ডানলপ থেকে বি টি রোড বরাবর উত্তর দিকে এগিয়ে গেলে একটা জায়গা কামারহাটি। আরও উত্তরে এগোলে ব্যারাকপুর। এই দুটি স্থানের মধ্যে বেশ কিছু পকেট ভীষণ ভাবেই পুরুষতান্ত্রিক। এতটাই যে দৈবাৎ কোনও মহিলা, তা সে যে বয়সেরই হোক না কেন সামনে এসে পড়লে, হয় এড়িয়ে চলে অথবা এমন ভাবে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যায় যে মনে হয় বস্তুটির কোনও অস্তিত্ব নেই। আসলে এই বেলা এগারোটা সোয়া এগারোটা নাগাদ ওখানে ভদ্রলোকের ভাষায় কিছু লাথখোর জুটে থাকে। স্কুল-কলেজ পালানো বখাটে ছোকরা, কোনোভাবে ডোর টু ডোর সেলসের চাকরি জুটিয়ে হাতখরচ তোলা সেলসম্যান, আশেপাশের ফ্যাক্টরির লেবার-হেল্পার, লরির ড্রাইভার-খালাসি এদের ভিড়। তবে সমাজের কোন অবস্থান থেকে কে এসেছে সেটা এখানে একেবারেই বিবেচ্য নয়। একটাই প্রশ্ন ‘ক’টা সিন আছে?’

তো শুক্কুরবারের বারবেলায় এই প্রশ্নটার উত্তর কার-ই বা জানা আছে ওই জমায়েতের মধ্যে? আজকেই তো প্রথম শো। আর অভিজ্ঞজনেরা জানে লবিকার্ড নেহাতই শো কেস। ওতে যা আছে তা পর্দায় আছড়ে পড়বে এমন কোনও নিশ্চয়তা তো নেই। কাজেই ‘কে জানে’, ‘মনে তো হচ্ছে ভালই আছে’, ‘আজ তো শুক্রবার’, ‘গত সপ্তাহে তো ভাল ছিল’ এই সব উত্তরই ভেসে বেড়ায়। কেউ কেউ আবার ‘ওইখানে ভাল সিন থাকে’ আউড়ে উদাস মুখে অন্য গন্তব্যের দিকে রওনা দেয়।

যত লাখ টাকার প্রশ্নই হোক না কেন এই ‘ক’টা সিন আছে?’ তার উত্তর পেতে কিন্তু লাগে খুব বেশি হলে মেরেকেটে পাঁচ টাকা। সেইটুকু খরচ করে প্রায়ান্ধকার ঘরে ঢুকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষার মাঝেই পুরো অন্ধকার হয়, কাঁপা কাঁপা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সহযোগে যা শুরু হয় তার প্রতি চেয়ারে কিংবা আরও বেশি দেখার ইচ্ছে নিয়ে একেবারে সামনে মেঝেতে উপবিষ্ট জনগণের যে বিশেষ একটা উৎসাহ নেই তা তো বলাই বাহুল্য। সুতরাং আয়েশ করে খৈনি ঝাড়ার আওয়াজ এবং বিড়ির গন্ধ উপস্থিত অন্যান্য কিছু বিশেষ গন্ধের সঙ্গে মিশে যখন উপযুক্ত অ্যামবিয়েন্স তৈরি করে ফেলে ভুলিয়ে দেয় মাথার ওপরে ফ্যানগুলো কর্তব্য রক্ষার তাগিদেই গোঁ গোঁ শব্দ করে শুধু ঘুরেই যাচ্ছে আর তারপরেই তুমুল একটা বিদ্রোহ শুরু হওয়ার ঠিক আগের মূহূর্তে দুই বিপরীত লিঙ্গ ঘনিষ্ঠ হয়, পাবলিক খৈনির পিক ফেলতে ভুলে যায়, বিড়িটা ঠোঁট পর্যন্ত পৌছনোর আগেই হাতটা স্থির হয়। অনেকটা যেন ‘গুড়্ গুড়্ গুড়্ গুড়িয়ে হামা খাপ পেতেছেন গোষ্ঠ মামা’। অকস্মাৎ পর্দায় রং বদল হয় তার সাথে ওই কাঁপা কাঁপা মিউজিককে প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বিদেয় করে ঝিনচ্যাক-এর প্রবেশ। পর্দা জুড়ে বিচিত্র গোলাপি কিংবা আকাশি রংয়ের উর্ধাঙ্গ অনাবৃত কটিবাস সম্বল স্নানরতা মেদবহুল নারীর উন্মুক্ত দ্বিস্তর পৃষ্ঠ প্রদর্শন। এরপর সেই রমণী যেই সামনের দিকে ফেরার উপক্রম করেছে অমনি কম্পিত মিউজিক বীর বিক্রমে হারানো সিংহাসন পুনরুদ্ধার করে গাছের পাতার ফাঁকে, পাহাড়ে বা সমুদ্রে সুর্যোদয় ঘটিয়ে ফেলল। এবং বাণটি যে আসলে গোষ্ঠ মামার বুক তাক করেই ছুটে আসছে বুঝতে পেরে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটু আগেই মুলতুবি হয়ে যাওয়া বিদ্রোহটি পুরোদমে শুরু হয়ে গেল।

বিদ্রোহ সশস্ত্র হয়ে ওঠার আগেই পেছন থেকে শোনা ভেসে এল আশ্বাসবাণী – ‘আরে, সবে তো শুরু হল, আছে, আছে। চুপ করে দেখে যাও, আরও আছে’। এই অভয় সত্ত্বেও সময় সময় বিপ্লব অহিংস থাকতো না আর তাতে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র অনেকটাই ছিল ইউজ অ্যান্ড থ্রো জাতীয় অথবা আসলে উল্টোটা। একবার ব্যবহারের পরেই এইসব অস্ত্রগুলির জীবনের অবশিষ্ট সময় সচরাচর গুদোমে পরিণত হওয়া ব্যালকনিতে অনাদরেই অতিবাহিত হত।

যাই হোক, এভাবেই আরও কয়েকটা তাপ্পি দেওয়া ওই আকাশি বা গোলাপি স্নানদৃশ্য এবং জাপটাজাপটি (সময় বিশেষে যা মূলত ধস্তাধস্তির সামিল) শেষে একসময় অন্ধকার ঘর আবার প্রায়ান্ধকার ঘরে পরিণত হতেই অতি সন্তর্পণে দেওয়াল এবং মেঝে দুটোকেই একই সঙ্গে সমান দক্ষতায় সামলে হাতের নীল কিংবা সবুজ রংয়ের ছোট্ট চিরকুটটাকে পাকিয়ে দাঁত, কান খোঁচাতে খোঁচাতে আবার সত্যিকারের সুর্যের আলোতে চোখ সইয়ে নেওয়া, একটা অভ্যাসের মধ্যেই চলে আসে ধীরে ধীরে। তবে ওই শুক্রবার, খুব বেশি হলে শনিবার। কারণ জনমানসে সাধারণ ধারণা তারপরে আর সিন থাকে না, মুখপোড়া হল সব কেটে দেয়। এহেন ধারণার উৎস খুব সম্ভবত কিল খেয়ে হজম করে অন্যকে কিল খাওয়ানোর ইচ্ছে। আবার হলের চরিত্রও একটা বড় ব্যাপার ছিল। রেগুলার শোতে ‘গণশত্রু’ চললে এমনকি শুক্রবারেও সেখানে দুপুরে ভীড় হওয়ার যে কোনও সম্ভাবনাই সুদূর পরাহত ছিল। 

দিন খুব মন্দ কাটছিল না এভাবে। সেই ‘জওয়ানি ষোলা সাল কি’-র ঢেউয়ে ভেসে আসা ‘মচলতি জওয়ানি’, ‘শিশকতি জওয়ানি’ জাতীয় জওয়ানি সিরিজ ছাড়াও অসংখ্য ছবি, এমনকি ‘বেসিক ইন্সটিংক্ট’, ‘স্লিপিং উইথ দ্য এনিমি’ মায় ‘ডাবল ইম্প্যাক্ট’, ‘টার্মিনেটর’ এরাও ঢুকে পড়ল এই দলে। ইংরিজি বইতে সিন বেশি থাকে!! সিল্কস্মিতা থেকে শুরু করে জুলিয়া রবার্টস হয়ে অনামী অঙ্গনা সবাই একই প্ল্যাটফর্মে। হোয়াটস ইন আ নেম? কে জানে তোমার নাম কি, আগে পরে কখনও দেখেছি কি দেখিনি তাই বা কে জানে!!! কাজেই অ্যাকাডেমি পাও আর যাই পাও ‘ক’টা সিন আছে’ এই হল একমাত্র নিক্তি।

তবু রইল না রাজ্যপাট। অবিশ্যি শেষ যে এগিয়ে আসছে বোঝা গিয়েছিল সেইদিন, যেদিন স্বঘোষিত কিছু নীতিবাগীশ আলকাতরার বালতি আর শনের ব্রাশ নিয়ে পোস্টারের মেয়েদের ব্লাউজ আর পেটিকোট পরানোর স্বনিযুক্তি প্রকল্পে নাম লেখালো। একটু সন্দেহ হলেই ব্যাগ চেকিং শুরু হল, আস্তে আস্তে নুন শো খ্যাত সিনেমাহলগুলিতেও শুরু হয়ে গেল এইসব উপদ্রব। এতদিন ছিল পোস্টারে, এখন লবিকার্ডেও লাগল সুসংস্কৃতির দখিনা পবন। আর দখিনা পবন যে শুধু মনে প্রেমের আকুলিবিকুলি জাগায় তা নয়, সঙ্গে চিকেন পক্সের জীবাণুও বয়ে আনে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয়টি হল। লোকে কি দেখে হলে ঢুকবে? শো কেসেই যদি ঝাঁপ ফেলে দেওয়া হয়? এর সাথে যুক্ত হল পূর্বোল্লেখিত অঞ্চলে একের পর এক কলকারখানার তালাপ্রীতি। অতএব রিক্ত বাগিচা, শূন্য উঠোন। শেষ পেরেক পুঁতে দিল হাতের মুঠোয় ভিডিও চলে এসে।

একটি শব্দবন্ধ তার চরিত্রসমেত চত্বর থেকে চিরতরে লোপাট হয়ে হল। যদিও আজকের দিনেও তার প্রতাপ টের পাওয়া যায় যখন দেখি সবেধন নীলমণি ব্যারাকপুরের মাল্টিপ্লেক্সটিতে মর্নিং শো চলে কিন্তু নুন শো চলে না।

শূন্য প্রাণ কাঁদে সদা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments