শীতকালটা বাঙালির জন্য বেজায় গোলমেলে। একদিকে ফেস্টিভ আবহাওয়া অন্যদিকে নাক ভর্তি কফ ! কালিপুজোর পর থেকেই বাক্স প্যাটরা খুলে মাফলার, মাঙ্কি টুপি বার করা , আরও কিছু দিন গেলে লন্ড্রি থেকে পুলোভার , সোয়েটার ইত্যাদি আনানো , ঠান্ডা বাড়লে ময়দান থেকে ভুটিয়া জ্যাকেট ও ধর্মতলা থেকে মরা সাহেবের কোট কেনা , লেপ কম্বল রোদে দেওয়া , বুলুপিসির বোনা শেষ হলে বুঁচকির দস্তানা টা পাইকপাড়া থেকে নিয়ে আসা। উফ একেই বোধহয় বলা হয় ‘শীতযুদ্ধ’ – তলে তলে সরঞ্জাম যোগার চলছে অথচ কেউ টের পাচ্ছে না। অরবিন্দ কেজরীওয়াল মাফলার জড়িয়ে কাশাকাশি করলে উত্তর ভারতীয়রা বেজায় হ্যাটা করে, উনি কলকাতায় কাশলে কিন্ত মা- মাসিমারা ‘আহারে বাছারে’ করে আরো এক প্রস্থ শীত বস্ত্র চাপিয়ে দিত , বলা যায়না ভিড়ের মধ্যে থেকে কোনো এক দাদু এসে হয়ত দু ফোঁটা ফেরাম ফস বা ব্রায়নিয়াও গিলিয়ে দিতে পারত । প্রসঙ্গত উত্তর ভারতে অবশ্য কাশলে পরে homeopathy ওষুধের মতন খেতে লাগা এক জাতীয় তরল পদার্থ আরো একটু বেশি পরিমানে গলায় ঢেলে দেওয়া হয়।

আমার মতন কয়েক জনকে বাদ দিলে বাঙালি শীতকালে একটু সেন্সিটিভ ও ভিতু প্রকৃতির হয়ে যায়। সেনসেটিভ মানে কিন্ত আবার সেন্সেবেল নয়, শীতের জায়গা বেড়াতে গিয়ে প্রকৃতির বিরল শোভা না দেখে কেউ কেউ বাসে , প্ল্যাটফর্মে , হোটেলে নিজের বাড়িতে ফেলে আসা ঘিয়ে রঙের উলিকটের গেঞ্জি খুঁজতে গিয়ে বাকি সব্বাইকে বিরক্ত করে সেই পরিবারের আনা গোটা আষ্টেক লাগেজ একে একে ঘেঁটে বেড়ায় । এমনিতেই মধ্যবিত্ত বাঙালি ক্লাস বজায় রাখতে ইংরেজদের কমবেশি অনুকরণ করে থাকে, শীতকালে তাদের এই জন্মসিদ্ধ প্রবণতাটি কিঞ্চিত বেড়ে যায় বললেই চলে। টিফিনে লুচি আলুর দমের জায়গায় sandwich , চমচমের জায়গায় প্যাস্ট্রি কিম্বা লাল চায়ের বদলে এসপ্রেসো কফি ! খ্রীষ্টমাসে কেক হওয়াটা যেন সংক্রান্তির পিঠে বানানোর থেকে বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে, আর হবেই না বা কেন, সব মিশিয়ে মেশিনে চাপলেই কেক তৈরী আর পিঠে তৈরী মানে সেই তো ছোটমাসি কে ভুলিয়ে ভালিয়ে ডেকে আনতে হবে, সক্কাল সক্কাল বাজার করতে হবে, কাজের মেয়েটাকে সারা দিন থাকার কথা বলতে হবে। এখন অবশ্য কেক বা পিঠে দুটো দোকানই থেকেই আনা হয়ে থাকে কেননা চাল, দুধ , নারকেল, ঘি, গ্যাস, নিজেদের ও ছোটমাসির সময়ের দাম হিসেব করলে পাড়ার দোকান থেকে কেনাটা অনেক বুদ্ধিমানের কাজ।

তবে যে যাই বলুক আমাদের ছোটবেলা ঘিরে শীতের একটা আলাদা আমেজ ছিল , একটা স্তব্ধতা জড়ানো মন আনচান করা সময় হাতছানি দিত। শীতকালে মা কাকিমাদের উলবোনা, কমলা লেবু , ছাদে বই পড়তে পড়তে রোদ পোহানো , অচেনা দলে ভিড়ে গিয়ে ক্রিকেট খেলা , বাগান কিম্বা ছাদ ভর্তি ফুলের টব , চিড়িয়াখানা , বেড়াতে যাওয়া, মামারবাড়ি,পিকনিক , বইমেলা, ঘুড়ি উড়ানো ও সরস্বতী পুজো। একটু বড় হলে পরে সাইকেল চালিয়ে গঙ্গার ধারে মাফলার খুলে সিগারেট খাওয়া পাছে তাতে গন্ধ হয়ে যায় ও চাঁদা করে চপ মুড়ি সহকারে কাকার চা। আরেকটু বেড়ে উঠলে মসজিদের পাশে গরুর কাবাব দিয়ে পরঠা , রেল লাইনের ধারে হাড়িতে করে বিক্রি করা শুওরের মাংশ ও রুটি – একেবারে সেক্যুলার মেনু। পয়সা থাকলে বার-এ দু পেগ না থাকলে হাফ পাইন্ট বাংলা – এবারে এলিট ও subaltern সংস্কৃতির মেলবন্ধন।দেখবেন শীতকালে বাঙালি তরুনেরা গান শোনে বেশি ও যুবকেরা প্রেম করে। আপামর সমাজে বাওয়াল বাট্টা কমে যায় ও ভালবাসা আকাশে বাতাসে উড়ে বেড়ায়, একটা বৃহত্তর ভালবাসা স্থলের প্রানীদের টেনে নিয়ে জলের মধ্যে হাবুডুবু খাওয়ায় !

তখন ইস্কুলে পড়ি , এই শীতের কালেতেই একা একাই গেছি বইমেলা দেখতে। রাস্তা পেরোচ্ছি , হটাত এক গাঁজাখোর আমাকে ধর্মতলার মোড়ে হাত চেপে ধরে চাপা গলায় জিগ্যেস করলো , “”যারা যতখানি বোঝে , তারা কি ততখানি খোঁজে?” কচি বয়েস , ক্লাসে বা কুইজে হরদম এরকম প্রশ্ন শোনা যায়না তাই উত্তর দিতে গিয়ে নিজেই খানিকটা হকচকিয়ে গেলাম। ও বাব্বা , কিছু বোঝার আগেই দেখি পাশ দিয়ে চলে যাওয়া ট্রামে চাপা একটা লুঙ্গি পড়া ছোকড়া দাঁত কেলিয়ে আমার ব্যাকপকেট থেকে তোলা মানিব্যাগটা নেড়ে নেড়ে দেখাচ্ছে। সেই গাঁজাখোরটা তখনও আমার পেছনে দাড়িয়ে, ঘাড় ঘোরাতেই মুচকি হেসে বলল , “যারা যত কম জানে তারা তত কম মানে !” পয়সাকড়ি বিশেষ ছিল না, এই ২২ কি ২৩ টাকা হবে সব মিলিয়ে, ১২ বা ১৩ হলেও হতে পারে, তবে চামড়ার পার্সটা শিয়ালদা থেকে ৫ টাকায় দর দাম করে কেনা ! সেটার দুঃখ আজও জানি কেমন থেকে থেকে মনের ভেতরে হুজ্জুতি করে ও ব্রেনের পেছন দিকটা খামছে ধরে। এক দলছুট শাবকের মত এদিক সেদিক চেনাশোনা লোক খুঁজে বেড়াচ্ছি, এমন সময় এক চাচা বোধহয় আমার অবস্থাটা বুঝতে পারল, সদ্যস্নাত পাক সফেদ পোশাক পরিহিত ভদ্রলোক ভাঙ্গা হিন্দি আর টুটা বাংলা মিলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বেটা , কোনো মুশকিল?” আমি মাথা নাড়লাম। সে মুচকি হাসি দিয়ে আবার বলল, “পিকপকেট হয়েছে? বুকফেয়ার যাবে?” মনে হলো এরা সব শালা এক সাথে চক্রান্ত করেছে , মা সকালেই বলেছিল একা একা যাস না। চোখে জল চলে এলো প্রায়! জানিনা কেন ঠিক তখনই সেই ফেরিস্তার মত সাদা চাচা পকেট থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট্ হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, “কোই বাত নেহি বেটা , দিল ছোটা নেহি করতে। ‘মনপসন্দ’ কিতাব খরিদ লেনা, আউর এক নয়া মানি ব্যাগ ভি লে লেনা। ” আমি সেদিন সটান বাড়ি ফিরে এসেছিলাম, বইমেলা আর ঢুকিনি পাছে ওই টাকাটাও চোট যায়। পরের বছর যখন বইমেলা গেছিলাম সেই চাচাকেও দেখতে পাইনি আর কোনো বইও কিনিনি। সেই টাকা দিয়ে সাঁটিয়ে নিজামের কাবাব পরোটা খেয়েছিলাম আর মা’র জন্যে হালফ্যাসনের জুটের হ্যান্ডব্যাগ কিনেছিলাম । নিজের জন্য মানিব্যাগ আর কোনদিন কেনা হয়নি কেননা টাকা ও সে সংক্রান্ত নিরাপত্তাহীনতা ব্যাপারটাকে সেই ঘটনার পর থেকে আমি আর একটা চামড়ার ব্যাগের মধ্যে বেঁধে রাখতে চাইনি।

এবার শীতে পারদ নামলেও মানুষের মুখে আর সেই প্রছন্ন ভালো লাগাটা কেন জানি আর খুঁজে পাচ্ছি না। কেউ টাকা ধার করেছে , কেউ ধার দিয়েছে, লোন, ছেলের ভর্তি, স্ত্রীর অপারেশন , কোমরে ব্যথা , কাজের লোক, টার্গেট , মেনটেনান্স এসব তো লেগেই আছে। তার ওপর আবার শালিদের জন্য পিকের টিকেট কাটা , শাশুড়ির বাতের ওষুধ জোগার , বাবার constipationটা বেড়েছে , বস বলেছে, ” আর একদিনও ছুটি নয়!” ,কিন্ত বউ বলছে , ” আর ভালো লাগছেনা। চল সপ্তাহ খানেক কোথাও একটা বেরিয়ে আসি। ” এই জন্যে হিমালয়ে শালা সারা বছর শীত, কোনো অফিস নেই, বাড়ি নেই, বাস নেই, ট্রেন নেই এমনকি কোনো কিছুর ওপর কোনো ট্যাক্স নেই ! ওখানে চমরী গাই হয়ে জন্মানও ভাগ্যের ব্যাপার। আসলে বাস্তব পরিস্থিতি এতটা খারাপও নয়, আমরা এরকম করে রেখেছি । খোদ শহরে বসে নিজেকে হিমালয়ে আছি ভাবলেও অনেকটা শান্তি পাওয়া যায়। বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোর কলরব দেখলে মনটা শান্তি পায়। কেন্দুলিতে বাউলদের রাতভর গান শুনলে মনে হয় সময় থেমে গেছে, একতারাটা বলছে ,যা লোটার লুটে লে রে পাগলা। আমি জানি শীত ফুরোলে আম গাছে মুকুলগুলো ঠিক ধরবে , নতুন গাছে নতুন পাতা লাগবে । আমাদের এই কল্লোলিনী শহরে ফুল ফুটিয়ে ঘাম ছুটিয়ে শীত শেষে আবার বসন্ত এসে জুটবে।

শীত সংক্রান্তি
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments