ইংরেজি এবং বাংলা কাগজগুলোতে বারবারই একটা সাধারণ ভুল হচ্ছে। দুটি শব্দের। ‘রিফিউজি’ এবং ‘মাইগ্র্যান্টস’।

প্রসঙ্গ অবশ্যই ইউরোপ জুড়ে চলা শরণার্থী সঙ্কট। আর তাতে যত খেলা চলছে, তার আসল ঘুঁটি এই দুই শব্দই। ১৯৫১ সালের রাষ্ট্রপুঞ্জ স্বীকৃত রিফিউজি কনভেনশন ‘রিফিউজি’ বা উদ্বাস্তু শব্দের মানে হিসেবে জানিয়েছে, যে সমস্ত মানুষের জীবন নিজের দেশে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জাতিগত বা ধর্মগত বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে বিপন্ন হতে পারে এবং তার জন্য তারা নিরাপত্তার কারণে অন্য দেশে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তারাই রিফিউজি। আর মাইগ্র্যান্টস বা অভিবাসী হল সেই সমস্ত মানুষ, যারা অন্য দেশে যায় আরও উন্নত জীবনযাত্রার খোঁজে। এক কথায়, দুই শব্দের প্রধান পার্থক্যটা হল, রিফিউজিদের অন্য দেশে আশ্রয় না পেলে একটাই ভবিতব্য, মৃত্যু। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ফলে বাঙালিরা সেটা বেশ ভালমতই জানে।

মাঠের একদিকে রয়েছেন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান। তাঁর যুক্তি, এই রিফিউজিদের বেশিরভাগই আদতে মাইগ্র্যান্টস, নইলে তারা প্রথম যে দেশ পেত সেখানেই থেকে যেত, জার্মানি বা আরও উন্নততর দেশে যাওয়ার জন্য ট্রেনে লাইন দিত না। পাল্লা নেহাত হালকা নয় তাঁর, পাশে পেয়েছেন মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের অনেক প্রাক্তন কমিউনিস্ট দেশকেই। যেমন পোল্যান্ডের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ ডুডা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একহাত নিয়েছেন, স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো কিঞ্চিৎ নরম হয়ে বলেছেন, তাঁরা শুধু খ্রিস্টান রিফিউজিই নেবেন, কারণ দেশে একটাও মসজিদ নেই। তালিকায় আরো আছে, এস্তোনিয়ার মানুষ রিফিউজিদের জন্য নির্মিত এক ক্যাম্প পুড়িয়ে দিয়েছেন, লাটভিয়াও গাঁইগুঁই করে বোঝাচ্ছে, মোটেই তারা ইচ্ছুক নয়। গ্রিস তো এমনিতেই আর্থিক সঙ্কটে ধুঁকছে। অস্ট্রিয়ার পুলিশ নাকি রিফিউজিদের আটক করে জেলেও পুরে দিচ্ছে। ফলে দিনের পর দিন কাগজে ছাপা হচ্ছে রিফিউজিদের মর্মান্তিক জীবনযাত্রা, ট্রেনের জন্য, খাবারের জন্য লাইন। এদিকে মানুষ আসারও কমতি নেই। যেন তেন প্রকারে ভূমধ্যসাগর পেরোনর চেষ্টা তুঙ্গে। ফলে মৃত্যুমিছিলও অব্যাহত। যার জন্য তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এর্দোগান ভূমধ্যসাগরকে রিফিউজি সমাধিক্ষেত্র বলে ইউরোপের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন।

যেখানে জার্মানি, ফ্রান্স বা সুইডেন উদারভাবে রিফিউজিদের নিতে হাত বাড়াচ্ছে, সেখানে পূর্ব ইউরোপের এই কঠোর মনোভাব কেন? খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, প্রাক্তন কমিউনিস্ট দেশগুলোর অনেকেই বর্তমানে নানাভাবে সঙ্কটে। ক্ষমতা কয়েকজনের হাতে কুক্ষিগত, দূর্নীতিতে হাবুডুবু খাচ্ছে, স্বজনপোষণ… কোনও কিছুই বাকি নেই। তার ওপর জুড়েছে আর্থিক সমস্যা। ইউরো ও গ্রিসকে নিয়ে কিছুদিন আগেও ইউরোপের হাওয়া গরম ছিল। তার ওপর এই দেশগুলোয় বৈচিত্র্য খুবই কম, এবং তারা মোটেই পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার ‘বিজাতীয়’ রিফিউজিদের আশ্রয় দিয়ে দেশের চরিত্র পাল্টাতে আগ্রহী নয়। সাংস্কৃতিক উদারতা একেবারে নেই বললেই চলে, তার ওপর বেশি রিফিউজিকে আশ্রয় দেবার মত কোনও পরিকাঠামো নেই বলে পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরির অনেক বিশেষজ্ঞ দাবি করছেন। তাদের মত, মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে ডামাডোলের জন্য আমরা দায়ী নই, ফলে আমরা বেকার চাপ কেন নেব? ফলে রিফিউজিদের প্রতি তাদের মনোভাবও কঠোর হচ্ছে। ভিক্টর অরবানের দাবিকে এইখানেই নস্যাৎ করা যায়। সুইডেন বা ফিনল্যান্ডের মত স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলিতে রিফিউজি কমিউনিটির অবস্থা যথেষ্ট ভাল, সমাজকল্যাণমূলক পরিকাঠামো বেশ উন্নত, চাকরিবাকরি পাওয়াও সুবিধের। জার্মানিতেই সেইরকমই ব্যবস্থা আছে, তার ওপর জার্মান চ্যান্সেলর উদারতা দেখানোয় নজির তৈরি করেছেন। ফলে ট্রেনের লাইন ক্রমশই বাড়ছে, সীমান্ত টপকানোর হিড়িকও, যার ফলে শেগেন ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা।

এই রিফিউজিদের ঢল আজকের নতুন নয়। মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকায় চলা দীর্ঘকালীন নানা যুদ্ধের ফলে রিফিউজি সঙ্কট বহুদিন ধরেই ইউরোপে ছিল। আজকের এই মানুষের মিছিল নামছে ইউরোপের দেশে দেশে, তার কারণও এটাই, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকা জুড়ে চলা নানা ছোটো বড় গৃহযুদ্ধ ও একনায়কয়ন্ত্র। আইএসআইএস, বোকো হারাম ইত্যাদি জঙ্গি সংগঠনের নাম তো সবাই জানে। মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে, আশ্রয় চাইছে ইউরোপে। তবু এর আগে সেটা এইরকম মারাত্মক আকার নেয়নি, তার কারণ একজন সদাসতর্ক প্রহরী, যিনি মারা যাওয়ার পরেই সব ঝোল ইউরোপের কোলে গড়াচ্ছে, আটকানোর মত কেউ নেই। তিনি আর কেউ নন, লিবিয়ার বিখ্যাত বা কুখ্যাত নেতা, কলোনেল গদ্দাফি!

সে আরেক গল্প, পিছিয়ে যাওয়া যাক আরও কয়েক বছর। ২০০৪ সাল থেকেই গদ্দাফি তাঁর আরো নানা কাজের সাথে ইউরোপের সাথে সুসম্পর্ক বাড়ানোর কাজটিও সুচারুভাবে করে যাচ্ছিলেন। তাঁর প্রধান অস্ত্র ছিল মাইগ্রেশন। আর স্লোগান ছিল, ‘তোমরা আমাকে পয়সা দাও, আমি এদিকের মাইগ্রেশন রুখব’। ২০১০-এ তৎকালীন ইতালির প্রধানমন্ত্রী বার্লুসকোনির সাথে এক বৈঠকের পর তো গদ্দাফি জানিয়েই দেন, ইউরোপের সাদা থেকে কালো হয়ে যাওয়া আটকাতে একমাত্র তিনিই পারবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন পা বাড়িয়েই ছিল, এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে? ভূমধ্যসাগরে আফ্রিকার সবচেয়ে কাছের দেশ ইতালি। কানাঘুষো, রোম গদ্দাফিকে বছরে পাঁচশো কোটি ইউরো দিতে রাজি হয়, বিনিময়ে গদ্দাফি রিফিউজি ও মাইগ্র্যান্টস আটকাতে মাঠে নামেন। ইউরোপ চোখে ঠুলি পরে নিশ্চিন্তে রইল, ওদিকে মিডিয়ায় একের পর এক আসতে থাকে নানা লিবিয়ান ক্যাম্পের খবর, শরণার্থীদের যেখানে আটকে চলত দিনের পর দিন অত্যাচার!

হনিমুন বেশিদিন চলে না। গদ্দাফিরও চলে নি। ২০১১ সাল, শুরু হল লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ। তুমুল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে কলোনেল গদ্দাফির পতন ঘটল, হঠাত করে খুলে গেল লিবিয়ার সীমান্ত। শরণার্থীরা এমনিতেই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসছিল, এবার সাথে জুড়ল লিবিয়ার সাধারণ মানুষও, গৃহযুদ্ধের পরবর্তী লণ্ডভণ্ড লিবিয়া থেকে যারা পালাতে পারলে বাঁচে! সিরিয়া আর ইরাকেও শুরু হল প্রবল যুদ্ধ, গোকুলে বাড়তে থাকে আইএসআইএস। পাল্লায় হাওয়া দিতে আসরে নামে আরব বসন্ত।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আবেদন, সব দেশ সমানভাবে রিফিউজিদের গ্রহণ করুক। ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-কাগজে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট মার্টিন শুলজ একটা ইহাও-হয়-উহাও-হয় গোছের প্রতিবেদন লিখেছেন, যাতে কি করিতে হইবের থেকেও বেশি ঢোল পিটিয়েছেন কেন ইউরোপের ঘাড়ে দোষ দেওয়া উচিত নয় বলে! কিন্তু অনেকেই নিজেদের ভাগ নিতে অনিচ্ছুক। আরও সমস্যা বাড়িয়েছে রিফিউজি সংক্রান্ত আইন ডাবলিন রেগুলেশন। এই আইন অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি আশ্রয় চেয়ে প্রথম যে দেশে পা রাখবেন, সেখানে থাকার আবেদন মঞ্জুর হওয়া বা না হওয়া অবধি তাঁকে সেখানেই থাকতে হবে। এতেই চটেছে ভূমধ্যসাগরের উপকূলের দেশগুলি। স্বাভাবিকভাবেই সেইসব দেশেই মানুষ আগে আসছে, তীরবর্তী বলে, তাই তাদের ঘাড়েই বোঝা বাড়ছে। ইতিমধ্যে জার্মানি এর বলবত থাকা স্থগিত করেছে। আবার অনেকেই এটাকে ব্রহ্মাস্ত্র করেছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বৃহত্তম এই রিফিউজি সমস্যার আশু সমাধানের এখনও কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইংল্যান্ড এবং আমেরিকার মত দুই মহাশক্তিধর দেশ এখনও অবধি জল মাপছে, আমেরিকা সিরিয়ান গৃহযুদ্ধের পর থেকে এখনও অবধি মাত্র ১৫০০ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। ডেভিড ক্যামেরন আরও এককাঠি সরেস, তিনি মাত্র ২০,০০০ শরণার্থীকে আশ্রয় দেবার জন্য পাঁচ বছরের প্ল্যান হাতে নিতে চান। এদিকে শুধু এই বছরেই এখনও অবধি ভূমধ্যসাগর পেরনোর হার গিয়ে দাঁড়িয়েছে তিন লক্ষে। জার্মানি ৯৮,০০০; সুইডেন ৬৪,০০ মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে, অ্যাঙ্গেলা মের্কেল আরও বেশি লোককে আশ্রয় দেবার জন্য প্রস্তুত। বাকিরা জল ঠেলাঠেলি করছেন, ব্রিটেন ফ্রান্সকে বলছে রিফিউজি পাঠিও না, ফ্রান্স ইতালিকে, ইতালি হাঙ্গেরিকে, হাঙ্গেরি গ্রিসকে।

এখন কদ্দিন এটা চলবে, জানা নেই। হয়ত মৃত্যু মিছিলও বাড়বে। হয়ত এটাই তাদের, সেই লাখ লাখ দেশ ছেড়ে আসা মানুষের ভবিতব্য। তোমার লক্ষ্য একটাই। কিভাবে পৌঁছবে তার অপশন অনেক। হয় বোমায়, নয় গুলিতে, নয় ভূমধ্যসাগরের জলে, নয়ত আশ্রয়শিবিরে পুলিশের লাঠিতে। এরই মধ্যে অনেকে হয়ত অন্য দেশে নিজের শিকড় পোঁতার চেষ্টা করবেন। তাঁরা বিভিন্ন দেশের উদারতার কথা বলবেন, তাঁদের নিয়ে বিভিন্ন দেশে রাজনীতিও বাড়বে, হয়ত আরও উগ্রপন্থার জন্ম নেবে, জেনোফোবিয়া বাড়বে। আর কিছু আয়লান কুর্দিদের ছবি হয়ত দিনের পর দিন আমাদের সকালবেলায় চায়ের সাথে খবরের কাগজ হাতে শিউরে তুলবে। আর ভাবতে বাধ্য করবে, আদৌ মানবাধিকার বস্তুটা রাজনীতির সাথে জড়াতে পারে তো?

রিফিউজি সমস্যাঃ ইউরোপের রিফিউজাল ও মানুষের হাহাকার
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments