আমি রোজ যে দোকানটা থেকে চা খাই ঘটনাটা সেই দোকানেই ঘটেছে , একেবারে তাজা মানে ভাতে গরম ঘি ও সাথে কাঁচা লঙ্কা ফ্রি, নুনও থাকুক আন্দাজমতো। শুনলে পরে অন্যরকম হতো কিন্তু এতো আমার আজ নিজের চোখে দেখা ! সুনীল যাদব ওরফে বাবুয়ার(ভাষার ফেরে ববুয়া) আদি বাড়ি কাটিহারে। চায়ের দোকানটা দিয়েছিলো ওর বাবা, এখন ও আর ওর ছেলে মিলে চালায় , ১৫ ঘন্টার রানিং দোকান- সকাল সাতটা থেকে রাত দশটা। বাবা দুই ভাগে ৬ ঘন্টা সামলায় এবং বাকিটা ওর ছেলে মনুয়া। মাটির ভাঁড়ে বড় ও প্লাষ্টিক কাপে ছোট চা , সাথে প্রজাপতি বিসকুট, বাপুজি কেক, ক্রিম রোল আর সাত আট রকমের সিগারেট। বলা বাহুল্য রজনীগন্ধা, তুলসী ও বিড়িও পাওয়া যায় এই দোকানে । আর আগের সপ্তাহ অব্দি পাওয়া যেত দেদার খুচরো ! তা সেই বাবুয়ার চায়ের ঠেকে গিয়ে দেখলুম ভিড় অন্যদিনের থেকে অপেক্ষাকৃত ভাবে কম আর বাবা ছেলে মিলে লোক ধরে ধরে ফ্রীতে চা সিগেরেট খাওয়াচ্ছে। আজব ব্যাপার ! বলি চালু দোকানের এ কি হাল হলো? জিজ্ঞেসা করার আগেই মনুয়া এক ভাঁড় চা এগিয়ে দিয়ে বললো, ” স্যার , আজ আর সিল্ক কাট না , ফিল্টার উইলস খান , পয়সা লাগবে না!” জিজ্ঞেস করলাম , ” সারা দেশ যখন নোটের অভাবে খাবি খাচ্ছে, তোদের কি লটারী ফটারি লাগলো নাকি?”
মনুয়া কিছু বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু তার আগেই বাবুয়া চাপা গলায় শুরু করে দিলো, ” বাবু, লুট গয়ে, পুরা বরবাদ হো গয়ে ……” এর পর যা সে বললো তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ হলো…..ওয়েস্ট কলকাতা টাউনশিপে একটা এলআইজি ফ্ল্যাটের জন্য এক স্থানীয় নেতাকে সে কিছুদিন আগে ওদের কাছে বছর দশেক ধরে জমানো হার্ড ক্যাশে পাঁচ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়েছিলো, ভেবেছিলো ফ্ল্যাটটা পেলে পরে ভালো দামে ঝেড়ে দেবে বা দেশোয়ালিদের ভাড়া দিয়ে দেবে। বলা বাহুল্য পুরোটাই কালো টাকাই ছিল কেননা ঘুষতো আর চেক বা ক্রেডিট কার্ডে কেউ দেয়না, আর দিলেও তো কেউ নেয়না! কিন্তু ৮ তারিখে পুরোনো নোট বাতিল হওয়াতে সেই নেতা আজ সকাল সকাল এক লক্ষ ঊনত্রিশ হাজার টাকা যা একশো টাকার নোটে ছিল সেটা রেখে দিয়ে বাকি টাকার ১০০০/৫০০ নোট ফেরত দিয়ে গেছে দোকানে ! অগত্যা এখন ওদের মাথার ওপর ভেঙে পড়েছে ক্যাশলেস ক্রাইসিস ! তাই বাবুয়া ও মনুয়া এখন ছেলে ছোকরা প্রৌঢ় আধমরা প্রায় সব্বাইকে ধরে ধরে ফ্রীতে চা খাইয়ে বলছে ৪০০০ টাকায় ৫০০ টাকা ছাড় মানে ব্যাংকে গিয়ে নোট বদলিয়ে ৫০০ টাকা কমিশন নাও, ৩৫০০ টাকা ফেরত দাও। আর বদলে তোমার একাউন্টের এই টাকাতেই আগামী দেড় দু বছর চা সিগারেট ফ্রীতে খেতে পাবে।অনেক স্টুডেন্ট ও ব্যাচেলর এই প্রস্তাব মেনেও নিয়েছে ও এই অভিনব স্কিমেরে একটা বেড়ে নাম দিয়েছে ওদের কয়েকটা রেগুলার খদ্দের মিলে – দেশিওয়ালেট। এবার ইনিয়ে বিনিয়ে আমাকেও ওই অফারটা করলো বাবুয়া,আগে হলে হয়তো আমি বাম্পার ক্ষেপে যেতাম। এখন দেশ জুড়ে ব্যাপক সহিষ্ণুতার অভাব ও তাই জন্য আমি আর সেরকম ভাবে ক্ষেপে উঠতে পারলুম না। মাথায় ঘুরতে লাগলো যে খামোখা বাঙালিরা ট্রেডিশনালি উত্কলবাসীদের উড়ে ও মৌর্য্যবাসীদের মাওরা বলে থাকে ও তাদের উত্তরাধিকারীরা মাড়োয়াড়িদের বলে মেড়ো। অনেক বুৰ্বক বাঙালি আবার লাস্ট দুজনের আইডেন্টিটি নিয়ে ব্যাবাক গুলিয়েও ফেলে যেরকম গোলায় বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে যে তারা বাঙালি হয়েও মুসলমান কেন বলে? আমি আদপে বাঙালি হলেও তামাম ভিনজাতিদের মধ্যে গুলিয়ে ফেলি না তাই আমার ভাতৃসম মৌর্য্যবাসীদের এই হ্যানো দাও মারা কীর্তি দেখে ওদেরকে বললাম প্রস্তাব যদিও যারপরনাই চিত্তাকর্ষক কিন্তু আমি ওই লাইনে দাঁড়াতে পারবো না আর ৫০০ টাকাও আমার চাই না। তবে আগামী দু বছর ফ্রীতে চা সিগেরেট খাওয়ালে ওই ‘দেশিওয়ালেটের’ এক জব্বর ক্যাচলাইন কিন্তু আমার মাথায় খেলছে। বাবুয়া বললো , ” বোলিয়ে, অরে বোলিয়ে না !” আমি আমার মাতৃভাষা অধ্যুষিত রাষ্ট্রভাষায় বললুম, ” চায় পে চলেগা চর্চা, রহেগা না কোই খরচা?” অমনি বাবুয়া চিল্লে উঠলো, ” অরে মনুয়া, এগো গোল্ড ফ্লেক বড়কা অউর সাথ মে মালাই মারকে ইস্পেশাল চায় কপ পিলেট মে তানিক জলদি লে আওয়া, কাল সে উ মোদিয়া অউর পেটিএমওয়া কা হাম গাঁড় মারাথানি।”

লেটেস্ট স্কিম
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments