রামনবমী কি আজকে ? হতে পারে, আজ হতে পারে, গতকালও হয়ে গিয়ে থাকতে পারে আবার আগামীকাল হবে এমনটাও সম্ভব। আসলে সব ঘেঁটে গিয়েছে। পাঁচ-ছয় বছর আগেও পাড়ায় এক বাড়িতে রামনবমীর নিমন্ত্রণ থাকতো রাতের খাওয়ার, নানা কারণে গত কয়েকবছর যাবৎ বন্ধ। পাড়ার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী তাই খানিকটা বাধ্য হয়েই যেতাম। পরিবেশিত খাদ্য অতি উপাদেয় হলেও নিরামিষ নেমন্তন্নে আমার চিরকালের অরুচি।

সে যাইহোক, নেমন্তন্ন নিরামিষ বা আমিষ, ঐটুকুই ছিল আমার রামনবমীর আকর্ষণ। ফলত এখন গত কয়েকবছর হল রামনবমী ব্যাপারটাই ভুলে গিয়েছি। ওই কাছাকাছি সময়েই মানে এক-দু’দিনের ভেতরেই পাড়ার অন্য আরেকটি বাড়িতে অন্নপূর্ণা পুজোতেও প্রসাদ খেতে যেতে হয়। এটা চালু থাকার কারণে মনেও আছে।

কিন্তু এই ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে এসে আর রামনবমীকে ভুলে যাওয়ার জো রইল না। হোয়াটস অ্যাপে বন্যার মত ভেসে আসতে শুরু করল – রামনৰমীকে হার্দিক শুভকাম্নায়ে। যদিও অন্নপূর্ণা পুজায় আমার সন্তানের জন্যে দুধ-ভাত কামনা করে আমায় বার্তা পাঠিয়েছেন এমনটা কাউকে পেলাম না।

এইখানে এসেই একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি মারে। প্রশ্নটা হল – এই যে একইসাথে এক-দু’দিনের তফাতে রামনবমী এবং অন্নপূর্ণা পুজা এই দুটি একই ধর্মবিশ্বাসীদের অনুষ্ঠান, তার একটির প্রতি এত বিমাতৃসুলভ ব্যবহারের কারণটা ঠিক কি। রামনবমী উপলক্ষে শুভকামনার ছড়াছড়ি, অথচ অন্নপূর্ণা পূজা ব্রাত্য কেন ? অথচ এই বাংলার বুকে অন্নপূর্ণা পুজা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এর সাথে অন্য সামাজিক কারণ জড়িয়ে রয়েছে যার সাথে জাতিধর্মবর্ণনির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে। তবে সেইসব সামাজিক-ধর্মীয় উৎসব ছেড়ে দিয়ে রামনবমী পালনের উদ্দেশ্য কি ?

অনেকেই হয়ত বলবেন এই উদ্দেশ্য রাজনৈতিক – কিন্তু তা মেনে নিতে অসুবিধে আছে। শুধুমাত্র ধর্ম ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলাই যদি এর উদ্দেশ্য হবে তাহলে রামের অজস্র বিকল্প যে পশ্চিমবঙ্গে হাজির এবং বলাবাহুল্য এই কাজে রামের চেয়ে শীতলা-শনি-মনসা-বনবিবি অন্তত বাংলার জন্যে অনেক, অনেক বেশি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে সক্ষম।

অতএব, এই কাজ আদৌ শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়। এই কাজ মূলত এক সাংস্কৃতিক গুন্ডামি। তথাকথিত ভারতীয়ত্বের নামে দীর্ঘলালিত বহুত্ববাদকে ধবংস করার পথে একটি পদক্ষেপ। যে উদ্দেশ্যে প্রতিনিয়ত কানের কাছে আউড়ানো হচ্ছে হিন্দি রাষ্ট্রভাষা, সেই একই উদ্দেশ্যের কিছুটা অংশ রামনবমী পালনের এই ঘনঘটা। ধনতেরাস, করভাচৌথ জাতীয় আদ্যন্ত উত্তরভারতীয় প্রথাগুলি মেগাসিরিয়ালের নর্দমা দিয়ে ভেসে এসে ইতিমধ্যেই ল্যাজামুড়ো অজানা রেখে বঙ্গজীবনের অঙ্গ হয়ে গেছে, এবারে অন্য পথে অন্যগুলি।  

আমার মত ভেতো কূপমণ্ডূক এক বাঙালিকে এক কদম ভারতীয়তা কে ঔর এগিয়ে দেওয়ার জন্যে এগিয়ে থাকা যে বাঙালি বন্ধুবর্গ আমাকে ‘রামনৰমীকে হার্দিক শুভকাম্নায়ে’ জানিয়ে মহান নিঃস্বার্থ কর্তব্যপালন করছেন তাঁরা কতজন রামনবমীর পেছনে মিথ জানেন যেমন সংশয় আছে তেমন সংশয় আছে এর মধ্যে কতজন অবাঙালি বিশেষত উত্তরভারতীয়দের শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়ে বাংলার সাথে হিন্দিবলয়ের এক ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনে উদ্যোগী হবেন।

মৌলানা আজাদ ‘ইন্ডিয়া উইন্স ফ্রীডম’ নামক বইটিতে লিখেছেন এক বিস্তীর্ণ জল-জঙ্গল ঘেরা অঞ্চলকে ভারত নামক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ঠাঁই দিতে নেহরু-র নাকি প্রাথমিকভাবে অস্বস্তিই ছিল।

অতএব আসুন – আসুন, ভুলে যাই চড়ক-গাজন-ভাদু-নবান্ন এইসব জংলী উৎসবকে, ভারতীয়ত্বের পথে পা মেলান – আপ্নাইয়ে লোহরি-নৰরাত্রি

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এক অত্যুৎসাহী ভক্ত মরাঠি ভাষায় আমাকে রামনবমীর শুভকামনা জানিয়েছেন – আমার সৌভাগ্য তিনি কলকাতাপ্রবাসী বাঙালি হয়েও ভারতীয়ত্ব বজায় রাখতে পেরেছেন 

রামনৰমীকে হার্দিক শুভকাম্নায়ে
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments