শ্রেয়া,

কেমন আছিস জানি না। বোধ হয় ভালোই আছিস। বহুদিন কথা হয় নি। কালকে বইগুলোর ফাঁকে তোর দেওয়া নিউ ইয়ারের কার্ডটা পেতেই অতীতটা যেন মনে ভিড় করে এলো। কোন কার্ডটা তা বলতে পারব না, বোধ হয় সবচেয়ে পুরনোটাই। হ্যাঁ, সবচেয়ে পুরনোটাই। আসলে ভাবি নি এত দিনের পুরনো জিনিস এখনও থাকতে পারে। বেশির ভাগ জিনিসই তো কেমন করে যেন হারিয়ে যায়! নিল খামের উপর অল্প কিছু ধুলো আর ঝুল লেগে ছিল, কিন্তু চিনতে অসুবিধে হয় নি। খামটা একই রকম আছে, জীবনের ধূসরতা যেমন তার নীলিমা কমাতে পারেনি, সময়ের কঠিন আঁচড়েও তেমনি তার কাগজের কাঠিন্য কমেনি। কার্ডটা দেখতে কেমন ছিল সেটা মনে ছিল, কিন্তু কি লেখা ছিল মনে ছিল না। কার্ডটা খুলে দেখলাম।

এখন সন্ধ্যেবেলা, মা রান্না ঘরে,  নতুন ফ্ল্যাট কেনার উপলক্ষে কালকে বাড়িতে খাওয়া দাওয়া আছে, তারই জোগাড় যন্ত্র করছে। বোন বেশ কিছুক্ষণ ধরে ফেসবুকে বসে আছে । ও এখন বায়োলজিতে অনার্স করছে, সেকেন্ড ইয়ার। বাবা ঘরে নেই, তুই হয়তো জানিস না বাবা চার বছর আগে মারা গেছে, স্ট্রোকে।

থাক সে কথা আজ।

আমি বসে আছি ভেতরের ঘরের মেঝেতে, শুধু বইয়ের তাকের টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে। আবছায়াময় ঘরে বারান্দা থেকে এসে পরছে নিওন আলোর টুকরো। আনমনা ভেজা কাপর গুলো উড়ছে হাল্কা হাওয়ায়। খুব বেশি না, অল্প। মা কিছুক্ষন আগেই বারান্দার রকিং চেয়ার থেকে উঠে রান্নাঘরে গেছে, চেয়ারটা এখনও দুলে চলেছে, ধীরে ধীরে। আমাদের আগের বাড়ীতে ঝিঁঝিঁর ডাক শোনা যেত। কিন্তু এখানে আর ঝিঁঝিঁ কোথায়? থাকলে বোধহয় ভালই হোতো, পরিবেশটা একটু রোম্যান্টিক হতে পারতো, আগের মত। তবে এখানে সন্ধ্যার দিকে বাদুড় উড়ে বেড়ায়, ভালোই লাগে দেখতে, আগের মতই, তবে একা একা।

দেখে অবাক লাগলো তুই কার্ডটার ভেতরে কিছুই লিখিস নি। শুধু তোর নাম আর আমার নাম। আরও অবাক লাগলো এই ভেবে যে, আগে আমার এতে কিছু মনেও হয় নি। লিখতে তো পারতিস কিছু, ডিয়ার বা উইথ লাভ! জানি, জানি, আমিই আগে মানা করতাম, ন্যাকা ন্যাকা লাগে। তবুও; লিখতে পারতিস। কার্ডের সাথে দেওয়া তোর সো-পিসটা ভেঙ্গে গেছিলো, তোকে তখন বলি নি। সেবার যখন বাড়িতে এসে দেখেছিলি নেই তার আগেই ঘটেছিলো, কিন্তু আপনি তো আপনি! তাই আমার বলার আর সাহস হয় নি। তাই বলেছিলাম আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখেছি। ভয় পাওয়ার মতই ছিলি তুই।

আমি এখনও একাই আছি। তুই কেমন আছিস? জানি চিঠিটা তুই পড়বি না। তবুও লিখছি, জানি না, কোনো ভাবে যদি পড়িস! 

তোর পরে অনেকের সাথেই দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, কিন্তু বেশিদূর এগোই নি, বোধ হয় এগতে পারি নি, কে জানে? তুই বোধ হয় ঠিকই বলতিস আমি একটু ভিতু গোছের। হয়তো সাহস হয় নি! মাও এখন আর বিশেষ কিছু বলে না। এগোই নি বলাটা বোধ হয় ভুল হবে, হয়তো এগোতে পারি নি! ভালো লাগে নি!

 

ছেড়ে না গেলেই পারতিস।

আমি এখনও ছবি আঁকি। কয়েক মাস আগে একটা এগজিবিসনও করলাম, সীমা আর্টস গ্যালারিতে, তোর তো নিশ্চয়ই মনে আছে। মনে হল লোকের খারাপ লাগে নি। কিছু কাজের অফারও পেয়েছি, পোর্ট্রেট বাদে। হ্যাঁ, পোর্ট্রেট আঁকা ছেড়ে দিয়েছি, ভালো লাগে না এখন আর। প্রতিকৃতি গুলোকে দেখতে কেমন যেন একা একা লাগে। বিশেষ করে সিঙ্গেল পোর্ট্রেটগুলো। কে জানে কেন! ছাড় ওসব কথা। তুই হয়ত শুনে খুশি হবি, গখের প্রতি ভালোবাসাটা আমার বেড়েছে, তবে সাল্ভাদর ডালি এখনও প্রিয়। ডালির ছবির যে বিশেষত্ব আছে তা অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এগজিবিসনে তোর পর্দায় ঢাকা ছবিটাও রেখেছিলাম। স্টুডিওতে  গোধূলি বানানোর আইডিয়াটা ভালোই ছিল তোর। ছবিটা দেখে মনেই হয় না যে, ভর দুপুরে জালনায় পর্দা টেনে বানানো নকল গোধূলির সেটের অনুকরণ ওটা। সুন্দর লাগছিল তোকে কিন্তু। দরজার পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছিস তুই, আবছায়াময় গোধূলির আলো এসে পড়েছে মুখে আর কাঁধে। সদ্য স্নাত চুলে তখনও হাল্কা জলের রেশ। তাকিয়ে আছিস আমার দেওয়া কলমটার দিকে। দেখে মনে হচ্ছিলো মাত্র কয়েকদিন আগের ছবি।

সত্যি! কতদিন দেখা হয় নি তোর সাথে। বুঝতেও পারি নি এতদিন কেটে গেছে। দেখা হলে আমায় চিনতে পারবি? অন্ধকারে শুধু ছুঁয়ে পারবি বুঝতে আমাকে, আগের মতো? তুই ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে বাড়িতে আর বেলি বা বকুল ফুল নিয়ে আসি না, আর এখন তো চাইলেও সম্ভব না। কিন্তু রজনীগন্ধার উপর ভালোবাসাটা যেন তারপর থেকে হঠাৎ বেড়ে গেছে। মাঝে মাঝে বাড়িতে আনি, মা মানা করে যদিও; তবুও আনি। ওটা নাকি অশুভ! মাও পারে বটে!

তোর কিছু ছবি সেদিন ফেসবুকে আপলোড করবো ভাবছিলাম, করি নি। ভাবলাম তুই কি না কি মনে করবি। কিছু মনে করবি কি যদি আপলোড করি?

আজ থাক, অনেক রাত হয়েছে আর কালকের কাজও অনেক বাকি। কে জানে কবে আবার কথা হবে!

চিঠিটা পড়লে খুশি হতাম।

দেবাঞ্জন


 

পুনশ্চঃ  তোর বাবা মা ভালোই আছে, ভাই টি সি এসে চাকরি করছে। আগের সপ্তাহে দেখা করতে গেছিলাম, এবারও জিজ্ঞেস করলো, নতুন কারও সাথে মেলামেশা করছি না কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। তোর পুরনো ঘরটা একই রকম আছে, খালি তোর একটা ছবি টাঙ্গিয়েছে। প্রথম দিকে মালাও পরাত। আমি মানা করায় এখন আর পরায় না।


 


 


 


 


 


 


 


 


 


 


 


 


 


 


 


 


 

শ্রেয়া
  • 0.00 / 5 5
0 votes, 0.00 avg. rating (0% score)

Comments

comments