বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি। একের পর এক সমুদ্রের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে।

দখিনা বাতাস এসে নড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে একের পর নারকেল গাছের মাথা।

ওপরের দুটি ঘটনার দরুন সৃষ্টি হওয়া শব্দ উপভোগ করেননি এই রকম মানুষ প্রায় নেই বললেই চলে। যাকে বলি নির্জন সে আসলে এই জাতীয় নানারকম শব্দের জন্যই আরও উপভোগ্য হয়ে ওঠে। উপভোগ্য কারন উপভোক্তা আছে। কি হত উপভোক্তা না থাকলে? শব্দ থেকেই যেত। তাকে তৈরি করেছে প্রকৃতি। আমার বা আপনার থাকা বা না থাকার ওপর সে নির্ভরশীল নয়। আবার অন্যদিকে থাকত না কালীপূজোর সন্ধ্যেতে কান ফাটিয়ে দেওয়া শব্দদানব (যদিও সে এখন অনেক সংযত) যদি না থাকত মানুষ। এইসব শব্দকে একবাক্যে সবাই দূষণসৃষ্টিকারী বলে রায় দিয়ে দেবেন। কিন্তু মনে করে দেখুন তো, দুপুর গড়িয়ে সবে যখন বিকেল হচ্ছে, ঠিক তখন আপনি আপনার বারান্দায় এসে বসলেন, এমন সময় পাড়ার বাচ্চাদের বিদ্যালয়ে বাজল ছুটির ঘণ্টা। একদল কচিকাঁচা বেরিয়ে এল হইহই করতে করতে, বোঝা যাচ্ছে না কে কি বলছে, শুধু তৈরি হচ্ছে একটা কোলাহল। পারবেন বিরক্ত হতে? নাকি ছুটির দিনটা কিছুটা হলেও ফাঁকা ফাঁকা ঠেকবে? বা সারাদিনের খাটনির শেষে বেশ খিদে পেয়েছে, কিন্তু এই ট্রেনটা না পেলে ঘণ্টা খানেক দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, তখন কি ভিড়ে ঠাসা কামরায়, বসার জায়গা পেয়েছেন বা পাননি, মন চায় না –‘চানাচুর, ভুজিয়া, মিষ্টি বাদাম, নোনতা বাদাম’ এইসব শুনতে? সব শব্দই যে একই রকম মাদকতা তৈরি করবে বলি না, কিন্তু জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এমন কিছু শব্দ, যা একান্তভাবেই মানুষের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে, যাকে পছন্দ করি বা না করি, তাদের অনুপস্থিতি শূন্যতা আনে। এই রকমই কিছু আওয়াজের কথা।

গরমকালে সহজেই বোঝা যায় লোডশেডিং হয়েছে। মাথার ওপর ঘুরতে থাকা পাখাটা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু শীতকালে যখন দিনের আলো থাকে? আমার বাড়ি শিল্পাঞ্চলে। অবিচ্ছেদ্য বিদ্যুৎ পরিবহন ব্যবস্থা অনেক কারখানাতেই তখনও হয়ে ওঠেনি, একটা শব্দ সবসময় ঘিরে থাকত, টেরই পেতাম না আছে। হঠাৎ থেমে যায়, উপলব্ধি করি সে ছিল, আর সেই সঙ্গে এটাও বুঝি এতক্ষণ আরও কেউ একজন ছিল, যে এই মুহুর্তে আর নেই।

ছেলেবেলাতে কিছুতেই বুঝতে পারতাম না লোকটা কি বলে। হাতে একটা বিশাল বাক্স, তার ঢাকনাটা কাঁচের। এতটাই দ্রুতগতিতে সে হাঁটত ভাল করে দেখতেও পেতাম না কি আছে ভেতরে। বাক্স দুলিয়ে দুলিয়ে পেরিয়ে যেত রাস্তা। কোনদিন সে দাঁড়ায়নি আমাদের বাড়ির সামনে। অনেকটা বড় হয়ে বুঝতে পেরেছিলাম সে বলে – ‘চাই চিনা সিঁদুর’।

বাড়ির সামনে মাসে-দুমাসে একবার করে এসে দাঁড়াত – ‘ভাঙা শিশি বোতল বিক্রি আছে’।

একটা লোক একটা কাঁসর নিয়ে একই ছন্দে বাজিয়ে বেরিয়ে যেত। মুখে কোনও শব্দ ছিল না। পিছনের অল্পবয়স্ক একজনকে দেখে বুঝতে পারতাম তার কাছে আছে ‘কাঁসা পিতলের বাসন’

একজন আরও ছিল। সে রোজ আসত না। সপ্তাহে একদিন নিয়ম করে। বয়স বেশি ছিল না তবে বেচারির পায়ে সমস্যা ছিল। প্রতি বৃহস্পতিবার বাড়ির সামনে এসে ডাকত – ‘কিছু ভিক্ষে পাই মা গো’। ভিক্ষে দেওয়ার দায়িত্বটা যে কবে মায়ের হাত থেকে আমার আর বোনের হাতে চলে এসেছিল সেকথা আজ আর মনে পড়ে না। যেমন মনে পড়ে না সে কবে থেকে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু তার মুখ আর সেই সুর আজও মনে আছে।

উৎসমুখ একই। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সেই শব্দ নিয়ে আসত আনন্দ এবং নিরানন্দ। বিদ্যালয়ের ঘণ্টা। একসময় আমার সারাদিনই কাটত সেই ধ্বনির মাঝে। আবাসিক বিদ্যালয়ে থাকার সুবাদে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে কখনও কখনও শুনতে পেতাম এগিয়ে এসে আবার দূরে চলে যাওয়া নিরাপত্তারক্ষীদের সময়জ্ঞাপক শব্দ। এগারোটার সময় এগারো ঢং, বারোটার সময় বারো। নিজস্ব ঘড়ি নিষিদ্ধ ছিল, ওতেই বুঝতে পারতাম রাত কত হল। আর সকালবেলা ঘুম থেকে সবাইকে তোলার জন্য যে ঘণ্টাধ্বনি হত তা কত বিরক্তিকর হতে পারে, বিশেষ করে শীতকালে, সেটা আবাসিক ছাত্র মাত্রেই জানে। আমাদের আবাসের সীমানা পাঁচিলের লাগোয়া ছিল একটি মসজিদ। ভোরবেলা ওখান থেকে ভেসে আসা শব্দটিকে যে ‘আজান’ বলে সেটা জানতে পেরেছিলাম বহুকাল বাংলাদেশে কাটানো আমার এক সহ–আবাসিকের সৌজন্যে।

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সবচেয়ে বেশি আনন্দ হয় যখন শুনি বারান্দায় ‘ঝপাং’। খবরের কাগজ এসেছে। যে কোনও প্রকারে বাবার নজর এড়িয়ে তুলে নিই।

এখন সবার হাতে সময় যথেষ্ট কম। কাজেই যে সকালে আমি শুনতে পাইনা ‘সবজি’, সেদিন মা বা স্ত্রী কারও সাথেই বিশেষ কথা বলি না। যথাসম্ভব ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’-এর ওপরেই থাকতে চেষ্টা করি। ইদানিং অবশ্য কানের কাছে অহরহ তারস্বরে বাজতে থাকা মোবাইল ফোনে গানের আওয়াজ আমার ভীষণ না-পসন্দ। নিজের ভাল জিনিস নিজের কাছেই রাখা উচিত বলে মনে করি।

খেয়াল করে দেখবেন, এই রকম আরও নানা শব্দ জড়িয়ে আছে আমাদের সাথে, যার অস্তিত্বই থাকত না আমাদের ছাড়া। তার থেকেই কয়েকটা নিলাম। হারিয়ে গেছে অনেকগুলোই। কিছু সগৌরবে বর্তমান। আবার সংযোজিতও হয়েছে। আসলে পড়ছিলাম রাধাপ্রসাদ গুপ্তের লেখা ‘কলকাতার ফিরিওয়ালার ডাক আর রাস্তার আওয়াজ’। মূলত কলকাতার রাস্তার ফিরিওয়ালাদের আওয়াজের ছবি এঁকেছেন বইতে। ভ্রমণ করেছেন সুদূর থেকে নিকট অতীতে। সেখান থেকে প্রেরনা পেয়েই কিছু একটা খাড়া করার চেষ্টা করলাম। সবশেষে একটা শব্দ, যা হারিয়ে যায়নি আমার জীবন থেকে।

সুর্য যখন ঢলে পড়ছে, রং ধরেছে আকাশে, ঠিক তখনই আমি আর আমার বোন দুজনেই এক ছুটে এসে দাঁড়াতাম রাস্তামুখী বারান্দায়। কানে এসেছে দূর থেকে ভেসে আসা একটা শব্দ। ‘শোওওওনপাপড়ি সন্দেশ’। দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসতে আসতে কখনও থেমে গেলে বুঝতাম আমাদের মতই কেউ ডেকে নিয়েছে তাকে। অধীর অপেক্ষা কখন আবার শুনব সেই আওয়াজ। ধীরে ধীরে শব্দ যত কাছাকাছি আসে, তত ভেঙে পড়তে থাকে ধৈর্যের বাঁধ। সামনে এসে হাসিমুখে দাঁড়ায়, মাথা থেকে নামায় তার বাক্স। আর কাগজে মুড়ে দুজনকে দেয় দুটো শোনপাপড়ি। তারপর পয়সা বুঝে নিয়ে যেমন এসেছিল, সেইরকমই মিলিয়ে যায় একসময়। আর আমরা দু’জন বসে থাকি কখন আসবে পরের বিকেল। শব্দের মালিকের মাথার বেশিরভাগ চুল সাদা হয়ে গেছে, বহুদিন হল আমার মাথাও শিখে গেছে কি করে ত্যাগ করতে হয় কালোর মোহ, আমার বাড়ির সামনেও সে আর নিয়ম করে থামে না, কিন্তু ছুটির দিনে আজও আমার কানে আসে সেই শব্দ আর মনে করিয়ে দেয় সেই ফেলে আসা দিনগুলির কথা।

শব্দ, তোমার সাথেই দিন কাটে
  • 5.00 / 5 5
2 votes, 5.00 avg. rating (94% score)

Comments

comments