হিমাদ্রী শেখর দত্ত
নানা অত্যাচার আর অমানবিকতার ভারে জর্জরিত আজ যেখানে আফগানিস্তান প্রদেশ, ৫০০০ বছর আগে সেই দেশেরই নাম ছিল গান্ধার প্রদেশ। আর তখন সেই দেশটি আজকের মতো ছিল না। ভারতবর্ষের ইতিহাসে গান্ধার প্রদেশের উল্লেখ অবশ্য করনীয় কেননা তা এক প্রকার সমগ্র মহাভারতের পশ্চাদপট রেখা, যার শুরুর শুরুটুকু বলা যায়, তা এই গান্ধার প্রদেশ থেকেই। গান্ধারের রাজকুমারী ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজপরিবারের কুলমহিষী হয়েছিলেন। গান্ধারী যে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ধৃতরাষ্ট্রের সহধর্মিনী হয়েছিলেন, সেটা তার সর্বকণিষ্ঠ ভাই শকুনির একেবারেই পছন্দ ছিল না। শুধু তাই নয়, শকুনি তা চূড়ান্ত অপমানকর বলেও মনে করতেন। কিন্তু সর্ব শক্তিমান ভারত সম্রাটের কাছে সেদিন গান্ধারের মাথা নীচু করে মেনে নেওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। তার একটা প্রধান কারণ অবশ্যই ছিল রাজার বাহুবল – যা’র পুরোধা ছিলেন মহামতি ভীষ্ম। ভগিনির বিবাহের অনেক আগে থেকেই হস্তিনাপুরবাসী ভারত সম্রাটের সাথে গান্ধারের বনিবনা ছিল না। হস্তিনাপুর সেই শান্তনু বা তার আগের সময় থেকেই গান্ধারের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু পান্ডু এবং ভীষ্মের সময় চলাকালীন যুদ্ধের ফলাফল হস্তিনাপুরের পক্ষেই যায়। সেই যুদ্ধে হস্তিনাপুরের রাজা গান্ধারের রাজাকে বধ করেন আর সেই রাজ্যের সমস্ত রাজ পুরুষ ও তাদের অনুচরদের কারাগারের নিক্ষেপ করেন। একজন পুরুষও সেদিন গান্ধারের রাস্তায় খোলা ঘুরে বেড়ানোর সৌভাগ্য পায় নি। রাজা সুভালার রজত্ব চলাকালীন এই আক্রমণ হয়েছিল, যার পরিণতি হিসাবে তাকে প্রাণ দিতে হয়। তাঁর রাজপরিবারের পাত্র মিত্র আত্মীয় পরিষদ সকলকে বন্দিত্ব বরণ করতে হয়েছিল, যার মধ্যে রাজপুত্র শকুনি সমেত তাঁর ১০০ জন ভাইও ছিলেন। তাঁর রাজ্য অধর্মানুসারে চলছে এবং তারা সকলেই অধার্মিক এই অপবাদে হস্তিনাপুর রাজা তাদের রাজ্য অধিকার করেন ও বন্দী করেন। বন্দী অবস্থায় তাদের প্রত্যেকের জন্য মাথাপিছু কেবল একটি করে চাঊলের দানা আহার্য্য হিসেবে দেওয়া হত। কোন মানুষকে অধর্মের পথ থেকে ধর্মের পথে আনার জন্য এমন অভাবনীয় শাস্তি দেবার প্রয়োজন কেন হয়েছিল- এই নিয়ে মনে মনে বিরুদ্ধাচারণ করলেও কেউই মুখ খুলে তখন বলতে চান নি। শকুনির ৯৯ জন ভাই অবশ্য তাদের ভাগের চাউল দানাটি শকুনির জন্য ত্যাগ করেন – এই মনে করে যে এই অকিঞ্চিৎ আহারে তাদের কারোরই ক্ষুধার কোন সুরাহা তো হবেই না, উলটে সকলে মিলেই ধীরে ধীরে মৃত্যু মুখে যাবেন। কিন্তু যদি সকলের ভাগ একসাথে একজনকে খাওয়ানো হয়, তবে সে কষ্টে সৃষ্টে বেঁচে যাবে হয়তো, ভবিষ্যতে কোন দিন সু্যোগ এলে এই অনুচিত শাস্তির উচিত বদলা নিতে পারবে! শকুনি যেহেতু সকলের ছোট ছিলেন, তাই তাঁর বড় ভাইয়েরা তাদের ভাগের খাদ্য শকুনির উদ্দেশে ছেড়ে দেন। শকুনি কে তা দেওয়া হয়েছিল দুটি কারণে। এক তিনি সকলের ছোট, তাই আদরের ছিলেন। আর দ্বিতীয় কারণ সমস্ত ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে চালাক ও ধুর্ত ছিলেন শকুনি। তাই এতো বড় রাজপরিবারের বিরুদ্ধে যদি কেউ লড়াই করতে পারে তা কেবল শকুনিই পারবেন, এটাই সকলে বিশ্বাস করেছিলেন। কালক্রমে শকুনি তা পেরেছিলেন, যদিও নিজের জীবনও সেই যুদ্ধে খোয়াতে হয়েছিল। সেই দিন থেকেই হস্তিনাপুরের সাথে গান্ধারের ঠান্ডা লড়াই এর শুরু। আর এর চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে মহাভারতে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ক্ষেত্রে। বন্দী দশায় শাস্তি মকুবের জন্য শকুনির পিতা রাজা সুবালা হাঁটু মুড়ে নীচু হয়ে স্বীকার করে নেন যে তারা তেমন ধার্মিক নন (কুরু অর্থে যা হওয়া উচিত) এবং হস্তিনাপুরের বশ্যতাও স্বীকার করেন। তখন তাদের সকলকে মুক্তি দেওয়া হয়।

আজকের দিনে একজন মানুষের অবস্থা যদি সেদিনের শকুনির মতো করে দেওয়া হয়, তাহলে তার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে ? বলা বাহুল্য, প্রথম সুযোগেই সেই লোকটি তার প্রতিশোধ নেবার জন্য উদগ্রীব থাকবে। সেই হিসেবে শকুনিকে আমি মোটেই খলনায়কের তকমা দিতে চাই না। একজন রাজ পরিবারের সন্তান, তাঁর থেকে বলশালী রাজা দ্বারা যদি বিনা কারণে অত্যাচারিত হোন এবং অপমানিত হোন তাহলে রাজ ধর্ম হিসেবে সে তার প্রতিশোধ অবশ্যই নেবে। ভারতবর্ষের তখনকার রাজনীতির আকাশে কুরু বংশের চেয়ে প্রতাপশালী এবং শক্তিশালী কোন রাজাই ছিলেন না। তাই বাঁচবার সাধারণ তাগিদে, বা কখনও ভয়ে, আবার কখনও বন্ধু ভাবে সমগ্র ভারতের রাজারা তাদের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। এদের মধ্যে কম বেশী লাঞ্ছিত বা অপমানিত অনেকেই হয়েছেন, আবার কারোর কারোর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক ও গড়ে উঠেছিল। সমগোত্রিয় (শক্তি ও সামর্থ্যে) রাজাদের ঘরে পান্ডবেরা (কুরু বংশীয়েরা) বিবাহ করেছেন নিজেদের শক্তি বাড়ানোর জন্য। এই ব্যাপারে তাদের মনে প্রথম নিজেদের বলবৃদ্ধির কথাই এসেছিল, যতটা না সেই রাজ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার ইচ্ছা। কুরু বংশের সাথে নিজেদের আত্মীয়তা বা বন্ধুত্ত্বের বাঁধনে বাঁধতে পেরে অনেক রাজাই নিজেদের ভাগ্যবান বলে মনে করতেন। এমন একটা সামাজিক ও রাজনৈতিক আখাড়ার মধ্যে শকুনির প্রবেশ সুদূর গান্ধার থেকে। তাঁর প্রবেশের মূল কারন তাঁর ভগিনির হস্তিনাপুরে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হওয়া। একজন রাজপুত্র নিজের পিতার অবর্তমানে তাঁর নিজের রাজ্য পরিত্যাগ করে শত্রুর পুরীতে দিনাতিপাত করেছেন কেবল মাত্র একটি সংকল্প নিয়ে – ‘ কুরু রাজ্যের বিনাশ’, ‘ভীষ্মের কুলের বিনাশ’। হতে পারে কুরু শক্তিশালী, প্রতিষ্ঠিত, উচ্চবংশীয়, ধনবান। কিন্তু সেই বংশের অন্ধ রাজার জন্য গান্ধারের সবচেয়ে সুন্দরী নারী ও রাজকন্যাকে বৈবাহিক প্রস্তাব দেওয়ার যে অবমাননা তারা করেছেন (প্রস্তাব দিয়েছিলেন ভীষ্ম), তাতেই শকুনির সবচেয়ে গভীর আপত্তির কারণ ছিল। এই আপত্তি আরও ক্রোধে পর্যবসিত হয়, যখন স্বামীর অন্ধত্বের অছিলায় গান্ধারী স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজের চোখের ওপর বন্ধন জড়িয়ে নেন এবং নিজেকে ধৃতরাষ্ট্রের পদাঙ্কনুসারী বলে জগৎ পরিচিতি দেন। চোখ থাকতেও তিনি সারা জীবন অন্ধের মতো দিন কাটালেন। আর এর কারণ মহামতী ভীষ্ম ছাড়া অন্য কাউকেই শকুনি করতে চান নি। তাই তাঁর ক্রোধ হওয়া স্বাভাবিক এবং তা একেবারেই অনুচিত নয়। কেবল মাত্র গায়ের জোরে যে তিনি এই বিশাল কুরুকুলের কিচ্ছু করতে পারবেন না, তা তিনি ভালোই বুঝতেন। তাই তাঁর আস্থা ছিল নিজের ধুর্ততা ও ভবিষ্যত আন্দাজ করার অসামান্য ক্ষমতার ওপর। আর তাঁর এই ক্ষমতায় যজ্ঞের হাওয়ার কাজ করেছিল তাঁর ভাগিনেয় দুর্য্যোধনের অসামান্য ঘৃণা ও হিংসা পান্ডু পুত্রদের জন্য। শকুনি মামা হিসেবে সব সময়ই দেখিয়েছেন তিনি ভাগিনেয়র জন্য সব কিছু করতে পারেন, করছেন। কিন্তু প্রত্যন্ত গভীরে সেই সব ঘটনার উদ্দেশ্য ছিল কুরুবংশের বিনাশ। ভীষ্মের কুলের বিনাশ। তা সে পান্ডবই হোক না’ কি তাঁর নিজের সহোদরা উদ্ভুত কৌরবই হোক। দুজনেই তো মূল কুরু বংশের থেকেই এসেছেন। এই বিরাট কাজের প্রেক্ষাপট গড়ে তুলতে তিনি ক্রমাগত দুর্য্যোধনের মনের মধ্যে অন্য কুরু বংশীয় বিশেষ করে পান্ডবদের প্রতি বিষ বাষ্প ঢুকিয়েছেন। দুর্য্যোধনের চোখে সব সময়ই সাধারণ খেলা ধুলো বা পারিবারিক মিলন মেলাকে তিনি একটা প্রতিযোগীতার মধ্যে নিয়ে যেতেন আর তাতেই দুর্য্যোধনের মনের ওপর তাঁর অধিকার আরোও বেশী করে জমিয়ে নিতেন। উনি হয়তো নিজেও জানতেন যে অন্যায় পথে তাঁর নিজের ভাগিনেয়কে উনি নিয়ে যাচ্ছেন- কিন্তু কুরু প্রতিশোধের আগুন তাঁর মধ্যে এতটাই তীব্র ছিল যে তিনি কখনও বর্তমানের পথে পাপ–পুন্যের হিসেব করেন নি- কেবল ভবিষ্যতের দিকে নির্নিমেশ চেয়ে থাকতেন। যে ভবিষ্যতে কুরুবংশের মর্য্যাদা ভুলুণ্ঠিত হয়েছে, তাঁর দিকে চেয়ে থাকতেন। যে ভবিষ্যতে সমগ্র কুরু বংশ ধনে প্রাণে সমূলে বিনষ্ট হয়েছে, তাই দেখতে চাইতেন।
কথিত আছে তিনি নাকি পাশা খেলায় অসামান্য পারদর্শী ছিলেন। আর এই কাজে তাঁর নিজস্ব পাশার যে ঘুঁটি ছিল সে দুটি না’কি তাঁরই পিতৃদেবের অস্থি হতে নির্মিত। সুবালার মৃত্যুর পরে তাঁর পাঁজরের অস্থি থেকে শকুনি এই দুটি ঘুঁটি বানান, যারা নাকি তাঁর কথা শুণে চলতো। পাশায় বসে তিনি যে ঘরের সংখ্যা বলতেন ঘুঁটি সেই ঘরেই গিয়ে স্থির হতো। যদিও এর কোন ঐতিহাসিক প্রামাণ্যতা কোথাও নেই মহাভারতে, কিন্তু মহাভারত উত্তরকালে এই কথা খুব দৃঢ়তার সাথে মহাভারত গল্পের মধ্যে আসে। ব্যাস দেবের মহাভারতে ঘুঁটির ব্যাপারে তেমন উল্লেখ না থাকলেও শকুনি পাশা খেলায় যে অত্যন্ত ধীমান ছিলেন সেই ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। সমগ্র মহাভারতের কার্য কারণ যে ঘটনার উপর দাঁড়িয়ে তা এই পাশা খেলার আসরেই ঘটিত হয়েছিল, একথা আমাদের সকলেরই জানা। এই খেলার সূত্র ধরেই শকুনি তাঁর নিজস্ব প্রতিহিংসার শেষ পেরেকটুকু কুরুকুলের বিনাশ ও বরবাদীর কফিনে লাগাতে সমর্থ হয়েছিলেন। এই খেলার পরিশেষেই কৌরব ও পান্ডবের মধ্যে এমন একটা সম্পর্কের দূরত্ব তৈরী করে দেয় যা বিনাযুদ্ধে মেটাবার আশায় স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণও বিফল হয়েছেন। এক উচ্চপদধারী ও সম্মানীয় রাজ পরিবারের মিলিত সংসারে নিয়তির অমোঘ বাণীর মতো গৃহযুদ্ধের ঘোষণা হয়ে গেলো সামান্য কোন সমঝোতা ছাড়াই। সারা ভারত যে যুদ্ধে অংশীদার হতে চলেছে তার প্রস্তুতি হস্তিনাপুরের পাশার আসরে সকলের অগোচরে নিঃশব্দে ঘটে গেলো। এ সবই ঘটনা পরম্পরায় হয় নি, এর পেছনে শকুনির অসামান্য বুদ্ধিমত্তা ও সুযোগ সন্ধানী চাতুরী কাজ করেছে। পান্ডবদের ইন্দ্রপ্রস্থ স্থাপনার পশ্চাতে, দুর্য্যোধন পান্ডবদের প্রতিপত্তি দেখে যখন হিংসায় জ্বলছেন, সেই সুযোগ শকুনি খালি যেতে দেননি। দ্যুত ক্রীড়ার আপাত প্রতিক্রিয়াহীন সাধারন নিমন্ত্রণের পেছনে তাঁর যে মানসিক সুচিন্তিত এক পন্থা ছিল তা তিনি দু দুবারই প্রমাণ করেছেন। দুর্য্যোধনের হিংসার আগুন সেই চিন্তায় সব সময় মদদ যুগিয়েছে। ধর্মানুসারে চালিত কুরুকুলের পান্ডুর বংশজদের শকুনি বারে বারেই মৃত্যু দিতে চেয়েছেন। বারে বারেই চেয়েছেন তাদের হীনবল করে দিতে। তারা ছিলেন তাঁর প্রথম লক্ষ্য। এতে দুটো লাভ ছিল। এক দুর্য্যোধনের কাছে আরোও বিশ্বস্ততা পাওয়া আর দ্বিতীয় ছিল ধর্মানুসারে যারা চলেছে তাদের বিনাশ করতে পারলে নিজের মনের জোর আরো বেড়ে যেত তুলনামূলক ভাবে ভ্রষ্ট নিজের সহোদরা থেকে উদ্ভুত কুরুকুলের কৌরবদের ধ্বংস করতে। শকুনি জানতেন যদি ভারতব্যাপী এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ একবার লাগিয়ে দিতে পারেন, কুরুকুল আপনা থেকেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। যুধিষ্ঠিরের সাথে যখন প্রথম পর্বে তিনি দু দুবার পাশা খেলেন, তখন তিনি যুধিষ্ঠিরের থেকে পাশা খেলায় নিপুণ ছিলেন। তাঁর মন্ত্রযুক্ত পাশা ঘুঁটি তাকে কতটা সাহায্য করেছিল সে হিসেবের না গিয়েও বলা যায় তিনি যুধিষ্ঠিরকে হারাতেন। আর তারই ফলস্বরুপ চূড়ান্ত হেনস্থা আর অপমানের বোঝা পান্ডবদের সইতে হয়েছিল। এমনকি তাদের কুল বধু দ্রৌপদীও সেই নির্লজ্জ অপমানের হাত থেকে রেহাই পান নি। এত বড় অধর্মাচারণ একদা ধর্মের দোহাই দেওয়া মহামতী ভীষ্ম পর্যন্ত প্রতিবাদ করেন নি – এখানেই শকুনির কুরুকুলের উপর প্রথম সার্বিক জয়। এই প্রতিবাদ না করার দ্বারা তারা সকলেই অধার্মিক হয়ে ওঠেন। কেবল অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র পাপের ভয়ে আর পান্ডবদের সাথে শ্রীকৃষ্ণ আছেন এই ভেবে সব কিছু হেরে যাওয়া বাজি পান্ডবদের ফিরিয়ে দেন। এতে দুর্য্যোধনের ক্রোধের কোন সীমা থাকে না। দ্বিতীয়বার তাদের আবার আমন্ত্রিত করা হয় দ্যূত ক্রীড়ায়। আর এবার দেশ ত্যাগের, রাজ্য ত্যাগের বাজি ধরা হয়। অপটু যুধিষ্ঠির এবারেও হেরে যান। কুরুকুলের এক অংশকে রাজ্য চ্যুত করতে পারা শকুনির দ্বিতীয় জয়। পান্ডবদের বিনাশের মন্ত্রণা তিনি তাদের ছোট্টবেলার থেকে করে আসছিলেন- কিন্তু সফল হতে পারেন নি। আজ হলেন। কৈশোরে দুর্য্যোধনকে দিয়ে ভীমের খাদ্যে বিষ মেশানো, পুরোচনকে দিয়ে পান্ডবদের কুন্তীসহ যতুগৃহে পুড়িয়ে মারতে চেষ্টা করা, অভুক্ত ও রাগী দুর্ব্বাসা মুনিকে তাঁর ক্ষুধার সময় পান্ডবদের কাছে বনে পাঠানো – যখন সম্ভবত তাদের কাছে কিছুই থাকবে না মুনিকে খাওয়াবার মতো, তা জানা সত্ত্বেও, এমন কত ঘটনা তিনি ঘটিয়েছেন পান্ডবদের বেকায়দায় ফেলার জন্য। আজ তাঁর পিতার আশীর্বাদ ধন্য পাশার ঘুঁটি সেই কাজ করে দিয়েছে। আমার নিজের ধারণা শকুনি সেই একটি রাত্রে বোধহয় একবারের জন্য হলেও শান্তির ঘুম ঘুমিয়েছেন। কিন্তু কাজ এখনও অর্দ্ধেক বাকি। অধুনা কারো কারো মতে শকুনি ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ গণিতজ্ঞ। গণিতের প্রোবাবিলিটি শাস্ত্রের তিনি ছিলেন মহাজ্ঞানী। আর এই প্রোবাবিলিটির জ্ঞানই তাকে পাশা খেলায় সকলের চেয়ে সফল করে তুলেছিল। সেই হিসেবে তাহলে বোধহয় এটা বললে ভুল হবে না, আধুনিক স্ট্যাটিস্টিকসের সবচেয়ে পুরোনো প্রফেসর ছিলেন এই শকুনিই।
এই সব কর্ম কান্ডের সাথে সাথে শকুনি একটা ব্যাপারে কিন্তু একেবারেই নির্মল হৃদয় ছিলেন। তা হল তাঁর ভগিনি গান্ধারীর প্রতি তাঁর অপরিসীম ভালোবাসা। গান্ধারীকে তিনি সারা জীবন ধরে অনুরোধ করে গেছেন চোখের বাঁধন খুলে নেবার জন্য, যা অবশ্য গান্ধারী বারংবার সবিনয়ে প্রত্যাখান করতে সমর্থ হয়েছিলেন। ভাতৃ প্রেমের কাছে নিজের স্ত্রী অধিকারের বলে যে শপথ তিনি নিয়েছিলেন তাকে কোন দিন হারিয়ে যেতে দেন নি গান্ধারী। দুজনেই তাদের নিজের নিজের কাজের প্রতি সমান ভাবে উৎসর্গীকৃত ছিলেন। এটাই শকুনির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট। শকুনিকে যতটা শঠ এবং ঋণাত্মক চরিত্রের মানুষ বলে মহাভারতে দেখানো হোক না কেন, তিনি তাঁর নিজের প্রতিজ্ঞা ও কর্মের প্রতি কায়মনোবাক্যে প্রতিবদ্ধ ছিলেন এবং তা তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তার কথাই বলে।
শকুনি তাঁর ভগিনির মতো কৃষ্ণ ভক্ত ছিলেন না। তিনি ছিলেন শিবের পূজারী। বর্তমান ভারতে কেরালায় শকুনির নামে একমাত্র মন্দিরটি দেখতে পাওয়া যায়। কেরালার কোল্লাম জেলায় পবিত্রেস্বরম নামে একটি মন্দির আছে যা শকুনির নামে উৎসর্গীকৃত। শিব সাধক হওয়ার জন্য শকুনির মধ্যেও নানা তামসিক গুণের সাথে সাথে কিছুটা রাজসিক গুণও ছিল। আর সেটা কুরুভর কমিউনিটির মানুষেরা মানে। বস্তুত পক্ষে শকুনির একমাত্র মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা এই কুরুভরেরাই। পবিত্রেস্বরমের এক বহু পুরাতন মন্দির যা কিনা শকুনির উদ্দেশে সমর্পিত, তাতে একটি সিংহাসন (যা কি’না শকুনি ব্যবহার করতেন) রাখা আছে। আর কোন পূজা বা মন্ত্রপাঠ সে মন্দিরে হয় না। আর মন্দিরে আছে দেবী ভুবনেশ্বরীর মূর্তি, কিরাতের আর নাগরাজের মূর্তি। কুরুভরেরা বিশ্বাস করে তারা শকুনির বংশদ্ভুত আর এই স্থানে শকুনি যুদ্ধের পরে ফেরত আসেন ও শিবের বরে মোক্ষ লাভ করেন। শিবের বরেই তিনি উপাধি পান লর্ড শকুনি হিসাবে। মালয়লি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মালয়লি মকর সংক্রান্তিতে এই মন্দিরে একটি মেলাও হয় প্রতি বছর যার নাম মালাক্কুডু মহলশোভম। শকুনির মন্দিরের কাছে আরও একটি ছোট্ট মন্দির আছে- যা দুর্য্যোধনের নামে। কুরুভরেরা মনে করে, শকুনি দ্বাপরের শেষ মানবতার, আর দুর্য্যোধন হল কলির প্রথম মানবতার।

পবিত্রেস্বরমে শকুনির নামে উৎসর্গীকৃত মন্দির, কোল্লাম জেলা, কেরালা
শকুনির অনেক পরে তাঁর বংশজ রাজা অম্ভি গান্ধারের সিংহাসনে বসেন। যিনি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সমসাময়িক ছিলেন। আলেকজান্দারের সাথে যুদ্ধে এই রাজা অম্ভি তক্ষশীলায় আলেকজান্দারের বশ্যতা স্বীকার করে নেন। পরে তিনি রাজ্য চ্যুত হোন।
শকুনি মহাভারতের সবচেয়ে বড় এবং কার্য্যকারী খলনায়ক ছিলেন কি’না এই নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে। সাধারণ বিচারে তাঁর নানা কর্মকান্ড একটা নেগেটিভ চরিত্রায়ন করলেও একটা জিনিস অস্বীকার করার কোন উপায় নেই, আর তা হল তিনি নিজের উদ্দেশ্যের প্রতি স্থিরপ্রতিজ্ঞ ছিলেন এবং শেষ দিন পর্যন্ত থাকতে পেরেছিলন। তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা তাকে নানা আপাত প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থার মধ্যেও স্থির রাখতে পেরেছিল এটা কোন মানব চরিত্রের জন্য কম বড় কথা নয়। বিশেষতঃ সেই সময় সারা ভারত বর্ষেই রাজা ও কুলপতিদের মধ্যে এক বা একাধিক দলের অন্তর্ভুক্ত হবার একটা তীব্র মানসিকতা ছিল। যে বিরাট দুটি শক্তির চারপাশে সে সময়ে সকলে জোট বাধছিলেন, যে শক্তির প্রতিভু একদিকে যেমন মহামতী ভীষ্ম বা অন্যদিকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন, সেখানে নিজের লক্ষ্যে টিকে থাকা ও উদ্ভুত পরিস্থিতির সাথে নিজের কর্মকাণ্ডকে সফলতার টিকা পড়ানো কম কথা নয়। সেদিক থেকে শকুনি কে ১০০ র মধ্যে ১০০ দিতে কেউ আপত্তি করবেন বলে মনে হয় না। আর তাঁর এই সব কাজ কেন করতে হল সেটাও ভেবে দেখতে বলি। তখনকার আর্য্য সমাজে যারা রাজা ও রাজ বংশোদ্ভুত, তারা কখনই নিজেদের অপমান ও হেনস্থা সহজে মেনে নিতেন না। সারা ভারতের রাজার মুখোমুখি হওয়া গান্ধারের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই বলের চেয়ে কৌশলই শকুনির একমাত্র হাতিয়ার ছিল। আর তিনি তাই করেছেন। এই জন্য তিনি নিজের রাজ্যসুখও ভোগ করেন নি। এটাও একটা ত্যাগ বলে মানতে হয়। অপমানের প্রতিশোধ নেওয়া ছাড়া আর কোন কিছুর দিকে শকুনি হাত বাড়ান নি। যদিও দুর্য্যোধনের সুবাদে তিনি অশেষ ধন দৌলত নিয়ে এক ভোগীর জীবন কাটাতে পারতেন। আমার মতে দ্বাপরের শেষ মানুষটি এক মহান কর্মযোগী ছিলেন। শুধু কাজ করে গেছেন প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী, ফলের দিকে কখনও তাকান নি। আপনারা কি বলেন ?

শকুনি চরিত্র
  • 5.00 / 5 5
1 vote, 5.00 avg. rating (91% score)

Comments

comments