এর আগের পোষ্টে বলেছিলাম, বর্ষাকালের প্রধান দুই অসুখ ঠান্ডা লাগা এবং পেটের অসুখ। আজকে আমরা আলোচনা করব পেটের অসুখ নিয়েই।

কেন হয়ঃ
মূলত রোটাভাইরাসের আক্রমনে ডায়রিয়া হয়, এখন অবশ্য শিশুদের জন্যে রটাভাইরাসের জন্যে রোটাটেক ভ্যাক্সিন দেওয়া হয় (৬ থেকে ৩২ সপ্তাহের মধ্যে), তবে এটি সম্ভবত অপশনাল ভ্যাক্সিন, তাই সরকারি হসপিটালে পাওয়া যায় কিনা আমার জানা নেই। রোটাভাইরাসের জন্যে হলে ৩ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যায় সাধারন ভাবে।

কি কি হয়ঃ
একদম শিশুদের ক্ষেত্রে বারে বারে পাতলা (জলের মত) পটি হতে থাকে, এর সাথে পেট ব্যাথা, বমি ইত্যাদিও থাকতে পারে। সাধারনতঃ পটিতে মিউকাস থাকে; তবে যদি রক্তের কনা দেখা যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত, না হলে এক-দুদিন দেখা যেতে পারে ঘরোয়া চিকিৎসাতে, তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ডিহাইড্রেশন না হতে পারে ( হিসি হচ্ছে কিনা, ঠোঁট শুকনো যেন না হয়, খুব বেশি ডিহাইড্রেটেড হয়ে গেলে, কান্নার সময়েও খুব কম জল বেরোবে এবং চোখের চারপাশ বসে যাবে ইত্যাদি)
সাধারনত আক্রান্ত হলে শরীর খাবার থেকে পুষ্টি শোষণ করতে পারে না, তাই খুব তাড়াতাড়ি বাচ্চা দুর্বল হয়ে যায়, ওজন কমে যায় এবং ক্লান্ত দেখায়।
যদি পটির রঙ সবুজাভ হয়, তাহলে তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।

ডায়েটঃ
১। মাতৃদুগ্ধঃ অসুস্থ শিশুর জন্যে মাতৃদুগ্ধের বিকল্প কিছু হতে পারে না, তাই যত সম্ভব মাতৃদুগ্ধ খাইয়ে যেতে হবে।
২। ও-আর-এসঃ সাধারনত দেহের জলশূন্যতা আটকাতে এটি ব্যবহৃত হয়, কোন প্রকার চিকিৎসা শুরু করার আগেই, ও আর এস চালু করতে হবে, যেকোনো গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এবং ওষুধের দোকানে শিশুদের ও আর এস কিনতে পাওয়া যায়, তবে যদি কিনে আনা সম্ভব না হয়, তাহলে ঘরে তৈরি নুন-চিনির জল খাওয়াতে হবে।
আধ লিটার ফোটানো জলে (২ই বড় গ্লাস জল), ৩ চামচ চিনি এবং ১/৪ চামচ নুন দিয়ে ভালো করে মেশাতে হবে, যতবার পাতলা পটি করবে, ততবার আস্তে আস্তে এই নুন-চিনির জল একটু একটু করে খাওাতে হবে। ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত ব্যবহার করা যায় একবার প্রস্তুত করার পরে, কিন্তু সাধারনত ১২ ঘন্টার বেশি না রাখলেই ভালো। জলের পরিবর্তে দুধ, ভাতের ফ্যান, জুস ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না।
৩। ডাবের জলঃ ডাবের জল দেওয়া চলতে পারে, পটাসিয়াম ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
৪। ডালের জলঃ ঘন ডাল না দিয়ে ডালের উপরের জল অংশ দেওয়া যেতে পারে, এতে প্রোটিন-ও শরীরে যাবে আর জলও।
৫। চিঁড়ে সেদ্ধঃ বাংলার ঘরোয়া টোটকা এটি। নিউট্রনকেও আমি দিয়েছি। অল্পও জলে একমুঠ চিঁড়ে সিদ্ধ হতে দিন, এবং নাড়তে থাকুন। মোটামুটি ঘন হয়ে এলে অল্পও দুধ দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন, স্বাদমত নুন-চিনি যোগ করতে পারেন। ৭/৮ মাসের বাচ্চাদেরও দেওয়া যেতে পারে, তবে এক বছরের ছোট বাচ্চা দের নুন-চিনি ছাড়া দেওয়া উচিত।
৬। আপেল সিদ্ধঃ আপেল ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে পিস করে কেটে কুকারে সিদ্ধ করে নিন, নুন-চিনি দিয়ে মেখে খাওয়ান।
৭। বেদানার রসঃ বেদানার দানা গুলি ছাড়িয়ে নিয়ে ব্লেন্ডারে মিশিয়ে নিন, ছেঁকে নিয়ে জুস অংশটা খাওআতে পারেন।
৮। ছানাঃ ছানা কাটানোর পাউডার বা ক্যালসিয়াম ল্যাক্টেট না থাকলে ফুটন্ত দুধে লেবুর রস/ ভিনিগার বা দই মেশালে আস্তে আস্তে ছানা কেটে যাবে; টক মিশানোর পরে দুধ ফুটতে দেবেন না, তাতে ছানা শক্ত ও রাবারি হয়ে যায়।
৯। দই/ ঘোলঃ ঘরে পাতা দই দেওয়া যেতে পারে, কারণ দইতে উপস্থিত ব্যাকটেরিয়া ডায়রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে। এক বছরের কম বয়সি হলে ডাক্তার কে জিজ্ঞেস করে নেবেন একবার। দই যেন খুব বেশি টক না হয়, দই না দিয়ে ঘোল দেওয়া যেতে পারে। ঠান্ডা লাগলে দই দেওয়া যাবেনা।
১০। পাউরুটিঃ সাদা পাউরুটি (ব্রাউন ব্রেড নয়!!) ভালো করে সেঁকে টোস্ট করে দেওয়া যেতে পারে, তবে মাখন/ঘি/জ্যাম না লাগানোই ভালো।
১১। কলাঃ ঠান্ডা লাগা না থাকলে কলা দেওয়া যেতে পারে, আদি ডায়েট পেটখারাপের।
১২। ভাত/ খিচুড়িঃ ভাত অথবা ভাত ডাল মেশানো পাতলা খিচুড়ি দেওয়া যেতে পারে। তবে আমরা বাঙালিরা খিচুড়ি বলতে ঘি/ গরম মশলা দেওয়া যে উপাদেয় পদটি বুঝি, এটি কিন্তু সেটি নয়। কোন রকম মশলা থাকবে না, ঘি নামমাত্র।
১৩। আলুসিদ্ধঃ WHO এখন পরামর্শ দিয়েছে, ডায়রিয়ার চিকিৎসার সময় জিঙ্ক সাপ্লিমেন্ট ওষুধ হিসেবে দেওয়ার জন্যে। সাধারনত জিঙ্কের প্রাকৃতিক উপাদান গুলো বেশিরভাগ আমিষ মানে ডিম/মাংস ইত্যাদি এবং সেগুলো পেট খারাপের সময় চলবে না, আলুও কিন্তু জিঙ্কের একটি সোর্স। আলুসিদ্ধ সামান্য নুন দিয়ে মেখে খাওানো যেতে পারে, যে সমস্ত শ্বেতসার দায়রিয়া চিকিৎসাতে সাহায্য করে আলু তাদের মধ্যে অন্যতম।
১৪। কাঁচকলা দিয়ে চারামাছের ঝোলঃ এটির স্মৃতি পেট রোগা বাঙ্গালিদের সবারি প্রায় আছে, নতুন করে বিশেষ কিছু লিখছি না।

কি কি খাবার চলবে নাঃ
১। ফ্রুট জুস, এমন কি আপেলের রসও চলবে না।
২। কোন রকম কোল্ড ড্রিঙ্ক চলবে না কারণ এমনিতেই ডায়রিয়াতে দেহের সোডিয়াম-পটাসিয়াম ভারসাম্যতা নস্ট হয়, তার উপরে এই ধরনের পানীয়তে অতিরিক্ত চিনি থাকে যা আরো বেশি ভারসাম্য নষ্ট করে।
৩। পেটের সমস্যা হলে দুধ না দেওয়াই ভালো, যদি দিতেও হয়, ফুল-ফ্যাট দুধ দেবেন না, ডাবল টোন্ড বা টোন্ড দুধ চলতে পারে।
৪। পালং বা অন্য শাক
৫। বাঁধাকপি বা অন্য যেকোনো ছিবড়ে জাতীয় সবজি।
৬। কিসমিস (এটি এমনিতেই পটি পাতলা করতে অর্থাৎ পিকুর বাবার সমস্যায় ব্যবহার করা হয়)
৭। আমন্ড বাদাম ইত্যাদি
৮। ঘি মাখন, চীজ ইত্যাদি
৯। কোনোরকম প্রিসারভেটিভ দেওয়া বা প্রসেসড খাবার
১০। বাইরের খাবার
যেহেতু বাচ্ছার হজমশক্তি কমে যায়, তাই বারে বারে অল্পও অল্পও করে খাওাতে হবে, বেশিরভাগ খাদ্যই যদিও শোষিত হয়না, কিন্তু খাবার চালু রাখা জরুরি, না হলে ওষুধ কাজ করবে না।
এ তো গেল আমার ফর্দ। বাংলা ফোরামএর পাঠকদের সবার ডায়রিয়ার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে, আমি নিশ্চিত, তাই একটু মনে করে আপনিও লিখে ফেলুন না, পেট খারাপের সময় আর কি কি খেতেন!!

শিশুদের ডায়রিয়া এবং তার প্রতিষেধক ডায়েট
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments