি। এখানে পাবেন না। তবে কালীবাড়ী গিয়ে খোঁজ নিন। কালাবাড়ীর সন্ধানও তিনিই দিলেন। কালীবাড়ীর পুরোহিতকে সমস্যার কথা বলতে তিনি বললেন, এখানে পাবেন না। তবে লোকে পুজো দিতে এসে শাঁখাও দিয়ে যায়, তাই না হয় আপনাদের দিচ্ছি। বিয়ের আগে মঙ্গলঘটএ ডাবের অভাবে চণ্ডীগড় গোল্ডেন আপেল দেওয়া হল।
লজ্জাবস্ত্রও আনা হয়েছিল, কিন্তু সেটা দিয়ে যে কি করা হয় তা দুজনেই জানতো না। আবার সেই মাসতুতো ভাই সহায়, কোনো বউদিকে ফোন করে জেনে নিল কখন কি করতে হয়। যাই হোক লজ্জাবস্ত্র আর শাঁখার বাঙালীয়ানা বাদ দিলে বিয়েতে সবই হল পাঞ্জাবিমতে। কনের সাজ দেখে তো নতুন শ্বশুড় শাশুড়ীর চক্ষু চড়কগাছ, কয়েককিলো ওজনের লেহংগা চোলি পরিহিতাকে বধু মানতে কিছুটা বাধছিলো। রাজা তাকে বলল, মা আমাদের ওখানে গিয়ে শাড়ী পরতে হবে। জলদি জবাব, হ্যাঁ বাবা, আমার জন্য দেবদাস শাড়ী রাখবেন, আমার খুব শখ। দেবদাসকে মদ্যপ জমিদারপুত্র হিসেবেই জানত রাজা, সে যে শাড়ীর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার হল কবে কবে থেকে তা তার বোধের বাইরে। তখন হবু বৌমা বোঝালো, কাহানি সিনেমায় বিদ্যা বালান যে শাড়ীতে অসুরনিধন করেছিল, ওই শাড়ী চাই।

তপা ভয়েভয়ে পাত্রীকে জিজ্ঞেস করলো, মা মাছ খাও তো। সপ্রতিভ উত্তর, হ্যাঁ, শিঙারা মছলি তার খুব প্রিয়। শিঙারা চায়ের সাথে খায়, তাই জানতো তপা, সেটা মছলির পর্যায়ে এলো কি করে তা বোধগম্য হচ্ছিল না তার। কিন্তু মাছ খায় শুনে বুকে বল এল; বলল, তোমাকে আমি মাছের রাজা ইলিশ খাওয়াব। ভুলে যাবে অন্য সব মাছ। ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ।
হবু বউমা বলে উঠল, জাতীয় পশু জানি, জাতীয় ফুল জানি, জাতীয় মাছের কথা তো শুনি নি।
- শুনবে কি করে মা, সব ওই ঘটিদের চক্রান্ত। হতবম্ভ হয়ে শাশুড়ীর দিকে তাকাল বৌমা।
ছেলে বৌ নিয়ে বাড়ী ফিরল তপা-রাজা। বিয়ের ভোজ চুকলো, লোকজন বিদায় হল। ক'দিন পর ছেলে তার বৌ নিয়ে আমেরিকা ফেরত যাবে। সকালবেলায় রাজা বাজার থেকে নিয়ে এল পেল্লায় মাপের গলদা চিংড়ি। এদিকে তপার পেয়ারের মাছওলাও দিয়ে গেছে পদ্মার ইলিশ। চিংড়ি দেখেই বৌমা আঁতকে উঠলো, ও তো জলের পোকা। আমি খাব না। তপা যারপরনাই খুশী। এই তো সাচ্চা বাঙাল, হোক না পাঞ্জাবের।
গোটা ইলিশ দেখে বৌমার তীব্র আপত্তি, ওই রকম চোখওয়ালা মাছ ও খাবে না। তপা প্রাইমারীর বাচ্চাদের মত করে তাকে বোঝাল যে শিঙাড়া মাছেরও চোখ থাকে। কেটে বাদ দিলেই হল। নতুন শাশুড়ীর কথা ফেলতে পারল না সে, খেতে রাজী হল।
দুপুরে খেতে বসে নতুন বৌয়ের চক্ষু চড়কগাছ। ভাতের থালায় সাজানো ইলিশের চারপদ। শুধু বলল, ইতনা মচ্ছি? শাশুড়ীর নির্দেশে একটা ভাজা ইলিশে দিল কামড়। তারপরই বিদ্যা বালানের মত শাড়ী পরিহিতা বৌমা শেফালি জরিওলার স্টাইলে নেচে উঠলো, কাঁটা লাগা।

রাজা চেঁচিয়ে উঠলো, বলেছিলাম উল্টোপাল্টা জিনিষ না খাওয়াতে। তাড়াতাড়ি শুকনো ভাত আর জল খাইয়ে কাঁটামুক্তি তো হল, কিন্তু পাঞ্জাবি বৌমা আর ভাতের থালার দিকে এগোলো না। শাশুড়ীর হাজার আশ্বাসেও তার ভয়মুক্তি হল না।
টেবিলে রাখা ছিল গোটাপাঁচেক রসগোল্লা। ক্ষুধার্ত বৌমা সেগুলোকে আক্রমন করলো। শ্বশুড়শাশুড়ীর লুব্ধ ক্ষুব্ধ দৃষ্টির সামনে সেগুলো শেষ করে বিনা শব্দে ঘোষনা করল, ইলিশ কি চিংড়ি নয় বাঙালীর প্রতীক রসগোল্লা। বাঙালীয়ানা বলতে সারাদেশে ওটাই বোঝে।

রসগোল্লা
  • 4.00 / 5 5
1 vote, 4.00 avg. rating (81% score)

Comments

comments