একটা বিয়ের আসরে ভি আই পি কে? সবাইই। ভি ভি আই পি কে? অনেকেই। পাত্র-পাত্রী আছেন, তাঁদের পিতা-মাতা, বাড়ির অন্যান্য লোকজন আছেন। ফিরিস্তি দিতে গেলে শেষ হবে না। এই সঙ্গে ভি ভি আই-এর মর্যাদা লাভ করে আরও একটি জিনিস। সাধারন সময়ে হয়ত তার প্রতি আমরা একটু অনাদরই দেখিয়ে থাকি। কিন্তু সেদিন তার আলাদা কদর। জিনিসটি একটি ব্যাগ হতে পারে বা মাঝারি মাপের একটা স্যুটকেসও হতে পারে। ব্যাগ ওজনে হাল্কা বলে তার আদর সচরাচর বেশি হয়। এতে থাকে পাত্রের ব্যবহার্য কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয়। দাঁত মাজার ব্রাশ, দাড়ি কামানোর যন্ত্র, তোয়ালে এই সব আর কি। এই ব্যাগটির সবচেয়ে বেশি নজরে রাখার দরকার পরে যখন পাত্রটি বিয়ের আসরে থাকেন। কারন এই সময়ে তাতে অন্যান্য বস্তুর সাথে যুক্ত হয় তাঁর মানিব্যাগ, ধুতি, সোনার বোতাম সমেত পাঞ্জাবিটি, সময়ে সময়ে মোবাইল ফোনটিও। ফলে যদি বিয়ে বাড়িতে কখনও কারও নজরে পড়ে কোনো সুবেশা তরুণ বা তরুণী একটি বেখাপ্পা ব্যাগ হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাহলে প্রায় নিশ্চিত ভাবেই বলে দিতে পারেন যে তিনি বরযাত্রী দলের লোক, বরের অত্যন্ত আস্থাভাজন এবং বন্ধুস্থানীয় হওয়াই সম্ভব (যদিও আমি ব্যাক্তিগত ভাবে কখনও কোনো সুবেশা তরুণীকে এই দায়িত্বটি নিতে দেখিনি তবু বিধিবদ্ধ উল্লেখ)। এখন প্রশ্ন, বরের আস্থাভাজন বা বন্ধু তো অনেকেই, তবে কার হাতে দেওয়া যাবে সেই ব্যাগ? এটাও আমি খেয়াল করে দেখেছি, যে মোটামুটি ভাল ধুতি পরাতে পারে, ধুতি-পাঞ্জাবি ভাঁজ করতে পারে, সে-ই এই ব্যাগটির অন্যতম দাবিদার হয়। এই ব্যাপারটিতে আমার কিঞ্চিৎ সুনাম আছে, ফলে অনেকবারই, এমনকি অনিচ্ছেতেও আমি এই জিনিসটি বহন করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। বন্ধু-বান্ধবদের বিয়েতে অত্যন্ত ‘দক্ষতার’ সাথে ব্যাগ সামলানোর পর, আমার দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নিয়ে সহধর্মিণির নির্দ্দিষ্ট শংসাপত্র থাকা সত্বেও, একবার আমার শ্যালকেরটি আমার হাতে এল। হাতে নিয়েই বুঝলাম ব্যাগটি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ভারী। কেন ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। ধুতি-পাঞ্জাবি ভাঁজ করে ব্যাগে ঢোকানোর সময় নজরে এল ভেতরে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট। বলা বাহুল্য, এটি অতিরিক্ত। এর আগে কখনও এই রকম কিছু চোখে পড়েনি। মনে হল মূল ব্যাগটির ওজন বাড়িয়ে তোলার জন্য এটির একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। জিজ্ঞাসা করলাম। সেইরকম কোনও উত্তর পেলাম না। বিয়ের ব্যস্ততা, আমিও ব্যাপারটা নিয়ে আর জোরাজুরি করলাম না। কিন্তু উৎসাহ এই পর্যায়ে ছিল আমি আমার স্ত্রী’র কাছেও ব্যাপারটি নিয়ে জানতে চেয়ে ফেললাম, এটা জেনেই যে তাঁর কোনও জিনিস ওইটির ভেতরে নেই, এমনকি তিনি গোছাননি পর্যন্ত। অর্থাৎ জানা তথ্যই আরেকবার জানা ছাড়া আর কোনও ফল হল না। বিয়ে মিটে গেল সঙ্গে ওই জগদ্দলটি নিয়ে আমার খাওয়া-দাওয়াও। রাতে থাকতে হবে। ব্যাগটি আবার খোলা হল। এবার প্রয়োজন একটি তোয়ালে আর রাত্রিবাসের। আবার দেখলাম সেই প্লাস্টিকের ব্যাগ। আবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম শ্যালকের দিকে

- কি আছে ওটাতে?

- সেরকম কিছু না

- না আমার মনে হচ্ছে ওটার জন্যই ব্যাগটা এত ভারী

মূল ব্যাগটা তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে গেল। বিরক্ত হলাম নিজের প্রতি। বলতে যে চাইছে না সেটা আগেই আমার বোঝা উচিত ছিল। এছাড়া অন্যের ব্যাগে কি আছে না আছে তাই নিয়ে এত কৌতূহলও কেমন একটা সৌজন্যবোধবিরোধী ঠেকল। যার ব্যাগ তাকে ঠিকমত ফিরিয়ে দিয়েছি ব্যস ল্যাঠা চুকে গেছে। শুরু হল বাসর। (প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, বাসর ব্যাপারটা আপামর বাঙালির জন্য নয়। আমাদের দুইদিকের পরিবারেই এর চল নেই, কিন্তু বর্তমানে মিশ্র সংস্কৃতির যুগে আমাদের খন্ড বাসর বা বাচ্চা বাসর ধরনের একটা জিনিস হয় মানে বাড়ির অন্যান্যদের চেয়ে একটু বেশি রাত পর্যন্ত সমবয়সীদের জেগে থাকা, ফলে আমি এবং আমার শ্যালক বাদে আমাদের দিকে কেউ ছিল না। তবে যাদের ঘরের মাঠে খেলা ছিল তারা স্বাভাবিক ভাবেই সংখ্যাগুরু ছিল) কিন্তু বেশিক্ষণ টিকল না। রাত তিনটে নাগাদ অন্য পক্ষের সৈন্য সামন্ত রণে ভঙ্গ দিয়ে দিতেই আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম ভাঙার পর বুঝলাম, সবাই উঠে গেছে তবে আমাদের কেউ বিরক্ত করেনি। দুজনেই উঠে বাথরুম ইত্যাদি সেরে আসার পর বসল চায়ের আসর। মোটামুটি মিনিট পাঁচেক বাদেই বুঝলাম, নতুন করে কেউ এই আসরে আসবে না। আগের দিন রাতে যে আট জনকে বাসরে দেখেছি তারা প্রত্যেকেই উপস্থিত। চায়ে চুমুক দিলাম। আমার চা খাওয়ার গতি একটু দ্রুত, চক্ষুলজ্জার খাতিরে সেদিন কমিয়ে রাখলাম। টুকটাক কথাবার্তা, তারপরেই প্রায় দৈববাণী নতুন বরের উদ্দেশ্যে – “ নাও বের কর টেন কে”। ঠাণ্ডা হতে চলা চায়েই আমি বিষম খেলাম। দু’একজন ‘আহা আহা’ করে উঠল। একজন আবার ফুট কাটল – “জামাইবাবুর জামাইবাবু বলে কথা”। সে মৃদু বকুনি খেল বড়দের কাছে, তার এই অস্থানোচিত মন্তব্যের জন্য। আমি মূল বিষয় থেকে সবার নজর ঘোরাবার জন্য বললাম – “কথাটা তো ঠিক”। ব্যর্থ হলাম। জিজ্ঞাসা করলাম – “এটা কি শয্যাতুলুনি?”

- হ্যাঁ

- ঠিক আছে। আমাদের শয্যা কাউকেই তুলতে হবে না। আমরা এই কাজে যথেষ্ট পারদর্শী। শয্যা তুলতে যদি টাকা লাগে তবে আমরা তুলে আমরাই টাকা নেব। ঘরের টাকা ঘরেই থেকে যাবে

বলেই আমি আমি চাদরে হাত দেওয়ার উপক্রম করতেই সকলে হাঁ হাঁ করে উঠল। একজন খালি অবিচলিত ভঙ্গিতে বলল – “শয্যা যেই তুলুক, টাকা আমরাই নেব”। এই চ্যালেঞ্জটা অপ্রত্যাশিত ছিল, গুটিয়ে আসতে হল। আবার সমবেত কন্ঠ – “কি হল? বের কর।” শ্যালকটি এবার মুখ খুলল – “কত চাইছ?”

- ওই যে বললাম টেন কে

- দেরি করলে কিন্তু আবার সময়ের দামটাও দিতে হবে

আরেকজনের কন্ঠনিঃসৃত বানী। অজান্তেই নিজের পাঞ্জাবির পকেটে হাত চলে গেল। এটিএম কার্ডটা জায়গায় আছে কিনা একবার দেখে নিলাম।

- নেই? তাহলে আমরা কেউ ধার দিচ্ছি। পরে শোধ করে দিও।

আবার সমবেত কণ্ঠে সম্মতি। এর চেয়ে অপমানজনক কথা আর কিছুই হতে পারে না। তবু হাসি হাসি মুখ করে শুনছি। নতুন বর পকেট থেকে চাবি বের করে ব্যাগের তালা খুললেন। আমি বেশ খানিকটা অবাক হলাম। কোনোরকম দরাদরি ছাড়াই……। ব্যাগ খোলা হল। সবার চোখ একদিকে। ব্যাগ থেকে বের হল সেই রহস্যময় প্লাস্টিকের প্যাকেট। এবার আমার সাথে অন্যান্যদের আর কোনও পার্থক্য নেই। নিজে নিজের মুখ দেখতে না পারলেও বেশ বুঝতে পারছিলাম আমার মুখের অবস্থা খানিকটা বিস্ময়, খানিকটা কৌতূহল মেশালে যে রকম হয়, অবশ্যই সেই রকম। এই সেই প্যাকেট, মনে হচ্ছিল একটা থ্রিলারের শেষে এসে পড়েছি। যাইহোক, প্যাকেট হাতবদল হল। আমিও তাকিয়ে কি বের হয় প্যাকেট থেকে। খোলা হল। প্যাকেট ভর্তি একতাল মাটি। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের নীরবতা। “এগুলি কি?”- আবার সমবেত স্বর।

- খুব সহজ। মহাপুরুষের বাণী। টাকা মাটি, মাটি টাকা। স্কোয়ার ফুট হিসেব করে টাকার অংক ঠিক করে নাও। থিকনেস ওয়ান এমএম। বিশুদ্ধ গঙ্গামাটি। দাম একটু বেশিই হবে।

 

কি বললেন? শেষ পর্যন্ত এতেই রফা হয়েছিল কিনা? না। মাটির বদলে কাগজেই রফা করতে হয়েছিল।

শয্যাতুলুনি বা মহাপুরুষের বাণী – যে যেভাবে নেয়
  • 4.00 / 5 5
2 votes, 4.00 avg. rating (80% score)

Comments

comments