প্রধানমন্ত্রী মোদী একটি স্কুলে গিয়ে বলেছেন গ্লোবাল ওয়ার্মিং ফার্মিং সব বাজে কথা। দুনিয়ার আবহাওয়া খোদ বাদশাহ-ই-খোদা ইন্দ্রদেব নিয়ন্ত্রন করেন আর তাই হুট্ হাট করে তাপমাত্রা বৃদ্ধি হতেই পারে না। যা হয়েছে তা আমাদের মতো এই নরাধমদের সহ্যশক্তি কমে গিয়েছে ও এখন ফ্যান, এসি ছাড়া আমাদের আর চলছে না। গ্লোবাল ওয়ার্মিং গুজব সেটা বোধকরি সেই ইস্কুলের পড়ুয়ারা মেনে নেয়নি বা কিঞ্চিৎ অবাকই হয়তো হয়েছিল তাদের রাষ্ট্রের সবথেকে বুদ্ধিমানবের উজবুকের মতো বিশ্লেষণ শুনে। দেশের ভৌগোলিক ক্লাইমেট নয় দেবলুচ্চেশ্বর ইন্দ্রের হাতে তবে আজ সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আবহাওয়া যে কত লক্ষ হারামজাদাদের হাতে, তার সঠিক অনুমান ভারতের ভাগ্যাকাশে জমা কালো মেঘপুঞ্জ দেখে বোঝার উপায় নেই। শৈশবে যখন আমরা স্কুলে পড়তাম তখন গ্লোবাল ওয়ার্মিং কি না জানলেও বসন্ত চলে গেলেই গ্রীষ্মের আসাটা খুব আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা ছিল না। সাথে পরীক্ষা শুরু হলে আনন্দ আরই মাঠে মারা পড়তো। কালবৈশাখীর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে নববর্ষ ও আমার জন্মদিন কাটতো রুলটানা উত্তরপত্রে হিজিবিজি লিখে তামাম শিক্ষাপদ্ধতি ও নির্দয় শিক্ষক শিক্ষিকাদের মুণ্ডপাত করতে করতে। এর মাঝে মরুদ্যানের মতো একদিন শুধু বিকেলে পারমিশন পেতাম পাড়ার রাম নবমীর মেলায় গিয়ে একটু নাগরদোলা চড়া কিংবা বন্দুক ফাটানোর। পরীক্ষার আগে পেট খারাপ হবে বলে জিলিপি কিংবা পাঁপড় ভাজার দিকে তাকানোর অনুমতি আমার পেরেন্টাল সিলেবাসে ছিল না। আর ঠিক সেই কারণেই শিশুকাল থেকেল রামের প্রতি আমি কিঞ্চিৎ দুর্বলতা পোষণ করি। দুর্বলতার মূল সূত্রপাতটা যদিও দাদুর কাছে রামায়ণের গল্প শুনে কিংবা উপেন্দ্রকিশোরের ছোটদের রামায়ণ পরেই শুরু হয়েছিল। বলা যায় প্রত্যেক রামনবমীর মেলায় আমার সেই রামভক্তি এক ধাপে অনেকখানি বৃদ্ধি পেতো। তীর ধনুক বানিয়ে রাম সেজে জনৈক বন্ধুদের সাথে নাটক করা কিংবা তীর ধনুক একঘেয়ে লাগার পরে নতুন অস্ত্র অর্থাৎ গদার লোভে পেছনে বেল্ট ঝুলিয়ে হনুমান সাজা কোনোটাতেই আমার কোনো আপত্তি ছিলোনা। তবে আমার শৈশবের রাম কে আমি কোনোদিন মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত প্রস্তরমূর্তি হিসেবে পুজো হতে পারে বলে কল্পনা করিনি। কল্পনার বাইরে গিয়ে সেটা অনুভব করলাম একদিন স্কুল থেকে সাইকেল করে ফেরার পথে থমথমে রাস্তা দেখে।
বারাকপুরের সদাব্যস্ত অঞ্চল চিড়িয়ামোড়ে তখন এক্কেবারে শুনশান , কাতারে কাতারে সেনাবাহিনী গিজগিজ করছে। ১৪৪ ধারা জারি হয়েছে, সেটা কি খায় না গায়ে মাখে? জওয়ান সাহেব কে কি হয়েছে তা জিজ্ঞেস করতে সে বললো “হালাত বিগাড় রাহা হায় , অন্দর অন্দর ঘর চলে যাও।” সময়টা ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর , সে বারই আমাদের মাধ্যমিক পরীক্ষা। শুনলাম কারা যেন রাম মন্দির গড়ার দাবিতে অযোধ্যায় এক পুরোনো মসজিদ ভেঙে দিয়েছে। চিড়িয়ামোড়ের এক প্রান্তে আর্দালীবাজার ও অন্য প্রান্তে বিটি রোড ধরে সোজা চলে গেলে তালপুকুর হয়ে টিটাগড় কামারহাটি মানে এক কথায় সাম্প্রদায়িকভাবে স্পর্শকাতর একটি লম্বা স্ট্রেচ। মিলিটারি সেনাদের ব্যারিকেড এড়িয়ে ভেতরের অলি গলি হয়ে যখন স্টেশন পৌঁছলাম তখন সেখানেও সামরিক বাহিনী ঘিরে ফেলেছে। এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের লাগোয়া হনুমান মন্দিরে কারা যেন যজ্ঞ করছে। বাইরে এক সাধু গোছের কমলা টিকাকাটা লোককে জিজ্ঞেস করলাম এতো সৈন্য কেন? মুচকি হেসে সে উত্তর দিলো, “এরা রামসেনা, মর্যাদা পুরুষোত্তম রামের আদেশেই সবাই জড়ো হয়েছে বাবরি-রাবণদের খতম করতে।” পরে জেনেছিলাম সেনা পুলিশ কিছুই করেনি যখন করসেবকরা ইট, সড়কি,বল্লম নিয়ে গিয়েছিলো অযোধ্যা উদ্ধার করতে। আমার নিজের কাছে আমার শৈশবের চেনা রামের ছবি কয়েক মুহূর্তেই হুশ করে অবলুপ্ত হয়ে গেলো। এখন আমার কাছে রাম মানেই তার মন্দির গড়ার নামে এক প্রচন্ড কঠোর দাবি। রাম মানেই তার ভক্তদের এক আগ্রাসী মৌলবাদী বিশ্বাস। আমার কাছে রামের দাম আরো কমে গ্যালো যখন বুঝলাম যে মালটা পুরোটাই ধড়িবাজি করে বালি কে মেরেছে ও পরবর্তীকালে আর্যবর্তের কুখ্যাত কূটনীতি ব্যবহার করে নিজের স্বার্থাভিলাষে প্রচুর বানরসেনার ও লঙ্কাবাসীদের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। এছাড়া শেষ লগ্নে সীতাকে জনগণের নাম করে অগ্নিপরীক্ষা দিতে বাধ্য করে বুঝিয়ে দিয়েছিলো যে পুরুষতান্ত্রিক ফিউডাল সিস্টেম কায়েম করাটাই রামরাজ্যের আসল উদ্দেশ্য। এসব ভাবনা চিন্তা মাথায় আসার সময় কেন জানিনা আমার অরুন গোভিলের মুখে হনুমানের বিষ্ঠা লেপে দিতে ইচ্ছে করতো, রাম হয়েছিস যখন তখন ভক্তের হাগা মুখে লাগা।
যাই হোক রামচন্দর এতটাই বড় মাপের বোকচন্দর ছিলেন যে তার দুই পুত্র জন্ম নেওয়ার সময় তিনি বাল্মীকি আশ্রমে একবার ঢুঁ টুকু মারেননি। যুদ্ধশেষে যখন বানসেনারা কিষ্কিন্ধ্যা ফেরে, বাল্মীকি রামায়ণে লেখা আছে যে রাম-সীতা-লক্ষণও অযোধ্যা ফেরার পথে সেখানে কিছু দিন ছিলেন। ওনারা দেখেন যুদ্ধফেরত বানররা তাদের পরিবারে ফিরে গিয়ে যারপরনাই আহ্লাদিত। কোনো বানররমণীকে দীর্ঘদিন একলা থাকার দরুন তার মরদ সন্দেহ করেছিল বলে কোনো উল্লেখ নেই, কোনো পবিত্রতা প্রমাণকারী যজ্ঞও হয়নি। উনি কি কিষ্কিন্ধা থেকে নারীদের কি করে সম্মান দেওয়া হয় সেটা কিছুটা হলেও শিখতে পারেননি নাকি গাঁটামোর জন্য জাস্ট শেখেন নি নাকি শিখেও ভীতু বলে দেশে ফিরে সব ভুলে মেরে দিয়েছিলেন। রাম ভীতু হলেও তার কলিকালের বানর সেনারা কিন্তু বেজায় জবরদস্ত। তারা শুনছি আজকাল হনুমানের গদা, শিবের ত্রিশূল এমনকি আকবরের তলোয়ার নিয়ে মাঠে ময়দানে নেমে পড়েছে। আমার ভালো লাগা রামের সময় আমি মামাবাড়ি গিয়ে প্রথম কোনো হিন্দিভাষী (ভোজপুরি,যাদেরকে আমরা মাওরা খোট্টা বলি) সেরকম এক পরিবারের রামকথা শুনি ,ঢোল করতাল বাজিয়ে সে কি উন্মাদনা। কিন্তু কোথাও সেখানে তীর তলোয়ার দেখিনি। গরমের ছুটির সময় মামাবাড়ি গেলেই সেই রামা, ভোলুদের রাতভর রামনাম শুনতে ভুলতাম না। একবার প্রচন্ড গরমে কষ্ট পেয়ে ভোলুর দাদু মারা গেলো, রামনামের বদলে পুরো বস্তি মরাকান্না জুড়লো। শশানের পথে দেহ ওঠানোর সাথে সাথে প্রথমবার শুনলাম ‘বোলো হরি হরি বোল ‘ এর বদলে ওরা বলছে ‘ রাম নাম সত্য হ্যায়’। দাদু কে জিজ্ঞেস করলাম ওরা হরিবোল না বলে রামনাম নিচ্ছে কেন? দাদু আমার দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলো , ” যাহাই হরি তাহাই রাম, সবই সত্য।”

রাম নাম সত্য হ্যায়
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments