২২শে অগাস্ট ২০১৩,-সকাল সাড়ে নটা,- ফোনটা ধরে হ্যালো বলতেই কান ফাটানো আওয়াজ,-“ভূতো আমাকে হেল্প কর । আমি আর কিছুতেই পেরে উঠছিনা । “ শোনা মাত্রই বুঝতে পারলাম – এতো শঙ্কুমামার গলা । শংকরপ্রসাদ মজুমদার । এরকম গলা আর কারোর হতেই পারেনা । বাজখাঁই নয়,হেঁড়েও নয়,-কিন্তু ফোনটা কানের থেকে ইঞ্চি ছয়েক দূরে না ধরলে নির্ঘাৎ সার্ভিসিং করাতে হবে,-ফোনের নয়-,-কানের । শঙ্কুমামা চিরকালই আদর্শবাদী সজ্জন । তাই ঘরে এখনও এ সি লাগেনি(সরি-তাবলে যাদের ঘরে এ সি আছে তাদের আমি অসজ্জন বলতে চাইনি)। গোদা পাটা সিমেন্টের মেঝে,-সিরামিক টাইলস বা টেরাজো নয় । সোদপুরের ইস্কুলে বাংলার টীচার । প্রায় বিশ বছর একই স্কুলে,একই বিষয়ে,একই পদে আসীন । ঘরেও একই মামী,আর একটাই ছেলে পুঁটে । দিনভর-রাতভর পড়াশুনা আর ছাত্র পড়ানো ছাড়া আর কোন প্যাশন নেই । তবে-গলাটাই ওনার সম্পদ । এই গলা কোন ক্লাসরুমে বাজতে থাকলে টিভি দেখে রাতজাগা কোন ছেলের চোখেও ঘুম আসবেনা । আস্তে কথা বলতে পারেননা,-কিছুতেই না । এর অবশ্য কারন আছে । মাত্র বছর পাঁচেক আগের ঘটনা । পাড়ার ফুটবল খেলায় চ্যাম্পিয়ান হয়ে পুঁটের দল ঘন ঘন চকলেট বোম ফাটাচ্ছে,-এমনই সময় শঙ্কুমামা সেখান দিয়ে পাস করছিলেন । ফাটবি তো ফাট-ওনার কানের গোড়ায় “দড়াম”। ঝুলপির কাছে বেশ কিছু চুল পুড়ে গেছিল । সেটা অবশ্য কোন কথা নয় । চুল গেলে চুল আসবে,-কিন্তু কান গেলে !! মৃদুভাষিনী বসুন্ধরা । পেছন থেকে গাড়ী বেধড়ক হর্ণ বাজালেও কোকিল ডাকছে মনে হয় । যার ফলে যা হবার তাই-ই হয় । শঙ্কু স্যারের ক্লাস মানেই ফূর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ । মনের আনন্দে গল্পগুজব কর ,কিন্তু চোখটা থাকতে হবে স্যারের দিকে,আর ঘাড়টা রাখতে হবে সোজা । শুধু যে হতভাগার কপাল খারাপ-তাকে প্রশ্মের উত্তর বলতে হবে ,- সেদিন বিকেলে বাড়ি ফিরলে মা জলে আদা ফুটিয়ে নুন মিশিয়ে রেডি করে রাখেন । মামীর বহুবার ভোকাল কর্ড জ্যাম হয়ে গেছিল । তারপর থেকে হাত পা নেড়ে , ঠোঁট নাড়িয়ে কমিউনিকেট করেন । এহেন শঙ্কুমামাকে তর কোন সহকর্মী ইদানীং ফেসবুক শিখিয়েছে । অনেকদিন থেকেই বাড়িতে একটা ডেস্কটপ আছে । তাতে পুঁটে ইন্টারনেট লাগিয়েছে । সব কিছু ভালোই চলছিল । কিন্তু সন্ধ্যার পর পূজোপাঠ করে সেই যে বাবা বসে-পুঁটের আর কোন চান্স নেই । আগে তো বইটই পড়ত,- এখন তো তাও নয় । মামীর নিঃসঙ্গতর জীবন ।

শঙ্কুমামা যে ফেসবুকে এ্যাকাউন্ট করেছে সেকথা মামী কাঁদতে কাঁদতে একদিন বলছিল আমাকে । “জানিস ভূতো-তোর মামা আগে আপিস থেকে ফিরলে কি সুন্দর গমগম করত ঘরটা,-মনে হত যেন কত লোক আছে বাড়িতে । আর এখন-সেই যে ঘাড় গুজে পড়ে থাকে-রাতের খাবার রেডি করে পুটে আর আমাকে মিলে রীতিমতো টনাটানি করতে হয় । স্বামীর এই আকস্মিক দুরারোগ্য ব্যাধির নিদারুণ অসহায়তায়-মামী সেদিন ঝরঝর করে কেঁদেছিল । -জানিস ভূতো, কানের জন্য তো অনেক চিকিৎসা হয়েছে, ফল ও পেয়েছি অনেক । কিন্তু একি ব্যামো হল বল দেখি । কত ডেকেছি ঠাকুরকে,মানত করেছি এমনকি পুঁটে কদিনের জন্য বিগড়ে দিয়েছিল কমপুটরটাকে,-লাভ হয়নি,পরের দিনই লোক ডাকিয়ে সারিয়ে ফেলেছে । মামীর জন্য সেদিন অনুকম্পা হচ্ছিল  । এমন একজন অ-মাইক পতিদেব যদি ঘরে ফিরেই সাইলেন্ট মোডে চলে যায়…।

আমার দ্বিতীয়বার “হ্যাল্লো” বলামাত্রই আমার গলার ডেসিবল শুনেই-ওঘর থেকে মা বলল-“কে রে ভূতো,শঙ্কুর ফোন,তাইনা” ?

বললাম-বলো মামা কিসের হেল্প চাই ?

-আরে শোননা-আমি তো কদিন আগে ফেসবুকে একটা অ্যাকাউন্ট খুলেছি । কি সুন্দর সুন্দর ছবি,কি সুন্দর কবিতা পাঠাচ্ছে বন্ধুরা । আমার খুব ইচ্ছে করছে ওদের আমার ভালোলাগার কথা জানাতে,-কিন্তু..

-কিন্তু কি? তুমি লাইক মারো, নিচে কমেন্ট লেখো-তাহলেই ওরা বুঝবে যে তোমার ভালো লেগেছে-এ তো খুব সিম্পল ব্যাপার।

-আরে,তুই তো বলছিস সিম্পল,-কিন্তু যতবার যেখানে Like মারছি ততবারই unlike দেখাচ্ছে । আধ ঘন্টা ধরে অনেক জায়গায় চেষ্টা করলাম-কিন্তু সেই unlike । আরে আমার পছন্দ না হলে আমি তো ডিসলাইক টিপতাম । unlike আর dislike কি এক হল,-তুই-ই বল । মনে হয় কম্পিউটারা কোন গড়বড় করছে,-কি করি বলতো এখন ?

-মামা,-তুমি লাইক টেপো ।

টিপছিতো,-টিপলেই আনলাইক হয়ে যাচ্ছে । আবার আনলাইক টিপলেই Like চলে আসছে, আবার like টিপলেই unlike..এতো কি বিদিকিচ্ছিরি ব্যাপার ।

-ছাড়ো, -তুমি কমেন্ট লেখো ।

-কারেন্ট?-হ্যা, আছে । ………

–কারেন্ট না,-কমেন্ট । কমেন্ট,–কমেন্ট—-শুনতে পেলে ।

–চ্যাঁচাচ্ছিস কেন—শুনেছি—কমেন্ট লিখতে বলছিস তো ? আচ্ছা দেখি,-পরে দরকার পড়লে আবার ফোন করব কিন্তু । এখন রাখছি ।

সকাল নটা পঞ্চান্ন- ভূতোরে—কমেন্ট করতে গিয়ে একটা প্রবলেম হয়ে গেছে । পারছিনা । A,B,C,D, কমা,ফুলস্টপ আর 1,2,3 দিয়ে বাংলায় কি করে লিখব ? ওরা কি সুন্দর ঝকঝকে বাংলায় লিখছে –

–মামু,-কিছু করার নেই-ঐ English keyboard এর সাহায্যে তোমাকে ইংরেজী হরফে বাংলায় লিখতে হবে । যেমন ধরো –“আমার ঘুম পেয়েছে”- এই কথাটা লিখতে গেলে তোমায় লিখতে হবে-amar ghum peyechhe..। বানান করে বুঝিয়ে দিলাম । কিম্বা ধরো-“ভূতো বড় ভালো ছেলে”-এটা লিখতে গেলে তোমাকে টাইপ করে লিখতে হবে-Bhuto baro bhalo chhele । কি,এবার বুঝলে তো ?

কিছুক্ষণ কোন উতর নেই ।

–মামু-তুমি শুনলে তো ?

–তুই কিছু বললে তবে ত শুনব !!

এবার মাথাটা দপদপ করছে । চীৎকার করে আবার আগের কথাগুলোই বলে গেলাম ।

আবার কিছুক্ষণ চুপ । কিন্তু এবার উত্তর এলো । –বাঃ,বেড়ে বলেছিস তো ! এখন তো সব লিখতে পারছি । থ্যাংক ইউ-ভূতো । তবে ওরা অমন ঝকঝকে বাংলায় লিখছে কেমন করে ?-

–ওসব তুমি এখন পারবেনা মামু,-তার জন্যে বাংলা সফটওয়্যার ডাউনলোড করতে হয় । এখন এভাবেই কাজ চালিয়ে যাও,-পরে আমি বুঝিয়ে দেবো ।

–ঠিক আছে,-দেখি কি হয়—

সকাল ১০টা ১০—ভূতো,বাবা,তোকে বারবার ফোন করে বিরক্ত করছি,-তুই কিছু মনে করছিস নাতো রে ? আজ রোববার-তাই একটু ফেসবুক খুলে বসেছি আরকি ।

–না মামু—বলুন না,-আবার কোন প্রোবলেম হলো নাকি ?

–না, প্রোবলেম ঠিক নয়,তবে একটা বড় ভুল করে ফেলেছি । একজন “কলা”র ওপর খুব সুন্দর একটা নিবন্ধ লিখেছে । পড়ে খুব ভালো লাগল,-তাই কমেন্টে গিয়ে লিখলাম—Kadali khub e upadeyo fall,-khosa chharalei gota fall ta atyanta suswadu. Kola onek prokarer hoy- ইত্যাদি লিখলাম । কিছুক্ষণ পরে দেখি মাথায় ফেট্টিবাঁধা,সরু গোঁফওলা একটা ছোকরা এসে হাজির-বলছে-“এটা কলা খাওয়ার জায়গা নয় । ভুল জায়গায় এসে পড়েছো । কলা খেতে হলে নিচের থ্রেডে গিয়ে খাও” । কে বলল-দেখতে গিয়ে-কি লজ্জা-কি লজ্জা,-ওরে ব্বাস-এখানে সাম্রাজ্যবাদ, সন্ত্রাসবাদ ইত্যাদি নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা চলছিল । তার মধ্যে –কলা । আমি বললাম ভুল হয়ে গেছে-কিন্তু ভাবছি –ভুলটা হল কিভাবে !

–না না মামু –ওরকম ভুল দুএকবার সবারই হয় । আর তুমি তো নিজেই বুঝেছো-কি ভুল করেছো । এরপর থেকে একটু দেখেশুনে কমেন্ট কোরো । তাহলেই আর কোন চিন্তা নেই । –ব্যস্ এবার অল্পের উপর দিয়ে বেরিয়ে গেল ।

সকাল ১০টা৪৫- আবার ফোন । ভূতোরে-আমার বড় কষ্ট ।

–কেন,আবার কি হলো ?

–সবার নিজের কেমন সুন্দর সুন্র ছবি আছে,-সবাই কত সুন্দর সুন্দর ছবি পোস্টিং করছে । আমি পারিনা কেন ?

–মামু, তুমি কি তোমার কোন ছবি কম্পিউটারে সেভ করে রেখেছো ?

–নাহ্ আমি তো এসব পারিনা রে,-তবে পুঁটে করলেও করতে পারে । ও বাড়িতে এলে ওকে জিজ্ঞেস করব ।

–শোনো মামু-তোমার পেজের ওপরের দিকে দ্যাখো-যাও-দ্যাখো,

–ধূস্ –কথা বলছিস না কেন রে ? ধুস্ , এই দিলাম রেখে ।

–ফোনটা কেটে গেল । 0hhh-God………(ক্রমশঃ)

সকাল সাড়ে দশটা- ভূতো, ও ভূতোরে-কিছু একটা কর ।

–আবার কী হল মামু ?

–কি আবার হবে—কিছুই হচ্ছে না,-নট নড়নচড়ন নট কিস্যু—

–মানে ?—

–মানে আবার কি—না পারছি লিখতে,না পারছি লাইক দিতে, না পারছি পেজটাকে নাড়াতে, না পারছি কাটতে,–

–মামু তোমার কম্পিউটার হ্যাং করে গেছে ।

–কোথায় ব্যাং ?-তোর কি মাথা খারাপ হলো নাকি রে ?

–ব্যাং নয় মামু—হ্যাং—হ্যাং—তোমার কম্পিউটার কাজ করছেনা । –রিস্টার্ট করতে পারো ?

–সেটা কী ?

–তোমার সি পি ইউ এর নীচের দিকে একটা বোতাম আছে—সেটা টিপে দাও ।

–না না,-কোন ডিউ টিউ নেই—সেকেন্ড হ্যান্ড বটে, কিন্তু নগদে কেনা ।

আমিও হাল ছাড়ব না । বললাম- মামু,-তোমার কম্পিউটারটা যে সুইচ টিপে চালাও—সেটাই আরেকবার টিপে দাও

–দিলাম টিপে—ওমা-এতো অন্ধকার হয়ে সব বন্ধ হয়ে গেল । -কি সব বলিস !!-কিস্যু জানিসনা । অর্বাচীন—অপদার্থ ।

তড়াক করে মাথায় রক্ত উঠে গেলো,-রোববারের সকালটা বরবাদ করে কন্ঠনালীর বিপর্যয় ঘটিয়ে যে কৃচ্ছ্রসাধন করলাম-তার এই পরিনাম –ছিঃ । আমি নিশ্চিত ছিলাম যে স্বাভাবিক স্বরে গালমন্দ দিলেও এক বর্ণও শুনতে পাবেননা । তাতে লাভ কী !—মনে বরফ ঢেলে –ফোনে চীৎকার কোরলাম—মামু এবার আবার সুইচটা টিপে দাও । –বলতে না বলতে ফোনের ওপাশে ঠং ঠঙাৎ আওয়াজ-তারপরই মামীর আর্তচীৎকার ।

–কি হলো মামু, কিসের আওয়াজ ?

–ও কিছু নয়-তোর মামী চা দিয়েছিল,-তাড়াহূড়োতে আমার হাত লেগে উল্টে গেছে । তুই ওসব নিয়ে ভাবিস না,-তোর মামী এখন টেবিলের তলায় হামাগুড়ি দিয়ে সব মুছে নিচ্ছে ।

–ভূতো,-তোর কথা মতো দিলাম তো টিপে,–এ বাবা স্ক্রীনটাই তো নীল হয়ে গেলো,–কী করলিরে ভূতো—সেই ঢিপির ওপর সবুজ ঘাস,-হলুদ ফুল-কোথায় হারিয়ে গেল ।

–কিচ্ছু হারায়নি মামু—একটু ধৈর্য ধরো—দ্যাখো –ঐ নীল স্ক্রীনে এক জায়গায় লেখা আছে—windows stars normally, আরেক জায়গায় আছে safe mode,-তুমি normally টা টিপে দাও,-দ্যাখো কি হয় । -

–এই দিলুম টিপে,–আরে ব্বাস্,-ভূতো তোর জয় হোক । বেঁচে থাক বাবা । কিন্তু এ তো দেখছি ফাঁকা মাঠ—ওর মধ্যে সুন্দর নানা রঙের বাক্সোগুলো কোথায় গেলো ?

–আরেকটু ধৈর্য ধরো—ঐ বাকসো-মানে আইকন গুলো সব ফেরত চলে আসবে ।

–হ্যা-রে ভূতো—সব কটা আস্তে আস্তে ফিরে আসছে ।

–আসুক,-এখন আর তুমি কিছু টিপে দিওনা । কম্পিউটারটাকে একটু জিরোতে দাও । ঠিক আছে,-এখন রাখছি,-একটু বাথরুম থেকে আসছি । তুই পালাস না যেন,-কোন অসুবিধে হলে আবার ফোন করব । ……………………

মামু বাথরুমে গেছে-আমিও কম্পিউটারের সামনে বসে বসে ক্লান্ত হয়ে গেছি । কোমর ব্যথা করছে । সটান গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম । অনেক টেনশান গেছে মামুর,-একটু রিলিস হয়ে গেলেই আবার নতুন উদ্যমে শুরু করা যাবে । –সকাল ১১টা ০৫,-সবে শুয়েছি-এমন সময় আবার ফোন । এবার মামী । -“ভূতো,-আমার লক্ষ্মী সোনা,-বাবা-তুই আমাদের রক্ষে কর । কি অলুক্ষুণে নেশায় ধরেছে রে—এঁ এঁ এঁ”-মনে হল মামী কাঁদছে ! কিছু একটা কর চাঁদু আমার,-তোকে নলেণ গুড়ের সন্দেশ খাওয়াবো,-ভাপে ইলিশ খাওয়াবো,-তুই যা চাস-তাই-ই করবো,-কিন্তু কিছু একটা কর ,-এঁ-এঁ-এঁ । মামীর কান্না শুনে আমার গলা শুকিয়ে উঠেছিল । সুর পঞ্চমে ওঠার আগেই কোঁৎ কোঁৎ করে খানিকটা জল খেয়ে গলা ভিজিয়ে নিলাম । তারপর রাজেশ খান্নার মতো স্টাইলে স্বরে মধু মাখিয়ে বললাম,-তুমি কাঁদছো মামীমা-আ-আ-! আমি তো আছি । মামু ফিরুক,-একটা বন্দোবস্ত নিশ্চই করব । -মনে হল মামী কিছুটা আশ্বস্ত হলেন । আর কথা না বাড়িয়ে-মা তারকেশ্বরীর নাম নিয়ে আমাকে যতরকম ভাবে আশীর্বাদ করা যায়-করে ফোন রেখেদিলেন । আমার আরো ক্লান্ত লাগছিল । আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম । চোখ জুড়ে ঘুম নেমে এলো । ঘুম….ঘুম…। স্বপ্নের ভেলায় ভাসতে ভাসতে ছেলেবেলার ছবিগুলো সব যেন ভেসে ভেসে উঠছিল । কি আশ্চর্য ! এ আমি কার কোলে ?-ছোঙ্কুমামা না ! তাই-ই তো । ছোঙ্কুমামার কোলে আমি-আর মামা পকেট থেকে লুকিয়ে বের করেছে আমার প্রিয় হজমি গুলি । সামনে একটা নাগরদোলা ঘুরছে পাঁই পাঁই করে । আমি ছোঙ্কুমামার কোলে ছটফট করছি-নাগরদোলায় চড়ব বলে । চারিদিকে ভেঁপু বাজছে-মেলা বসেছে । ….তারপর দেখি আমি সার্কাসের তাবুতে বসে জোকারদের খেলা দেখছি-পাশে শঙ্কুমামা । অনেক উঁচুতে দোলনায় ঝুলতে ঝুলতে সবাই কেমন খেলা দেখাচ্ছে । বাঘ এলো,সিংহ এলো,-হাতী এসে ফুটবল খেললো । হঠাৎ একটা জোকার এত জোরে ফূঁ-বাঁশী বাজালো যে ঘুমটাই গেল ভেঙ্গে—

 দুপুর ১২ টা, -মোবাইলটা ফোনটা বেজেই চলেছে । –হ্যালো—ও—মামু, বলো,-এতো দেরী হলো কেন? তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছিলে ?-

–না রে-ঘুমোইনি—আসলে কালকে শোবার আগে কায়ম চূর্ণ খেতে ভুলে গেছিলাম তো—আর পুঁটেটাও এমন বিচ্ছু-আমার দেরী হচ্ছে দেখে বাইরে দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিয়েছিল-আর জানিস তো-তোর মামী আবার একবার পূজোয় বসলে শেষ না করে ওঠেনা । আজ ফিরুক পুঁটে-জবাই না করেছি-দেখিস ।

–ও-

–এদিকে ফিরে এসে দেখি—ইন্টারনেট চলছেনা-এটাও পুঁটের ফিচলেমো, সুইচ অফ করে দিয়ে গেছে ।

–যাক,-এখন চালু করেছো তো?-

হ্যাঁ-এই তো করলাম । গুগুল খুললাম, কিন্তু ভূতোরে-সর্বনাশ হয়েছে –সব টেনশান একসাথে এসে যাওয়ায় আমি পাসওয়ার্ড ভুলে গেছি ।

–এই সেরেছে,-মামু-ঠিক করে-মন দিয়ে ভাবো—

–ধূর ছাতা-! কি খাবো ?—তুই কি খেতে বলছিস ?—ধর তো একটু-“এ্যাই-শুনছো?-ও পুঁটের মা-কোথায় গেলে গো -? একটু ব্রাহ্মী তেলের শিশিটা নিয়ে এসোনা একবার—

–বুঝলাম-মামী এসে শঙ্কুমামার মাথায় ব্রাহ্মী তেল মাখাচ্ছে ।

–হ্যাঁ,-এইবার বল্—

–কি বলব?-

–মনে করার চেষ্টা কর্-

–তুমি ভুলেছো,-আর আমি মনে করব?-

–তাও তো ঠিক,-দাঁড়া-মাথাটা ঠান্ডা হচ্ছে—হ্যাঁ-হ্যাঁ-আরেকটু নিচে দাও-কানের পাশে আর ঘাড়ে-আহ্-কি আরাম রে ভূতো ,মনে হচ্ছে মগজটা পুরো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে । -হ্যাঁ এবার ভাবছি । –

–মনে কর মামু-শব্দ না সংখ্যা ?

–শব্দই মনে হয়-

–তোমার নাম?-

–নাঃ

–দাদুর নাম?-

নাহ–

–মামীর নাম-?-

–পুঁটের নাম-?

–নাঃ-

–ইস্কুলের নাম?-

–না মনে হয়,–এখন মনে হচ্ছে সংখ্যাও হতে পারে-

–তাহলে দ্যাখো-তোমার ফোন নাম্বার?-

–কোন নাম্বার–?-তুইকি বলছিস?-

–আরে বাবা—তোমার ফোন নাম্বার ।

চলতে থাকল অনুমান ও উপলব্ধির মেমোরি গেম । এই ফাঁকে একটা কথা জানিয়ে রাখি—মামা যখন বাথরুমে,-তখন মামীর ঐ দেড় মিনিটের মড়া কান্না আমার কোমল মনে এত গভীর দাগ কেটেছিলো-যে forgot password এর রহস্যটা মামাকে জানাতে চাইনি । তবে বেপরোয় ভাবে ভুল পাসওয়ার্ড দিতে দিতে হঠাৎ মামুরই সেটা নজরে এলো । বলল—ভূতোরে-ব্রাহ্মী তেলে কোন কাজ দিচ্ছেনা-বরং নিচে নীল একটা পুঁচকে লেখা-দাঁত বের করে হাসছে ।

–সেটা আবার কী?-

–গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে-আমি মরছি আমার জ্বালায়-আর বলছে-forgot password..পাশে আবার একটা জিজ্ঞাসা চিহ্ন ।

বিবেকের দংশন সামলে ভাবলাম-সবার নিস্তার পাবার এটাই পরম সুযোগ ।–বললাম—মামু,-আমিও আর ঠিক মনে করে উঠতে পারছিনা । তোমার মাথা গরম হয়ে গেছে—এখন এভাবে আর হবেনা । তুমি বরং এখন কম্পিউটার বন্ধ করে একটু জিরিয়ে নাও ।

–বলছিস?-নাহ্—তুইও তাহলে ওদের দলেই পড়লি রে-!! তোর থেকে অন্তত এটা আশা করিনি ভুতো । আমার এই করুন অবস্থায়ও তুই আমার পাশে দাঁড়ালিনা । –মনে থাকবে—নেতাজী ঠিকই বলেছিলেন-

–কি বলেছিলেন মামু?-

–হ্যাঁ-এসব কথা তো ভুলে যাবিই । –যখন স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সবাই তাকে একা ফেলে চলে গেল –তখন উনি গেয়ে উঠেছিলেন-“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে-তবে একলা চলো-রে-।

–মামু –তুমি একটু বিশ্রাম নাও ।

–ঠিক আছে-আমাকে অত বোকা পাসনি-বুঝেছি-তুই কি বলতে চাইছিস । বলেই ধড়াম করে ফোনটা রেখে দিলেন ।

আমি জানি-শঙ্কুমামু খুব অভিমানী মানুষ । কিন্তু এতো অভিমান-আগে বুঝিনি-একমাস কোন ফোন নেই-দেখা নেই,-কথা নেই,-আমি মাঝে মাঝে খুঁজে বেড়াতাম আমার অত্যন্ত প্রিয় শঙ্কুমামাকে । মাঝে মাঝে মনটা যে ভারী হয়ে আসতোনা তা নয় । শেষ পর্যন্ত আমি ব্যাপারটা আমার অগোচরেই ভুলে যেতে থাকলাম । ফেসবুকের সমস্ত গ্রুপের সব বন্ধুদের সাথে আনন্দে মশগুল হয়ে গেলাম । ভালোই চলছিলো দিনগুলো,-হঠাৎ এক সন্ধ্যায় ফেসবুকে লগ-ইন করেই চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল । চোখ কচলে ,গায়ে চিমটি কেটে দেখে নিলাম । –একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে । –“শঙ্করপ্রসাদ মজুমদার”—মামার সেই প্রানখোলা হাসিমুখ আর ডানপাশে মামী-বাঁ পাশে পুঁটে । আমি চকিতে রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করে নিলাম ।

.

শঙ্কুমামা ও ফেসবুক
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments