ছেলেবেলা থেকেই বড় একটা ঝোঁক ছিল না তার কেনাকাটার দিকে। একটি মাত্র জিনিস কেনার জন্যে সে বড় ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারত, দিন সপ্তাহ, মাসের গন্ডি ছাড়িয়ে বছরে পা ফেলত, তবু হাল ছাড়ত না, কোনও না কোনও সময়ে ঠিক কিনেই ফেলত। এখনও হয়ত পারে। সভার মতে সে বড় অকাজের জিনিস। কাজের জিনিস সে না চাইতেই যা পেত, তাতেই চলে যেত অনেকদিন। অনেকবার বলার চেষ্টা করেছে তাকে যেন সেই জিনিসটাই উপহার দেওয়া হয় যেটা তার আদত কাজে লাগে। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। প্রায় কেউই তার কথায় কান দিত না। এমনকি একদিন যাদের জন্যে সেইসব অকাজের জিনিসের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তারাও যখন মুখ ফিরিয়ে নিল তখন নিজের ওপরেই ভরসা করে থাকা একমাত্র উপায় হিসেবে বেছে নিল সে। তবু তুমি যাও বঙ্গে, কপাল যায় সঙ্গে। একদিন না একদিন তাকে ফাঁদে পা দিতেই হল। কেজো জিনিস কেনাকাটায় নাম লেখাতে হল।

ঐ যে কাজের জিনিস কেনাকাটা, তার সঙ্গে তার প্রথম আলাপ কার্যত একা থেকে দোকা হওয়ার বাসনা থেকেই সৃষ্টি। কুঁজোরও তো চিৎ হয়ে শোওয়ার সাধ জাগে। এই ছেলেটির মনেও একইরকম ইচ্ছে জেগে উঠল তার বিয়ের পরে প্রথম পুজোতে। নববিবাহিতা স্ত্রীকে, বিশেষ কিছু নয়, একটি শাড়ি, তবে সে শাড়ি যেন হয় অন্যতম সেরা, কিনে দিতে সে উতলা হয়ে উঠল। শাড়ি সে বিস্তর দেখেছে, একেবারে পাতে না দিতে পারার মত পাতি না হলে অপছন্দ হয়েছে এইরকম কখনও ঘটেনি। এত এত শাড়ি পরে কলকাতা শহরে মহিলাকুল ঘুরে বেড়াচ্ছে সে তো কেউ না কেউ কিনছেই। অনেক চিন্তাভাবনা করে শেষ অবধি সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূরে সরিয়ে এই নতুন ভেঞ্চারটিতে নাম লিখিয়ে ফেলল। তবু প্রথম পদক্ষেপ – একেবারে আনাড়ির মত পা ফেললে বিপদ হতে পারে অতএব ভেঞ্চারটি অচিরেই জয়েন্ট ভেঞ্চারে পরিণত হল।

কোনও এক শনিবার, বিকেল বেলা কলেজস্ট্রিটের মোড়ে ছেলেটির সাথে তার স্ত্রীর দেখা হল। শুভস্য শীঘ্রম, সময় নষ্ট না করে সরাসরি ঢুকে পড়ল একটি শাড়ির দোকানে। মেয়েটি আত্মহারা, ছেলেটির চক্ষু চড়কগাছ। কাউন্টার থেকে প্রথম তিন টিয়ারে তিলধারণের জায়গা নেই, তা সত্বেও, মারধোর খাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে ছেলেটি মেয়েটির পিছু নিয়ে কলকাতা শহরতলীর লোকাল ট্রেনে যাতায়াত করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্বল করে সেই চক্রব্যূহ ভেদ করে কোনও রকমে তার স্ত্রীর পাশে এসে দাঁড়াল। চারিদিকে ‘ওইটা ওইটা, উঁহু ওইটা নয়, ও-ও ই যে ওইটা’, ‘দাদা একটু দেখি’, ‘আচ্ছা এইটার অন্য কোনও কালার’ – এইসব নানাবিধ শব্দবন্ধের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থিতু হতে না হতেই এক মহিলা কণ্ঠ – এইটা দেখো তো, ভাল লাগছে? – শুনে তাকিয়ে দেখে – কখন থেকে বলছি তোমায়, শুনতে পাচ্ছ না – কি করে আর বলে নিজের বৌয়ের গলার আওয়াজ বোঝার মত অবস্থায় আর সে নেই, তবু ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলতেই হল – বাঃ বেশ ভাল লাগছে। ‘আচ্ছা এইটা?’ ‘হ্যাঁ, এইটাও ভাল’ – আশা, সে ভাল বললে তার অর্ধাঙ্গিনী সেটি নিয়ে নেবে, কিন্তু হায় – আরও একটি শাড়ি তুলে – এইটা দেখো তো। সব ক’টি শাড়িই তার বৌকে খুব মানাচ্ছে এইটা আশেপাশের মানুষজন কিভাবে নেবে তার চেয়েও বড় কথা তার স্ত্রীর মনে এইরকম একটা সংশয় জেগে উঠতে পারে যে সে আদৌ এই শাড়ি কেনা নিয়ে সিরিয়াস নয়, ‘চল দুজনে মিলেই যাই নাহয় শাড়ি কিনতে’ এইসব কথা নেহাতই কথার কথা। ফলত দুয়েকটা শাড়ি সম্বন্ধে তাকে এক্সপার্ট কমেন্ট দিতেই হল – নাহ্, এটা তেমন ভাল লাগছে না। এবং অবাক হয়ে লক্ষ্য করল তার স্ত্রী তার পছন্দের ওপর বিশেষ ভরসা না করতে পারলেও অপছন্দের ওপরে দিব্যি ভরসা করে।

একটা সিগারেট খেয়ে এলে কি ভাল হত ? পেছন দিকে তাকিয়ে সে আশাতেও জলাঞ্জলি দিতে হল, বের হলে তো হবে না আবার ঢুকতেও হবে, কাজেই থাক…… একেবারেই না হয় বেরিয়ে দেখা যাবে। পিঠের ওপর উঠে আসা সব রকম চাপ সামলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হাতের ঘড়িটার দিকে চোখ পড়তেই দেখল ঘণ্টাখানেক ইতিমধ্যেই কাবার হয়ে গেছে। যাবতীয় সৌজন্য বিসর্জন দিয়ে, সবরকম অনাগত বিপদের সম্ভাবনাকে মন থেকে তাড়িয়ে দিয়ে সমস্ত শাড়িতেই তখন তার বৌকে মেনকা, উর্বশী, রম্ভার ককটেল মনে হতে শুরু করে দিলেও, ঐ যে অপছন্দ একতরফা হলেও চলবে, পছন্দ দু’তরফা হওয়া চাই। এইভাবেই এগোতে এগোতে –এটা তো বেশ ভাল, আর পারা যাচ্ছে না – পর্যন্ত পৌঁছে মির‍্যাকল। তার পছন্দ বৌয়ের পছন্দের সাথে মিলে গেছে, লাফিয়ে উঠতে গিয়েও আশেপাশে একবার চোখ বুলিয়ে কোনওক্রমে নিজেকে সামলে নিল। ‘দাঁড়াও ভাল করে দেখে নিই’ – ম্যাডামের অনুরোধে শাড়ি ভাঁজমুক্ত হল – এ কি! এখানে তো ফেঁসে আছে, ইস এত ভাল শাড়িটা

 

- নিয়ে নাও, ওটা তো ভেতরের দিকে পড়বে, আর এমন কিছু বেশিও নয়, একটুখানি, রিফু করিয়ে নিও

শোনা ঘটনা
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments