সময়টা আশির দশকের মাঝামাঝি হবে যখন যে কোনো পুজো পার্বনে ছেলে ছোকরারা চাঁদা তুলে ফুনাই-এর ভিসিপি আর আকাই-এর টিভি ভাড়া করে সিনেমা দেখত ও অন্যদেরও দেখাতো । পাড়ার বয়স্কদের জন্য প্রথম শো বিকেল বিকেল শুরু হত যাতে ‘ বেহুলা লক্ষিন্দর’ বা ‘জয় বাবা তারকনাথ’ মার্কা ধার্মিক ‘বই’ থাকত। সিনেমা দেখতে দেখতে বুড়ো বুড়িরা ঘন ঘন কপালে হাত ঠেকাতো ও হাপুস হুপুস করে বলত,”আহাঃ ,ওই টুকু কচি মেয়েটার কত কষ্ট গো….” আবার পরের শোতে সন্ধেবেলা বাড়ির মেয়ে বৌদের জন্য ‘শত্রু’ বা ‘মেজোবউ’ গোছের হাই ভোল্টেজ মেলোড্রামাটিক ‘ছবি’ দেখানো হত ও সিনেমা শেষে সদ্য চার্জড গিন্নিরা তাদের শাশুড়ি ও ননদের গুষ্ঠি উদ্ধার করতে করতে বাড়ি ফিরত। রাত দশটা নাগাদ তিন নম্বর শোতে ভাষার বাঁধ ভেঙ্গে যেত ও তত্কালীন হিট করেছে এরকম একটা হিন্দি সিনেমা চালানো হত। যাবতীয় পেরেন্টাল চোখরাঙানি কে অগ্রাহ্য করে ছোকরা ছোকরীরা মেতে উঠত মিঠুনের ‘ডিস্কো ড্যান্সে’ কিম্বা ‘কয়ামত সে কয়ামত তাক’-এ আমির-জুহির ঘর পালানো দুরন্ত প্রেমে। অবশ্য ক্লায়ম্যাক্সের বেশ খানিকক্ষণ আগেই কিছু নির্বোধ বাবারা ‘আর নয় এবারে চলো…’ মার্কা থ্রেট কিম্বা মা-রা ‘শান্তি নেই….শান্তি নেই..’ মার্কা সেন্টি দিয়ে তাদের ছেলে মেয়েদের উঠিয়ে নিয়ে যেত। এবার পড়ে থাকা গুটিকয়েক বেওয়ারিশ জনগণ আরো এক ধাপ ভাষা বদলে ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ বা ‘ফার্স্ট ব্লাড’ চালিয়ে সিটি মারতে মারতে এন্তার ক্যালাকেলি উপভোগ করত। ভিসিপির ভাড়া এতেও না উঠলে আর কি ফিল্ম দেখা হত তা অবশ্য আমার ঠিক জানা নেই!

যাই হোক, নবুদা কোত্থেকে একবার শান্তিগোপালের ‘নেতাজি’ দেখে এসে যারপরনাই উদ্বুদ্ধ হলো। ও সেই সালের ২৩ এ জানুয়ারী সে ‘বাম্পি ড্রেসার্স’-এর কাছ থেকে মিলিটারি ড্রেস ভাড়া করে সকাল সকাল তার লাওয়ারিশ আর্মির সাথে (নবুদার লাওয়ারিশ আর্মিতে যাবতীয় অনাথ, নেশাখোর, ভিখিরি ও পাগলরা ন্যাচারাল মেম্বার ছিল) প্রভাত ফেরি করতে বেরোলো। সবার শেষে নবুদার পোষ্য দুই নেড়ি। সে এক kaleidoscopic দৃশ্য বটে ! জনাবিশেক ঢুলু ঢুলু চোখওয়ালা লুঙ্গি কিম্বা শর্ট প্যান্ট পরিহিত অপুষ্ট পাবলিক টলতে টলতে মার্চ করছে ও তাদের সামনে ভারতের তেরঙ্গা হাতে নবুদা ‘লেফট-রাইট’ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। ডান দিকে পার্টি অফিস দেখলে চিল্লে বলছে ,”বাঁয়ে দেখ” আর সঙ্গে সঙ্গে নবুদার আর্মি বাঁ দিকে তাকিয়ে জনৈক শিব দূর্গা মিষ্টান্ন ভান্ডারকে স্যালুট মারছে। শিব দুর্গার মালিকও নিজেকে হুট করে রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপাল গোছের কিছু একটা ভেবে ভুঁড়ি বাগিয়ে গম্ভীর মুখে স্যালুটের উত্তর স্যালুট দিয়েই ফিরিয়ে দিচ্ছে। কখনও বা সবাই বেসুরে ‘কদম কদম বাড়ায়ে যা’ কিম্বা ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ গেয়ে উঠছে। যদিও নবুদা ওই ধরা চুরায়ে নেতাজি কম আর অনশনরত গাদ্দাফি বেশি মনে হচ্ছিল তবুও সমগ্র ব্যাপারটা এলাকার মানুষ বেশ ইতিবাচক ভাবেই গ্রহণ করেছিল। কয়েকজন তো এটা ভিক্ষার্জনের অভিনব উপায় মনে করে নবুদাকে কিছু দিতে টিতে গেছিল কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হলো ও নবুদা গম্ভীর গলায়ে বলল , “বাব্বা , মাগনা ছুটি পেয়ে মন যে দেখছি গড়ের মাঠ। দান করতে হয় চোখ বা দেহ করুন …. এখানে ওসব মিচকে দরদ দেখাবেন না। ”

কিছুদিন পর শিবরাত্রি, তাই বুড়ো ভিখিরি লক্ষিপদ নবুদা কে আর্জি জানালো যে সে যেন আরেকবার এরকম সেজে গুজে বের হয় সেদিন, তারাও সঙ্গে থাকবে। নবুদারও কথাটা মনে ধরল, হাজার হোক শিব ঠাকুর ছিল বলেই তো তারা এত নেশাভাং করতে পারছে। ড্রাইডে তে যখন সাপ্লাই বন্দ থাকে ও স্টকেও কিছু থাকেনা তখন নবুদা মনে মনে তিনবার শিবের নাম করলেই কেমন জানি হাল্কা ঝিমঝিম বোধ করে। মজার ব্যাপার একই পরিস্থিতিতে নবুদার চ্যালারা শিবের বদলে নবুদার নাম মনে করে একই জিনিস অনুভব করে। অবশেষে ‘শিব রাত্রির’ দিনের বেলা থেকেই নবুদা ‘বাম্পি ড্রেসার্স’ থেকে আনা বাঘ ছাল ও জটা লাগিয়ে , গায়ে ছাই টাই মেখে, গলায়ে রবারের সাঁপ ও সিঙ্গে লটকে বেরিয়ে পড়ল। এক হাতে প্লাস্টিকের ডুগডুগি লাগানো ত্রিশুল ও অন্যহাতে কমণ্ডল। কমণ্ডলে বাংলা লোড করা আছে আর বাঘ ছালের নিচে শর্ট প্যান্টের পকেটে বিড়ির প্যাকেট, গাঁজা ও দেশলাই। নবুদার ভাষায়ে বাংলাটা underworld ও গাঁজাটা terrorist আর এই দুয়ে মিলে গেলে হয়ে যায়ে প্রলয়-বাওয়াল। এক কথায় ‘ধামাকার গোলা,জয় বম বোলা ‘ , বলা বাহুল্য কিছুক্ষণের মধ্যে নবুদা ও তার চ্যালারা সবাই এক একটা ধামাকার গোলা হয়ে গেল।

নবুদাও ধুমকি তে ওই ধামাকার গোলাদের নিয়ে পোল পারের বস্তির কাছে শিব মন্দিরের দিকে হই হই করে নাচতে নাচতে এগোতে লাগলো। শিব মন্দিরটা কে বা কারা বানিয়েছিল তা জানা নেই তবে যখনই বানানো হোক না কেন তখন এই খালটাই সুধু ছিল, পোল বা তার পাশে এই বস্তি গড়ে ওঠেনি। এক কথাযে এখানকার শিব লিঙ্গটাও অনেক দিন ধরে লাওয়ারিশ পড়ে ছিল বলাই চলে। লাওয়ারিশ শিবে লিঙ্গের পাশে বেওয়ারিশ নবুদার শিবমূর্তি ধারন করাটা তাই কিরকম কাকতালীয় হলেও সরল মনের বস্তিবাসীদের কাছে বেশ জাগ্রত ব্যাপার স্যাপার বলেই মনে হলো। আর ওদিকে প্রলয়-বাওয়ালের দরুন নবুদাও সেমি আউট অবস্থায়ে ধুন্ধুমার প্রলয় নেত্য জুড়েছে। প্রভাসের গোলায়ে ঠ্যালা টানে বিশু খুড়ো একটু কৌতহলবশত নবুদার আর্মির থার্ড ইন কমান্ড হুলো কে জিগ্গেস করেই বসলো , “এ লোকটা সেই দিনকে নেতাজি সেজে ছিল না ?” হুলো নবুদার ব্যাপারে ভীষণ সেনসিটিভ, তাই একটু ‘এটা কে বে’ মার্কা টোনেই উত্তরটা দিল ,”কাকা, সেদিনকে গুরুকে নেতাজি ভর করেছিল, আর আজ স্বয়ং বাবা ..গুরু কি রং মেখে সং সেজেছে ভেবেছো নাকি? ভেবে থাকলে পাপ হবে বলে দিলাম, হ্যাঁ। ” তাই শুনে একজন মহিলা চেঁচিয়ে উঠলো ,”ভর করেছে , বাবা ভর করেছে..” আরেকজন মহিলা যে ঘটি করে দুধ নিয়ে এসেছিল শিবের মাথায়ে ঢালবে বলে, সে ঝুপ করে সে ঘটি নবুদার মাথায়ে উল্টে দিল ! দেখাদেখি আরও গোটা পাঁচেক মহিলাও নবুদার মাথায়ে দুম দারাক্কা দুধ ঢালতে লাগলো। ব্যাস, নবুদার নেশা গেল চটকে ! উদ্দাম নেত্য ফাস্ট মোড থেকে ক্রমশ স্লো মোশন হয়ে শেষ মেশ থেমে গেল । নেক্সট ব্যাচের মহিলারা সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে আসছিল দুধ ঢালার জন্যে, কিন্তু নবুদা রেগে গিয়ে হাত তুলে বলে উঠলো , “রোকো , থামো ..” লোক জন একটু থমকেই গেল। কি হলো রে বাবা, বাবার ওপর দুধ পড়তেই বাবা কই ঠান্ডা হবে তা না উল্টে আরো ক্ষেপে গেল যে !

নবুদা উঠে দাড়ালো, জটা খুলে ঝাঁকিয়ে দুধ ঝেড়ে আবার সেট করে জিজ্ঞেস করলো ,”তোমরা কজন ঢালবে দুধ? ”
কেউ একজন উত্তর দিল, “ওই ধরেন গিয়ে তা পঞ্চাশ জন তো হবেই.. ” আবার কে যেন বলে উঠলো , “না না ভুল বলছে , রাত অবধি চলবে, দেড়শ জন তো হবেই ..”
নবুদা হাত তুলে আবার বলল , “ঠিক আছে , ধর যদি আমি না আসতাম তা হলে কোথায় ঢালতে?” সবাই পোল পারের শিব মন্দির দেখিয়ে বলল , ‘ওই তো, ওখানে বাবার মাথায়ে ‘
নবুদা এবার ভেংচে বলল ,”তোমার মুন্ডু ,ওটা বাবার মাথা? এই জন্যে তো বাবা কাল স্বপ্নে এসে দেখতে বলল যে তোমরা কি ভেবে কিসে কি ঢালছ .. ”
কানু সর্দার একটু নেতা গোছের মানুষ , সেই সাহস করে বলল,”বাবা আমরা মুখ্যু সুখ্যু , ঠাকুরমশাই রা এদিকে আসে না , কোথায়ে দুধ ঢালতে হবে, কোথায় মিষ্টি দিতে হবে তা আপনিই বলে দেন্। ”
নবুদা জানালো সে নিজে পৈতেবিহীন ব্রাহ্মন ও এবার সবাই যেন শান্ত হয়ে একটা লাইন করে দাড়ায় । তারপর তার বেওয়ারিশ আর্মির সেকেন্ড ইন কমান্ড পচা ও থার্ড ইন কমান্ড হুলো কে বলল , “দে caterer থেকে আমার নাম করে ৫ টা বড় ড্রাম আর দুটো নৌকো নিবি। হরির দোকান থেকে গোটা ১০০ টা ভাঁড়, ১০০ টা শালপাতা আর মানিকের কাছ থেকে ১০০ টা গোল্ড স্পট খাওয়ার পাইপ। ছুটে যাবি দৌড়ে আসবি ,পড়ে গেলে গড়িয়ে আসবি, যা। ”
নবুদার ইন্সট্রাকশন অনুযায়ী মহিলারা এক লাইনে দাড়িয়ে পড়ল, বাচ্ছারা অন্য লাইনে ও পুরুষরা নবুদার আর্মির তত্ত্বাবধানে discipline ম্যানেজমেন্ট করতে লাগলো।
ড্রাম, নৌকো , ভাঁড় , শালপাতা , straw আসার পর নবুদা কমণ্ডল থেকে দু ঢোঁক বাংলু মেরে আবার শুরু করলো , “তোমরা স্বামী ও ছেলেমেয়েদের ভালোর জন্য শিবের মাথা ভেবে যাতে দুধ ঢালো সন্দেশ মাখাও সেটা আসলে শিবের লিঙ্গ মানে… ইয়ে ওসব অসভ্য কথা বাদ দাও। তোমাদের কারবার দেখে বাবা তো চমকে চৌত্রিশ , আমাকে জিগ্গেস করল যে তোরা নিজেদের ছেলে মেয়েকে না খাইয়ে আমার সবে ধন এক মাত্র ওই ইয়েতে দুধ ঢালিস কেন ? সেই দুধ ড্রেন দিয়ে খালে মিশছে অথচ তোদের ছেলে মেয়েরা সেই কে সেই রয়ে যাচ্ছে। যাই হোক বাবার স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী মহিলারা ওই ড্রাম গুলোতে দুধ ঢালবে আর নৌকোগুলোতে মিষ্টি। পচা তুই দেখবি যেন সব বাচ্ছারা লাইন করে ড্রাম থেকে এক ভাঁড় করে দুধ নেয় ও হুলো তুই সন্দেশ,মিষ্টি, লাড্ডু , বাতাসা, নকুলদানা সব একসাথে পাইল করে সবাইকে বাবার প্রসাদ হিসেবে এক শালপাতা করে মাখা সন্দেশ দিবি , আর আমি এখন লিঙ্গ পুরান থেকে মন্ত্র পাঠ করব , ক্লিয়ার ? ”
পচা আর হুলো ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো ও তত্ক্ষনাত ডিস্ট্রিবিউশনের কাজে লেগে পড়ল। বাচ্চারা মনের আনন্দে ভাঁড় থেকে straw দিয়ে দুধ ও শালপাতা থেকে মিষ্টি খেতে লাগলো। আর নবুদা লিঙ্গ পুরান থেকে স্বরচিত মন্ত্র বলতে লাগলো,

“ওং ত্রয়ম্বকং তব নামাংনি দুঘ্ধম
বুভুখ্যুং উদরাত পুষ্টি বর্ধানাম।

ওং মৃত্যুঞ্জয়ম মহাদেব গঞ্জিকা সেবনম
জন্ম ,মৃত্যু ,জরা ,ব্যাধি ,পীড়া হরনম

ওং তত্পুরুষায় বিদমহে
মহাদেবায়ে ধীমহি
তন্ন রুদ্ররচদিয়াত

ওং নমঃ শিবায়ঃ ”

মন্ত্রের জোরে কিনা বলতে পারব না সবাই প্রাণ ভরে দুধ ও পেট পুরে মিষ্টি খাওয়ার পরেও প্রচুর বেঁচে গেল। নবুদা পোল পরের বাসিন্দাদের বিদায়ে জানিয়ে বেওয়ারিশ আর্মির সাথে আবার সেই নাচতে নাচতে স্টেশন চত্ত্বরে ফিরে গেল। তখন মাঝরাত পেরিয়ে গেছে, বাঁচা দুধ আর সন্দেশ দিয়ে সবার জন্য ঝাক্কাস একটা ভাং বানানো হলো। ‘বম ভোলে’ বলে সেই প্রসাদ মিলে বেটে খাওয়া হলো । নবুদার তখনকার দুই পোষা কুত্তা রাজু আর জতুও বাবার প্রসাদ পেল। কোথাও দূর থেকে ভেসে আসছিল, “ভোলে বাবা পার করেগা….বম বম তারক বম ” , পচা বলল,”ওই দেখো আমরা ফিরে আসতেই সালা পোল পারের মালগুলো ভিসিপিতে ‘জয় বাবা তারকনাথ’ লাগিয়েছে।” বিরক্ত নবুদা এক ঝামটা মেরে পচাকে বলল,”ওদের ইচ্ছা ওরা লাগিয়েছে,তোর হয় তো তুইও লাগা না। ” গানটা কিন্তু অন্য কোনো জায়েগা থেকে আসছিল,নেশার ঘোরে পচা বা নবুদা কেউ ঠিক দিকটা ঠাওর করতে পারেনি। সেবার শিবরাত্রি তে সত্যি সত্যি কেন জানি পোল পারের বাসিন্দারা ভিসিপি বা টিভি ভাড়া করে সারা রাত কোনো সিনেমা দেখেনি।

শাশ্বত , শিবরাত্রি , কলকাতা

লিঙ্গ পুরাণ
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments